লিখেছেনঃ ফিরোজ মাহবুব কামাল
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতা নিয়ে বহু লেখা হয়েছে, বহু ছায়াছবিও নির্মিত হয়েছে। কিন্তু যাদেরকে বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ বাঙালী বলা হচ্ছে তাদের দ্বারা যে নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে সে বিররণও কি সঠিক ভাবে তুলে ধরা হয়েছে? অথচ এটিও তো ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ। এটুকু না জানলে বাঙালীর ইতিহাসের পাঠই যথার্থ ও পূর্ণাঙ্গ হবে না। দেখা যাক তাদের কাণ্ডটি।
- ১৯৭১এর ২৬শে মার্চ কুষ্টিয়ার মত একটি মফস্বল শহর আওয়ামী ক্যাডারগণ কতটা হিংস্র রূপ ধারণ করেছিল তার বর্ণনা একজন প্রত্যক্ষ্যদর্শি দিয়েছেন এভাবে,“উর্দুভাষী এডিশনাল ডিপুটি কমিশনার ও মিউনিসিপ্যালটির ভাইস চেয়ারম্যানকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা মিছিল বের করে লাশ দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে মহা উল্লাসে শহর প্রদক্ষিণ করল। উর্দুভাষীদের দোকানপাট লুট ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। ভারতীয় হিন্দু সাংবাদিক ও সামরিক বাহিনীর অফিসারদের শহরে আনাগোনা দেখে বিশ্বাস না করে উপায় ছিল না যে দু দেশের মানচিত্রে যে সীমারেখা ছিল তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।-(সা`দ আহম্মদ,২০০৬)।”
- পাক আর্মী পাবনা জেলা দখল করে যখন ১৫ই এপ্রিল তারিখে হার্ডিঞ্জ ব্রীজ পার হয় তখন থেকেই (আওয়ামী লীগ) নেতারা (কুষ্টিয়া ছেড়ে) পালাতে শুরু করে। কিন্তু পালিয়ে যাওয়ার পূর্বে যে বীভৎস ও নারকীয় কাণ্ড আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ঘটিয়ে গেল এবং দেশের যে সম্পদ লুট করে নিয়ে গেল তা ছিল অচিন্তনীয়। জেলার সর্বত্র গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে উর্দুভাষীদের জড়ো করে হত্যা করা এবং সম্পদ লুট করার কাজ তারা ১২ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে করেছে। ট্রেজারি, ব্যাংক ইত্যাদি থেকে কোটি কোটি টাকা, সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে কয়েক লক্ষ মণ খাদ্য, কয়েক শত সরকারি জীপ,ট্রাক,ওয়াগান ক্যারিয়ার,রেলওয়ে ইঞ্জিন ও বগী ইত্যাদী লুট করে ভারতে নিয়ে গেল। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ পালিয়ে যাওয়ার সময় ব্যক্তিগত সম্পদ যা রেখে গেলেন নিয়ে গেলেন তার চাইতে হাজার গুণ বেশি।“-(সা`দ আহম্মদ, ২০০৬)।
- ১৯৭১এর ১৭ই ডিসেম্বরে ঢাকা শহরের মতিঝিলে বর্বরতার আরেকটি চিত্র ধরা পড়েছে প্রত্যক্ষদর্শির দৃষ্টিতে এভাবে, “রাস্তায় মানুষের হৈ চৈ শুনে জানালার পর্দা সরিয়ে যা দেখলাম তা ছিল সত্যই মর্মবিদারক। আদমজী কোর্ট ও বাওয়ানী বিল্ডিং এর উর্দুভাষী দারোয়ানগুলোকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে এবং মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার জন্য গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। দারোয়ানগুলো সংখ্যায় পনের-ষোল জন। অধিকাংশই বৃদ্ধ কিন্তু ওদের মৃত্যুর কারণ ওরা বাঙালী নয়। এদেশের মাটিতে ওরা জন্মায়নি এই ছিল ওদের অপরাধ। দু-চারজন পথচারী এই নৃশংস হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে মৃদু প্রতিবাদ করেছে, নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু উল্লাসে ফেটে পড়া মানুষের সংখ্যার তুলনায় এ ছিল নগণ্য’ -(সা`দ আহম্মদ, ২০০৬)।
- ঢাকার অবাঙালীদের উপর কিরূপ নারকীয় তাণ্ডব নেমে এসেছিল তার আরেক বিবরণ শুনা যাক আরেক প্রত্যক্ষদর্শী থেকে, “রাত ১১টার দিকে হঠাৎ হৈ চৈ আর কান্নার রোল শুনতে পেলাম। ইউসুফের বাসার সামনে ছিল একটা খোলা জায়গা। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম সেই খোলা জায়গায় কিছূ সংখ্যক অবাঙালিকে দাঁড় করানো হয়েছে গুলি করে মারার জন্য। কয়েকজন গেরিলা স্টেনগান তাক করে আছে তাদের বুক ও মাথা বরাবর। অবাঙ্গালিদের পোষক-আশাক দেখে মনে হলো তারা খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজন হবে। তাদের বৌ ছেলে মেয়েরা তখন গেরিলাদের কাছে মিনতি করে চলেছে সব কিছুর বিনিময়ে প্রাণ ভিক্ষা দেয়ার। নিজের চোখে দেখলাম এই সব মেয়ে নিজেদের অলংকার ছুঁড়ে দিচ্ছে গেরিলাদের দিকে। কিন্তু গেরিলাদের অন্তরে সামান্যতম করুণার উদ্রেগ হয়নি। এক এক করে তারা সেই রাতে সবগুলো পুরুষকে গুলি করে মেরে ফেলল। নিহতদের বৌ-ছেলে মেয়ের ভাগ্যে পরে কি ঘটেছিল তা আর কখনো জানতে পারিনি। এদের অপরাধ ছিল এরা অবাঙালী’-(ইব্রাহিম হোসেন, ২০০৩)।
- বাঙালী মুসলিমের ইতিহাসে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি হলেন এ্যাডভোকেট মৌলভী ফরিদ আহম্মদ। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও পার্লামেন্টেরিয়ান। ছিলেন অতি প্রতিভাবান ও পন্ডিত ব্যক্তি। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে তিনি সদস্য (এমএনএ) ছিলেন কক্সবাজার থেকে। নিজামে ইসলাম পার্টির পক্ষ থেকে তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীও হয়েছিলেন। অথচ তাঁকে যেরূপ বর্বরভাবে হত্যা করা হয় সেটি হালাকু-চেঙ্গীজ বা নাজী বর্বতাকেও হার মানাবে। তার নির্মম হত্যাকান্ডের বর্ণনাটি এসেছে এভাবে,”১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর মৌলভী ফরিদ আহমদকে গ্রেফতার করে লালবাগ থানায় নেয়া হয়। গেরিলারা ১৯শে ডিসেম্বর তাঁকে লালবাগ থানা থেকে ছিনিয়ে ইকবাল হলে নিয়ে যায়। সে সময় ইকবাল হলে ছিল গেরিলাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। এখানে গেরিলারা পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসীদের ধরে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে মেরে ফেলতো। আমি যখন জেল ধেকে বের হই তখন মৌলভী ফরিদ আহমদের দুঃখজনক পরিণতির কথা জহিরুদ্দিনের মুখে আদ্যোপান্ত শুনেছিলাম। জহিরুদ্দিন ছিলেন এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। গেরিলারা তাঁকেও ধরে নিয়ে ইকবাল হলে রেখেছিল। মৌলভী ফরিদ আহমদকে ইকবাল ধরে নিয়ে যায় সমাজতন্ত্রের লেবেলধারী কতিপয় কপট ছাত্র নেতা ও তাদের সঙ্গী-সাথীরা। তারা প্রথমেই ফরিদ আহমদকে মুক্তি দেয়ার কথা বলে তাঁর ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা নিজেদের নামে তুলে নেয়। তারপর শুরু হয় তাঁর উপর অকথ্য শারীরিক নির্যাতন। প্রথমে তাঁর চোখ তুলে ফেলা হয়। কান কাটা হয়। হাত ভেঙ্গে দেয়া হয়। সর্বশেষে দীর্ঘ নিপীড়নের পর ২৪শে ডিসেম্বর রাতে তাকে হত্যা করা হয়। তার আগে তাঁর জিহ্বা কেটে ফেলা হয়েছিল এবং শরীর থেকে অবশিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। নরপশুরা তাঁকে ঐ রাতেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের পিছনে একটি ডোবার মধ্যে ফেলে দেয়” -(ইব্রাহিম হোসেন,২০০৩)।
ধীরে ধীরে অতি নৃশংস ও বীভৎসভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডটিকে কি করে অতি বেশী বেদনাদায়ক করা যায় এবং সে অসহ্য বেদনাদায়ক মুহুর্তগুলোকে কি করে আরো দীর্ঘস্থায়ী করা যায়,পরিকল্পনা করা হয়েছিল সে ক্ষেত্রেও। অথচ তিনি কাউকে হত্যা করেছেন বা হত্যার সাথে জড়িত ছিলেন-আওয়ামী-বাকশালী চক্র আজও সে প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। মানব-ইতিহাসের এটি হলো অন্যতম অতি জঘন্য যুদ্ধাপরাধ। যুদ্ধের ময়দানে নেমে যারা হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করে আন্তর্জাতিক আইনে তাদেরকেও এভাবে হত্যা করার অনুমতি নেই। অথচ এরূপ হত্যাকাণ্ডটি যারা ঘটিয়েছিল, আওয়ামী-বাকশালী চক্রের বুদ্ধিজীবীরা তাদেরকেই চিত্রিত করছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালীরূপে। আরো লক্ষ্যণীয় হলো, এ বীভৎস হত্যাকাণ্ডটি যেখানে এ ঘটেছিল সেটি কোন ডাকাত-পল্লি নয়, কোন জেলখানাও নয়, এটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাস। জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলি কিভাবে দুর্বৃত্ত-কবলিত হয়েছিল এ হলো তার নমুনা।
- সিরাজগঞ্জের ইসমাইল হোসেন সিরাজী বাংলার মুসলিম জাগরণে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন ইসলামিক রেনেসাঁর প্রখ্যাত ও প্রধানতম কবি। আওয়ামী বাকশালীদের নৃশংস হামলার শিকার হয়েছিল এ পরিবারটিও। এ সিরাজী পরিবারের সন্তান ছিলেন সৈয়দ আসাদুল্লাহ সিরাজী। তাঁর অপরাধ, ইসলামের জাগরনে তার গভীর অঙ্গীকার ছিল। তিনি বিরোধীতা করেছিলেন পাকিস্তান ভাঙ্গার। এ অপরাধে তাঁকে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা অতি নির্মম ভাবে হত্যা করে। তাঁকে প্রথমে গ্রেফতার করে সিরাজগঞ্জ জেলে রাখা হয়। কিন্তু জেলও সে সময় বন্দীদের জন্য নিরাপদ ছিল না। আওয়ামী লীগের নেতা ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা যাকে ইচ্ছা তাকে জেল থেকে তুলে নিয়ে যেত। তাদেরক নির্যাতন করত এবং নির্যাতনের পর হত্যা করত। গেরিলারা (জনাব সিরাজীকে)হত্যা ও রক্তের জন্য এতখানি মরিয়া হয়ে উঠেছিল যে পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে ছিনতাই করে নিয়ে যায়। তাঁকে ও তাঁর সাথে আরো ১৫/১৬ জন পাকিস্তানপন্থীকে গেরিলারা ধরে নিয়ে প্রথমে শারীরিক নির্যাতন করে পরে গুলি হত্যা করে। তাদের লাশও ফেরত দেয়নি। যমুনার বক্ষে এসব লাশ ছুঁড়ে ফেলেছিল। পাকিস্তানপন্থিদের হত্যা করার এরকম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। যে যত বেশি দালাল(?) খুন করতে পারতো সেই তত বড় বীর হিসেবে চিহ্নিত হতো।”-(ইব্রাহিম হোসেন, ২০০৩)।
অন্যান্য জেলার ন্যায় নির্মম বর্বরতার বহু করুণ ঘটনা ঘটেছে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলাতে। তার কিছু বিররণ দেয়া যাক।
- “ছাগলনাইয়া থানার ইউপি চেয়ারম্যান ও মুসলিম লীগ নেতাকে ধরে নিয়ে শুধু নির্যাতনই করেনি, পানুয়া মাঠের মধ্যেই তাঁকে দিয়ে নিজ হাতে নিজের কবর খুঁড়িয়ে তার মধ্যে তাঁকে জোর নামিয়ে মাটি চাপা দিয়ে জ্যান্ত কবর দেয় আওয়ামী লীগাররা। নজরুল ইসলাম নামে একজন মুসলিম লীগ কর্মীকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রথমে ধরে নিয়ে সারা শরীরে খেজুরের কাটা ফুটিয়ে জয় বাংলা উচ্চারণ করতে বলে। নজরুল ইসলাম ছিলেন সুসাহিত্যিক এবং মনে-প্রাণে পাকিস্তানী আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি জয় বাংলা বলতে অস্বীকার করায় তাঁকেও নিজের কবর খুঁড়তে বাধ্য করা হয় এবং খেজুরের ডাল দিয়ে পিটাতে পিটাতে জ্যান্ত কবর দেয়া হয়’-(ইব্রাহিম হোসেন, ২০০৩)। বাংলাদেশ হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন নাগের নেতৃত্বে নোয়াখালীতে বহু আলেম ও মুহাদ্দিসকে ধরে নিয়ে লাইন বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমি প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে থেকে শুনেছি বহুদিন ধরে একটি খাল আলেম ওলামাদের লাশে পূর্ণ ছিল। -(ইব্রাহিম হোসেন, ২০০৩)।
- মুহাম্মদ ইলিয়াস ছিলেন ইসলামি ছাত্রসংঘ নামক ছাত্রসংগঠনের ফেনীতে স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। তাঁকে গ্রেফতারের পর নানা ভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর জীপের পিছনে তাকে বেঁধে দাগনভূইয়া থেকে ফেনীতে নেয়া হয়। উত্তপ্ত লোহার রড দিয়ে তাঁকে মারা হয়। চোখ তুলে নেয়া হয়। নাক-কানও কেটে ফেলা হয়। অবশেষে হত্যা করা হয় এবং তার লাশকে দাফন না করে ফেনীর চৌরাস্তায় ফেলে রাখা হয়।
- আরেক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হল ১৪ বছরের ছাত্র জালালুদ্দীন।তাঁরও অপরাধ ছিল সে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। তাঁকে জীবন্ত কবর দেয়া হয়। কবরটিও তাঁকে খুঁড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। কবর খুঁড়ার পর তাতে খেজুরের কাটা বিছানো হয়েছিল এবং তার উপরই জালালুদ্দীনকে শুতে বাধা করা হয়েছিল। এরপর তাকে মাটিচাপা দেয়া হয়।
- মাওলানা আযহারুস সোবহান ছিলেন এক সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষক। তাকে মারতে মারতে তার বুকের ছাতির হাড় ভেঙ্গে ফেলা হয়।তাঁর চোখের সামনেই তাঁর তিন জন ছাত্রের মাথা কেটে ফেলা হয়। তাদের ছিন্ন মথা দিয়ে মালা বানিয়ে মাওলানা সাহেবের গলায় সেটি পড়িয়ে দেয়া হয়।এরপর তাঁকে তিন দিন তিন রাত দাড় করিয়ে রাখা হয় এবং পড়ে হত্যা করা হয়।
- মাওলানা পীর দেওয়ান আলী ছিলেন ঢাকার একজন আলেম। তাঁরও অপরাধ তিনি অখণ্ড পাকিস্তানের বিভক্তিকে সমর্থন করেননি। তাঁর মুখের দাড়ি কেটে ফেলা হয়। তাকে পিটানো হয়, পিটাতে পিটাতে হাড্ডি ভাঙা হয়। তারপর হাতপা বেধে মাঝ নদীতে ফেলা হয়। -( Matiur Rahman & Naeem Hasan, 1980)।
আন্তর্জাতিক আইনে এগুলো ছিল বীভৎস রকমের যুদ্ধাপরাধ। অথচ এসব অপরাধের নায়কদের বিচার না করে তাদেরকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীর খেতাব দেয়া হয়েছে। শুধু মফস্বলেই নয়, খোদ ঢাকার কেন্দ্র বিন্দুতে সে মানবেতর অপরাধগুলো যে কতটা বীভৎসতা নিয়ে সংগঠিত হয়েছিল তার বিবরণ বিদেশী পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছিল। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সংঘটিত তেমন একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ছেপেছিল নিউজ উইক ম্যাগাজিন। সে বিবরণটি ছিল নিন্মরূপঃ

“As a frenzied, shouting mob of 5,000 Bengalis screamed encouragement, young Mukti Bahini guerrillas methodically tortured four suspected Pakistani quislings. For 30 minutes, the guerrillas battered the bound bodies of the helpless prisoners with kicks and karate blows with their bayonets. Quietly and systematically, they began stabbing their victims over and over again –all the time carefully avoiding the prisoners’ hearts. After more than ten minutes of stabbing, the grisly performance seemed at an end. The soldiers wiped the blood from their bayonets and began do depart. But before they left the scene, a small –perhaps a relative of one of the victims-flung himself on the ground next to a prisoner’s near lifeless body. In an instant the guerrillas were back, kicking the boy and beating him with their rifle butts. And as he writhed, the child was trampled to death by the surging crowd.” –(Newsweek, New York, 3rd January, 1972). অনুবাদঃ সমবেত ৫ হাজার বাঙালীর উত্তেজনাপূর্ণ উম্মত্ততা ও চিৎকারপূর্ণ উৎসাহের মধ্য দিয়ে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা চার জন সন্দেহভাজন রাজাকারের উপর উপর্যপরি নির্যাতন চালাচ্ছিল। আধা ঘন্টা ধরে হাতপা বাঁধা সে অসহায় রাজাকারদের উপর লাথি,ঘুষি এবং রাইফেলের বেয়োনেট দিয়ে আঘাত হানা হচ্ছিল। তাদের দেহে তারা বার বার চাকু ডুকিয়ে দিচ্ছিল, তবে সেটি নীরবে এবং মনে হচ্ছিল পরিকল্পিত পদ্ধতিতে। প্রতিবারেই তারা সতর্কতার সাথে হৃৎপিণ্ড এড়িয়ে যাচ্ছিল। প্রায় ১০ মিনিট চাকু দিয়ে খুঁচানোর পর মনে হচ্ছিল নিষ্ঠুর কর্মটি বোধ হয় শেষ হলো। সৈন্যরা তাদের বেয়োনেট থেকে রক্ত মুছে নিল এবং চলে যাওয়া শুরু করলো। তখনও তারা স্থান ত্যাগ শেষ করেনি এমন সময় এক শিশু –সম্ভবত নিহতদের কোন আপনজন হবে, ঝাঁপিয়ে পড়ে এক লাশের পাশে। মুহুর্তের মধ্যেই গেরিলারা আবার ফিরে আসে। শুরু করে তাঁর উপর লাথি এবং রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত। নিস্তেজ সে শিশুটি একবার নড়ে উঠেছিল। কিন্তু ফুলে ফেঁপে উঠা সমবেত জনতা পদপিষ্ট করে তাঁর প্রাণবায়ু নিমিষেই নিঃশেষ করে দেয়।”
একাত্তরের চেতনার নামে যেসব বীভৎস নিষ্ঠুরতাকে বাঙালীর বীরত্বপূর্ণ শ্রেষ্ঠ কর্ম বলে প্রশংসা করা হয় তার আরো কিছু নমুনা দেয়া যাক।
- ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন তার স্মৃতিচারনে লিখেছেন,“১৯৭১ সালে অনেক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে যাকে কোলকাতা স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে দেশপ্রেমের অত্যুৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরা হতো। শুনেছি এক পরিবারে বাপ ছিলেন পাকিস্তান সমর্থক আর ছেলে যোগ দিয়েছিল বিদ্রোহী বাহিনীতে। একরাত্রে এসে সে বর্শা দিয়ে বাপকে হত্যা করে। এবং পরদিন তারই প্রশংসা কোলকাতা থেকে প্রচারিত হয়।
- আর একটি ঘটনার কথা শুনেছি, সেটা ঐ রকমই লোমহর্ষক। ফরিদপুরের এক ব্যক্তি এক বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। তার শ্বশুর ছিল মুসলিম লীগের লোক। দেশে সে স্ত্রী এবং ছোট একটি মেয়েকে রেখে গিয়েছিল। একদিন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে শ্বশুরবাড়ীতে চড়াও হয়। নিজ হাতে প্রথমে শ্বশুরকে হত্যা করে। পরে অনুরূপভাবে স্ত্রী ও কন্যাকেও খতম করে। এসব জঞ্জাল থাকলে দেশ উদ্ধারের কাজে বাধার সৃষ্টি হবে এজন্য সে পথের কন্টক দূর করে দিয়েছিল। তার বাবা-মা বেঁচেছিলেন কিনা জানি না, তবে আরো শুনেছি ঘরে এক বোন ছিল তাকে টেনে নিয়ে তার সহকর্মী এক হিন্দুর হাতে স্ত্রী হিসেবে সঁপে দেয়। সে যে সত্যিকার অর্থে বাঙালী এবং কোনো রকমের সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ মানে না দুনিয়ার সামনে সে কথা প্রমাণ করার প্রকৃষ্ট উপায় হিসাবে এই পন্থা অবলম্বন করে। এই হত্যাকারীকে পরে রাষ্ট্রীয় উপাধিতে ভূষিত করা হয়।”-(সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, ১৯৯৩)
- সা’দ আহম্মদ,২০০৬; আমার দেখা সমাজ ও রাজনীতির তিনকাল (বৃটিশ-ভারত,পাকিস্তান ও বাংলাদেশ),খোশরোজ কিতাব মহলো,১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০
- ড.সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন,১৯৯৩;একাত্তরের স্মৃতি,নতুন সফর প্রকাশনী ৪৪,পুরানা পল্টন দোতালা,ঢাকা ১০০০
- ইব্রাহিম হোসেন,২০০৩;ফেলে আসা দিনগুলো,নতুন সফর প্রকাশনী,৪৪, পুরানা পল্টন দোতালা,ঢাকা ১০০০
- Matiur Rahman & Naeem Hasan, 1980; Iron Bars of Freedom, News and Media Ltd., 33 Stroud Green Road, London N4 3EF




