লিখেছেনঃ হাফেজ নূরুজ্জামান
এক.
এই মুহূর্তে ধর্ম হিসেবে ইসলামের কাজ কি? প্রশ্নটি জটিল হলেও এর উত্তর খুঁজে বের করাটা একজন মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব বটে। তবে প্রশ্নটি এভাবেও করা যায়-মুসলিম হিসেবে আমাদের কাজ কি? ইসলামের কাজ মানেই একজন মুমিন মুসলমানের কাজ। মুসলিম হিসেবে আমাদের কাজ হল,ইসলামের কাজ করা। কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মানা। আমরা কি তা করছি? এই উপলব্ধি থেকেই প্রায় দুই যুগের বেশি সময় আগে আল্লামা মুহাম্মদ কুতুব প্রশ্ন রেখেছিলেন, আমরা কি মুসলমান? (২০১৪সালে সৌদী আরবে নির্বাসিত আবস্থায় আল্লামা মুহাম্মদ কুতুব ইন্তেকাল করেন)

আসলে এই প্রশ্নটি এখনও প্রাসঙ্গিক এবং সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে। এই প্রশ্নের ভেতর দিয়ে আল্লামা কুতুব আসলে দেখিয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম এবং ওই সময়ের মুসলমানগণ ইসলামকে কীভাবে দেখতেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ইসলামের গুরুত্ব। কোরআন এবং হাদিসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তিনি নিরুপণ করেছিলেন ইসলামের অনস্বীকার্য মাহাত্ম। মুসলিম সমাজ কীভাবে সেই মাহাত্মের পথ থেকে ক্রমশ দূরে গেছে এবং সেই বিচ্যুতির ধরণ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেছিলেন তিনি। আমরা, আজকের মুসলমান সমাজও সেই বিচ্যুতির পথ থেকে ফিরে আসতে পারিনি বরঞ্চ আরও গভীর তলদেশে যাচ্ছি এক ধরনের মোহ, দুশ্চিন্তা, অর্থনৈতিক প্রপাগান্ডা এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কারণে।
দুই.
মনে রাখতে হবে, শত্রুর চেয়ে ভয়ঙ্কর হচ্ছে মূর্খতা । এই মূর্খতা যতক্ষণ না মন ও মনন থেকে দূর করে ইসলামের অনুশীলন শুরু করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বাস্তবতায় দেশীয়, আন্তঃদেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের প্রেক্ষাপটে মুসলমান হিসেবে নয়, বরং কেবল রাজনৈতিক বিশ্বের নূন্যতম একজন ভোটার-মানুষ হয়ে টিকে থাকতে হবে, ক্ষেত্র বিশেষ বাধ্যও হতে হবে। ধর্ম হিসেবে ইসলামের সৌকর্য, সৌন্দর্য, মাহাত্ম এবং একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামকে সামান্যতম অনুশীলন করতে পারবো না।
আজকের পৃথিবীতে ধর্ম হিসেবে ইসলামকে অন্যান্য ধর্মের মতোই দেখার চেষ্টা চলছে এবং সে চেষ্টা দিনকে দিন অব্যাহত আছে। শুধু ধর্ম হিসেবে ইসলামকে দেখার প্রবণতার মধ্যে এক ধরনের সুবিধা আছে। সে সুবিধাটি হচ্ছে কেবলমাত্র ধর্ম হিসেবে দেখলে, এর একটি নিরীহ দৃষ্ঠিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। সেটি হচ্ছে পালন করুণ বা নাই করুন, এতে করে রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বচালকদের কোনও ‘অসুবিধা’থাকে না। এ ‘অসুবিধা’ হচ্ছে নৈতিকতার, এ ‘অসুবিধা’ হচ্ছে ন্যায়-অন্যায় এবং সত্য-মিথ্যার। এই নৈতিকতা কিংবা সত্য-মিথ্যাকে এক ধরনের আপেক্ষিক বিষয় হিসেবে তুলে ধরে সমস্ত রাষ্ট্রনৈতিক-অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে হালাল করে ফেলা যায়। এতে করে রাষ্ট্রের জনগণ কোনও ধরনের প্রশ্ন ওঠাতে পারে না।
‘অসুবিধা’ র মধ্যে আরও একটি হচ্ছে বাজারে প্রচলিত প্রগতিশীলতার। এই প্রগতিশীলতা হচ্ছে স্বেচ্ছাচারীতা, এই প্রগতিশীলতা হচ্ছে ব্যাক্তির নৈতিক কোনও অবস্থান না রাখা। এর মানে কি? মানে হচ্ছে একজন মানুষ তার চিন্তা-চেতনার বাস্তবায়নে যে নৈতিক বাঁধাটি অতিক্রম করতে ভয় পান, সে বাঁধাটি না থাকা। পবিত্র ধর্ম ইসলাম এই নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। এবং কেবলমাত্র শিক্ষা নয় নৈতিক ভিত্তিমাত্রই একজন ব্যাক্তি মানুষ হিসেবে পরিণতি লাভ করতে পারে। তো রাষ্ট্র কিংবা প্রতিষ্ঠান, তার নাগরিকের যে কোনও নৈতিক ভিত্তি টলাতে পারলেই কেবল তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ হয়। তখন, রাষ্ট্রের বা প্রতিষ্ঠানের কোনও অনৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না।
ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সা. যে কথাটি বলেছেন, যে শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার পাওনা বুঝিয়ে দাও; এই কথাটি কেবলমাত্র একটি উপদেশ নয়। এটি অর্থনৈতিক রাষ্ট্রের জন্য একটি বার্তাও। শ্রমনির্ভর রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি নীতিমালাও বটে। কিন্তু কি দেখা যাচ্ছে? দেখা যাচ্ছে, যে, প্রায় সাড়া দুনিয়ায়ই শ্রমিকদের বেতনভাতার দাবিতে রাস্তায় নামতে হয়। অন্যদিকে এই শ্রমিকদের প্রাপ্য দাবিকে দমনের জন্য রাষ্ট্রের আইনশৃংখলাবাহিনীও সক্রিয় হয়ে ওঠে। পক্ষ নেয়, শ্রমিকদের পাওনা যারা বুঝিয়ে দেয়নি, তাদের।
সুবিধাটি দেওয়া হচ্ছে কাদের? যারা মালিক। এই দেশে, মানে বাংলাদেশে এমন কিছু মালিকশ্রেণী তৈরি করা হয়েছে, যারা কেবল নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করেই চলেছেন। এই দেশের শ্রমিকশ্রেণী যখন তার সারা মাসের টাকা দিয়ে রাজধানীর ভাড়া পুষিয়ে নিতে কষ্ট হয়, সেখানে ‘‘লাভ নেই, লস বেশি’’ বলে বাংলাদেশি মালিক এটিকে স্বয়ংক্রিয় শোষণের মেশিন হিসেবে পরিণত করেন। শ্রমিকরা যখন কারখানার একটি মেশিন চালু করেন, তখন মনের অজান্তেই তারা একটি শোষণের কারখানা চালু করেন। ইসলাম যখন তার নিজস্ব শক্তি, আদেশ-নিষেধ নিয়ে রাষ্ট্রে হাজির হবে, তখন এই শোষণ নামের কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।
এই একটি বিষয়ের মাধ্যমেই আশা করি পুরো বিষয়টি হৃদয়লব্ধ হওয়ার কথা। ঠিক কি কারণে ইসলামকে কেবলমাত্র ব্যবহারিক-ঐচ্ছিক ধর্মে পরিণত করার একটি প্রাণান্ত প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় আমাদের দেশে তথা সাড়া পৃথিবীতেই। অত্যন্ত সচেতনভাবে পৃথিবীর দেশে দেশে ইসলামকে রাষ্ট্রনৈতিকতাবিবর্জিত একটি ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর এই ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে মুসলমানরাই। এই প্রপাগান্ডায় অগ্রভাবে রয়েছে মুসলমানরাই। তবে মজার বিষয় হচ্ছে ইসলামের ব্যবহারিক দিকগুলো উপেক্ষিত থাকলেও, বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কারণে মুসলমানদের কাছে অবজ্ঞার বিষয় হয়ে থাকলেও এর উৎসবগুলোকে কিন্তু ঠিকই মহা-উৎসবে রূপ দেওয়া হয়।
সংখ্যানুপাতিক দিক থেকে ইন্দোনেশিয়া, ভারত,পাকিস্থান, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে মুসলমান সংখ্যায় বেশি। বৃহত্তম মুসলমান নাগরিকদের দেশ হিসেবে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সুপরিচিত। কিন্তু কেন ব্যবহারিক দিক দিয়ে, নৈতিক দিক দিয়ে আমরা ইসলামকে জানছি না,মানছি না। এমনকী বিধর্মীরা পর্যন্ত যেকোনও নৈতিকতার ধার ধরে চলে, সেটুকুও অন্তত কেন আমাদের মাঝে পালিত হয় না। কেন চরিত্রের দিক, ব্যবহারিক দিক দিয়ে বিধর্মী রাষ্ট্রগুলোর নাগরিকদের চেয়ে বেশি পিছিয়ে থাকবে মুসলমানরা? কেন পাকিস্তানই বিশ্বের বুকে অস্থির রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম? কেনইবা আফগানিস্তানে বছরের পর বছর চলবে অভ্যন্তরীন সংঘাত, বিপর্যয়?
কারণ হচ্ছে একটিই আমরা আসলে জানিই না, আমরা কে? কি আমাদের পরিচয়? কালের বিবর্তনে আমাদের পরিচয় আমাদের কাছে পরিস্কার হয়ে ওঠেনি। ওঠেনি ইসলামের পরিচয় ব্যবহার করে দালালশ্রেণীর লোকদের কারণে। এই দালালশ্রেণী বিভিন্ন কারণে, নানাবিধ প্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছে কালে কালে। কিন্তু খুব সহজেই মাত্র ২০০ বছর আগের ইতিহাস দেখলেও বুঝা যাবে, এই দালালি শ্রেণীর লোক থাকলেও ইসলামের খাঁটি লোকদের কারণেই ইংরেজদের বিতাড়ন করা সম্ভব হয়েছে।
শাহ আব্দুল আজীজ মোহাদ্দেসে দেহলভী রহ. এর যুগ বিজয়ী ফতোয়া। সায়্যেদ আহমদ বেরলভী রহ. ও শাহ ইসমাঈল শহীদ রহ. এর রক্তাক্ত বালাকোট আন্দোলন। মাওলানা ফজলে হক খায়রাবাদী রহ., আল্লামা কাসেম নানূতবী রহ. এর সুচিন্তা, সুপরিকল্পনা আর অবর্ণনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ., মাওলানা ইলিয়াছ রহ. ও শাইখুল হাদীস জাকারিয়া রহ. এর আত্মশুদ্ধীর আন্দোলন। শাইখুল হিন্দ আল্লামা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী রহ., মাওলানা উজাইর গুল পেশওয়ারী রহ. ও সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর রেশমি রুমাল আন্দোলন। শাহ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভী রহ., হাজী এমদাদুল্লাহ মোহাজেরে মাক্কী রহ., মাওলানা আবুল কালাম আজাদ রহ., আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী রহ., শাহ আতাউল্লাহ বুখারী রহ. সহ পাক ভারত উপমহাদেশের হাজার হাজার উলামায়ে কেরামগণের সীমাহিন ত্যাগ-তিতিক্ষা, তাদের ধর্ম-চিন্তা, সমাজ-চিন্তা, রাস্ট্র-চিন্তার কথা সাধারণ মানুষ তো দূরে কথা বরং কোন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক বা রাজনীতিকরাও পর্যন্ত জানেন না। জানেন, কিন্তু অনুশীলণ করেন না। দরকার ও প্রয়োজন মনে করেন না।
কারণ? ব্যাক্তিগত অভিলাষ। কারণ, চারিত্রিক স্খলন। কারণ, ইসলামকে মন থেকে রাজনৈতিকভাবে দেখেন না। অন্যথা, দেখলেও বিশ্বাস করেন না। ঈমান যাওয়ার ভয়ে বিশ্বাস করলেও প্রকাশে ভয় পান। ইত্যাদি কারণ।
এই কারণগুলো সবচেয়ে বেশি যাদের মধ্যে আশ্রয় পেয়েছে তারা হচ্ছেন গত ৫০ বছরের কওমি আলেমরা। কিন্তু যারা বেশি মুক্ত থেকেছেন তারাও এই কওমি মাদ্রাসার আলেমরা। আর সে জন্যই আমরা পেয়েছি-ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ., আল্লামা সিরাজূল ইসলাম বড় হুুুুজুর রহ., মাওলানা আতহার আলী রহ., মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ., আল্লামা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ., শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ., মুফতী ফজলুল হক আমেনী রহ. সহ আরো অনেককে। ইসলামের রাজনৈতিক মূল্যবোধ সাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন আলেমরা। রাজনৈতিকবঞ্চনা তৈরি করেছেনও বেশি আলেমরা।
তাহলে সমাধান কি? যদিও সমাধানের চেষ্টা করা এত দ্রুত সঠিক নয়। কিন্তু সময়ের বিবেচনায় সমাধানের চেষ্টা করতেই হবে।
আর সে জন্য আমাদেরকে বারবার ইতিহাসের কাছে ফিরে যেতেই হবে। ইতিহাস আমাদেরকে সমাধানের পথ দেখিয়ো দিবেন। যে আলেমটি নিজের কাপড় ধুয়েছেন মধ্যরাতে, ভাগ করে খেয়েছেন ভাতের মার। পাশাপাশি ইসলামের রাজনৈতিক বিবেচনায় ভারতবর্ষকে ইংরেজ জালিমমূক্ত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। আন্দোলন-লড়াই সংগ্রাম করেছেন আল্লামা কাসেম নানূতূবী রহ.। রাজনৈতিক সংগ্রামের খাতিরে উস্তাদের শীতল পানিকে বুকে ধারণ করে গরম করেছেন সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.।
আলামা কাসেম নানূতূবী রহ.,উস্তাদ মাহমুদুল হাসান রহ.,আর ছাত্র মাহমুদুল হাসান রহ., তারা তাদের দূরদৃস্টি দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে বর্তমান ও অনাগত যে প্রলয় দেখতে পেয়েছিলেন তা প্রতিরোধের জন্যই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দ–যা একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সূতিতাগার বটে।
এই -কওমি মাদ্রাসার ইতিহাসগুলো অপাংক্তেয় নয়, নয় স্মৃতিকাতরতা করতেও। এগুলো বাস্তবায়নের স্বপ্ন, এগুলো আমাদের জীবনের পাথেয়। কিন্তু এগুলোকে বইয়ের ভাঁজে রেখে ক্লাসে ক্লাসে শুনিয়ে দেওয়া পর্যন্ত বরাদ্দ্ রেখেছি আমরা। আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যাক্তি যখন সৎ হয়, তখন ব্যাক্তিগতভাবেও হয়, সামষ্টিকভাবেও হয়। কারণ, ব্যাক্তির উপরেই গড়ে ওঠে সমষ্টি।
ইসলামের সঙ্গে রাজনীতির যে সম্পর্ক সেটি আরও পরিস্কার হয়ে ওঠে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ইউজিন স্মিথের রিলিজিয়ন এন্ড পলিটিক্যাল ডেবেলোপমেন্ট গ্রন্থে, যেটি ১৯৭০ সালে বোস্টনের লিটল ব্রাউন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ভদ্রলোক বলছেন, “সামাজিক, সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে মুসলিম সমাজ একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা। এরূপ সমাজে ধর্ম স্বাতন্ত্রিক স্বায়ত্ত¡শাসিত কোন এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সমাজের সকল প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্ম প্রবিষ্ট হয়। আর এটি কেবলমাত্র ইসলাম ধর্মের বেলায় প্রযোজ্য। ইসলামের মূল ৫ টি স্তবের দিকে নজর দিলেই পরিস্কার হয়ে ওঠবে বিষয়টি। মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে চারটি স্তম্ভ যথা নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্জ্ব ‘ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ ও ঐক্যবোধ সৃষ্টি করে।”
১৯৮২ সালে ইংল্যান্ডের ম্যাকমিলান থেকে প্রকাশিত Modern Islamic Political Thought গ্রন্থে জনৈক লেখক হামিদ এনায়েত বলছেন, ইসলামের এ স্তম্ভগুলোর উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তির আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা সাধন নয় বরং এর আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিক তাৎপর্য রয়েছে। এ সব স্তম্ভসমূহ মানুষের আচরণ ও কার্যকলাপের সাথে ঘনিষ্টভাবে সংযুক্ত। নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্বাসীদের জন্য যে নামাজ ফরজ করা হয়েছে (৪:১০৩), জামাতের সাথে যা আদায় করা ফরজ, সে নামাজের মাধ্যমে একজন ঈমানদার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে যাতে রয়েছে চিন্তন, আবেগগত অনুপ্রেরণা ও শারীরিক সঞ্চালন। নামাজে বিশ্বাসী মানুষেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়, নামাজ আদায়ের জন্য একজনকে ইমাম নির্বাচিত করা হয়, মহান আল্লাহর মহিমা ঘোষণা; করে নামাজীরা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে প্রার্থনা করে, ‘হে প্রভু, আমাদের সরল সঠিক পথ দেখাও’। নামাজের প্রার্থনার মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে কল্যাণময় জীবনের নীতিমালা, সামাজিক সমতা ও ঐক্য, নেতৃত্ব ও আনুগত্য, দায়িত্ববোধ ও দায়িত্ব সচেতনতা এবং বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব। একই ধরনের গুণাবলী সম্বলিত নিয়মাবলী ইসলামের অন্যান্য স্তম্ভগুলির পরিচর্চা এক ধরনের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক প্রশিক্ষণ।’’
যে প্রসঙ্গটি আমরা আগেই বলেছিলাম, তাহলে কেন ইসলামের উৎসবগুলোকে এত বড় করে দেখানো হয়? কেন এত ভ্রাত্বিত্বের মাহাত্ম-ই-বা জানানো হয়? কারণটা হচ্ছে অর্থনৈতিক। যে ব্যবস্থার ওপর এই পৃথিবীর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে, সেটি এখন নিঃশেষের পথে। কিন্তু একে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এই বাঁচিয়ে রাখার কারণটি বুঝতে পারলেই এক উত্তরেই পরিস্কার হয়ে যাবে কেন ইরাক-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-আইএস যুদ্ধ। অর্থাৎ, এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এখন মুসলমানদের উৎসবগুলোকে ব্যবহার করতে এর মাহাত্ম প্রচার করছে। পাশাপাশি নিজেদের অস্ত্রনির্ভর অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে একের পর এক যুদ্ধ বাধাচ্ছে।
এক দিকে পণ্যবিক্রি অন্যদিকে স্থবির অর্থনীতির চাকা সচল করা। দুই-ই এখন মুসলমানদের মাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে। একদিকে জঙ্গীবাদি বলে যুদ্ধ লাগাও, তাহলেই অস্ত্র বেঁচা যাবে, ঈদকে টার্গেট করো, তাহলেই পণ্য বেঁচা যাবে। খুব সোজা, পণ্য বেঁচতে মুসলমানের উৎসব কেন, পারলে জায়নামাজে করে কাবা ঘরকেও বিক্রি করতে প্রস্তুত ওই বেনিয়া গোষ্ঠী। ফলে, বুঝতে হবে আজকের পৃথিবীর ইসলাম, ইসলামী রাজনীতি, রাজনৈতিক ইসলাম এসব নিয়ে ধুন্ধুমার যাচ্ছেতাই চলছে। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এখন এই কথাগুলোই আমাদের ইসলামী রাজনীতিকরা বলতে দ্বিধাবোধ করেন। দ্বিধা কেন হবে? ইসলামের রাজনৈতিক দর্শন ও এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই দ্বিধার চরম মূল্য দিতে হবে।
তিন .
ইতিহাসের একটি ক্রান্তিলগ্নে ভারতবর্ষে ইসলামের রাজনৈতিক দৃস্টিভঙ্গিকে সামনে রেখেই দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। আর দারুল উলুম দেওবন্দ এর আদর্শ ধারণ করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার এক ক্রান্তিলগ্নে ১৩৩৮ হিজরীতে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বাহরুল উলূম । যা আজ জামেআ ইসলামিয়া ইউনুছিয়া নাম ধারণ করে শতবর্ষ অতিক্রান্ত করছে। এই শতবর্ষব্যাপী জামেআ তার অবদানকে সর্বজন বিদিত করে সাড়া দুনিয়ায় আলোকিত করে আছে। আজ সাড়া পৃথিবী জানে ব্রাক্ষণবাড়িয়া মানে- জামেআ ইসলামিয়া ইউনুছিয়া ।
জামেআ ইসলামিয়া ইউনুছিয়া তার শতবর্ষব্যাপী প্রয়াস দ্বারা ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ইতিহাস তৈরি করেছে। ঐতিহ্য নির্মাণ করেছে। মূল্যবোধ সমুন্নত করেছে। সর্বোপরি সুস্থ, সবল, দ্বীনদার ও একটি প্রাণবন্ত ব্রাক্ষণবাড়িয়া গঠনে এই জামেআ ইসলামিয়া ইউনুছিয়া অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে নিজের অবদানকে সর্বজনবিদিত করতে সক্ষম হয়েছে। মাওলানা ইউনুস রহ., ফখরে বাঙাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ., মাওলানা ছফিউল্লাহ চাঁদপুরী রহ., মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ., মাওলানা আব্দুল ওহ্হাব পীরজী হুজুর রহ., আল্লামা সিরাজুল ইসলাম বড় হুজুর রহ., মাওলানা মুতিউর রহমান রহ., মাওলানা আব্দুন নূর রহ., মুফতি নূরুল্লাহ রহ থেকে নিয়ে মাওলানা রাহমতুল্লাহ রহ. পর্যন্ত যারা এই সুদূরপ্রসারী কাজ এগিয়ে নিয়ে এসেছেন এবং এখনো যারা তা আরো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আল্লাহ পাক তাদের সকলের প্রচেষ্টাকে জান্নাতের বিনিময়ে কবুল করুন।
পরিশেষে বলব, আমাদেরকে খেয়াল করে দেখতে হবে, যা আজকের এই দিনে খুব প্রাসঙ্গিকও বটে। সেটি হচ্ছে যে, কোন অবক্ষয়ে সকল রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে নিজকে কঠিন সংগ্রামে নিয়োজিত রেখেছিলেন ফখরে বাঙাল রাহ.? কোন অস্থিতিশীলতায়, অস্থিরতায় সমূলে বুক পেতে দিয়েছেন বড় হুজুর রাহ.? ব্রাক্ষণবাড়িয়ার প্রয়াত সকল বুযুর্গ কেরামের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি এই দুই মহিরূহের অবদান গোটা দুনিয়ায় ব্রাক্ষণবাড়িয়াকে এক অন্যন্য বৈশিষ্ঠ এনে দিয়েছে । সামাজিক মূল্যবোধ নির্মাণে তাদের অবদান আজকের প্রেক্ষাপটে রূপকথার গল্পের মতন। মাত্র কয়েক বছরের বিগত সেই দিনগুলো আজ স্মৃতি হয়ে ধরা দিচ্ছে আমাদের মনে, মস্তিষ্কে। এই স্মৃতিময়তা ভাল; কিন্তু অবাস্তবায়ন থাকলে যুগে যুগে ব্যবহার হতে হবে।
ইতিহাসে জামিয়া ইসলামিয়া ইউনূছিয়া মাদ্রাসার ভূমিকা আমাদের মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে কেবল নামেই কওমি মাদ্রাসা হলে চলবে না। আজকের এই দিনে জামিয়া ও জামিয়ার আকাবিরদের ইতিহাস, দিনলিপি আমাদের পাথেয় করে নিয়ত চলতে হবে। ইসলামের রাজনৈতিক দিকগুলোকে প্রয়োজনে পুনরায় পড়তে হবে। বুকে ধারণ করতে হবে। তাহলেই শাপলা চত্বরে শনুতে হবে না মাজলুমের হাহাকার।
হাফেজ নূরুজ্জামান
পরিচালক, হিফজ বিভাগ, দারুল উলুম ইসলামিয়া, হরষপুর, মাধবপুর
মুহতামিম, মাদ্রাসা তাহফিজুল কোরআন, ধর্মঘর, মাধবপুর
লেখক, “ফখরে বাঙ্গাল রহ. ও সাথিবর্গ ” ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত
উৎস: কওমি নিউজ, জামিয়া ইসলামীয়া ইউনূছিয়ার শতবার্ষিকী: ইসলামের রাজনৈতিক দর্শন, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫





আসসালামু আলাইকুম…..
সমষ্টিগতভাবে ক্বওমী মাদ্রাসাগুলো বাংলাদেশে ইসলামের সুরক্ষাপ্রাচীর, কিন্তু এর রক্ষীরা লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই ভুলে গেছেন
এ ব্যাপারে পরিকল্পিত মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী কাজ প্রয়োজন
গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি তুলে আনার জন্য কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ, জাযাকুমুল্লাহ