গত কোন এক শুক্রবারে জুমার নামাজের খুতবায় খতিব সাহেব রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনের কিছু ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তার মধ্যে একটি ঘটনা ছিল এমন যে, “নবুয়তের প্রথম দিকে মক্কার এক বৃদ্ধা রাসূলুল্লাহ (স) এর হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করছিল। কেননা সে শুনেছে যে মক্কায় মোহাম্মদ নামের এক লোকের আবির্ভাব হয়েছে, যে কিনা মানুষকে “বিভ্রান্ত” করে তার বাপ-দাদার ধর্ম থেকে বিচ্যুত করে ফেলছে। তো পালানোর সময় ঘটনাক্রমে সেই বৃদ্ধার সাথে রাসূলুল্লাহ-র দেখা হয়ে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (স) নিজের পরিচয় গোপন রেখে সেই বৃদ্ধার জিনিসপত্র নিজ কাঁধে বহন করে তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। পরবর্তীতে বৃদ্ধা রাসূলুল্লাহ (স) এর পরিচয় জানতে পেরে অভিভূত হয়ে যায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে।”
খতিব সাহেব ঘটনাটিকে রাসূলুল্লাহ (স) এর দয়া এবং মহত্বের উদাহরণ হিসাবে উপস্থাপন করেন। নিঃসন্দেহে উপরোক্ত ঘটনাটি রাসূলুল্লাহর দয়ালু মানসিকতার অনুপম দৃষ্টান্ত। কিন্তু একই সাথে এটি তাঁর বুদ্ধিমান ও কৌশলী রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বেরও প্রতিচ্ছবি নয় কি? আমারতো মনে হয় ঘটনাটিকে রাসূলুল্লাহর দয়ালু স্বত্তার চেয়ে বরং বুদ্ধিমান রাজনৈতিক স্বত্তা দিয়ে আরো ভালভাবে ব্যাখা করা যায়।
বিষয়টি এজন্য উল্লেখ করলাম, কারণ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশের আলেম সমাজ ওয়াজ মাহফিল, জুমার খুতবা, ইসলামী আলোচনা তথা ইসলামের দাওয়াত সংক্রান্ত যত কাজ করেছেন তাতে রাসূলুল্লাহর জীবনকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে খুব কমই উপস্থাপিত করেছেন। সীরাত সংক্রান্ত আলোচনায় আমাদের ইমাম সাহেব বা আলেমরা যতটা সময় রাসূলুল্লাহ (স) এর দয়া নিয়ে আলোচনা করেন এর সিকিভাগও তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করেন না। উদাহরণ স্বরূপ, মক্কা বিজয়ের পর কুরাইশদের ক্ষমা করে তিনি যে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন আলোচনায় আলেমরা এটিকে “অভূতপূর্ব দয়ার” দৃষ্টান্ত পর্যন্ত বলেই থেমে যান। কিন্তু এটি যে একই সাথে “অভূতপূর্ব রাজনৈতিক প্রজ্ঞারও” দৃষ্টান্ত আলোচনায় তা উপেক্ষিতই থেকে যায়। কেননা এই ক্ষমার মাধ্যমে তিনি বল প্রয়োগ ছাড়াই কুরাইশ সহ পুরো আরব উপদ্বীপের অধিবাসীদের স্বতস্ফুর্ত আনুগত্য লাভ করেছিলেন, অন্যান্য রাজনৈতিক বিজয়ীদের যা লাভ করতে হয় ব্যাপক দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে।
সাধারণ ভাবে যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয় আপনার রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক নির্বাচনে কোন গুনকে আপনি অগ্রাধিকার দিবেন?
১. দয়ালু ও ক্ষমাশীল
২. বুদ্ধিমান ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন
তাহলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই ভোটটা বুদ্ধিমান ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যাক্তির দিকেই যাবে। তার উপর যদি এই বুদ্ধিমান ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যাক্তিটি যদি একই সাথে দয়ালু, ক্ষমাশীল ও উদার হয় তাহলেতো কথাই নেই। আর এই সবগুলো গুনের পরিপূর্ণ সমাবেশ একমাত্র রাসূলুল্লাহ (স) এর মধ্যেই অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ভাবে ঘটেছিল।
যেহেতু ইসলামের একটি পলিটিক্যাল রূপ আছে এবং রাসূল (স) ইসলামের চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম মডেল; সেহেতু পলিটিক্যাল ইসলামের বিজয়ের জন্য রাসূল (স) এর জীবনীকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে উপস্থাপন করাও অত্যন্ত জরুরী। অন্যথায় সাধারন মানুষের মনে ইসলাম সম্পর্কে যে সংকীর্ন ধারনার জন্ম হয়েছে তার দায়দায়িত্ব আমাদের আলেম সমাজের উপরও অনেকখানি বর্তায়।





জাযাকাল্লাহ… যথার্থ বলেছেন এবং খুব সুন্দর বলেছেন