গনতন্ত্র ব্যাসিক বা মৌলিক কোন মতবাদের নাম নয়। এটা শুধু নির্বাচন কেন্দ্রীক কলা কৌশল নির্ধারন করে, সাধারন মানুষদের পছন্দ অপছন্দকে প্রয়োগের সুযোগ তৈরী করে। জনগনের নেতা যিনি হবেন তাকে জনগনই ঠিক করার ক্ষমতা প্রদান করে। এবার রাষ্ট্র কিসের উপর ভিত্তি করে চলবে তাহা আলাদা বিষয়, গনতান্ত্রিক পন্থায় সরকারের রকমফের এর কোন বিষয়ে কোন বক্তব্য নেই।
আব্রাহাম লিংকনের সেই সংজ্ঞাতেই গনতন্ত্রকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এটার পর আর কোন বিশ্লেষন প্রয়োজন পড়েনা ”জনগন দ্বারা, জনগনের জন্য, জনগনের সরকার” ইহাই গনতন্ত্র। সমস্যা হয়ে যায় এটা প্রয়োগের ক্ষেত্রে। যেমন আমরা বৃটিশ বা আমেরিকার গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফলো করি কিন্তু তাদের দেশে চলে দ্বি-দলীয় ও দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি । তারা উন্নত বিশ্বের লিডারশিপের মালিক, স্বয়ংসম্পন্ন দেশ। কিন্তু আমাদের দেশে চলছে বহুদলীয় ও এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা। আমাদের এখানে চলছে জগাখিচুড়ী গনতন্ত্র, দলীয় নমিনেশনে আবার ব্যাক্তি নির্ভর প্রার্থীতা, মার্কা আলাদা আলাদা। এই পদ্ধতিতে সব সময়ই সংখ্যা লগু সরকার প্রতিষ্ঠা হয়, তাই এই সমাজে গনতন্ত্র টেকসই হয়না।
যেমন আমি কুমিল্লার লোক, কুমিল্লার আসন নিয়ে উদাহরণ দেই। ধরে নিন ভোটার সংখ্যা তিন লক্ষ, ভোট কাষ্টিং দুই লক্ষ আশি হাজার, ধরুন আওয়ামী লীগ পাস করেছে এক লক্ষ সাত হাজার ভোটে, বিএনপি নিকটতম পাইছে এক লক্ষ তিন হাজার, আর জামাত চল্লিশ হাজার, জাতীয় পার্টি, ন্যাপ, জাসদ, জাকের পার্টি, বাসদ, কমিউনিষ্ট, ইসলামী ঐক্যজোট সবাই মিলে ত্রিশ হাজার।
তাহলে ফলাফল বিশ্লেষনে দেখা যায় লীগ এক লক্ষ সাত হাজার পেয়ে ক্ষমতার অংশিদার হয়ে গেল। কিন্তু বাকি এক লক্ষ তিয়াত্তর হাজার লোক যে ভোট প্রদান করলেন তাহা সরকার বিরোধী রয়ে গেল। তাই অশান্তি থেকেই যায়, কেননা সংখ্যার দিকে বিবেচনা করলে কম ভোট পাওয়া দলই ক্ষমতা গ্রহন করে, বিরাট অংশ যদিও বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে থাকে কিন্তু প্রেজেন্ট সরকারের পক্ষে তো তারা নাই এই সত্যটুকু কিন্তু আমরা কেউই অনুধাবন করতে পারিনা। তাই সরকার বিরোধীদের সংখ্যা সব সময় বেশী থাকে বা থাকবেই, এ জন্য এই দেশে কখনো পুরোপুরি শান্তি কোন সরকারই পায়না।
আরো একটা মৌলিক গলদ তৈরী করা হয়েছে ভোটের আগেই জোট বেধে নির্বাচন করা। এমনকি নিজেদের মার্কা বাদ দিয়ে অন্য দলের মার্কা নিয়া নির্বাচন করা। তাই বলা যায় এই পদ্ধতিতে জনগনের মতামত সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়না তাই এই গনতন্ত্র টেকসইও হয়না, উন্নয়ণও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
সমাধান কল্পে পরামর্শ
# প্রত্যেক দলের এলাকা ভিত্তিক কাউন্সীলের মতো তাদের দলীয় অভ্যন্তরে আগে একটি নেতা নির্বাচন হবে, এই সব নির্বাচনও ইচ্ছা করলে নিরপেক্ষ ইসি পরিচালনা করতে পারে, এরপর ইসির নিকট সব দলের নির্বাচিত একটি একটি লিষ্ট থাকবে যে ব্যাক্তি বেশী পাইছে তিনি এক নম্বর সিরিয়ালে থাকবেন।
# এরপর মূল নির্বাচনে প্রত্যেক দল মার্কা নিয়া অংশ গ্রহন করবে, ফলাফল নির্ধারিত হবে মূল প্রদত্ত ভোটের অর্থাৎ কাষ্টিং ভোটের পারসেন্টিস % অনুযায়ী সীট বন্টন সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। তখন কারো ভোট কাজে লাগে নাই বা সংখ্যালগু সরকারের জায়গায় সংখ্যা গরিষ্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
# জোটবদ্ধ হওয়া যাবে তবে নির্বাচনের আগে কোন জোট করা যাবেনা, জোট হবে নির্বাচনের ফলাফলের পর। তাহলে যারা হয়তো একটিও সীট এখন পায়না তারা ২/৩ টা আসন হইলেও পাবেন নিজেদের মার্কা নিয়ে। তখন তারা যে কোন জোটে যেতে চাইলে তাদের মূল্যায়ন সঠিক হবে। তখন জাসদের মতো দলের অথর্ব মন্ত্রী হইতে পারবেনা, দলের ত্যাগী ও যোগ্য লোকেরা সংসদে থাকতে পারবেন। এখন দেখা যায় অনেক দলেরই মূল নেতা ফেইল নতুন একজন টাকার বিনিময়ে পাস! তাকে দিয়ে দল বা দেশের কোন উন্নতি আশা করা যায়না। যেমন ভারতে সাইকেল চালিয়ে নেতা সংসদে আসেন সেরকম নেতারা এই দেশেও ভূমিকা রাখতে পারবেন, দলের পারফর্মেন্সও বাড়বে, দলের নেতাদের গুরুত্বও বাড়বে।
# কোন দলের নেতা দলীয় ফোরামে কমপক্ষে পাঁচ বছর কাজ করার পর প্রার্থী তালিকায় নাম আসবে। কেউ ব্যাক্তিগত টাকা খরচ না করে দলের ফান্ডে টাকা জমা দিবে সেখান থেকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খরচ করা হবে।
# কারোর ভোটই পঁচা গেলনা, সকল দলেরই কমবেশী প্রতিনিধি সংসদে থাকবে।
# কোন সংসদ সদস্যই ডিগ্রী পাসের নীচে হতে পারবেননা । মন্ত্রী হবার ক্ষেত্রে যোগ্যতা আর সততা যাচাই করে করতে হবে। সে ক্ষেত্রে লেখা পড়া বলতে সার্টিফিকেট না থাকলেও চলবে, যদি তিনি সে বিষয়ে বিশেষ পারদর্শিতার সুনাম অর্জন করে থাকেন। মন্ত্রী টেকনোক্রেট হতে পারেন, তার জন্য যদি তিনি ঐ দলের লোক নাও হন কিন্তু দল চাইলে তার জ্ঞান দেশের কাজে লাগানোর জন্যে এইসব বিশেষজ্ঞদেরকে উপদেষ্টা বানাতে পারেন।
# কেউ দুইবার প্রধানমন্ত্রী থাকলে তিনি আর দাড়াতে পারবেননা। দলীয় নেতাদের ক্ষেত্রেও বয়স বাইন্ডিং করতে হবে, এরপর তারা উপদেষ্টা হিসাবে মৃর্ত্যুর আগ পর্যন্ত থাকবেন। চাকরী ক্ষেত্রে বয়স বাইন্ডিং থাকবে আর নেতা মন্ত্রীদের ব্যাপারে থাকবেনা এটা দ্বিমূখী নীতি, তাহা বাদ দিতে হবে।
# প্রত্যেক দলের নিজস্ব যেমন মতবাদ আছে তেমনি সেই ধরনের মতবাদের ভিত্তিতে প্রত্যেক দলের কিছু প্রজেক্ট থাকতে হবে। যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প এইসব বিষয়ে তাদের মতবাদ ভিত্তিক প্রজেক্ট করার অনুমোদন থাকবে। দলের কর্মসূচীতে কমন কিছু বিষয় থাকবে একই রকম যেমন নিরক্ষরতা দূরীকরন, পোলিও প্রোগ্রাম ইত্যাদি।
আমি সংক্ষেপে একটা ডায়াগ্রাম বর্ননা করলাম মাত্র। এই পদ্ধতিতে কোন দল একেবারে গো হারা হারবেনা, জবাবদিহীতা বাড়বে। তখন বলা যাবে বা দেখা যাবে টেকসই একটা গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পাবে। তখন দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত হবে, যা উন্নয়নের পূর্ব শর্ত তা পেলে জীবন মান সব কিছু বদলে যাবে। চোরদের দালাল বিদেশী এজেন্ট সবই ধরা পরে যাবে।
প্রাসঙ্গিক লেখাঃ টেকসই গণতন্ত্রঃ উন্নয়নের পূর্বশর্ত




