অনুবাদ : হাসান শরীফ
রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান অসাধারণ প্রতিভাধর রাজনীতিবিদ। তিনি মাত্রাতিরিক্ত কড়া হতে পারেন, কর্তৃত্বপরায়ণ হতে পারেন, হতে পারেন বেদনাদায়ক ঔদ্ধত্য; কিন্তু তার একটি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে, যা অনেক তুর্কিকে জাগিয়ে রেখেছে এবং এটাই তাকে তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছে। গত বসন্তে শুরু হওয়া গাজি পার্ক বিক্ষোভের সময় (যা আসলে এখনো শেষ হয়নি) লাখ লাখ লোক ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা ও ইজমিরের রাস্তায় নেমে এসেছিল। তুরস্কের অন্যান্য রাস্তাতেও মানুষের ঢল নেমেছিল। তারা এরদোগান এবং তার একে পার্টির নিন্দায় সোচ্চার হয়েছিল। কিন্তু তিনিও জবাবে লাখ লাখ লোককে জড়ো করেছিলেন। ওই সময় অনেক কলামিস্ট লিখেছিলেন, এরদোগান দুর্বল এবং আসক্ত। কারণ জনপ্রিয়তা প্রমাণের জন্য যদি কোনো প্রধানমন্ত্রীর জনসভা আয়োজন করতে হয়, তবে তাতে তার শক্তিমত্তা প্রকাশ পায় না। সাম্প্রতিক দুর্নীতি কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হওয়ার পরও ‘এরদোনের দিন শেষ’ বলে জোরেশোরে কথা উঠেছে। কিন্তু এরদোগান কোথাও যাচ্ছেন না। তিনি আবারো প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। তার মানে এই নয় যে, বিক্ষোভ কিংবা দুর্নীতি তার কোনো তি করেনি। অবশ্যই করেছে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, তার বিরোধীরা যেমন কিছু সুবিধা পাচ্ছে, তেমনি তাদের অনেক সমস্যাও রয়েছে।
আঙ্কারা থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত অনেকেই মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান সমস্যাগুলোর সুযোগ নিয়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল একেপির (জাস্টিজ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি) নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবেন। কথাটা এক কথায় উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। তার মোহনীয় ব্যক্তিত্ব রয়েছে, তিনিও ক্যারিশমেটিক নেতা। তবে দু’জনের মধ্যে অনেক ভিন্নতাও রয়েছে। গুল অনেক বেশি শান্ত, আত্মবিশ্বাসী, চিন্তামনস্ক ও রাষ্ট্রনায়কোচিত। যেকোনো বিচারেই তিনি তুর্কিদের মধ্যে জনপ্রিয়। তিনি যেখানেই যান না কেন, বিপুলসংখ্যক তুর্কি তাকে অভিনন্দন জানাতে ছুটে আসে। এ কারণেই অনেকে মনে করেন, এরদোগানের কড়াকড়ি শাসনের বিপরীতে গুলের বোধগম্য ও মার্জিত আচরণ বেশি পছন্দ করবে।
গুল তুরস্ক এবং একেপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ২০০১ সালের আগস্টে পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। এরদোগান রাজনীতিতে নিষিদ্ধ থাকার সময় তিনি একেপির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু তবুও দলের মধ্যে এরদোগানের চেয়ে তার জনপ্রিয়তা অনেক কম। বর্তমান মন্ত্রীদের মধ্যে মাত্র একজন তার সমর্থক। পার্লামেন্ট সদস্যদেরও প্রায় সবাই এরদোগানের প্রতি বেশি অনুগত। অধিকন্তু, ১১ বছর ধরে এরদোগান প্রধানমন্ত্রিত্ব করার সময় রাজনীতির অলিগলি অনেক বেশি চিনে নিয়েছেন। আর এর বেশির ভাগ সময় গুল থেকেছেন রাজনীতির ঊর্ধ্বে। ফলে এখানেও এরদোগান এগিয়ে থাকছেন।
তা ছাড়া এরদোগানের বিরুদ্ধে লড়তে হলে, একে পার্টির মধ্যে কী ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হবে, জনগণের মধ্যে এর প্রভাব কেমন হবেÑ এগুলোও হিসাব করতে হবে গুলকে। দলকে নিয়ে অনেক ভাবতে হবে গুলকে। হ্যাঁ, দলটি এখন এরদোগানের মুখপত্রে পরিণত হয়েছে, কিন্তু এটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তো গুলও। এই পার্টির ওপর ভর করেই তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। এখন দুই নেতার মধ্যে রেষারেষি সৃষ্টি হলে দলের মারাত্মক তি হবে এবং পরিণতিতে দু’জনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারেরই অবসান ঘটতে পারে। অনেকে কিন্তু এমনটাই দেখার জন্য ওঁত পেতে আছেন। এ দু’জনের মধ্যে লড়াই হওয়া মানে তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হওয়া।
সাধারণ জ্ঞানেই বলে দেয়া যেতে পারে, এরদোগানের সমস্যা বাড়লে ৩০ মার্চ অনুষ্ঠেয় স্থানীয় নির্বাচনে রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (তুর্কি ভাষায় সিএইচপি) জন্য বিশেষ করে ইস্তাম্বুলে বড় সাফল্য বয়ে আনতে পারে। ইস্তাম্বুলের মেয়র পদে দলটির হয়ে মোস্তফা স্যারিগুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে ব্যাপক গুঞ্জন চলছে। তিনি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। পাশ্চাত্যপন্থীরা তাদের স্বার্থ হাসিলে তাকে ব্যবহার করতে পারে।
তবে গত দশকে খাবার পানি, স্বাস্থ্য পরিচর্যা, পরিবহন ইত্যাদি মৌলিক নাগরিক সমস্যা সমাধানে একেপি যে ভূমিকা রেখেছে, তাতে করে মনে হয় না, তুর্কিরা অন্য কিছু চিন্তা করবে। বর্তমানে যারা মনে করছেন, এরদোগানের দলে দুর্নীতির যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো কাজে লাগিয়ে সিএইচপি অন্তত ইস্তাম্বুলের মেয়র পদটি বাগিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন, স্বয়ং মোস্তফা স্যারিগুলের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া মেয়র পদে এরদোগান প্রার্থী হচ্ছেন না। যিনি হবেন, তারও ভোট আকর্ষণ করার মতা থাকবে। এ ক্ষেত্রে ওয়াইল্ড কার্ড হতে পারেন ফাতুল্লাহ গুলেন। এই শিাবিদ ও ধর্মনেতার পুরো তুরস্কে বিপুল জনসমর্থন রয়েছে। তুরস্কের বাইরে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রেও বসবাসকারী তুর্কিদের মধ্যেও তিনি জনপ্রিয়। অনেকে মনে করছেন, দুর্নীতি কেলেঙ্কারি নিয়ে যে কথা চলছে, তা আসলে গুলেন ও এরদোগানের মধ্যকার যুদ্ধের অংশমাত্র। তাদের মতে, এই যুদ্ধের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে তুর্কি রাজনীতিতে এরদোগান না গুলেন বড়। একটি গুজবও রয়েছে, গুলেন ইতোমধ্যেই স্যারিগুলকে সমর্থন দেবেন বলে সিএইচপি নেতাদের জানিয়েছেন।
এরদোগান যদি তার নিজ শহর ইস্তাম্বুলে পরাজিত হন, তবে তা হবে তার জন্য একটি বড় আঘাত। তবে সেই আঘাত তার জন্য শাপে বর হতে পারে। তিনি জাতীয় নির্বাচনের জন্য আরো ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ পাবেন। তা ছাড়া স্থানীয় নির্বাচন অনেক সময় জাতীয় নির্বাচনের প্রতিফলন করে না। ২০০৯ সালে স্থানীয় নির্বাচনে একেপির প্রার্থীরা মোট ৩৮.৯ শতাংশ ভোট সংগ্রহ করেছিলেন। ২০০৭ সালে জাতীয় নির্বাচন থেকে তা ছিল আট ভাগ কম। আবার ২০১১ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে তারা পেয়েছিল ৪৯.৯৫ ভাগ ভোট, যা ১৯৫৪ সালের পর কোনো তুর্কি দলের জন্য সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে একে পার্টি তুরস্কের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বর্তমানে কিছু সমস্যায় পড়লেও এগুলো এরদোগানের ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার কারণ হয়ে ওঠেনি। দুর্নীতির তদন্ত বড় ধরনের কোনো সমস্যার সৃষ্টি করবে না বলেই মনে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কথা, তুরস্ক এই ক্রান্তিকালে আবার জেগে উঠতে পারে। তারা আবার আরো দৃঢ়ভাবে এরদোগানের পেছনে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে পারে।
লেখক : মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষক





কোন সোর্স থেকে আমরা আব্দুল্লাহ গুল বনাম এরদোগানের সাথে এবং গুলেন মোভমেন্ট বনাম এরদুগান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারব? এই লেখাটিতে বিস্তারিত কিছু জানতে পারলামনা কিন্তু