[বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষন: ধারাবাহিকতা রক্ষার সার্থে এই সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ার পরেই এই লেখাটা পড়ার অনুরোধ রইল]
জামায়াতের ইতিহাস-৭: সংগঠনের ভিতরে রাজনীতির শুরু
গত পর্বের সারসংক্ষেপ: আবদুল রহিম আশরাফ এর নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্টিত শুরার সামনে জামায়াতের লাহোর অফিসের অর্থনৈতিক অপব্যবহার ও অন্যান্য অপকর্মের বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করার পর জামায়াতকে মুল ধারায় ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে শুরা ১৫ দিন ব্যাপী আলোচনার পর ৪টি মুল প্রস্তাবনা নিয়ে অধিবেশন সমাপ্ত করে।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য,মাওলানা মওদুদী তার আশেপাশের কিছু সংখ্যক দায়ীত্বশীল দ্বারা রাজনৈতিকভাবে মোটিভেট হয়ে তদন্ত কমিটিকে সংগঠনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিয়ে পদত্যগের আহবান জানান।
(গত পর্বের পর থেকে)
কমিটির চার সদস্য মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহীর কাছে সুবিচার প্রার্থনা করলেন।মাও ইসলাহীকে মাওলানা মওদুদীর পরেই জামায়াতে মান্য করা হত।অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের মতে মাও মওদুদীর পর তিনিই জামায়াতের আমীর হওয়ার সবচেয়ে যোগ্য ছিলেন।তিনি মাওলানা মওদুদীর সাথে জেলও খাটেন (1)।
তিনি সেই ব্যাক্তি আন্দোলনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গী কেমন ছিল তা তার নিন্মলিখিত লেখা থেকে বুঝা যায়,
“এ সংগ্রামের পথে আমাকে চলতেই হবে।যদি চলার সাধ্য না থেকে তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও চলতে থাকবো।এরও সাধ্য না থাকলে বুকে গড়িয়ে চলবো।সে ক্ষমতাটুকু যদি না থাকে তাহলে আমার চলার পথের দিকে তাকিয়ে থাকবো,যতক্ষণ প্রাণ থাকে।তবুও এ পথ ছেড়ে যাবো না।এ পথ ছাড়া আর কোন পথ নেই“(2)
ব্যক্তি জীবনে মাওলানা ইসলাহী খুবই ঠান্ডা মেজাজের মানুষ ছিলেন।তিনি এই ঘটনার আগ পর্যন্ত সবসময়ে মাওলানা মওদুদীকে সাপোর্ট করে গেছেন।এই প্রথম তিনি ঐ চার সদস্যদের পক্ষ হয়ে রেসপন্স করেন।তিনি মাওলানা মওদুদীকে ঐ চার সদস্য যারা কিনা জামায়াতের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র ও উচ্চ তাকওয়ার অধিকারী, তাদের কথা স্বরণ করিয়ে দিয়ে তার ঐ সীদ্ধান্তের সমালোচনা করে জবাব চান।মাওলানা মওদুদী নিজে তাদেরকে রিভিউ কমিটিতে নিয়োগ দেন।তাদের তিন জনেই ছিলেন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রাদেশের আমীর।যেমন; আব্দুল গাফ্ফার হাসান(১৯৪৮-৪৯,৫৬),আব্দুল জব্বার গাজী(১৯৪৮-৪৯)এবং সুলতান আহমেদ (১৯৫৩-৫৪)।

তিনি মাওলানা মওদুদীকে জিজ্ঞেস করেন,তাদের প্রতি তার আনা অপবাদের অন্যায় হিসেব না করেই তিনি কিভাবে তাদের সততার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেন।তিনি মাও মওদুদীকে আরও বলেন জামায়াত সেন্ট্রাল অফিসের স্টাফদের কুটিল প্ররোচনায় জামায়াত সংবিধান অনুসারে তিনি অগনতান্ত্রিক আচরণ করেছেন। মাও ইসলাহী এটাকে আরো গভীরে গিয়ে দেখলেন সাংবিধানিক ভাবে প্রদত্ত শুরার ক্ষমতায় আমীরের অনধিকার প্রবেশ, আর তাই সংবিধানকে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করলেন।(3)
উপরোক্ত কথাগুলোর সমন্বয়ে আমিন আহসান ইসলাহীর লেখা চিঠি যখন মাওলানা মওদুদী পেলেন তখন তিনি খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং জামায়াত সেক্রেটারী মিয়া তুফায়েল কে চিঠি লিখেন যাতে জামায়াত তাকে মৃত মনে করে(অথবা তিনি মারা গেলে যা করা হত) নতুন আমীর নির্বাচন করে নেয় (4)।
মাওলানা মওদুদী খুব ভাল করেই জানতেন জামায়াতে তার অবস্থান কোথায়।ইসরার আহমেদের মতে মাওলানা মওদুদী জানতেন তার পদত্যাগ দলের ভিতর আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ঠ এবং জামায়াতের সদস্যদের মতামতের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করবে। এই ঘটনার মাধ্যমে মাওলানা জামায়াতকে কঠিন দুটি অবস্থানে ছেড়ে দেন;তিনি থাকবেন অথবা সমালোচকরা!(5)
মাওলানা মওদুদীর খুবই loyal lieutenants হিসেবে পরিচিত মিয়া তোফায়েল,নঈম সিদ্দিকি এবং মালিক নাসরুল্লাহ খান আজিজ মাও ইসলাহীর কাছে গেলেন এই ক্রাইসিসের সমাধানের জন্য। ইসলাহী তাদেরকে মাওলানা মওদুদীর পদত্যাগের কথা ভিতরে,বাহিরে কারো কাছে প্রকাশ না করার নির্দেশ দেন এবং গোপনে শুরার একটি সেশান ডাকতে বলেন।কিন্তু নঈম সিদ্দিকি এখানে হেকমত খাটিয়ে পদত্যাগ করে নিজেকে জামায়াতের কোন আদেশ-নিষেধ মানা থেকে মুক্ত করে নেন।এরপর তিনি ইসলাহীর আদেশ অমান্য করে মাও মওদুদীর পদত্যাগের খবর ও কারন হিসেবে মাও ইসলাহী ও রিভিউ কমিটিকে দায়ী করে খবর ছড়িয়ে দেন।এই খবর জামায়াত ছাড়িয়ে তৎকালীন মিডিয়েতেও চলে আসে।(6)
মাওলানা মওদুদীর পদত্যাগের পর চৌধুরী গোলাম মোহাম্মদ নায়েবে আমীর হিসেবে নিযুক্ত হন।তিনি মাও মওদুদী ও মাও ইসলাহীর মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেন।জামায়াত নেতৃবৃন্দু এটা জনাতেন যে যদি সরকার জামায়াতের আভ্যন্তরীন এই ব্যাপারে জানতে পারে এবং জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পায় তাহলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে এবং ইসলামী আন্দোলন নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হবে।গোলাম মোহাম্মদ মাওলানা মওদুদীকে তার পদত্যাগ পত্র তুলে নিতে বলেন এবং যারা এই ব্যাপারে জানে তাদেরকে কঠোর গোপনীয়তা পালন করতে নির্দেশ দেন।
মিয়া তোফায়েল ১২ জানুয়ারী ১৯৫৭ সালে শুরা সেশান ডাকেন কিন্তু ইসলাহী,আশরাফ এবং জব্বার গাজী ঐ সেশানে যোগ দেননি।মাও ইসলাহী বলেন জামায়াত নেতৃবৃন্দু ইচ্ছাকৃতভাবে এই সভা ডেকেছেন যাতে করে ওনাদের উপস্থিত হওয়ার পরিবেশ না থাকে(7)।মাওলানা মওদুদীর অভিযোগ ছিল মাও ইসলাহী নিজের উচ্চাকাঙ্খা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এসব করেছেন,এর sensitivity চিন্তা করে মাও ইসলাহী ভদ্রতা সুলভ ভাবে পদত্যাগ করেন(8)। কিন্তু গোলাম মোহাম্মদের নেতৃত্বে জামায়াতের উচ্চ পর্যায়ের একদল তাকে ফেব্রুয়ারী ১৯৫৭ সালে আগত রুকন সম্মেলন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অনুরোধ করেন এবং পদত্যাগ পত্র তুলে নিতে রাজী করান।তিনি পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহার করে নেন এবং ঐ দলের কাছে সমঝোতার ব্যাপারে সম্মত হন।যারাই তার কাছে গিয়েছে তিনি তাদের সাথে ছিলেন আন্তরিক(9)।
তিনি রিভিউ কমিটির দায়িত্বশীলদের প্রতি যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা তুলে নেয়ার এবং মাওলানা মওদুদীর ক্ষমতাকে সুনির্দিষ্ট করে দেবার দাবী জানান।গোলাম মোহাম্মদের নেতৃত্বে শুরা সদস্যগন কোন রকম পরিবর্তন ছাড়া মাওলানা ইসলাহীর প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হন এবং আব্দুল গাফ্ফার হাসান মাওলানা মওদুদীকে বাধ্য করেন তার পদত্যাগ পত্র তুলে নেয়ার(10)। কিন্তু মাওলানা মওদুদী ও তার সমর্থকগন কোন রকম সমঝোতায় যেতে রাজি হননি বরং মাও মওদুদী একটা শর্ত দিয়ে ঐ প্রস্তাবনায় রাজী হন; রুকন সম্মেলনের মাধ্যমে এই মতানৈক্যের ব্যাপারে সীদ্ধান্ত নিতে হবে।(11)
মাওলানা মওদুদী কেন রুকন সম্মেলনে এই সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন, এর উপরে ভেলি রেজা নাসরের একটা এক্সপার্ট রিভিউ দেখুন,
He (Maulana Mawdudi) intended to hold the threat of resignation over the shura’ and the review committee, because he was convinced that the rank and file of the party supported him and that an open session would circumvent the constitutional powers of the shura’, which was stacked against him by supporters of Islahi and the review committee. Faced with constitutional restrictions and unable to win his case through regular channels, Mawdudi circumvented the very rules he had himself devised to prevent the domination by any one leader.
This was a volte-face with momentous implications and a testament to the fundamental role politics and personal ambitions played in Mawdudi’s decisions and policies. By acceding to an open meeting and Mawdudi’s demand that Jama’at members arbitrate the issues in dispute, the shura’ surrendered its constitutional powers to an ad hoc body, opening the door for the amir to undermine the authority of the shura’ with the blessing of its members.(12)
মাছিগোটের ফলাফল তো এখানেই নির্ধারণ হয়ে যায়।এখানে একটা বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার মাওলানা মওদুদী একই সাথে ছিলেন Ideologue ,কারো কারো ভাষায় মুজাদ্দিদ এবং খুবই জানু politician(রাজনীতিবিদ),ইতিহাসের এই পর্যায়ে দেখা যায় তার geniuses of politics এর কাছে দলের শুরা সদস্যগন পরাভূত।
একটা উদাহরন দিয়ে শেষ করতে চাই, মানুষ হিসেবে আমরা সবাই সমান এতে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু যোগ্যতার বিচারে মানুষের পার্থক্য আমরা করে থাকি।একজন ব্যারিষ্টার আব্দুর রাজ্জাক কে এক পাল্লায় এবং অন্যদিকে ১০-২০ জন সাধারন রুকনকে আরেক পাল্লায় রাখলে আমার কাছে মনে হয় প্রথম জনের দিকে পাল্লা ভারী হবে।মাছিগোটে সম্মেলনের এক পর্যায়ে মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহীও মাওলানা মওদুদীকে একই প্রশ্ন করেছিলেন বলে জানা যায় ” মাওলানা! আপনি সাধারন রুকনদের ভোটের সাথে আমাদের তুলনা(এখানে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বুঝানো হয়েছে)করলেন”? আগেই বলেছি politician always ruled the world and here in Jamat too.
মাছিগোট জামায়াতে ইসলামীর paradigm shift (দিক পরিবর্তন) করে দিয়েছে,এ নিয়ে লেখা খুবই কম আমাদের দেশে।অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেব তার বইতে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অল্প একটু বর্ণনা করেছেন,যেটুকু বর্তমান আন্দোলনের পক্ষে যায় ঠিক ততটুকুই।তাই একটু সবিস্তারে বর্ণনা করতে আরেকটা পর্বে দিতে হবে।
পরের পর্ব ৯:ঐতিহাসিক মাছিগোট,জামায়াতের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা
নোট:
1. অধ্যাপক গোলাম আযম,জীবনে যা দেখলাম,২য় খন্ড, কামিয়াব প্রকাশনী,বাংলাবাজার,ঢাকা,পুনর্মুদ্রণ,২০০৪,পৃষ্ঠা: ২১৯
2. Ibid: পৃষ্ঠা:২২০
3. Sayyed Vali Reza Nasr , The vanguard of the Islamic revolution: the Jamaʻat-i Islami of Pakistan, University of California Press,1994 :34 cited in NGH :33-56
4. Archival papers of Islamic Studies Academy, Lahore
5. Israr ahmed arguments,Reza Nasr:35 cited in NGH :73-75
6. Sayyed Vali Reza Nasr , The vanguard of the Islamic revolution: 35
7. Sayyed Vali Reza Nasr cited from NGH:82
8. ১৯৫৮ সালে মাও ইসলাহী তার পদত্যাগের কারন ব্যাখ্যা করে মাও মওদুদীকে যে চিঠি দেন তাতে তিনি কঠোর ভাষায় তার উচ্ছাকাঙ্খার কথা অস্বীকার করেন। That letter is reprinted in Nida (March 14, 1989): 29
9. Mithaq 39, 3 (March 1990): 32
10. Since members of the review committee had never asked for Mawdudi’s resignation, they were hard-pressed not to go along with Ghulam Muhammad’s initiative. Sultan Ahmad did register a note of dissent regarding such manipulations of the shura’ to Mawdudi’s advantage. This note was excluded from circular no. 118-4-27 of January 19, 1957, which reported the proceedings of this shura’ session to the members; see NGH, 80-81
11. Ibid., 81
12. Sayyed Vali Reza Nasr , The vanguard of the Islamic revolution: the Jamaʻat-i Islami of Pakistan, University of California Press,1994,pp 36
মন্তব্য
(লেখাটি সোনার বাংলাদেশ ব্লগে প্রথম প্রকাশ হওয়ার পরে,অনেক পাঠকই মন্তব্য-প্রতি মন্তব্য করেছেন।সেখান থেকে পোষ্টের সাথে রেলিভেন্ট কয়েকটি মন্তব্য তুলে ধরা হল।)
যাররিনের বাবা লিখেছেন : এই পোস্ট এবং এর আগের পোস্টটি একটি আদর্শবাদী দলের অজানা অধ্যায়, আপনার মাধ্যমেই প্রথমবারের মত জানতে পারলাম! এধরণের একটি দলের সাথে জড়িত থাকে হাজারো কর্মীর আবেগ, কেউই ভূলের উর্ধে নয় এ কথা মুখে বললেও মন মানতে রাজী থাকেনা চুল পরিমাণ বিচ্যুতি, তাই এ আলোচনা তাদের জন্য প্রায় বজ্রপাতের শামিল সে কথা নিজেকে দিয়েই বুঝতে পারছি।একটি ব্যাপার নিশ্চিত হওয়া দরকার। আপনার না বলা ইতিহাসের একটি বড় সোর্স হল সাইয়েদ ভালী নাসর-এর বইটি। আশা করি এটিও একটি নির্মোহ এবং পক্ষপাতহীন সোর্স। যেহেতু বইটি আপনার সংগ্রহে আছে, তাই মনে করছি, আপনি এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই উপস্হাপন করছেন!
লেখকের জবাব; আপনি জানতে চেয়েছেন ভেলী রেজা নাসর সম্পর্কে;
লেখক বাংলাদেশ/পাকিস্তান কোথাও জামায়াতের পক্ষেরও না, না সে বিপক্ষের।প্রত্যক্ষ ভাবে জামায়াত তার কোন stake নেই বলা চলে তবে হ্যা পরোক্ষ কিছু stake থাকতে পারে যেমন আমেরিকা সহ পাশ্চাত্য গবেষকগন বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্টাডি করেন।লেখক Massachusetts Institute of Technology(MIT) থেকে পলিটিকাল সাইন্সে পিএইডি করেন যেখানে তার থিসিস ছিল জামায়াতে ইসলামীর উপর।পরে সে জামায়াতের উপর তিনি বইও লেখে।ইসলামিক পূনর্জাগরনে মাওলানা মওদুদীর অবদান নিয়েও তার একটা বই আছে।পি এই ডি করতে গিয়ে সে অনেক জামায়াতের উর্ধতন কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছেন তাদের ইন্টারভিউ নিয়েছেন যেটা আমি আগেই বলেছি প্রায় ৪৫ জন জামায়াত সংশ্লিষ্ট লোকের ইন্টারভিউ তার বইয়ে পাওয়া যায়।
মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী, মাও হাসান নদভী, ডা ইসরার আহমেদ, মিয়া তুফায়েল, কাজি হোসাইন আহমেদ সহ অনেক সিনিয়র লিডার যারা সময়ের সাক্ষী ছিলেন। সেই হিসেবে তার বইয়ের চেয়ে গ্রহনযোগ্য বই জামায়াত নিয়ে কেউ লিখেছে আমার জানা নেই। জামায়াত নিয়ে পাশ্চাত্যে কেউ লিখেছে অথচ ভেলী রেজা নাসরের বইয়ের রেফারেন্স নেয় নাই আমার জানা নাই।
আর এই বই থেকে রেফারেন্স নেয়ার আগে অবশ্যই চিন্তা ভাবনা করেই নিয়েছে।ঢাকা ভার্সিটির আমাদের সাবেক সদস্য ও পড়ে টিচার যিনি জামায়াত সহ কম্পারেটিভ মুভমেন্টের এক্সপার্ট বলা যায়, তার সাথে স্টাডি সার্কেলে বসার সুযোগ হয়েছে আমার,জামায়াত নিয়ে আমাদের স্টাডি সার্কেলে প্রচুর আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে আমার….সব মিলিয়ে আমি বলতে পারি নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা আমার নিজের সবসময়ই কারন এই লেখায় আমার কোন hidden agenda নাই, সবার কাছে পরিষ্কার যারা শুরু থেকে পড়ছেন, কেন শুরু করেছি, কি অর্জন করতে চাচ্ছি সব পরিষ্কার। ঐ বই ছাড়াও আরও কয়েকটা বই থেকে তথ্য নিয়েছে যা পরবর্তিতে bibliography তে দেব ইনশাআল্লাহ।
আবূসামীহা লিখেছেন : ওয়ালী রেজা নাসরের বইটা IIUM থাকার সময় পড়েছিলাম। ওটা যেহেতু মূলত তাঁর MIT পি-এইচ,ডি, ডিসার্টেশন তাই ওখানে তথাকথিত পশ্চিমা অব্জেটিভিটির প্রচেষ্টা অনেক বেশী। আর ঐ অব্জেক্টিভিটি দেখানোর জন্য অনেক সময় পরিষ্কার সত্যের সাথে আপোষ করা লাগে। পরিষ্কার সত্য অনেক সময় পশ্চিমের একাডেমিক অব্জেকটিভির মান উত্তীর্ণ হয়না।
লেখকের জবাব; ঠিক বলেছেন, খুবই ভাল পয়েন্ট ধরেছেন। নাসর একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই ঐ বই লিখেছেন এবং বই প্রকাশ হওয়ার পর পাকিস্তান জামায়াত কিছু কিছু তথ্যের ব্যাপারে আপত্তিও জানিয়েছে।পরে সে বইয়ের রিজয়েন্ডার দিয়ে বলেছে, কিছু জিনিস সে নিজে ইন্টারপ্রিট করেছে আলোচনার জন্য।তাই আমি চেষ্টা করেছি তার মতামত গুলো উপেক্ষা করার জন্য এবং শুধু রেফারেন্সগুলো নেয়ার জন্য। তারপরও আমি সব কিছু ১০০% সত্য এটা নিজেও মনে করিনা।এর ভিতরে ৬০-৭০% ও যদি সত্য হয় তাহলেও বলব দ্যাট ইজ হিউজ। সমস্যা হচ্ছে,আমরা নিজেরা আমাদের কোন ঘটনার সঠিক জিনিসটা প্রকাশ করিনা বা করতে চাইনা,ফলে যখন আপনি কোন গবেষনা করতে যান তখন আপনাকে পাব্লিকল ডোমেইনে যে সমস্ত তথ্য রয়েছে তার থেকেই তথ্য নিতে হবে।
যেমন ধরুন,২০১০ সালের সদস্য সম্মেলনের পর সকল ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে কালের কন্ঠ, সমকাল,বাংলাদেশ প্রতিদিন,আমাদের সময় টাইপের পত্রিকায় আমরা স্বাভাবিকভাবে মনে করি এগুলো বাম/সেকুলার ধারার সংবাদ পত্র।ঐ সমস্ত পত্রিকায় যদি সত্যও কোন কিছু আসে আমরা তা মেনে নিতে নারাজ কারন তা আমাদের আদর্শের বিপরীত।কিন্তু আসলেই কি ঘটেছে তা কি আমরা জানিনা? মোবাইল,ফেইসবুক,ইমেইল,ইন্টারনেটে যারা একেবারে ঘটনার সথে প্রত্যক্ষ জড়িত তাদের মাধ্যমেই তথ্য pass হয়ে যাচ্ছে কারন দেশবিদেশে সবারই বন্ধু, দায়িত্বশীল,সাংগঠনিক ভাইরা আছেন সবাই মোটামুটি ঘটনা জানেন।এই টেকনোলজির যুগেও আমাদের নেতাগন লুকোচুরি করার চেষ্টা করছেন ফলে কি হবে…
আজ থেকে ১০ বছর পরে যখন কেউ বই লিখবে,জামায়াতের রাজনীতির উপর থিসিস,পিএইচডি করবে তখন তাকে ঐ কালের কন্ঠ,সমকালে প্রকাশিত লেখাই রেফারেন্স হিসেবে নিতে হবে কারন তখনও আমাদের দায়িত্বশীলগন আনুগত্যের কথা বলে,গোপনীয়তার কথা বলে মুখ খুলবেন না কিন্তু তাতেতো মানুষের চিন্তা,গবেষনা থেমে থাকবে না ।এভাবেই অনেক বই লেখা হয়েছে এবং আমাদেরকে আলোচনার সার্থে ঐ সমস্ত বই থেকেই রেফারেন্স নিতে হয়।উপায় কি না নিয়ে? নিজেদের কেউ লিখবেন না,লেখার জন্য লেখক তৈরি করবেন না তাহলে সেকুলারদের লেখাই মনের অজান্তে আমাদের সিলেবাসে অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাচ্ছে, আর এটা চলতেই থাকবে কারন মানুষের চিন্তাকে একটা নির্দিষ্ট পরিসরে,৮-১০ বইয়ের সিলিবাসে সীমাবদ্ধ রাখা যায়না।আর এখনতো ব্লগ সবার জন্যই উন্মুক্ত “সব মতের মিলন মেলা”।
সব মত যখন এক জায়গায় মিলবে তখন আামার নিজের পায়ের নিচে মাটি না থাকলে বাতিল অবশ্যই অবশ্যই জয়ি হবে, no doubt . আজকে আমাদের লোকগুলোর ক্ষেত্রে এই ধরনের ইন্টেলেকসুয়াল দৈন্যতাই দেখতে পাচ্ছি।
আবূসামীহা লিখেছেন : একটা আন্দোলন তার নিজের প্রতিষ্ঠিত সিস্টেমের সাথে আপোষ করে ফেললে তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব স্বাভাবিকভাবেই হুমকির মুখে পড়ে। শুরাকে সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করার পরিণাম কখনোই ভাল হয়না।
আল্লাহ আমাদের অগ্রজদের ক্ষমা করুন!
লেখকের জবাব; ঠিক বলেছেন,এটা জামায়াতের ইতিহাসে অনেক বারই ঘটেছে ফলে মারাত্বক ফলাফলও ভোগ করতে হয়েছে।মাওলানা মওদুদী’র কথা বাদ দিলাম কারন ঐ সময়ে তার কাউন্টার করার মত সমসাময়িক কোন দার্শনিক শুরাতে ছিলেন না,আলেম ছিলেন যেমন মাও ইসলাহি কিন্তু উনি দার্শনিকনা, মাও মওদুদীর মত চিন্তাশীল লেখক ছিলেন না। কিন্তু বর্তমানে একক প্রভাব বিস্তারকারী কোন আলেম বা চিন্তাশীল লোক কি শুরাতে আছে? যার জন্য “Think tank” যারা স্টাকসারের বাহিরের লোক,একাডেমিকলি Capable , তাদের চিন্তা গবেষনার ফলাফল নিয়েই শুরা বর্ধিত আলোচনা করে সীদ্ধান্ত নিলে অনেক ভাল ফলাফল হয়তবা আশা করা যেত।এটাই দেখি পাশ্চাত্য রাজনীতির সিস্টেম,বৃটেনে শুধু লেবার পার্টিরই প্রায় ৫০ টির মত “Think tank” রয়েছে বলে শুনেছি যারা মুল পার্টির কমিটিকে এডভাইস করে কারন পার্টি যারা চালান তারা পলিটিশিয়ান তাদের চিন্তা করার সময় কোথায়? ফলে ঐ সমস্ত দেশ এতটা স্টেবল।আর আমাদের অবস্থা কি? “Think tank” ? বহু দুরের বস্তু?দুই একজন চেষ্টা করেছেন,সেগুলোও বন্ধ করার জন্য প্রেসার আসে উর্ধতন নেতৃবৃন্দ থেকে।উচ্চ পর্যায়ের এক নেতা তো সরাসারিই বলেন ” আমি বুদ্ধিজীবি পছন্দ করিনা”…চিন্তা করতে গেলেও অপনাকে রুকন হইতে হবে……?সবাইকে গন্ডির ভিতরে বন্ধি করতে হবে কেন?
আবূ সামীহার সংযোজিত মন্তব্য : আমি কিন্তু আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করিনি। বরং জামা’আত নিজেই নিজের গড়া সিস্টেমের [শুরা] বিরুদ্ধাচরণ করেছে, সেটা বলতে চেয়েছি। সাথে আরেকটা সমস্যা যেটা হয়েছে তা হল জামা’আতের নিজের গড়া কুকুনের [Cocoon] ভিতরে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলা, আর বাইরের কোন কিছুকেই সহজে গ্রহন করতে না পারা। গতিশীলতার পরিবর্তে ফলশ্রুতিতে স্থবিরতা নেমে আসে আন্দোলনে। আর এ কারণে ইন্টেলেকচুয়াল ব্যক্তিবর্গ যারা সংগঠনের ভেতরের নন তাদেরকে ভাল মূল্যায়ন করা হয়না। আন্দোলনে অনেক সময় “Group Cohesiveness” তৈরী করতে যেয়ে ভুল পদক্ষেপ নেয়া হয়। আর ফলাফল দাঁড়ায় “Group think”, যা যে কোন আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকর। হয়তো সে সময়েও এরকম ঘটনা ঘটেছিল। তবে সম্ভবত এই ‘group think’ প্রবণতা এখন একটু বেশী।




