আমরা যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বসবাস করছি তার সৃষ্টিকৌশল নিয়ে চিন্তা করলে বিস্ময়াভিভূত হতে হয়। এই যে বৈচিত্র্যময় বিশ্বচরাচর তার মূলে কী রহস্য নিহিত? এর কি একজন স্রষ্টা আছেন? যদি থেকে থাকেন, তাহলে তিনি কখন, কেন এবং কিভাবে সৃষ্টি করলেন এ জগৎসংসার? কিভাবে পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি হল নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত ও লোকালয়? এ জগতের সবকিছু একধরনের নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। যেমন, সব জিনিস পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, আকাশের সব গ্রহ-উপগ্রহ একই নিয়মে আবর্তিত হয়ে চলছে, একই কায়দায় দিবা-রাত্রির পরিবর্তন, জোয়ার-ভাটার উৎপত্তি ও অবসান হচ্ছে, চক্রের মতো ঋতু নিয়মিত পরিবর্তিত হয়ে চলছে। এ থেকে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক; এই বিশ্বব্যবস্থা ও তার গতিপ্রকৃতির উৎস কী? এ জগত কি অনাদি অনন্তকাল থেকে আছে, নাকি কোনো বিশেষ মুহূর্তে কোনো এক পরম স্রষ্টা তাকে সৃষ্টি করেছেন? আমি কে? জন্মের আগে আমি কোথায় ছিলাম? মৃত্যুর পর কোথায় যাব? জীবনের মূল্য ও তাৎপর্য কী?
এই প্রশ্নগুলো দ্বারা তাড়িত হয়ে সৃষ্টির উষালগ্ন থেকেই মানুষ ভাবতে থাকে এই বিশ্বসৃষ্টি এবং স্রষ্টা সম্পর্কে। এভাবেই উৎপত্তি হয় দর্শন শাস্ত্রের। ধর্মই একমাত্র মতবাদ যা এই সৃষ্টির পূর্বাপর ব্যাখ্যা করতে পেরেছে। ধর্মের ব্যাখ্যার ব্যাপারে পরে আসছি। দর্শনশাস্ত্র সবসময় ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আসছিল। এদিকে কালের বিবর্তনে উদ্ভব ঘটে বিজ্ঞান শাস্ত্রের। আধুনিক বিজ্ঞানের এত উন্নতির পিছনে মূলত দুইটি কারণ রয়েছে। একটি হল মধ্যযুগের মুসলিমদের দ্বারা বিজ্ঞান চর্চা, আরেকটি হলো ইউরোপের বিজ্ঞান চর্চা। এই দুই জায়গার বিজ্ঞান চর্চার পরিবেশ ছিল সম্পূর্ন ভিন্ন- মুসলিমদের বিজ্ঞান চর্চায় কোন প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়নি বরং বিজ্ঞানীগন পেয়েছে রাজকীয় সহায়তা কিন্তু ইউরোপের বিজ্ঞান চর্চার জন্য বিজ্ঞানীদের দিতে হয়েছে চরম মূল্য। অনেক বিজ্ঞানীকে জেল, দেশান্তরিত, ফাঁসি বা শূলে চড়ানো হয়েছিল শুধুমাত্র বিজ্ঞানের আবিস্কারসমূহ চার্চের বিরুদ্ধে যেত বলে। এই সমস্ত অত্যাচারের ফলে বিজ্ঞানীরা ক্ষেপে যায় এবং ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়ে যায়। তারা ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে বিভিন্ন রকম তত্ত্ব দিতে থাকে। চাই তা সঠিক হোক বা ভুল- মোটকথা তাদের তখন কাজই ছিল ধর্মের বিরোধিতা করা। আর এগুলো করতে গিয়ে তারা আকস্মিক সৃষ্টিবাদ, বিবির্তনবাদের মতো তত্ত্ব দিতে শুরু করে। এই তত্ত্ব ধর্মের বিপক্ষে যায় বলেই সবাই একযোগে এই তত্ত্বগুলো নিয়ে মাতামাতি শুরু করে। এভাবেই এই তত্ত্বগুলো খুবই জনপ্রিয়তা পায় এবং আজ পর্যন্ত এই মতবাদগুলো আলোচনার শীর্ষে আছে। আমরা এখন এই মতবাদগুলো সামান্য পর্যালোচনা করে দেখবো। এ মতবাদ দুটোর মূল কথা হলো-
এ জগতের সবকিছুই উদ্দেশ্যহীন। এই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির পেছনে কোন উদ্দেশ্য নেই, এই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড ও বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের সব কিছুই সৃষ্টি হয়েছে সৃষ্টির নিয়মে, কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই। আল্লাহ এসব কিছুই সৃষ্টি করেননি, এসব সৃষ্টি হয়েছে সৃষ্টির নিয়মে। আর এসব কিছু হঠাৎ একদিনে সৃষ্টি হয়নি, হয়েছে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মাধ্যমে।
আজ এই পৃথিবীতে আমরা যা কিছু দেখছি বিভিন্ন পদার্থ, গাছপালা, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, মানুষ ইত্যাদি সমস্ত কিছু কতগুলো পরমাণুর সমষ্টি। তবে মানুষের ক্ষেত্রে শুধু পরমাণুর সমষ্টি বললে সম্পূর্ণ বলা হয় না তাই বলতে হবে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল কতগুলো পরমাণুর সমষ্টি। কারণ প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট জীব, মানুষই এসেছে সবার শেষে।
বিজ্ঞান বলে এই পৃথিবী যেমন একদিনে সৃষ্টি হয়নি তেমনি মানুষও একদিনে সৃষ্টি হয়নি। আবার বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডও শূণ্য থেকে সৃষ্টি হয়নি। একটি বিশ্ব ছিল, যার মধ্যে ছিল তেজপূর্ণ প্রচন্ড শক্তি। কেমন তার শক্তি, কি তার বৈশিষ্ট্য তা আজো বিজ্ঞানের অজানা। তারপর হঠাৎই এক সময় ঐ তেজপুঞ্জ বিস্ফোরিত হল। বিস্ফোরণের সময় এক হাজার থেকে দু’হাজার কোটি বছর আগে। গড় ধরে বলা যায়, আনুমানিক দেড় হাজার কোটি বছর আগে। সেই বিস্ফোরনের নাম দেওয়া হয়েছে “বিগ ব্যাং” বা মহা বিস্ফোরণ।
বিস্ফোরণের প্রথম ৩ মিনিটের মধ্যে যা ঘটেছিল, বিশ্বব্রহ্মান্ডের গোটা ইতিহাসে আর কখনো তা ঘটেনি। বিশ্বসৃষ্টির রহস্য ঐ ৩ মিনিট সময়ের মধ্যেই ধরা আছে। তখনই প্রকৃত অর্থে বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। আজকের বিশ্বে আমরা যা কিছু দেখি তার বীজ সৃষ্টি হয়েছিল তখন। তখন নিউক্লিয়ন ইত্যাদি বহু কণিকা গঠিত হয়েছিল এবং কণিকাগুলো পরস্পরের সাথে ক্রিয়া করতে আরম্ভ করেছিল। এই যে পারস্পরিক ক্রিয়া, বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে মিথস্ক্রিয়া। বহুকাল ধরে বিভিন্নভাবে এই মিথস্ক্রিয়া হওয়ার ফলে বিভিন্ন পদার্থের সৃষ্টি। এইভাবেই আস্তে আস্তে উদ্ভিদ, পশু, পাখি, মানুষ প্রভৃতি জীব সৃষ্টি হয়েছে।
বিস্ফোরণের পর বিশ্ব যেমন আয়তনে বাড়তে লাগল, তেমনই একসময় তার উত্তাপ কমতে শুরু করলো। বিশ্ব সম্প্রসারিত আর শীতল হতেই থাকলো। একটা পর্যায়ে সৃষ্টি হল হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেন তারকা সৃষ্টির ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। এইভাবেই সৃষ্টি হল তারার। সৃষ্টি হল আবার ধ্বংসও হল। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উদ্ভব হল বিভিন্ন ভারী পদার্থের ইংরেজীতে যাকে বলে হেভি এলিমেন্ট।
ঐ যে “বিগ ব্যাং” – এর পর নিউক্লিয়ন ইত্যাদি কিছু কণিকা সৃষ্টি হয়েছিল সে তো শূণ্য থেকে হয়নি। নিশ্চয় কিছু ছিল যা থেকে হয়েছিল। কারণ বিজ্ঞানের গোড়ার কথাই হল – matter cannot be created nor can it be destroyed। শুধু ম্যাটার নয়, এনার্জীর বেলায়ও এই কথা। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ম্যাটার আর এনার্জী বিশ্বসৃষ্টির আগেও ছিল, বিশ্ব যদি কোনদিন ধ্বংস হয়ে যায় তখনো থাকবে। তবে আজ যেভাবে আছে সেইভাবে হয়তো থাকবে না। হয়তো আবার “ব্ল্যাক হোল”- এর মতো কিছু একটা হয়ে ম্যাটারগুলো সব এক জায়গায় জড়ো হয়ে যাবে, যেমন দেড় হাজার কোটি বছর আগে “বিগ ব্যাং”-এর আগে যেমন ছিল। তার মানে ম্যাটার আর এনার্জী আগেও ছিল, পরেও থাকবে-চিরকালই থাকবে। কেবল রূপ বদলাবে হয়তো।
ম্যাটার আর এনার্জীর মূল উপাদান হল প্রোটন, নিউট্রন ইত্যাদি মৌলিক কণা আর ফোটন। এটমের আবার নিজস্ব জগৎ আছে। তার মধ্যে ইলেকট্রন আছে, নিউক্লিয়ন আছে। নিউক্লিয়নের মধ্যেও আবার অতিক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সব কণিকা আছে। ম্যাটার আর এনার্জী ভিন্ন ইউনিটে, ভিন্ন লেভেলে এবং ভিন্ন ফর্মে অর্গানাইজড হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে অর্গানাইজড হয়ে যখন একটা নতুন এটম তৈরি হচ্ছে তখন তার নতুন ধর্ম দেখা যাচ্ছে। এইভাবে কতগুলো এটম মিলে মলিকিউল তৈরি হল। আবার কতগুলো মলিকিউল মিলে ম্যাক্রোমলিকিউল তৈরি হল। শেষে রেপ্লিকেটিং মলিকিউল এল। রেপ্লিকেটিং মলিকিউল মানে সেই ধরনের মলিকিউল, যা থেকে ঠিক একই ধরণের মলিকিউল তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক সময় এল ইউক্যারিয়োটিক সেল। এই সেল বা কোষের মধ্যে এল জেনেটিক কোষ। এই কোষ থেকেই প্রাণের সৃষ্টি হল। প্রথমে এল এককোষী প্রাণী, তারপর বহুকোষী।
প্রথমে সৃষ্টি উদ্ভিদের তারপর প্রাণীর। পৃথিবীতে জীবসৃষ্টির পর দু’টি ধারায় জীবজগৎ বিভক্ত হয়ে গেল-একটি উদ্ভিদজগৎ আর একটি প্রাণীজগৎ। উদ্ভিদজগৎ আর প্রাণীজগৎ মিলে জীবজগৎ। মানুষ এসেছে সবার শেষে। মানুষের আগমণ মাত্র ত্রিশ লক্ষ বছর আগে। মানুষও একেবারে পৃথিবীতে আসেনি। এককোষী প্রাণীর থেকে যে রূপান্তর সৃষ্টি হয়েছিল, তারই শেষ পরিণতি মানুষ। সৃষ্টির এই যে তত্ত্ব, বিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলে বিবর্তনবাদ।
প্রকৃতির রাজ্যে যে রূপান্তর জন্ম-লগ্ন থেকেই শুরু হয়েছিল, তা সম্পূর্নই উদ্দেশ্যহীনভাবে এবং আজো তা ক্রিয়াশীল। “বিগ ব্যাং” এর পর কোটি কোটি বছর ধরে পরিবর্তন হতে হতে সৃষ্টি আজ এই অবস্থায় এসে দাড়িয়েছে। কোষের মধ্যেও উদ্দেশ্যহীনভাবে মিউটেশন হচ্ছে। এই মিউটেশনই মূল কথা। এই মিউটেশনের জন্যই এককোষী প্রাণী থেকে বিবর্তনের পথ ধরে আজ এসেছি আমরা কোটি কোটি কোষের প্রাণী – মানুষ। এই মিউটেশনের জন্যই বিবর্তন সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে সৃষ্টিকর্তা নেই। বিবর্তনের এই ধারায় সৃষ্টিকর্তার কোন প্রয়োজন হয়নি।
বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে প্রথমেই আমাদের কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। যেমন বিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হতে হলে বেশ কিছু শর্ত তার মাঝে থাকতে হবে। নাথান এসেঞ্জ তার বিখ্যাত বই ‘Science versus Pseudo Science’ এবং ‘The Philosophy of Science’ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান হওয়ার জন্য বেশকিছু শর্ত উল্লেখ করেছেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটা হলো- বিজ্ঞান হতে হবে পর্যবেক্ষনযোগ্য, বিজ্ঞান হতে হবে যৌক্তিক, বিজ্ঞানের দাবী হতে হবে সু-সংজ্ঞায়িত, বিজ্ঞানের তত্ত্ব Falsifiable (ভুল প্রমাণ করা সম্ভব) এবং পরিক্ষা করার উপযুক্ত হতে হবে, বিজ্ঞানের পরীক্ষণ পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব, বিজ্ঞান-বিষয়ক দাবী এমন হতে হবে যে, বাকী বিজ্ঞানীদের দ্বারা সেটা পরিক্ষা করা সম্ভব বা পরিক্ষীত হতে হবে, ইত্যাদি।
আরেকটা বিষয় Theory এবং Fact এই দুটি প্রপঞ্চ ভালভাবে বুঝতে হবে। Fact বলা হয় এমন মতবাদ যা প্রমাণিত বা প্রতিষ্ঠিত সত্য আর Theory/Hypothesis হলো এমন মতবাদ যা প্রমাণিত নয় বা প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। যা ভুলও হতে পারে আর Theory এর গ্রহনযোগ্যতা Hypothesis এর চেয়ে বেশি।
এখন আমরা সৃষ্টিতত্ত্ব এবং বিবর্তনবাদকে বিজ্ঞানের আলোকে পর্যালোচনা করে দেখবো যে এগুলো কি আসলেই বিজ্ঞান কিনা? বা বিজ্ঞানের শর্তগুলো এর মাঝে পাওয়া যায় কিনা?
*সৃষ্টিতত্ত্ব কি বিজ্ঞান সম্মত? উত্তর- না। কারণ সৃষ্টিতত্ত্ব পর্যবেক্ষণযোগ্য নয়।
*সৃষ্টিতত্ত্ব ধর্মের দ্বারা বর্ননাকৃত, এবং ধর্মের আলোচ্য বিষয় বলে বিবেচিত।
*সৃষ্টিতত্ত্ব পর্যবেক্ষনযোগ্য নয়।
*সৃষ্টিতত্ত্ব কোন প্রকার পক্রিয়ার দ্বারা পরীক্ষণযোগ্য নয়, এটিকে কোনভাবে কোন পরীক্ষার আওয়তায় আনা যায় না।
*সৃষ্টিতত্ত্বের মূল ভিত্তি হল স্রষ্টা, এবং তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে, সেহেতু তিনি স্থান ও কালের দ্বারা আবদ্ধ মানুষের ক্ষমতার দ্বারা মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সেজন্যই বলা হয়ে থাকে, আমাদের মনের মধ্যে আল্লাহ পাক সম্পর্কে যত ধরনের ধারণা এসে থাকে, সবকটি থেকে আল্লাহ পাক পবিত্র। আল্লাহ পাককে ততদূর জানা যায়, যতদূর তিনি নিজে নিজেকে প্রকাশ করেছেন।
*সৃষ্টিতত্ত্ব ফলসিফায়েবল নয়, এটি ফলসিফিকশনের ঊর্ধ্বে।
এই জন্যই যারা বলে থাকেন, “বিজ্ঞান স্রষ্টা নাই প্রমাণ করেছে” তারা নিজেরাই বিজ্ঞান-বিরোধী বক্তব্য দেন।
বিবর্তনবাদ কী? এর আরেকটি নাম হল প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদ ( Theory of natural Selection) এর মূল কথাটা এমন, ‘‘ প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরল কোষ ধীরে ধীরে জটিল হয়ে এবং সরল জীব টিকে থাকার জন্য প্রাকৃতিক নিয়মেই পরিবর্তিত হয়ে জটিল অবস্থার রূপ নেয়।’’
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ”Survival of the fittest” পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়িয়ে নেওয়ার জন্য জীব সরল থেকে জটিল হয়। ডারউইন এ তত্ত্বটি দেন ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর বিখ্যাত গবেষনাপুস্তক ”Origin of species by means of natural selection”. এ তত্ত্বটি তিনি দেন গেলাপেগোস দ্বীপে চার বছর গবেষনার পর। তিনি খাবার গ্রহণের উপর পাখিদের ঠোঁটের আকৃতির পরিবর্তন লক্ষ্য করে এই তত্ত্বটি দেন। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান এতটাই অগ্রসর যা তখনকার সময়ে ছিল না। তাই জেনেটিকস্ মাইক্রোবায়োলজি, এমব্রায়োলজি এ শাখাগুলো বিকাশের সাথে সাথে নতুন নতুন তথ্য উম্মেচিত হয় এবং বিবর্তনবাদ একটি পঙ্গু তত্ত্বের রূপ নেয়। এখানে কতগুলো যুক্তি দেওয়া হল যা বিবর্তনবাদকে একটি ভিত্তিহীন তত্ত্বে রূপান্তরিত করে।
*স্লাইডেন এবং সোয়ান যারা কোষ তত্ত্বের প্রবর্তক তাঁরা বলেছেন ”Every cell comes from a pre-existing cell” প্রত্যেকটি কোষ শূন্য থেকে আসে না। তার অবশ্যই একটি মাতৃকোষ থাকে। ভারউইনের বিবর্তবাদ এটির ব্যাখ্যা দিতে পারে না যা কিভাবে জীবনের উৎপত্তি হল। আর সে জন্য বিবর্তনবাদ একটি ভ্রান্ত তত্ত্বে পরিণত হয়েছে।
বিবর্তনবাদ পরীক্ষা করা খুবই কঠিন। ধরুন, বিবর্তনবাদের অনুসিদ্ধান্ত, এইপের মতো কোন প্রাচীন প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়ে মানুষের উৎপত্তি হয়েছে। এই অনুসিদ্ধান্ত প্রমাণ করতে হলে, কোন এইপ জাতিয় প্রাণীকে উপযুক্ত পরিবেশ দিয়ে মানুষে রূপান্তরিত করতে হবে, যা বর্তমানে অসম্ভব। তার মানে, বিবর্তনবাদ ফলসিফায়েবল না।
*DNA (Deoxyribonucleic Acid) হচ্ছে জীবনের রাসায়কি ভিত্তি। DNA এর উপাদান ৫টি কার্বন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও ফসফরাস। DNA গুলো অ্যামিনো এসিড তৈরী করে আর এই অ্যামিনো এসিডগুলো প্রোটিন তৈরী করে। আজকের বিজ্ঞান আমাদের বলে একটি DNA অনু যদি হঠাৎ করে তৈরী হত ( বিবর্তনবাদ অনুযায়ী) তবে এর সম্ভাবনা 1/10-268 যা শূন্যের কাছাকাছি। এমনকি বিশ্ব জগতের সব অনুপরমানু একত্রিত করেও একটি DNA তৈরী করা সম্ভব না। বর্তমান এত উচ্চমানের গবেষনাগারেও বিজ্ঞানীরা শূন্য থেকে কোষ তৈরী করতে সক্ষম না।
*Thermodynamics এর 2nd Law অনুযায়ী, প্রত্যেকটি সিস্টেম সুশৃঙ্খল অবস্থা থেকে বিশৃঙ্খল অবস্থার দিকে যায় যদি বাহিরের কোন শক্তি এটিকে নিয়ন্ত্রন না করে। ডারউইনের বিবর্তবাদ অনুযায়ী প্রাকৃতিক নিয়মেই সুশৃঙ্খল ভাবে সরল জীবগুলো জটিল অবস্থার রূপ নেয়। Thermodynamics এর সূত্রানুযায়ী, স্রষ্টার সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা ছাড়া প্রাকৃতিক নিয়মে কখনোই সরল জীবগুলো জটিল অবস্থা লাভ করতে পারে না। তাই Thermodynamics যা প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য তা বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করে।
*পৃথিবীর এ বিচিত্র প্রাণীর সমারোহ দেখে আমরা কখনোই ভাবতে পারি না মানুষের উৎপত্তি বানর থেকে। কেননা প্রত্যেকটি প্রাণীর ক্রোমোসোম সংখ্যা নির্দিষ্ট। এর কম বা, বেশি হলে প্রাণীটি তার অস্তিত্ব হারায়। বানরের ক্রোমোসোম থেকে মানুষে উৎপত্তি হওয়াটা বিজ্ঞানের কাছে হাস্যকর।
Mutation বিবর্তনবাদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বিবর্তনবাদ অনুযায়ী সরীসৃপ হতে বিবর্তিত হলে এসেছে পক্ষীকূল। আজকের বিজ্ঞান প্রমাণ কর যে, Mutation অর্থাৎ জীনের পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো জীবের বৈশিষ্ঠ্যের পরিবর্তন করা যায় কিন্তু কখনোই বাঘ থেকে হাতী তৈরী করা সম্ভব না। তাই বিবর্তনবাদ অনুযায়ী, সরীসৃপ থেকে পাখির উদ্ভবের ঘটনাটি অবৈজ্ঞানিক।
*নৃতত্ত্ববিদরা মানুষের উৎপত্তির ধারাকে চারটি ভাগে ভাগ করেন। এগুলো হলঃ অস্ট্রালোপিথেকাস, হোমো ইরেকটাস হোমোএভিলাস এবং হোমোসেপিয়েনস। বিবর্তনবাদের সাথে এই স্তরগুলোর কোন মিল নেই যা এর অগ্রহণযোগ্যতার একটি কারণ।
বিবর্তনবাদকে যারা সমর্থন করেন তারা ফসিল ( Fossil) গুলো থেকে যুক্তি দেখান। মানুষ ও Primate গোত্রের প্রাণীদের Skull গুলো নিয়ে সাদৃশ্য খুঁজে বের করে তারা মানুষের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তাই আজ তারা সবচেয়ে বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন কেননা জিরাফ এবং জেব্রার মত প্রাণীদের ক্ষেত্রে এ ফসিলগুলো উপর্যুক্ত সত্যতা প্রমাণ করে না। অন্য কোন প্রাণীদের ক্ষেত্রে সাদৃশ্য পাওয়া যায় নি।
*বিবর্তবাদ অনুযায়ী প্রতিকূল পরিবেশে টিকে যাকার জন্য প্রাণীদের দৈহিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটে এবং জীবটি তার নিজস্বতা হারিয়ে অন্য একটি প্রজাতিতে পরিণত হয়। আজকের বিজ্ঞান বলে পরিবেশের সাথে সাথে জীবরে কিছু জীনগত পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে জীবটির কিছু বৈশিষ্ট্যর পরিবর্তন ঘটে কিন্তু কখনোই জীবটি অন্য প্রজাতির আরেকটি জীবে পরিণত হয় না। এটি ‘Genetics’ এর একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক সত্য। তাই বিবর্তনবাদ আজ তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন। নোবেল বিজয়ী কয়েকশ বিজ্ঞানী আছেন যারা বিবর্তনবাদকে সমর্থন করেন নি। স্যার ওয়াটসন ও ক্রীক তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
*বিবর্তনবাদ যদি সত্যই হবে তবে বর্তমান একজন মানব শিশুকে মানব পরিবেশ হতে সম্পূর্ন পৃথক করে বনজ পরিবেশে আর একটি বানরকে মানব পরিবেশে আনলেতো অভিযোজন প্রক্রিয়ার ফলে মানব শিশু বানরে আর বানর মানবে পরিনত হবার কথা । কিন্তু তা চিরকাল অসম্ভব যা বুঝিয়ে দেয় যে ডারউইনের বিবর্তনবাদ একটি মিথ্যা যুক্তি ।
*যারা বিবর্তনবাদে বিশ্বাস করেন তাদের জন্য আর একটি প্রশ্ন যে একটি মাত্র কোষ থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট আজকের এই জটিল মহাবিশ্বের সকল । ঠিক সেই কোষটির সৃষ্টিকর্তা কে ? কোথা থেকে পেল তার বিভাজন ক্ষমতা ? সেটার কি জীবন আর বিবেক ছিল ? সেটা কোন পরিবেশে ছিল ? কে প্রথম ঐ কোষটি প্রকৃতিক ভাবে নির্বাচন করেছিলেন ?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর বিজ্ঞান কখনো ব্যাখ্যা করতে পারেনি, তাই বিবর্তনবাদ আজ একটি ভ্রান্ত মতবাদে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ধর্ম এ জায়গায় সফল ও সুন্দরভাবে প্রথম প্রাণ বা আত্মা সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিয়েছে। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব তার সৃষ্টি বানর থেকে হতে পারে না। বরং প্রত্যেকটি সৃষ্টিজীব স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্টি হয়েছে। ঐশীগ্রন্থ প্রাপ্ত ধর্মগুলোর বিশ্বসৃষ্টির ও আত্মাসৃষ্টির ব্যাখ্যা এক এবং পৃথিবীর সকল ধর্মের ব্যাখ্যা কমবেশি কাছাকাছিই। আর এ ক্ষেত্রে সর্বশেষে আগত ইসলামের ব্যাখ্যা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। অন্য একদিন ধর্মের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা হবে। ইনশা আল্লাহ





ভাল লাগল। ধন্যবাদ।