জামায়াত গঠনের গোড়ার কথা-২:দারুল ইসলাম বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন

লিখেছেনঃ এম এন হাসান

জামায়াত গঠনের গোড়ার কথা-1

জামায়াতকে study করতে হলে তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারনা থাকতে হবে কারন মাওলানা মওদুদী জামায়াত শুরু করার আগে শিক্ষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তার লেখাও ঐ বিশেষ পরিস্থিতি দ্বারা দারুনভাবে প্রভাবিত হয়েছিল

তৎকালীন শিক্ষার পরিবেশ

ঐ সময়ে দুইটি পরস্পর বিরোধী শিক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল।  পুরাতন ধর্ম ভিত্তিক( মাদ্রাসা)স্কুল  খনতুন পশ্চিমা ধারার স্কুল। প্রথমটার বৈশিষ্ট্য ছিল সময় অনুপযোগিতা বিশেষ করে অর্থনৈতিক বিচারে(ইংরেজিতে বলে suffered from stagnation) এবং অন্ধঅনুকরন (তাকলিদ)যা সমাজে দুর্বল চেতা খুবই রক্ষনশীল মুসলমান তৈরি করছিল। অন্যদিকে দ্বীতিয় মাধ্যম ছিল বিদেশি সংস্কৃতির উপর নির্ভরশীল এবং একেবারে ইসলামিক চিন্তা চেতনা থেকে দুরে।

একটা মাধ্যম যে সমস্ত লোক তৈরি করছিল তারা বাস্তবিক অর্থে সমাজের দায়িত্ব নেয়া ও নেতৃত্ব দেয়ার অনুপযোগি এবং তা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন লোক তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছিল।অন্যদিকে অন্য মাধ্যম দুনিয়াবী যোগ্যতা সম্পন্ন লোক তৈরি করছিল বটে কিন্তু তা ধর্মের দিকনির্দেশনা অনুসারে ধর্মীয় জ্ঞান সম্পন্ন লোক তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। ঐ পরিবেশে অবস্থা দাড়িয়েছিল এই যে, দুই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা দুই ধরনের ভিন্ন spirit বা মানসিকতার লোক তৈরি করছিল যাদের চিন্তা চেতনা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখি।ফলে এটা সমাজের অভ্যন্তরে মারাত্নক conflict তৈরি করছিল।(1)

এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখে মাওলানা মওদুদী “দারুল ইসলাম” প্রতিষ্ঠা করেন যার লক্ষ ও উদ্দেশ্য ছিল নিন্মরুপ ;

“We have decided to assemble within the precincts of this institute person well-versed in modern academic disciplines, and others who have a deep grasp of the religious sciences. These individuals must be of high calibre and intellectual capability. They will work under the guidance of a mentor, to be appointed shortly, who will be of excellent moral character. Besides having attained deep and full insight into the wisdom of the Holy Qur’an, he will know in detail about modern revolutions and changes in various realms. He will work to acquaint these people with the spirit and elan of the Divine Book and the Prophet’s (SAW) Sunnah. He will also help them in reconstructing the manifold aspects of Islamic thought, including Philosophy, “Hikmah”, Morality, Political Science and Economics, so that through their scholarship and missionary work they can struggle to revive the pristine glory of Islamic civilization.” (2)

অর্থাৎ, “আধুনিক যুগের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এবং ধর্মীয় বিজ্ঞানে যাদের গভীর দখল রয়েছে,এমন মানুষকে একটা প্লাট ফরমে নিয়ে আসার ব্যাপারে আমরা সীদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। এই ধরনের লোক গুলো অবশ্যই অতি উচ্চ জ্ঞান সম্পন্ন এবং বুদ্ধিভিত্তিক দক্ষতা সম্পন্ন হবে। তারা খুবই ভাল চরিত্রের অধিকারী একজন মেন্টরের নেতৃত্বে কাজ করবেন যিনি কিনা অল্প সময়ের মধ্যেই নিযুক্ত হবেন। পবিত্র কোরআনের অন্তর্নীহিত এবং পরিপূর্ন অন্তদৃষ্টি সম্পুর্ন জ্ঞানের পাশাপাশি তিনি আধুনিক বিপ্লব এবং বিভিন্ন সাম্রাজ্য বা শক্তির পরিবর্তন সম্পর্কেও জানবেন।তিনি ঐ লোকদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত ওহীর স্পিরিট ও রাসুলের সুন্নাহর আলোকে সব কিছু সবিস্তারে বর্ণনা করবেন। তিনি তাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামিক চিন্তার পূনর্গঠনেও সাহায্য করবেন, ঐ সমস্ত বিষয়ের মধ্যে থাকবে দর্শন, হিকমা,এথিকস(মূল্যবোধ), রাষ্ট্র বিজ্ঞান, অর্থনীত,যার ফলে তাদের নেতৃত্বে দাওয়াতী কাজ এবং প্রচেষ্টায় ইসলামের স্বর্নময় যুগের পূনর্জাগরণ ঘটবে।”

স্বাভাবিক ভাবে পাঠকের বুঝে আসে এখানে Mentor বলতে মাওলানা মওদুদী নিজেকেই বুঝিয়ে ছিলেন।তাই এখানে মাওলানা মওদুদী সম্পর্কে সংক্ষেপে   না বললে বুঝা যাবেনা কেন তিনি ঐ যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন।

সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী ১৯০৩ সালের ২৫ ই সেপ্টেম্বর ভারতের আওরঙ্গবাদের খুবই সম্মানীত ও রক্ষনশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন।জানা যায় তার পরিবারের ক্রনলজি (“সাইয়েদ”)রাসুল সঃ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে।তার পরিবারে সুফী ইসলামের যথেষ্ঠ প্রভাব বিদ্যমান ছিল। ছোট থেকে শিক্ষার প্রতি তার যথেষ্ঠ জোঁক থাকায় মাত্র ৫ বছর বয়সে তিনি অর্থসহ কোরআনের ৩০টি আয়াত মুখস্থ করেন।ছোট বয়স থেকেই মওদুদীর উপর তার মা(যিনি ছিলেন খুবই ধার্মিক,তিনি প্রায় সব সময়ই রোজা রাখতেন) এর প্রভাব ছিল বেশি।

মাওলানা মওদুদী তার বাবার অসুস্থতা এবং তার মৃত্যুর পর পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা করতে পারেননি।কিন্তু তার বাবা যিনি নিজে খুবই বড় মানের আলেম ছিলেন,তিনি নিজেই তার ছেলেকে তৈরি করছিলেন এবং অসুস্থ হওয়ার পর তার ছেলের জন্য বাসায় ওস্তাদ রেখে দিয়েছিলেন।ফলে অল্প বয়সে তিনি ফিকাহ,যুক্তিশাস্র,হাদীস এ এক্সপার্ট হয়ে উঠেন।মাত্র ১৬/১৭ বছর বয়স থেকে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন।১৬ বছর বয়সে তিনি ইংরেজি শেখা শুরু করেন এবং মাত্র ছয় বছরের মাথায় , he was in a position to read, digest and assimilate English works dealing with history, philosophy, economics, political science and other subjects with ease. (3)

যার ফলে পরবর্তীতে তার লেখায় পাশ্চাত্য দর্শনের কঠোর সমালোচনা খুজে পাওয়া যায়।তার লেখা “ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দন্ধ” , “ইসলাম ও   “গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ইসলাম”,“পুঁজিবাদ ও ইসলাম”“ইসলাম ও ধর্মহীন গণতন্ত্র” ইত্যাদি বই গুলো তার প্রমাণ। রশীদ মতিন বলেন, The influence of traditional and western Knowledge is discernible upon careful reading of his essays that cover a wide spectrum of subject :from a critique of Hegel and Marx to the religious injunctions concerning meat and establishing an Islamic Political system (4)

দারুল ইসলাম অধ্যায়ের সমাপ্তি

দুঃখজনক হলো, যেই লক্ষ্য নিয়ে পাঠানকোটে মাওলানা মওদুদী দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন তা বেশি দিন স্থায়ীত্ব পায়নি।মাত্র ৪ জন মানুষ তার ঐ আন্দোলনে শরিক হন। মাত্র কয়েক মাস পরে মাওলানা দারুল ইসলাম ছেড়ে লাহোর চলে যান এবং তরজুমালুন কোরআন ওখান থেকেই প্রকাশ পায়। কারন হিসেবে মাওলানা মওদুদীর ভাষ্য আমি তেমন একটা খুজে পায়নি তবে পরবর্তিতে এক বক্তৃতায় তিনি বলেন Dar al-Islam was considered to be absolutely insignificant (5)

কিন্তু তার এক সময়ের খুবই ভক্ত ও পরে কট্টোর সমালোচক মাওলানা মনজুর নোমানী বলেন, যিনি দারুল ইসলাম গড়ার জন্য জায়গাটি দান করে ছিলেন(চৌধুরী নেয়াজ আলী খান) তিনি মাওলানা মওদুদীর ছোট দাড়ীর কারনে তার তাকওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন ফলে একটা সময় কিছুটা ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয় এবং দারুল ইসলাম ছেড়ে চলে যান মাওলানা মওদুদী। তখন থেকেই মওলানা মওদুদী আরো গনমুখী আন্দোলনের চিন্তা করতে থাকেন(6),যা পরবর্তিতে জামায়াতে ইসলামী নামে প্রতিষ্ঠিত হয়।

দারুল ইসলামের ক্ষণস্থায়িত্বের একটা কারন

দারুল ইসলামের ক্ষণস্থায়িত্বের একটা কারন জানা যায় মাওলানা মনজুর নোমানীর বই থেকে। তিনি বলেছেন যে লোক দারুল ইসলামের জন্য জায়গা দিয়েছিলেন তিনি খুব আল্লাহওয়ালা লোক ছিলেন এবং আল্লামা ইকবালের পরামর্শে ঐ জায়গায় মাওলানা মওদুদীকে আমন্ত্রণ জানান।মাওলানা মওদুদীর লেখা মাধ্যমে তিনি তাকে চিনতেন এবং খুবই উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। কিন্তু মাওলানা মওদুদীকে যখন তিনি প্রথম দেখলেন তখন তার ছোট দাড়ির কারনে প্রথম আশাহত হন।এভাবে শুরু হলেও যখন দেখলেন মাওলানা মনজুর নোমানী দারুল ইসলামে একই কারনে জয়েন করতে রাজী হলেন না তখন ঐ ব্যক্তির সাথে মাওলানা মওদুদীর দুরুত্ব বাড়তে থাকে।আর মাওলানা মওদুদীও ছিলেন যথেষ্ঠ পারসোনালিটি সম্পন্ন লোক, তিনি নিজেও একটা সময় দারুল ইসলাম ছেড়ে চলে যান লাহোরে।

চিন্তার খোরাকের জন্য দুটো কথা

প্রথম কথা, যে পরিস্তিতিকে সামনে রেখে জামায়াত গঠন হয়েছিল তা এখন সবার  কাছে পরিষ্কার। প্রশ্ন হচ্ছে ঐ পরিস্থিতি কি এখনো বদলেছে? শিক্ষার পরিবেশ কি এখনো উপরে বর্ণিত দুই ধারায় চলছেনা?? তাই যদি হয় তাহলে “দারুল ইসলামের” মত শিক্ষা আন্দোলন আজও আমাদের সমাজে খুব প্রয়োজন,এই চিন্তাটা কিছু লোকের মাথায় আশা উচিৎ।

দ্বীতিয়ত, দ্বীমুখী শিক্ষায় শিক্ষিতরা এখনো একে অপরের সাথে conflict এ লিপ্ত নয় কি?? এই ইস্যুটা  আজ জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে । এই বিষয়ের কোন সফল উপসংহারে পৌঁছানো যাবে কি..??

Related Next postজামায়াতে ইসলামী গঠনের ইতিহাস

Note:
1. Jamat-e-Islami ke 29 Sal, fn.1, 24
2. Islamic Renaissance: The Real Task Ahead, Dr. Israr Ahmad (1968), English Translation by Dr. Absar Ahmad (cited from “Iqbal, Darul-Islam and Mawdudi”, P.82)
3. Asim Numani (compiled), Makateeb Sayyid abul Ala Maududi (writings of Mawdudi) (Lahore: Islamic Publication, 1981), 312
4. Abdur Rashid Moten (page-19)
5. S. Zakir Aijar tr., Selected speeches and writing of Maulana Mawdudi,(Karachi:International Islamic Publication,1982).Vol.II, page 1-2
6. মাওলানা মনজুর নোমানী,২৬

One Response

  1. শাকিল মামুন
    শাকিল মামুন at |

    দারুল ইসলামের প্রয়োজনীয়তা মোটেও ফুরিয়ে যায়নি। এর প্রয়োজনীয়তা কখনোই ফুরায়নি ফুরাবেও না। অসংখ্য দারুণ ইসলাম প্রয়োজন। যার মধ্য দিয়ে তৈরী করা যাবে আগামী দিনের কর্মী, কর্মপদ্ধতি এবং নেতা।

    Reply

Leave a Reply