লিখেছেনঃ এম. আহসান গিলানী
এখন ‘বিএনপি ব্যর্থ’ হয়েছে কথাটি ভীষণভাবে, ভয়ংকরভাবে, অনবরত, অবিরল, অবিরাম, অবিশ্রাম ধারায় প্রচার করা হচ্ছে। একে ওকে দায়ী করলেও, সরকারী যন্তর মন্তর ধন্য পত্রিকাগুলো আকারে ইংগিতে বোঝাতে চেষ্টা করছে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানই সংকটের মুলে। তারা নিজেরা একা একা সিদ্ধান্ত নেন, নিজেদের সিদ্ধান্ত সকলের ওপর চাপিয়ে দেন, তারা কাউকে বিশ্বাস করেন না, বড় বড় নেতাদের পাত্তা দেন না ইত্যাদি আরও কত অভিযোগ। আর সমাধানের পথ হলো আওয়ামী লীগের প্রেসক্রিপশন মেনে সরকারের পায়ের উপর সেজদায় পড়ে থাকা সংবাদপত্রগুলোর নির্দেশিত পথে পা চালাতে হবে। তাতেই বিএনপি’র ইহলৌকিক তরক্কী লাভ নিশ্চিত হবে।
অদ্ভুত কথা! অবাক করা ব্যাপার! বিএনপি এর নেতা কর্মী ও সমর্থকদের চাইতে এদের দরদ এতা বেশী কেন? প্রথম কথা হলো, বিএনপি ব্যর্থ হয়নি। পাকিস্তান প্রস্তাব পাশ হয়েছিল ১৯৪০ সালে। আর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৭ সালে। ৭ বছর সময় লাগে সাফল্য পেতে। ভাষা আন্দোলনের সূচনা ১৯৪৭-এ, তুঙ্গ মুহূর্ত ১৯৫২, রাষ্ট্র ভাষার দাবী সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৬ সালে। ৫২ থেকে ধরলেও ৪ বছর পেরিয়ে যায়। ১৯৬৯ গণ অভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক ফল ইয়াহিয়া খার মার্শাল ল। ১৯৭১-এ শেষ পর্যন্ত পুরো জাতিকে ঝাপিয়ে পড়তে হয় মুক্তিযুদ্ধে। এরশাদকে বিতাড়িত করতে সংঘবদ্ধ বিরোধী দলের সময় লেগেছিল প্রায় ৮ বছর। দেখা যাচ্ছে কোন আন্দোলনের ফলই রাতারাতি বা তাৎক্ষনিকভাবে হাতে আসেনি। সময় লেগেছে। তারপরও সেই সব আন্দোলনকে কেউ কখনো ব্যর্থ বা বিফল ভাবেনি। ভাবতে পারেনি। ভাবার দরকার হয়নি।
কিন্তু বিএনপিকে হরদম শুনতে হচ্ছে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন, গেল গেল’ ধ্বনি। এই ‘গেল গেল’ ওয়ালারা তলিয়ে দেখেন না যে আমাদের ইতিহাসে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে এবারই প্রথম আন্দোলন গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল, হাজার কোশেশ করেও বিএনপিতে ফাটল ধরাতে পারেনি সরকার। এবারই প্রথম বাংলাদেশের শতধা বিভক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের লোকজন বেগম জিয়ার সঙ্গে একমত হয়েছিল। এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একবাক্যে (ভারত ছাড়া) বিএনপির আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল।
বিএনপির শত্রুরা ভালোভাবেই জানে এই দলটি দাঁড়িয়ে আছে প্রেসিডেন্ট জিয়ার ইমেজ, তাঁর কল্যাণ ও উন্নয়নমূখী রাজনীতি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, জিয়া পরিবার ও অযুত নিযুত সমর্থকদের উপর। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে কাজ করে নেতা কর্মীরা। এখন এই চারটি মূল স্তম্ভের নিচ থেকে কর্মী ও সমর্থকদের সরাতে হলে জিয়া পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেতা কর্মীদের নেতৃত্বহীন বিশৃংখলায় ঠেলে দিতে হবে। ভাঙতে হবে জিয়ার ইমেজ, খতম করতে হবে বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, তারেক রহমানকে বানাতে হবে ‘ভিলেন’। তারপর বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতি অভিভাবক শূন্য হলে সরাতে হবে এ স্তম্ভটিকে।
তারপরও নেতা কর্মীরা সরকারের ফর্মূলা মানছে না। কথা শোনে না বলেই তাদের উপর চলছে ফ্যাসিবাদী নির্মম নৃশংস নির্যাতন। সব
মিলিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মনোবল, নীতি ও নৈতিক সাহস বিনষ্ট ধারার জন্য যে এসব করা হচ্ছে, তা বুঝতে সক্রেটিসের দর্শন কিংবা গাজজালীর গ্রন্থ পাঠের দরকার পড়ে না।
শেখ হাসিনা কিংবা তার পুত্রধন ছাড়া আওয়ামী লীগ চলবে না এটা যেমন গোপালগঞ্জের সবচেয়ে বড় ধান্দাবাজ লোকটাও জানে, তেমনি জানে কুড়িগ্রামের নুন খাওয়া ঘাটের গরীব জেলেও। একই রকম ভাবে বিএনপির জন্য আবশ্যক ও অতীব জরুরী হলো জিয়া পরিবারের উপস্থিতি। এটাকে আবেগ, কৌশল, কিংবা ভাগ্য যাই বলেন, এটাই দক্ষিণ এশিয়ার নিয়তি। পাকিস্তানে ভুট্টো পরিবার ছাড়া পিপিপি চলবে না। ভারতে নেহেরু পরিবার ছাড়া কংগ্রেসের কথা কেউ ভাবতেও পারে না। শ্রীলংকায় মাভো বান্দরনায়েক কিংবা চন্দ্রিমা কুমারাতুঙ্গাও তো একই তরিকা বহন করে চলেছেন। এখানে সামিল আছেন, সৈয়দ আশরাফ, সোহেল তাজ, খায়রুজ্জামান লিটন কিংবা নাসিমও। অর্থাৎ এটাই দক্ষিণ এশিয়ার পদ্ধতি। এই পদ্ধতি ও নিয়তির কথা মাথায় রেখেই শেখ হাসিনা জয়ের পাশাপাশি সামনে নিয়ে আসেন পুতুল ও শেখ রেহেনাকে।
আবারও সরকারী মন্ত্রী, এমপি, নেতা এবং তাদের অনুগ্রহ ভাজন সংবাদপত্রের কাছে যাই। ১৯৯৬-এর চাইতেও তারা সংঘবদ্ধভাবে, পরিকল্পিতভাবে এবার প্রপাগান্ডার ঝড় বইয়ে দিয়েছে। প্রতিটি লেখার অন্তরে একটা আকুতি- বিএনপি বাঁচাও। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ অনেক বেশী যখন হয় তখন বলতেই হয় ‘ডাল মে কুচ কালা হে’। কারণ মার্কসের চাইতে বড় মার্কসিস্ট কিংবা মওলানা ভাসানীর চাইতে বড় কৃষক দরদী কেউ যখন সাজতে যায়, তখন তার মনোবাঞ্ছার ব্যাপারে সন্দেহ দেখা দিতেই পারে। আর সেটাই তো স্বাভাবিক। আর বিএনপির মঙ্গল চিন্তায় এবারের মতো আগেও শত্রুরা ব্যাকুল হয়ে পড়তো। ফলে এটাও কোন নতুন বিষয় নয়। এর আগে বিএনপিতে বুদ্ধিজীবী নাই, বিএনপিতে শিল্পী নেই, লেখক কবি নেই, বিএনপিতে কোন নিয়ম নীতি নেই। বিএনপিকে কিছু লোক খুবলে খুবলে খাচ্ছে।
মোসাদ্দেক আলী ফালুর ব্যাপারেও অনেক কুৎসিত ও কটু কথা এই শত্রুরা প্রচার করেছে। ভাব দেখিয়েছে মোসাদ্দেক আলী ফালুকে সরিয়ে দিলেই বিএনপি জেগে উঠবে। দেশের সব নদ-নদীতে বইতে থাকবে দুধের নহর। না হলে বিএনপি গেছে। দেখা গেল বাস্তবে কোনটাই সত্য হয়নি। আসলে ব্যক্তি গুরুত্বর্পূণ হলেও সিস্টেমেই যে বড় কথা এটা অনেকেই মানতে চায়না। কিন্তু আগের বারের চাইতে এবারের পার্থক্য হলো, আমাদের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের ব্যাপক মাথা ব্যথা। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের খাসলত ও মতলব পরিস্কার। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তাদের সৃষ্ট ব্রেন স্টরমিং-এর শিকার হয়েছেন জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা। তারাও ভিন্ন ভাবে সরকারের রেকর্ডই ঘ্যানর ঘ্যানর করে বাজিয়ে যাচ্ছেন।
আর জামায়াতের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীগণ এই হল্লা চিল্লায় এতটাই উৎফুল্ল যে, তারা ধরেই নিয়েছেন বিএনপির দিন শেষ। ইতিহাসের আস্তা কুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন খালেদা-তারেক? বিএনপিকে গুডবাই জানাবেন একশজন কেন্দ্রীয় নেতা! বিএনপি ভেঙ্গে খন্ড বিখন্ড হয়ে যাবে? তৃণমূল কর্মীরা দলে দলে আমীরে জামায়াতের হাতে বাইআত গ্রহণ করে ইক্বামাতে দ্বীনের বিজয় পতাকা উড্ডীন করার শপথে বলীয়ান হবে! হায় হোসেন! হায় হোসেন! বিএনপি শেষ হয়ে গেলো! বিএনপি শেষ হয়ে গেলো?




