আলী আহসান মুজাহিদ প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন বলে আগেও মনে হচ্ছিল। যদিও কেউ কেউ বলছেন মুজাহিদও চাননি, সরকার অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে সালাউদ্দিন কাদের সরাসরি না করে দিয়েছেন। ফারাকটা গুরুত্বপূর্ণ।অবশ্য প্রাণ ভিক্ষা চাওয়া বা না চাওয়ায় কিছু আসে যায়না, খবরের সত্য-মিথ্যেতেও কিছু যায় আসেনা। আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন সরকার জাতীয় ঐক্যের পথ থেকে সরে গিয়েছে আগেই,মানে ঐক্য-রাষ্ট্র থেকে সরে মতাদর্শিক রাষ্ট্র।ফলে গ্রহণ করবে বলে মনে হয়না।
তবে মুজাহিদের ক্ষমাপ্রার্থনা একরকম তাচ্ছিল্য। যে তাচ্ছিল্য হয়তো বলেছে, শেষ সুযোগ দিয়ে গেলাম! ফাঁসি হয়ে গেলে জামায়াতি রাজনৈতিক ইসলামের সাথে বাংলাদেশের সেকুলারিজমের সংঘর্ষ জরুরি হয়ে উঠবে।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা ইসলামপন্থীরা একে কীভাবে দেখব ও এর সাথে কীভাবে সম্পর্কিত হব?
জামায়াত কি কোন সংঘর্ষে যেতে চাইবে ও পারবে? হয়তো না। তবে তার মধ্যে সংঘর্ষ-চিন্তা ও তার প্রয়োগ সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু এখন ক্ষমতার ব্যবহার করতে গেলে রাষ্ট্র দুর্বল হবে, দল আকারে জামায়াত অসামাজিক ও নেতিবাচক আকারে গড়ে উঠবে। সেটা তারা নিশ্চয় চাইবেনা।
জামায়াতের এখন দরকার, রাষ্ট্রটা ধরে রাখা,যে রাষ্ট্র তারা একসময় চাননি এবং সামাজিক ও দাওয়াতি কাজে সক্রিয় হওয়া। ইসলামপন্থা ও সেকুলারিজমকে একটা একক নৈতিকতায় টেনে আনা, এটা দীর্ঘ মেয়াদী প্রসেস অবশ্যই!
অনেক বছর আগে পল্টনে মাওলানা মওদুদি (রহঃ) এর আগমনে বাঁধা দেবার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামীলীগ। আমাদের মাদরাসায় (জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া, লালবাগ) শেখ মুজিব ফোন করে বলেন; আমরা কিন্তু তাদের উপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মাদরাসা পর্ষদ থেকে কোন কিছু বলা ছাড়াই ফোন কেটে দেওয়া হয়। গোলাম আজম ও শেখ মুজিব দুজনের সাথেই আমাদের মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সম্পর্ক ছিল। তারা মাঝে মাঝেই আসতেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়, তারা কেউ কথা শুনছিলেন না। একটা কঠোর ইসলামপন্থা ও জাতীয়তাবাদের দিকে হাটতে থাকেন। ফলে তারা আসলেও শায়খরা কেউ দেখা দিতেননা।
আজকে এত বছর পরে এসে মনে হচ্ছে, শায়খরা বিপদ বুঝতে পেরেছিলেন বটে। কিন্তু লাভ হয়নি কিছুই। তারা দায়িত্ব নিতে পারেননি। তারা ব্যর্থ। যদি ফোন কেটে না দিয়ে মুজিবকে বলতেন, বাবা কোনভাবে মীমাংসা করা যায়না? একটা ডাকমাত্র, তাহলে আজ মুজাহিদের তাচ্ছিল্যের শেষ বাঁশিটা বাজাতে হতনা, রাষ্ট্রটাও ব্যর্থতার দিকে যেতনা।
এটা ঠিক যে, সেকুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ও ইসলামপন্থার মধ্যে মতাদর্শিক ফারাক দূর করা অসম্ভব। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে মতাদর্শ ব্যবহার করা আরও ভয়ঙ্কর।তবে মুশকিল হচ্ছে, সেকুলারিজমের মাধ্যমে অপরকে মতাদর্শহীন করে নিজের মতাদর্শকে একক আকারে হাজির করার গ্রীকো খৃস্টান তরিকা কোন কাজে আসছেনা এবং আসবেনা। বরং আরও জুলুম সৃষ্টি করবে।
রাষ্ট্রকে মতাদর্শহীন করার পথ হচ্ছে রাজনীতি কথাটা ইসলামি ট্র্যাডিশনের মধ্য দিয়ে বুঝা। এখানে রাজনীতি মানে শুধু পরিচালনা ও নিরাপত্তা। বাকি সব সমাজের কাঁধে অর্পিত। সামাজিক স্বাধীনতায় সিদ্ধান্ত হোক কে কোন মতাদর্শ গ্রহণ করবে,সে সেই মতাদর্শই গ্রহণ করুক। রাষ্ট্রে মতাদর্শিক সিদ্ধান্ত নেবার স্পেস তৈরি করে মতাদর্শহীন হতে বলা স্রেফ ধোঁকাবাজি।
মোদ্দাকথা আসলে, আমরা কি এমন রাষ্ট্র বানাতে পারিনা যাকে ইসলামপন্থীরা ভাববে ইসলামি রাষ্ট্র এবং সেকুলাররা সেকুলার রাষ্ট্র? এটা কি মুজাহিদের ক্ষমা চাইবার মর্ম? এ মর্ম হোক বা নাই হোক, আমরা যাতে এই সহিংসতা-সংঘর্ষের মধ্যেও আমাদের দায়িত্ব না ভুলি!




