দর্শনগত বিভ্রান্তির কুফল (disadvantages of defective philosophy):
দর্শন বা মতবাদ বা বিশ্বাস বা মূলনীতি বা সূত্রসমূহ সাধারণত সিনোনিমাস হিসেবে ব্যবহ্রত হয়। দর্শন যেহেতু কোন কাজের পেছনে মূল নিয়ামতের ভূমিকা পালন করে, তাই দর্শনের মধ্যে কোন ভুল থাকলে কাজের ফলাফল কখনোই সঠিকভাবে আশা করা যায় না। দর্শনে সামান্য পরিমান ভুল থাকলে মাঠ পর্যায় (Field level) বা উৎপাদন পর্যায়ে (production level) এ বড় ধরনের ক্ষতি হয়। দর্শন একই সাথে মূল নিয়ামক (principal factor) এবং অনুঘটক ((catalyst) উভয় ভূমিকাই পালন করে। কাজেই দর্শন ঠিক না থাকলে কাংখিত ফলাফল গুনগত (qualitatively) কিংবা পরিমানগত (quantitively) কোনভাবেই পাওয়া যায় না। দর্শনগত ভুলের ফলে যে ক্ষতি হয় তা কখনো মাঠ পর্যায়ে বা উৎপাদন পর্যায়ে ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব হয় না। দর্শনগত ভুল শুধুমাত্র দর্শনগত স্তরে ঠিক করার মাধ্যমেই ক্ষতিএড়ানো যায়। তাই দর্শন কাজ করে একটি ডিভাইস ((device/ tools/blueprint) এর মতো। যেমন: ইট-ভাটা হতে আমরা যেই আকার-আকৃতির ইট চাইনা কেন অথবা যে উৎপাদন দিয়েই লেই/ খামির তৈরী করি না কেন ইট ভাটায় সেই আকার-আকৃতির ইটই তৈরী হবে ইট তৈরীর ডাইস ঠিক যেমন হবে। ইট পোড়ানোর পর কখনোই এই ইটের আকার-আকৃতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
দর্শনকে আবার জীবনের মূলসূত্র ডিএনএ/আরএনএ (DNA/RNA) এর সাথেও তুলনা করা যায়।জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ((Genetic Engineering) এর উন্নতির ফলে বর্তমানে জীবদেহের কোন সমস্যা সমাধানের জন্য ডিএনএ/ আরএনএ লেভেল (DNA/RNA) এ কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। কোন কাজের জন্য দায়ী জীনকে (Resposible gene) সুনির্দিষ্টভাবে সনাক্ত করে তা রিমুভ করা যাচ্ছে। ফলে জীবদেহের যে কোন সমস্যার সমাধান খুবই সহজ হয়ে পড়েছে। অথচ কিছুদিন আগেও এ সমস্যার সমাধানের জন্য পুরো এ্যাফেক্টেড অর্গান কেটে ফেলা হত।
তেমনি আমরা যে ধরনের জনশক্তি তৈরী করতে চাই ঠিক সেই ধরনের দর্শন বা মতবাদ বা বিশ্বাস তাদের সামনে রাখতে হবে। কখনোই এক দর্শন দিয়ে অন্য দর্শনের ফল পাওয়া যাবেনা। আবার ভুল কিংবা ডিফেক্টিভ দর্শন দিয়েও কখনও কাংক্ষিত ফলাফল পাওয়া সম্ভব হয় না। আবার ভুল দর্শনের কোন ক্ষতি দর্শন সংশোধন করে খুব সহজেই এড়ানো যায়, যা অন্য কোন উপায়ে কোনক্রমেই সম্ভব হয়না । এখানেই দর্শনের অনন্যতা (Uniqueness), দর্শনের সার্বজনীনতা (Universality)।
ইসলামী দর্শন (Philosophy of the word ‘Islam):
ইসলাম শব্দটির উৎপত্তি কিংবা বিশ্লেষণে না গিয়ে আমরা আল কুরআন ও হাদীসের আলোকে শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। শব্দটি কুরআন ও সুন্নাহর একটি বিশেষ Terminology. ইসলাম হচ্ছে একটি জীবন-ব্যবস্থা যাতে রয়েছে কিছু guidelines যা মানব সমাজের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। এর বিধি-বিধানের মধ্যে যেগুলো মৌলিক তা স্বয়ং আল্লাহপাক আল-কুরআনে নাযিল করেছেন এবং বাকীগুলো আল্লাহর রাসূল (স) আমাদের বলে গিয়েছেন। আল-কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা অনুযায়ী আমরা বলতে পারি, আল্লাহ প্রদত্ত এই জীবন-বিধান অনুযায়ী মানুষের ব্যক্তিক, সামাজিক, পরিবারিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিচালিত হলে সেখানে শান্তি নেমে আসে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে। মানুষ তখন আস্বাদন করে এক স্বর্গীয় শান্তি। মানব সমাজে ইসলামের এই বিশ্বাস বা মূলনীতিগুলো, যাকে দর্শন (philosophy) ও বলা হয়, বাস্তবায়িত হলে সেই সমাজে মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব খতম হয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। শাসক ও শাসিতের এই সম্পর্ক তখন রূপ নেয় সেবক ও জনগনের সম্পর্ক হিসাবে। শাসক সেবা করে ধন্য হয়। আবার শাসিত জনগণ অধিকার ফিরে পেয়ে কৃতজ্ঞ হয়। রাসূল (স) এর সময়ে, তৎকালীন সমাজের মানুষের উপর সমাজপতিদের যে প্রভুত্ব চলছিলো তা যেন খতম না হয়ে যায়- সে জন্যই তারা বিরোধীতা করেছিলো মানবতাবাদী এই জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার। আর ফলস্বরূপ রাসূল (স) কে তীব্র নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। রাসূল(স) এর কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে যখন যে উপাদান ও কর্মপদ্ধতি প্রয়োজন ছিলো আল্লাহ তা রাসূলের প্রতি নাযিল করেন এবং রাসূল (স) আল্লাহর বিধি-বিধান পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠা করে মানব সমাজে এক নব বিপ্লব কায়েম করেন। যেহেতু রাসূল (স) হলেন পৃথিবীতে সর্বশেষ বার্তাবাহক, সেহেতু আল্লাহ কোরআনের বিধি-বিধানকে এমন পর্যায় পর্যন্ত তিনি নাযিল /কোডিফাই করেন যাতে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন মৌলিক বিধি-বিধানের প্রয়োজন না পড়ে। এভাবেই আল্লাহ মানব সমাজের জন্য তার নেয়ামত স্বরূপ “আল-কুরআন” নাযিল করেন এবং তার সমাপ্তির ঘোষণা আল-কুরআনে তিনি নিজেই ঘোষণা করেন। “আর আজ আমি আমার নিয়ামতকে তোমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ করলাম…………… ” (সূরা: মায়িদা- আয়াতাংশ ০৩)।
সুতরাং বলা যায়, ইসলাম হচ্ছে বিশ্ব-মানবসভ্যতার জন্য আল্লাহর নিকট হতে প্রেরিত এক পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা বা জীবনদর্শন-যার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পাই রাসূল (স) এর জীবনে। রাসূল (স) এর মৃত্যুর সাথে সাথে আল-কুরআনের বিধি-বিধান নাযিলের পরিসমাপ্তি ঘটে। তাই বলা হয়,“Islam is a bundle of codified fundamental Rules & Regulations to be followed by the man-kind up to its end.”
‘ইসলামী দর্শন’ শব্দটির ব্যবহারিক বিশ্লেষণ (the figurative meaning Islam):
রাসূল (স) এর জীবনী হতে দেখা যায় যে, কোন ব্যক্তি যখন আলাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি জানায় তখন বলা হতো যে তিনি ইসলাম কবুল করেছেন আর উক্ত ব্যক্তিকে বলা হতো মুসলিম। আর সার্বভৌমত্বের সেই স্বীকৃতিটি হচ্ছে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং মোহাম্মদ (স) হচ্ছেন তার রাসূল। এই ঘোষণার স্বীকৃতির নিকট নিজেকে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে মানুষ ইসলামে অনুপ্রবেশ করে এবং এর পর সে শুরু করে প্রাত্যহিক জীবনের সকল কাজে-ইসলাম নির্ধারিত “বিধি-নিষেধের” অনুসরণ। তাহলে দেখা যায় মুসলমানদের জীবনে দুইটি অংশ-
১) মৌলিক বিশ্বাসের স্বীকৃতি (Fundamental faith)
২) বিশ্বাস অনুযায়ী প্রাত্যহিক জীবনাচার পরিপালন (Behavioral aspect)
গোটা বিশ্বব্যাপী বর্তমান মুসলমানদের জীবনাচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এখানে তাদের বিশ্বাস নিয়ে কোন সমস্যা নেই বরং বিশ্বাসগতভাবে সবাই মুসলিম কিন্তু এখানে মুসলমানদের আচরণগত বিষয়গুলো নিয়ে সমস্যা বিদ্যমান। অর্থাৎ মুসলিম হওয়ার স্বীকৃতি দেবার পর আচরণগত বিষয়গুলো যেভাবে মেনে চলার কথা সেগুলোর ঘাটতি। আচরণগত এই ঘাটতির নানা কারণ থাকতে পারে তার মধ্যে বিশ্বাসের দূর্বলতা, সেই বিশ্বাস সম্পর্কে ভালভাবে অবহিত না হওয়া, চারদিকে পুঁজিবাদী সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ, মানব জীবন সম্পর্কে বোধের অভাব, জীবনের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে না ভাবা ইত্যাদি অন্যতম। সুতরাং বলা যায়,
মুসলিম = সার্বভৌমত্বের ঘোষণা + প্রাত্যহিক জীবনে তার অনুসরণ
বাংলাদেশে ইসলাম–ভিত্তিক আন্দোলনগুলোর উত্থান এবং বর্তমান অবস্থা (Genesis of Islam-based movement in Bangladesh) :
রাসূল (স) এর নবুয়্যত লাভের পর থেকে অর্থাৎ ৬১০ সাল হতে ৬২৩ সাল পর্যন্ত ইসলামের প্রচার কাজ তিনি নিজে পরিচালনা করেন। এই সময় ইসলামের মৌলিক বিধানের revelation & codification সম্পন্ন হয়ে যায়। রাসূল (স)-এর মৃত্যুর পর হতে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত ইসলামের অগ্রযাত্রা – মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত হিসাবে- অব্যাহত থাকে। এর পরেও বিশ্বের কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে ইসলামের প্রসার ঘটে। শিল্প বিপ্লবের পর ক্রসেডারদের সম্মিলিত সামরিক আক্রমণের কাছে মুসলমান সেনাপতিরা পরাজয় বরণ করে। তবে সামরিক ভাবে পরাজিত হবার আগেই তৎকালীন মুসলিম শাসকদের সাংস্কৃতিক/বুদ্ধিবৃত্তিক/নৈতিক পরাজয় ঘটে এবং মুসলিম কমিউনিটির ভাঙ্গন শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অক্ষ শক্তির নিকট মিত্রপক্ষের পরাজয় হলে তৎকালীন তুর্কী খিলাফাতের অবসান ঘটে এবং আরব জাতীয়তাবাদের নামে নতুন নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় যার ভিত্তি ছিল ভৌগলিকতাবাদ অথবা ভাষাবাদ। ইসলামী উম্মাহর যে বৈশ্বিক চিন্তা তা থেকে এটা ছিলো পুরোপুরি মুক্ত। সামরিক ও সাংস্কৃতিক এই পরাজয়ের ফলে মুসলিম জীবনে নেমে আসে দুর্যোগের ঘনঘটা। মুসলিমরা ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধান পালন হতে দূরে সরে যায়। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে হিসেবে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ভোগবাদ নন-মুসলিম সোসাইটি হতে মুসলিম সোসাইটিতে জেঁকে বসে। যা হোক, অবশেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান হলে Decolonization শুরু হয় এবং colonialism এর নাগপাশ ছিন্ন করে অনেক মুসলিম রাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে। আর এর পেছনে রয়েছে, অন্যান্য নানাবিধ কারণের পাশাপাশি, বিশ্বব্যাপী ইসলামী জীবন-বিধানের পুনর্জাগরণ (Revival of Islamic Code & ethics)। দিকে দিকে উত্থান ঘটে ইসলাম-ভিত্তিক আন্দোলনের। এই আন্দোলন ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন (Islamic Revival movement) নামেও পরিচিত। ইসলামী জীবন-ব্যবস্থা ভিত্তিক এই আন্দোলনগুলো বর্তমান বিশ্বে এক অন্যতম শক্তি। এই আন্দোলনের কারণেই বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা আবার জেগে উঠছে। তারা তাদের অনন্য জীবন ব্যবস্থার প্রকৃত অনুসরন শুরু করছে। পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইসলামী নৈতিক শক্তিতে বলিয়ান একটি দল/গ্র“প/গোষ্ঠী গড়ে উঠছে। সমাজের সর্বস্তরে তারা নৈতিকতার ছাপ রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
বাংলাদেশে ইসলাম–ভিত্তিক/ ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলনগুলোর আত্মজিজ্ঞাসার–কারণ ((Reasons of self-criticism):
ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলনগুলো বর্তমানে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হচ্ছে এবং এই ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করেই এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। এই আঘাত আসছে যেমন নন-মুসলিম কমিউনিটি থেকে তেমনি আসছে মুসলিম কমিউনিটি থেকেও। নন-মুসলিম দেশের আঘাত ও মুসলিম দেশগুলোর আঘাতের ধরন ভিন্ন ভিন্ন। এই আঘাত যেমনি সামরিক তেমনি সাংস্কৃতিক। তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বিরোধীতার ধরনও অনেক পাল্টে গেছে। পেশীশক্তির লড়াই হতে তা পরিণত হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এ। কামান অথবা বিমান যুদ্ধের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে সাইবার যুদ্ধ। তাই ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোকে অগ্রসর হতে হচ্ছে অনেক চিন্তা- ভাবনা করে। বৈশ্বিক-চিন্তার অগ্রগতির সাথে সাথে তাদেরকেও গ্রহন করতে হচ্ছে নতুন নতুন পদ্ধতি। আর এমনি এক প্রেক্ষাপটে আমাদেরকে বিবেচনা করতে হচ্ছে আমাদের কর্মপদ্ধতি। ভেবে দেখতে হচ্ছে আমাদের গৃহীত পথ ও পন্থাকে। ভাবতে হচ্ছে আমাদের অর্জিত ফল নিয়ে। বিরোধীদের বিরোধীতার পথ ও পন্থাকে নিয়েও বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে। আমাদের কোন কর্মপদ্ধতি ও কর্মপন্থাকে নিয়ে তারা যাতে সমাজে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে না পারে- সে বিষয়টিও আমাদের ভেবে দেখতে হচ্ছে। তাছাড়া, তারাই যে শুধু আমাদের ভুল বুঝছে বা আমাদের ব্যাপারে ভুল ছড়াচ্ছে বিষয়টি এমন নাও হতে পারে। কারণ প্রকৃতপক্ষেই আমাদের কোন ভুল থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভুলটি আমাদের সংশোধন করে নিতে হবে। তাছাড়াও আমাদের এমন কোন কর্মপদ্ধতি যা হয়তো ইসলামী বিধি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় কিন্তু ইপ্সিত ফল প্রদানেও সক্ষম নয়- সেটি নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। যে সকল পদ্ধতি আগে হতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে যদি তার চাইতে বেশি ফললাভে সক্ষম এবং যাতে বিভ্রান্তির/ভুল বুঝাবোঝির সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম এমন পদ্ধতি থাকে তাহলে সেগুলোকে আমাদের Adopt করতে হবে। আর এ চিন্তা থেকেই ইসলাম, ইসলাম-ভিত্তিক আন্দোলন, বাংলাদেশ জামাতে ইসলামী, বাংলাদেশ ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রীসংস্থা নিয়ে আমাদের আলোচনা।
নামকরণ ও তার ভূমিকা (Naming and its role):
আমরা যদি সাধারণ কোন সংগঠনের কথা বলি তাহলে নামকরণের কারণে সাধারণত কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু যদি এমন সংগঠনের কথা বলি যার একটি সুনির্দিষ্ট, সুদূর- প্রসারী, সমাজ-বিপ্লবী ও আকাশসম বিস্তৃত কোন পরিকল্পনা থাকে এবং সেই সংগঠনের সাথে সমাজ বা রাষ্ট্রের লক্ষ লক্ষ মানুষের চিন্তা-চেতনা, দর্শনগত বিশ্বাস বা সময়দান/প্রচেষ্টার বিষয়টি জড়িত থাকে তাহলে নামকরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। নামকরণ তখন যথার্থ হতে হয়। তার একটি অর্থবহ ব্যাখ্যা থাকা চাই।নামটি এমন হতে হয় যেন বিরোধীদের সমালোচনার মুখে তার অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকে। নামটি এমন হতে হয় যেন তা সংগঠনের যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, কর্মপদ্ধতি ও কর্মপরিকল্পনা থাকে তা অর্জনের পথে সহায়ক হয়। সংগঠনের অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে যেন তা বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, নামকরণ যত সুন্দর হবে, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, কর্মপদ্ধতি ও কর্মপরিকল্পনার সাথে যত প্রাসঙ্গিক হবে লক্ষ্য অর্জনের পথে তা ততো সহায়ক হবে।
ইসলাম ভিত্তিক আন্দোলনগুলোর নামকরণের প্রেক্ষাপট ((Background of Naming of Islam-Based Movement and Parties):
কুরআন, হাদীস ও ইসলামের ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায় তাতে দেখা যায় যে, ইসলামভিত্তিক আন্দোলনগুলোর কোন সুনির্দিষ্ট নাম কখনো ছিল না। বরং রাসূলের দলকে কোন সুনির্দিষ্ট অভিধায়ে অভিহিত না করে তাকে রাসূলের দল, বিশ্বাসী মানুষের দল, জিহাদী দল কিংবা শুধুমাত্র দল তথা সংঘবদ্ধ প হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। এটা চালু ছিল মুসলিম খিলাফত ভাঙ্গার পূর্ব পর্যন্ত। যখন মুসলিম খিলাফত ভেঙ্গে গেল এবং মুসলিম বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদীদের পদানত হল তখন মুসলিমরা তাদের সার্বজনীন উদ্দেশ্য হতে বিচ্যুত হল। এ সময় তারা মুসলিম হলেও সাম্রাজ্যবাদীদের সেকুউলারিজম কে ধারন করে নিজ নিজ দেশে বিভিন্ন দল গঠন করল। এই প্রেক্ষাপটেই উত্থান হল ইসলাম-বিশ্বাসী, ইসলামের অনুসরন-প্রয়াসী অনুশীলনকারী মুসলিমদের (Practicing Muslims) । তারা গঠন করল বিভিন্ন দল বা গ্রুপ। যেহেতু অন্যান্য দলগুলো ছিলো নন-মুসলিমদের ( যেসব দেশে মুসলমানরা সংখ্যা লঘিষ্ঠ) কিংবা ধর্ম বিশ্বাসে মুসলিম হলেও জীবনদর্শনে সেকুউলারিস্ট, লেফটিস্ট কিংবা ব্যক্তি জীবনে ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ যেমন নেই তেমন এর প্রচার প্রসারে ভূমিকা পালন করেনা (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে) এমনসব লোকদের, সেহেতু Practicing মুসলিমরা তাদের দলের নামকরণের ক্ষেত্রে খুব সহজেই তাদের দলকে অন্যান্যদের দল হতে পৃথক করার জন্য মুসলিম কিংবা ইসলাম/ ইসলামী শব্দটি জুড়ে দেয়। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নাম নির্ধারণ কিভাবে হয়েছিলো কিংবা কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে করা হয়েছিলো, সেটি কতটাই বা স্বার্থক কিংবা যুক্তিসঙ্গত সে বিতর্কে না গিয়ে আমরা সেই নামকরণ এবং বর্তমানে সেইকারনে সৃষ্ট সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি।
ইসলামী দল বনাম ইসলামপন্থী/ ইসলামভিত্তিক/ ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন/ দল ((Islamic party versus pro-Islamic party/Islam-based party/ Islamic revivalism movement):
মহান রাব্বুল আলামিন কেন আলকুরআনে দল শব্দটিকে সরাসরি quantitative না করে qualitative করে বর্ণনা করলেন তা আমাদরে অজানা। কিন্তু qualitative হিসেবে বর্ণনা করার কারণে এর যে সার্বজনীন তা যুগোপযোগীতা আমাদের নিকট আজ বোধগম্য।যেহেতু আমদের আলোচনা হতে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, ইসলাম শব্দটি আল্লাহর নিকট সর্বতোভাবে আত্মসমর্পন করার একটি অঙ্গীকার এবং সে অনুযায়ী (বিধি-বিধান) জীবন পরিচালনা করার নাম। আর সে বিধি বিধানগুলো শুধুমাত্র আলকুরআন ও আল হাদীস তথা রাসূলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কাজেই ইসলাম বা ইসলামী শব্দটিকে আল-কুরআন ও রাসূলের জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে রাসূল পরবর্তী সাহাবী, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন, ইমাম এবং তৎপরবর্তী যে কোন ব্যক্তিকে ইসলামের অনুসারী কিংবা অনুসরন-প্রয়াসী বলতে পারি। আল-কুরআনের পরিপূর্ণ অনুসরনের ক্ষেত্রে রাসূলের বিষয়টি কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু রাসূলের পরবর্তীতে যারা ইসলামের অনুসরন করার চেষ্টা করেছেন তাদের সে অনুসরনের ব্যাপারে আল-কুরআনের কোন ঘোষণা নেই তাই আমরা তাদের এই কুরআন-হাদীস অনুসরণ চেষ্টাকে সরাসরি অনুসরণ না বলে অনুসরন-প্রয়াস এবং ব্যক্তিদেরকে অনুসারী না বলে অনুসরন-প্রয়াসী বলতে পারি।
অনুসরন কিংবা অনুসরন-প্রয়াস অথবা অনুসারী কিংবা অনুসরন-প্রয়াসী শব্দগুলোর বলা বা না বলার ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিধান যেহেতু অনুপস্থিত সেহেতু সরাসরি কুরআন-হাদীসের অনুসরন কিংবা অনুসারী না বলে বরং অনুসরন-প্রয়াস কিংবা অনুসরন-প্রয়াসী বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত, প্রাসঙ্গিক এবং আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনের পথে সহায়ক। রাসূল (স) এর সময়ে সাহাবীদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতপার্থক্য হলে ওহীর মাধ্যমে তার সমাধান হতো। ফলে গৃহিত সিদ্ধান্তটি হতো আবশ্যকীয়ভাবে সঠিক এবং অনুসরণযোগ্য। তাছাড়া ওহী কিংবা রাসূলের মাধ্যমে ফয়সালা হবার ফলে সাহাবীদের মাঝে মনক্ষুন্নতার বিষয়টি অবশিষ্ট থাকতো না এবং কোন সন্দেহ সংশয়েরও সুযোগ ছিল না। রাসূল (স) এর মৃত্যুর পর যেহেতু কোন বিষয়ে মতামত যাচাই বাছাই করার জন্য কোন ওহী নাযিল হতো না- কাজেই মতামত প্রদানে কিংবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ১০০% একমত হবার সুযোগ ছিল না এবং এভাবেই মতপার্থক্যের বিষয়টি তখন থেকেই সমাজে সৃষ্টি হয়। কাজেই মতামত প্রদানকারী সকল পক্ষই যদি নিজেদেরকে ইসলামী বা ইসলামের অনুসারী বলে ঘোষণা দেয়- তাহলে অন্যমতকে আবশ্যকীয়ভাবে অনৈসলামিক কিংবা অন্য কোন অভিধায়ে, যা তুলনামূলকভাবে inferior, অভিহিত করার বিষয়টি সামনে আসে- যার ফলে মতপার্থক্য থেকে সৃষ্টি হয় মতদ্বৈততা, মতভিন্নতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা । কিন্তু মত-প্রদানকারী সকল পক্ষই যদি নিজেদেরকে ইসলামের অনুসরণ-প্রয়াসী কিংবা ইসলামী না বলে ইসলামপন্থী বলে অভিহিত করে তাহলে তাদের নিজেদের মধ্যে কোন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়না। কারণ ইসলামী কিংবা ইসলামের অনুসারী শব্দদ্বয়ের মাঝে নিহিত রয়েছে singularity একক (one & only) সম্পর্কিত ধারণা কিন্তু ইসলামপন্থী বা ইসলামের অনুসরন-প্রয়াসী শব্দগুলোর মাঝে নিহিত রয়েছে plurality বা বহুত্ববাদের ধারণা। ফলে ইসলামী বা ইসলামের অনুসারী না বলে ইসলামপন্থী বা ইসলামের অনুসরন-প্রয়াসী বললে মৌলিকতার মধ্যে অবস্থানকারী ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণকারী ব্যক্তিদের/দলগুলোকে একই বাস্কেট বা ঝুঁড়িতে accommodate করা সহজতর হয়। ফলে মতপার্থক্য, মতদ্বৈততা, মতভিন্নতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সম্ভাবনা কমে যায় । এছাড়াও রয়েছে আরো আনুসঙ্গিক নানান উপকারিতা। অসুবিধাজনক কিছু নেই এমন নয় কিন্তু তা তুলনামূলকভাবে কম।
ইসলাম–ভিত্তিক দলসমূহ: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ (Islam-Based Movement/ parties of Bangladesh):
ক) ইসলাম ভিত্তিক যে সকল আন্দোলন সারা বিশ্বব্যাপী (বাংলাদেশসহ) কার্যক্রম পরিচালনা করছে সেগুলোকে আমরা সরাসরি ইসলামি আন্দোলন (Islami Movement) না বলে ইসলামপন্থী আন্দোলন (Pro-islamic)/ ইসলাম-ভিত্তিক আন্দোলন (Islam-Based) বা ইসলামের পুনর্জাগরনবাদী আন্দোলন (Islamic Revivalism Movement) বলতে পারি। কারণ আমদের জীবনে ইসলামের অনুসরন (Following of Islam) যদি অনুসরন না হয়ে অনুসরন-প্রচেষ্টা (trying to follow Islam) হয়, আমরা যদি ইসলামী (Islamic) না হয়ে ইসলাম-পন্থী (Pro-islamic) হয়ে থাকি তাহলে ইসলামের বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করার জন্য যে আন্দোলন তা অবশ্যই ইসলামী আন্দোলন (Islamic Movement) না হয়ে ইসলাম-পন্থী (Pro-Islamic movement) আন্দোলন হবে।
খ) সুতরাং বাংলাদেশ জামাতে ইসলামী কিংবা ইসলামিক শাসনতন্ত্র আন্দোলন ইত্যাকার আন্দোলনগুলোকে আমরা সরাসরি ইসলামী আন্দোলন না বলে বরং ইসলামপন্থী আন্দোলন (Pro-Islamic movement) বলতে পারি।
গ) বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রীসংস্থা প্রভৃতি ছাত্র-ছাত্রী সংগঠনগুলোকেও আমরা সরাসরি ইসলামী ছাত্র আন্দোলন (Islamic student movement) না বলে ইসলামপন্থী ছাত্র আন্দোলন (pro-Islamic student movement) বলতে পারি। এবং এক্ষেত্রে ইসলামী ছাত্র শিবির, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রীসংস্থা, বাংলাদেশ জামাতে ইসলামী কিংবা ইসলামিক শাসনতন্ত্র আন্দোলন একধরনের দর্শনগত বিভ্রান্তি ও (philosophical mistake) বলা যেতে পারে।
ইসলামপন্থী আন্দোলন (pro-Islamic student movement) কে ইসলামি আন্দোলন (Islamic student movement) বলার কুফল (Disadvantages of misnaming the the Pro-Islamic parties):
(১) ইসলামী বিধি-বিধানের পৃথকীকরণে সমস্যা:
যেহেতু ইসলাম বা ইসলামের বিষয়টি আল্লাহ এবং তার রাসূলের সাথে জড়িত তাই ইসলামকে সেখানেই সীমাবদ্ধ রেখে সাহাবীসহ পরবর্তী সকলের মধ্যে একটি সীমারেখা টানতে পারি। যাতে পরবর্তীতে কুরআন হাদীসের অনুসরণে আমাদের সমস্যা হয় না। আমরা যদি সাহাবী, তাবেঈন, ইমামসহ সকলের ক্ষেত্রেই ইসলাম শব্দটিকে জুড়ে দিই তাহলে কোনটি রাসূলের নির্দেশ, কোনটি বা পরবর্তী যুগের তা পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং অনেকক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়/নির্দেশমালা সামনে না এসে অন্যান্যদের নীতিমালা/নির্দেশমালা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে সামনে চলে আসবে।
(২) মত-পার্থক্যগত বিভ্রান্তি:
আমরা যদি ইসলাম নিয়ে কাজ করে এমন সকলের সিদ্ধান্তকে ইসলামী বলে সম্বোধন করি, তাহলে একই বিষয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন দলের গৃহীত বিভিন্ন রকম সিদ্ধান্তের কোনটি প্রকৃতপক্ষে ইসলামী তা নিয়ে এক মহা-বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। কিন্তু সকলের কাজকে যদি ইসলামপন্থী আন্দোলন বা ইসলামের অনুসরণ-প্রচেষ্টা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করি, তাহলে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা কমে যাবে।
(৩) পারস্পরিক কোন্দল:
একই এলাকায় চলমান ইসলাম-ভিত্তিক সংগঠনসমূহ যখন নিজেদের ইসলামী বলে দাবী করে তখন তাদের, subconsciously, এক দলের বিপক্ষে অন্য দলের মধ্যে ঘৃণা-বিদ্বেষ, হিংসা, কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি সৃষ্টি হয়। নষ্ট হয় পারস্পরিক সম্মান-শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা।
(৪) ক্রমাগত দলগত ও আত্মিক মানোন্নয়নে সমস্যা:
কোন ব্যক্তি বা দল যখন নিজেদের ইসলামী/ইসলামের অনুসারী বা ইসলামিক আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত, সংশ্লিষ্ট বা নিরবিচ্ছিন্ন কর্মী বলে ভাবতে থাকে-তখন সেই দল বা দলের কর্মী ও দায়িত্বশীলদের মাঝে এক ধরনের self-egoism তৈরি হয়। কোন বিষয়ে যা তারা ভাবে তাকেই ইসলামী বলে মনে করে। যেহেতু তারা অলরেডি ইসলামি/ইসলামের অনুসারী/ইসলামিক আন্দোলনের অংশ কাজেই তাদেরও যে জানার প্রয়োজন আছে, বুঝার আছে, পরামর্শ করার আছে, দেশ-বিদেশ ভ্রমনের প্রয়োজন আছে- এসব তাদের মাঝে অনুভূত হয়না অথবা হলেও কম হয়।। এর ফলে বাধাগ্রস্ত হয় ক্রমাগত মানোন্নয়ন প্রক্রিয়া। অপরদিকে যদি তাদেরকে ইসলামপন্থী/ইসলামের অনুসরণ-প্রয়াসী কিংবা ইসলামপন্থী আন্দোলনের অংশ বলে অভিহিতকরা হয়-তখন তাদের মাঝে স্বয়ংক্রিভাবে জন্মলাভ করে এমন ধারণা যে-তাদের আরো জানতে হবে, গড়তে হবে, বুঝতে হবে, পরামর্শ করতে হবে, আমল উন্নত করতে হবে।
(৫) একনায়কতান্ত্রিকতার জন্মলাভ:
উপরোক্ত পরিস্থিতিতে ক্রমান্বয়ে ব্যক্তি/দল বহুত্ববাদী চিন্তা/দর্শন হতে একমুখী/একনায়ক তান্ত্রিক দর্শন বা চিন্তার অভিসারী হতে শুরু করে।
(৬) কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যাগত বিভ্রান্তি:
উপরোক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার এক পর্যায়ে যখন নানা বিষয়ে মত-পার্থক্য তৈরী হয়, তখন যৌক্তিক কোন কারণ দেখাতে ব্যর্থ হলে অনেকক্ষেত্রে সর্বশেষ হাতিয়ার হিসাবে কুরআন-হাদীসের অপব্যাখ্যা করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।
(৭) জ্ঞান ও জ্ঞানীর অসম্মান:
যখন কোন দল/কর্মীরা নিজেরা নিজেদের already ইসলামী/ইসলামিক ভাবে-তখন স্বাভাবতই তাদের নিকট পড়াশুনা, জ্ঞান অর্জন ও জানার প্রতি আগ্রহ লোপ পায়। এক্ষেত্রে তাদের সময় ও অর্থ বিনিয়োগ কমে যায়। এক্ষেত্রে যারা সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করেন তাদেরকে অনেকক্ষেত্রে encouragement এর বদলে discouraged করা হয়। আর যারা জ্ঞানী তাদেরকে তাদের প্রাপ্য সম্মান হতে বঞ্চিত করা হয়। অপরদিকে বিপরীত প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে তথা ইসলামী/ইসলামিক না ভেবে ইসলামপন্থী/ইসলামের অনুসরণ-প্রয়াসী ভাবলে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়, এক্ষেত্রে encouraged করা হয়, জ্ঞানার্জনে সময় ও অর্থ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এবং জ্ঞানী-ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান করা হয়।
(৮) সংগঠনের বিচ্যুতি:
যদি উপরোক্ত প্রক্রিয়া চলমান থাকে তাহলে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট দল/কর্মী তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে পারে। যেহেতু ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোর কাজ বহুমাত্রিক এবং নানান পেশার নানান ধরনের লোকের সম্মিলনে এখানে বহুমাত্রিকতা বৃদ্ধি পায় কাজেই এই বহুমাত্রিকতার পরিবেশ না থাকলে ধীরে ধীরে সংগঠন তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হতে বিচ্যুত হয়।
(৯) বিরোধীদের মোকাবিলা করা:
যখন কোন ইসলাম পন্থী আন্দোলন কোন দেশে তার কাজ চলমান রাখে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নতুন লোক recruit করতে থাকে- (ল্যাটেরাল এন্ট্রির মাধ্যমে) তখন বিভ্রান্তবাদী/ বিপরীত মত ও পক্ষের লোকেরা সহজেই ইসলামপন্থীদের কাজের নানা সমালোচনা করতে থাকে এবং অন্যদেরকে বিভ্রান্ত করার ক্ষেত্রে তারা সফলতা পায়।
উদাহরণঃ এক ব্যক্তি একদিন শিবিরের নানাবিধ কাজ যা তার দৃষ্টিতে অনৈসলামিক তার বর্ণনা দিয়ে বলছিলো- এগুলো কি ইসলামে জায়েজ? যেহেতু তারা দাবী করে তারা ইসলামী দল, এগুলো করা কি ঠিক? পাশের উত্তরদাতা বললেন- আপনি একটু ভুল বলেছেন। তারা আসলে ইসলামী দল নয় বরং তারা ছাত্রদের একটি সংগঠিত দল যারা ইসলামের অনুসরণ করতে চায়। আচ্ছা আপনিই বলুন, একই সমাজে বসবাস করে, একই স্কুল কলেজে পড়ালেখা করে, একই রাজনৈতিক সরকারের অধীনে থেকে আপনি কিভাবে আশা করেন যে, তারা সব ফেরেস্তাতুল্য হবে। বরং একই স্কুল-ভার্সিটিতে পড়ার পাশাপাশি শিবির করার কারণে তাদের মাঝে যে কিছু নৈতিক গুণাবলী সৃষ্টি হয়েছে-এগুলো কি খারাপ? তারা যে কুরআন-হাদীস পড়ে তা জানা এবং মানার চেষ্টা করে এটা কি অন্যায়? নারীর প্রতি সম্মানবোধ পোষনকারী , বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি মুক্ত এসব মননশীল ছেলেরা কি ছাত্রলীগ-ছাত্রদল কিংবা বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মীদের চাইতেও খারাপ? একথা শুনে তো লোকটি একেবারেই ‘থ’ বনে গেল। সে এবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলো এবং বললো হ্যাঁ, নি:সন্দেহে এগুলো ভালো তবে তাদের আরো অনেক কিছু অর্জন করতে হবে। একথায় উভয়ে সম্মত হয়ে তাদের বিতর্ক শেষ করলো। উপরোক্ত আলোচনার মাঝে কিন্তু মিথ্যা নেই বরং সত্যই প্রকাশিত। কাজেই ইসলামী নয় বরং ইসলামপন্থী নামটিই তাদের জন্য উপযুক্ত।
ক্রস চেকিং (Cross-checking):
উপরোক্ত সমস্যাগুলো একটি সংগঠনের জন্য খুবই মারাত্মক। এ সকল সমস্যা সংগঠনের আত্মিক ও বাহ্যিক প্রাণশক্তি ক্ষয় করে ফেলে। আভ্যন্তরীন শৃঙখলা ভেঙ্গে পড়ে । সংগঠনকে তখন বাইরের শক্তি মোকাবিলার চাইতে ভেতরের আভ্যন্তরীন শৃঙখলা রক্ষায় অধিক শক্তি ব্যয় করতে হয়। তাই এ সকল সমস্যা সমাধন জরুরী। যে কোন সমস্যা সমাধানের অনেক পথ থাকে তবে সব পথেই সমান ফল পাওয়া যায়না। সেই পথগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম পথেই সবচেয়ে ভাল ফল পাওয়া যায়। । উপরোক্ত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য অনেক উপায় অবলম্বন করা গেলেও, যেই কারনে সমাধানের জন্ম সেই সমস্যার সমাধান করাই সর্বোত্তম হবে। সংগঠনের জন্য দর্শন হচ্ছে জীবদেহের জীনের (gene, the functional unit of heredity) মত। বর্তমানে জীবদেহের কোন সমস্যা সমাধানের জন্য দায়ী জীনকে (responsible gene) সুনির্দিষ্টভাবে সনাক্ত করে তা রিমুভ করা যায়। ফলে জীবদেহের যে কোন সমস্যার সমাধান খুবই সহজ হয়ে পড়েছে। অথচ কিছুদিন আগেও এ সমস্যার সমাধানের জন্য পুরো এ্যাফেক্টেড অর্গান কেটে ফেলা হত। ঠিক তেমনি, দর্শনগত বিভ্রান্তি বিদ্যমান থাকলে, পুরোপুরি সমাধান কখনোই সম্ভব নয়। দর্শনগত ভ্রান্তি দূর করার মাধ্যমেই এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব।
মূল্যায়নঃ
কাজেই যে সকল বিষয়ে কুরআন-হাদীসের সরাসরি কোন নির্দেশনা নেই, সে সকল ক্ষেত্রে যা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক, যা অধিক যুক্তিযুক্ত, যা অধিক বিজ্ঞান সম্মত বা তুলনামূলকভাবে কম অসুবিধাজনক, যা আমাদের ব্যক্তি/দলের কাংখিত গুণাবলী/সামষ্টিক পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক তাই হোক আমাদের মূলনীতি, হোক সামনে বাড়ার পাদ-প্রক্রিয়া, এগিয়ে চলার সোপান। তাই, সকল সংকীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে এক্ষেত্রে ইসলামি/ইসলামের অনুসারী/ইসলামিক মুভমেন্ট এসব শব্দগুলোর চাইতে ইসলামপন্থী/ইসলামের অনুসরন-প্রয়াসী, ইসলামপন্থী আন্দোলন বা ইসলামের পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন……… ইত্যাকার শব্দগুলো অধিকতর সুবিধাজনক, কাজের সহায়ক, অর্থবোধক হওয়ার কারণে এগুলোর ব্যবহারই আমাদের কাম্য।





সুন্দর একটি লেখা । আমাদের দেশে যেকোন দলই ‘ইসলামী’ নাম নিতে খুবই আগ্রহী । অথচ নিজেরা নিজেকে ‘ইসলামী’ বলাটাই তো একটা অবাস্তব ব্যাপার । কোন দল বা ব্যক্তি কেউই পরিপুর্ণভাবে ‘ইসলামী’ হতে পারবেনা । ক্ষমতায় গেলেও কেউই পরিপুর্ণ ইসলামী সমাজ কায়েম করতে পারবে না । এরচেয়েও বড় সমস্যা হলো – ইসলাম বলতে আসলে কী বোঝায় সেটা নিয়েই তো এখন বিভ্রান্তির ছড়াছড়ি ।