আমরা হচ্ছি আল্লাহর ‘খলীফা’। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলছেন-
“আমি পৃথিবীতে খলীফা প্রেরণ করতে চাই” – বাকারা ৩০
এই খলীফার স্বরূপ কি? কি তার স্বাধীনতা আর কি তার সীমাবদ্ধতা? এটাকে সহজে বুঝার জন্য আমরা খলীফাকে “সীমিত স্বায়ত্তশাসনের” সাথে তুলনা করতে পারি।
আমরা জানি যে, স্বায়ত্তশাসন হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকার বা রাজ্য সরকার কিছু ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে পারে কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। যেমন আমাদের বাঙ্গালীর ৬ দফায় ছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবী।
তেমনি খলীফা হিসাবে “সীমিত স্বায়ত্তশাসনের” মধ্য দিয়ে আমরা কিছু বিষয়ে স্বাধীনতা লাভ করে থাকি। অর্থাৎ আমাদের কর্মের স্বাধীনতা। মানুষ ইচ্ছা করলে ন্যায় কিংবা অন্যায়, সৎ কিংবা মন্দ, প্রজ্ঞা কিংবা প্রবৃত্তি উভয় পথেই পথ চলতে পারে দুনিয়ার বুকে।
অর্থাৎ দুনিয়ায় সরল ও বক্র উভয় পথই মানুষের জন্য উন্মুক্ত। যেমন আল্লাহ বলছেন-
“আর সোজা পথ বলে দেয়ার দায়িত্ব আল্লাহর উপর। যেখানে বাকা পথও রয়েছে।” – সুরা নাহলঃ ০৯
আর আল্লাহ যে এ ব্যাপারে বাধ্য করবেন না কিংবা স্বাধীনতা দিয়ে দেয়া হয়েছে, সে ব্যাপারে আল্লাহ বলেন-
“কিন্তু তোমরা যদি অবাধ্যতা কর, তবে জেনে রাখো, আমাদের রাসুলের কাজ শুধু নির্দেশকে স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।” – মায়েদাঃ৯২
এবার আমরা লক্ষ্য করব, খলীফাকে স্বাধীনতা দেয়া হলেও তার সাথে আল্লাহর একটা আদি চুক্তি রয়েছে। আল্লাহ বলছেন-
“আর হে নবী! লোকদের স্মরণ করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা, যখন তোমাদের রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করেছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমি কি তোমাদের রব নই?” তারা বলেছিল, “নিশ্চয়ই তুমি আমাদের রব, আমরা এর সাক্ষ্য দিচ্ছি।”১৩৪ এটা আমি এ জন্য করেছিলাম যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা না বলে বসো, “আমরা তো একথা জানতাম না।” আরাফঃ ১৭২
এখানে লক্ষ্যনীয়, আল্লাহ আমাদের সাক্ষী বানিয়েছেন এবং আমাদের তা স্পস্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের চিন্তা, বুদ্ধি, সজ্ঞা, প্রজ্ঞা তথা মানব জ্ঞানের সর্বচ্চ ব্যাবহার করেও কি সেই সাক্ষ্যদানের কথা আমরা স্মরণ করতে পারি?
যদি না পারি তাহলে, আল্লাহর এই কথার হাকিকত কি?
হ্যা, আল্লাহ তা আমাদের স্মরণে এনে দেয়ার জন্য বিকল্প ব্যাবস্থা বা মাধ্যম ব্যাবহার করেছেন। আর সেই মাধ্যমই হচ্ছে নবী-রাসুল। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলছেন-
“এবং আমরা প্রত্যেক জাতির নিকটে একজন পয়গম্বর পাথিয়েছি” – নাহলঃ৩৬
এই আলোচনার মধ্যে আমরা বুঝতে পারলাম, কেন রিসালাত দরকার? এর উদ্দেশ্য কি? অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ্ থেকে আদিসাক্ষ্য ও সঠিক পথ, নবী-রাসুলগন দেখিয়ে দিবেন।
কিন্তু খলিফাদের সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য যে সকল নবী-রাসুল দুনিয়ায় আসবেন তাদের আমরা কিভাবে চিনতে পারব?
আমরা সাধারণ ভাবে জানি বা সবচেয়ে প্রচলিত মত হচ্ছে-
“নবুয়তের জন্য মুজিযা শর্ত এবং এটাই নবুয়তের চিহ্ন”
মূলত এটা “প্রকাশ্যবাদী আশারিয়া” মাজহাবের মতবাদ। আর যেহেতু আমরা আশারিয়াবাদ দ্বারা সর্বাধিক প্রভাবিত তাই, সমাজে এ মতটিরই সবচেয়ে প্রসার ঘটেছে। বিশেষত আব্বাসীয় আমলে এ মতের সবচেয়ে বেশি প্রচার ও প্রসার হয়।
যেমন, “মওয়াকিফ” গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ-
“পয়গম্বর হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ সম্বোধন করে বলেছেন- “আমি আপনাকে পাঠিয়েছি” অথবা বলবেন- “আপনি আমার পক্ষ থেকে লোকদের বানী পৌঁছে দিন” অথবা এ ধরনের কিছু বলেছেন। পয়গমর হওয়ার জন্য যোগ্যতার কোন শর্ত নাই। আল্লাহ নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তাকেই এ বিশেষ রহমত দান করেন”
অর্থাৎ, কিভাবে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে যে, অমুক ব্যক্তির সাথে আল্লাহর কথা হয়েছে? এর জন্য মুজিযা দরকার হবে ,যার দ্বারা মানুষ বুঝবে যে ইনিই আল্লাহর পয়গম্বর। এটাই “প্রকাশ্যবাদী আশারিয়া”দের কথা।
কিন্তু নিরেট “মুজিযা” দ্বারা কি “নবী-রাসুল” চিনা সম্ভব?
সম্ভবত, না!
কারণ, আব্দুল্লাহ ইবনে মুকান্না, জরোয়াস্টাররাও অনেক বড় বড় অলৌকিক ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন । পাশাপাশি তারা নবুয়তের দাবীও করেছিলেন! তাহলে মুজিযা ও যাদুর মধ্যে আমরা পার্থক্য করব কিভাবে? সবাই-ই তো যাদুকে নিজ পক্ষের “মুজিযা” বলে দাবি করবে!
ফলে, ইমাম গাজ্জালী, ইমাম রাজী, ইবনে রুশদ, আল্লামা রাগিব ইস্পাহানী, শাহ ওয়ালীউল্লাহ, আল্লামা শিবলী নোমানী সহ অধিকাংশ মুসলিম দার্শনিকগন এ মতবাদ ত্যাগ করেন এবং নিজস্ব পদ্ধতিতে নবুয়তের বিষয়ে আলাপ করেন।
আমরা প্রকাশ্যবাদী আশারিয়াবাদের সমালোচনায় এ সকল দার্শনিকগণের মতামত একটু খেয়াল করব-
ইমাম রাজী ‘সুরা আনকাবুতে’র তাফসীরে বলেনঃ-
“পয়গম্বরীর জন্য মুজিযা পূর্বশর্ত নয়”
“হজরত শীশ, ইদ্রিস ও শুয়াইব(আ) প্রমুখ নবীদের কাছে কোন মুজিযা অবতীর্ণ হয়েছে বলে জানা যায় না”
শাহ ওয়ালীউল্লাহ “হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ” গ্রন্থে বলেনঃ-
“নবুয়তের স্বরূপের সংগে মুজিযা , দোয়া কবুল হওয়া এবং এ ধরনের অন্যান্ন কোন বিষয়ের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু অধিকাংশ সময়ে এগুলো নবুয়তের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে দেখা যায়”
ইমাম গাজ্জালী “মুনকিজ মিনাদ দালাল” গ্রন্থে বলেন-
“আপনি(প্রকাশ্যবাদী আশারিয়া) এভাবেই নবুয়তের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন; লাঠি সাপে পরিণত হওয়া বা চাঁদ বিদীর্ণ হওয়া- এসবের উপরে ভিত্তি করে নয়”
আল্লামা রাগেব ইস্পাহানী বলেনঃ-
“দুই ধরনের লোক মুজিযা অনুসন্ধান করেঃ-
১- যারা আল্লাহর বানী ও মানুষের বানীর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না।
২- আর যারা তদপরি গোঁড়ামিও করে।”
অর্থাৎ আমরা এ সিদ্ধান্তে আসতে পারলাম যে, মুজিযা দ্বারা নবী-রাসুল চিহ্নিত করা সম্ভব না। তাহলে আমরা কিভাবে নবী-রাসুল চিনতে পারব?
আল্লামা শিবলী নোমানী “মুসলিম দর্শন” গ্রন্থে বলেনঃ-
“প্রথমে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, যথার্থ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সৎ কাজ বলতে কি বুঝায়? এ বিষয়টি স্থিরকৃত হওয়ার পড়ে যদি দেখা যায় যে, কোন ব্যক্তি লোকদের সত্য ধর্মের দিকে দাওয়াত দিচ্ছেন এবং তার বানীতেও বিরাট প্রভাব রয়েছে, তখন আমরা বুঝে নিবো যে, তিনি সত্য পয়গম্বর এবং তার অনুসরণ করা আবশ্য কর্তব্য। এ মতবাদই যুক্তিবাদের অতি নিকটবর্তী”
ইমাম গাজ্জালী “এহইয়াউল উলুমুদ্দীন” গ্রন্থে বলেনঃ-
“যদি কোন ব্যক্তির সম্পর্কে এ প্রশ্ন উঠে যে, এ ব্যক্তি কি নবী? নাকি নবী নয়? তবে এ প্রশ্নের সমাধান এভাবে করে দেব যে, ইমাম শফেই যে একজন বড় ফকিহ ছিলেন, তা আমরা কিভাবে নিশ্চিত হতে পারি?
ফিকাহ শাস্ত্রে তার ভাল ভাল রচনা আছে বলেই আমরা তাকে ফকিহ মনে করি। এমনিভাবে আমরা যখন কুরআনের প্রতি তাকাই এবং বুঝতে পারি যে , নবুয়তের লক্ষণগুলি কোন এক বিশেষ ব্যক্তির শব্দে শব্দে প্রতিফলিত, তখন নিশ্চিতভাবে ধারণা করি যে, এর ধারক ও বাহক পয়গম্বর বই আর কিছু নন।”
অর্থাৎ আমরা এ সিদ্ধান্তে আসলাম যে, নিরেট মুজিযা দিয়ে আমরা পয়গম্বর চিনতে পারব না বরং নবীদের সার্বিক বৈশিষ্টসমূহ ও ন্যায় পথের দিকে আহ্বানের দিকে লক্ষ্য রাখব।
(আজকের “#ক্লাসরুম” পাঠচক্রে প্রদত্ত লেকচার হুবহু তুলে ধরা হলো। রিসালাত একটি বিস্তর ব্যাপার, এখানে সামান্য কিছু বিষয় আলোকপাত করা হয়েছে। আপনাদের সকলের ক্রিটিক ও পরামর্শ আশা করছি।)




