বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির অবস্থা যে খারাপ, বৃহৎ অর্থে, তা আমরা সকলেই বুঝি। বিশেষভাবে আমরা তিনটে উদাহারণ টানতে পারি।
১. জামাতে ইসলামির অবস্থা খুবই খারাপ। প্রধান নেতাদের ফাঁসি দেয়া হচ্ছে, ঘোষিত ও অঘোষিতভাবে দলের সক্রিয়তা নিষিদ্ধ। তারচে বড় কথা, জামাতি রাজনীতির বয়ান নিয়ে নানা প্রক্রিয়ায় জনসাধারণের মধ্যে সন্দেহ ও প্রশ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে। যদিও, আদতে জামাতকে যে কয়টা বিষয়ে প্রশ্ন করা যায়ঃ মুক্তিযুদ্ধ,মতাদর্শিক রাজনীতি ও সহিংসতা, আওয়ামীলীগকেও ঠিক একই প্রশ্ন করা যায়।খোদ আহমদ ছফাও এই প্রশ্নগুলো তোলেছেন।
২. ট্র্যাডিশনাল সমাজে কওমি মাদরাসার সঙ্কটটা একটু ভিন্ন। বর্তমান সরকার আপাতত তাদেরকে হাতে রাখতে চাচ্ছে।তাদের রাজনীতিকে বিএনপি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হচ্ছেন। লোভও দেখানো হচ্ছে। ভয় ও জঙ্গি মামলায় গ্রেফতার।মাদরাসা বন্ধ। একটা গৃহপালিত বিরোধীর ভূমিকায় তাদেরকে নিয়ে যাবার চেষ্টা সরকারের আছে এবং একই সাথে জিহাদি ইস্যুতে সহযোগিতা গ্রহণের চেষ্টা।
৩. সবশেষে, সামাজিক পরিসর থেকে বের করে ধর্মকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেবার চেষ্টা। মূলত জামাতের সাথে বিরোধটা যাতে হেফাজতের ঘটনার মত সমাজে ইসলাম বিরোধিতা আকারে হাজির না হয়, সেজন্যই এই চেষ্টা। তবে মুশকিল হচ্ছে, মীমাংসা কিছুতেই আসছেনা।
রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ভেঙ্গে পড়ছে।রাষ্ট্রীয় আইন, বৈধতা ও সহিংসতা ভেঙ্গে পড়ছে। রাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষমতাগ্রহণ, জামাত ও বিএনপিকে বৈধ পরিসর থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা ও মাদরাসা ও মসজিদে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বিস্তারিত করার প্রয়াস সরকার চালাচ্ছে। মুশকিল হচ্ছে রাষ্ট্রের মতাদর্শিকরণ, বৃহৎ জনগণকে বৈধ পরিসর থেকে বিতারিত করণ ও যে মাদরাসা ও মসজিদ সরকারের কোন নৈতিকতা ও সাহায্যে বড় হয়নি, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ প্রায় অসম্ভব। তারও আগে দুইটি প্রশ্ন কঠিন ভাবে হাজির হচ্ছে!
১. অমীমাংসীত ইসলাম প্রশ্ন
বাংলাদেশে আমরা কি ইসলাম প্রশ্ন মীমাংসা করতে পেরেছি এবং একটা ঐক্য রাষ্ট্র? প্রশ্নটা যত সহজ মনে হচ্ছে, তত সহজ নয়।কোন রাষ্ট্রে যদি তার বিশ্বাস ও নৈতিকতার সাথে আইন ও সিস্টেমের মিল না থাকে তাহলে সেখানে সংঘর্ষ জরুরি হয়ে উঠে। বিশেষত, ইসলামের মত সামগ্রিক ধর্মে। আমরিকা, ভারত বা রাশিয়াতেও কিন্তু রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে এই বিরোধ নেই। তারা নিজেদের মত মীমাংসা করে নিয়েছে। ফলে, প্রশ্নটা ইসলামি রাজনীতি বা শরিয়া কায়েমের প্রশ্ন নয়।
আরও গুরতর হল মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও বিশ্বাসের প্রবণতা অন্যান্য ধর্মের চেয়ে বেশি। একজন মুসলমান যখন দেখছেন সরাসরি ইসলাম বিরোধিতা চলছে এবং ব্যাখ্যাহীনভাবে, তখন তিনি ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় বিরোধ লালন করা শুরু করছেন।অবচেতনভাবে নৈতিকতা ও ইনসাফ প্রশ্নে ইসলামের স্বপ্ন প্রবলভাবে কামনা করা শুরু করেছেন। এই অন্ধকার সময় তাদের মধ্যে স্বপ্ন আরও বাড়াচ্ছে।অনেক ক্ষেত্রে না বুঝেই।
২. ৭১ কে সাম্প্রদায়িক মতাদর্শে রুপান্তর
একাত্তরের অর্থ ও রাজনৈতিক মুক্তির যুদ্ধকে পরবর্তীতে মতাদর্শে রুপান্তরিত করা হয়েছে। ফলে, আওয়ামীলীগের সেকুলার অংশ ও বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী-সাহিত্যিক- সুশীল শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রকল্প একটা সাম্প্রদায়িক প্রকল্প আকারে হাজির হয়েছে। যে ট্র্যাডিশনাল বাঙালি মুসলিম সমাজ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ছিল, বিহারী, সাতচল্লিশের দেশভাগের স্বপ্ন, ইসলাম সব চূর্ণ করে একটা বিশেষ শ্রেণীর রাষ্ট্র করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। ফলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। যদিও মুক্তিযুদ্ধে এই সুশীল শ্রেণীর ভূমিকা নিস্ক্রিয় বা পাকিস্তানের পক্ষেই ছিল। যে শামসুর রাহমান, মৃত মুনির চৌধরিসহ যে সাহিত্যিকরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ফ্যান্টাসি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন তারা পাকিস্তান সরকারের চাকরিতে পেট ভরেছেন। চেতনার জাফর স্যারের বাবা পাকিস্তান সরকারের পুলিশে চাকরি করা অবস্থায় মারা যান।
ইসলামি রাজনীতির মূল সমস্যা
বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির মূল সমস্যা হচ্ছে তারা রাষ্ট্র, বৃহত্তর রাষ্ট্র ও ইসলামি আকিদার প্রশ্ন তোলতে পারেননি। আগেই রাজনীতিতে সফল হবার চেষ্টা করেছেন। বলে রাখি, রাষ্ট্রগঠন ও আকিদার সাথে রাজনীতির মোটাদাগে ফারাক আছে। ক্ষমতা ও নৈতিকতা ধরণ কি হবে এর মীমাংসা ছাড়া রাষ্ট্রগঠন সম্ভব নয়। অনেকে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধে প্রাক-জামাতিদের পরাজয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে গেছে। হয়নি। আজকের জামাতিরা তো মুক্তিযুদ্ধের পরের সন্তান এবং যে কোন বিচারে মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক শ্রেণীর তুলনায় আলেম মৃতের সংখ্যা বেশি,বৃহত্তর ধর্মীয় সমাজের হিসেব বাদ রেখেই।
অপর দিকে, শরিয়া আইন ও ইসলামি শাসনের চেয়ে গুরতর বিষয় হল রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি ধর্মের বাধ্যতাকে অস্বীকার করা হয় তাহলে আকিদার প্রশ্ন এসে যায়। কোরআন শরিফের রাজনৈতিক আয়াত বলে পরিচিত আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের আনুগত্য করো এবং শাসনবর্গের। ফলে, যদি আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের আনুগত্য না থাকে তাহলে ইমান-কুফরের প্রশ্ন এসে যায়।
ফলে, বর্তমান সঙ্কটটা নিছক ইসলামি রাজনীতির সঙ্কট নয়। রাষ্ট্র, সরকার ও ক্ষমতাবানদেরও সঙ্কট। যদি এর মীমাংসা না হয় তাহলে দেশে গৃহযুদ্ধ, বিদেশি আক্রমণ আসতে বাধ্য। এবং ব্যাপক সহিংসতা। নিশ্চয় সহিংসতা রাষ্ট্র ও বিরোধীদের মধ্যে ফারাক করতে শিখবেনা। জামাতি, হেফাজতি বা বামের মধ্যেও না।
( আগামী পর্বে সমাপ্ত)




