নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার েেত্র তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সম একটি দেশ। তুরস্ক তার সামর্থ্য এবং কী করা উচিত সে সম্পর্কে সচেতন। বন্ধু ও অংশীদারদের সহযোগিতায় তুরস্ক প্রতিবেশী এবং অন্যান্য এলাকায় ইতিবাচক ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ কথা বলেছেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আহমেত দাভুতুগ্লু। ২০১২ সালের ১২ মার্চ মিসরের এইউসি কায়রো রিভিও পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাাতকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। ড. আহমেত দাভুতুগ্লু শুধু একেপির একজন শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও কূটনীতি বিশেষজ্ঞই নন, তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একজন একাডেমিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও খ্যাতনামা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে ইস্তাম্বুলের বেকেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি । তার বই Alternative Paradigms: The Impact of Islamic and Western Weltanschauungs on Political Theory, The Civilizational Transformation and The Muslim World, Strategic Depth I The Global Crisis আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত। ফরেন পলিসি ২০১০ সালের সেরা ১০০ চিন্তাবিদের মধ্যে তালিকাভুক্ত করেন দাভুতুগ্লুকে। এ সাাৎকারটি ২০১২ সালের ১২ মার্চ প্রকাশিত হলেও বর্তমানে এর প্রাসঙ্গিকতা থাকায় এখানে এর নির্বাচিত অংশটুকু প্রকাশ করা হলো। সাাৎকারে তিনি আরব বসন্ত, এর প্রয়োজনীয়তা, সূচনা, পরিণাম নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আরব বসন্ত ছিল অনিবার্য। তবে আরব বসন্তের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার পর বর্তমানে যে কিছুটা হলেও বিপরীত স্রোত দেখা দিয়েছে, সেটাও একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না। দাভুতুগ্লু বলেছেন, গণ-আন্দোলনের জয় সরলরেখায় হতেই থাকবে, তা নয়। একে নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে হয়। সাাৎকারটির অনুবাদ করেছেন হাসান শরীফ
কায়রো রিভিউ : বর্তমানে তুরস্কের কৌশলগত স্বার্থকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
দাভুতুগ্লু : তুরস্কের কৌশলগত স্বার্থ তার প্রতিবেশী এবং এর বাইরের দেশগুলোর শান্তি, স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। আফ্রো-ইউরেশিয়ার মধ্যে থাকায় ভূ-রাজনৈতিক পরিভাষায় তুরস্কের অবস্থানটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস ও বলকানের মতো সঙ্কটপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে এই বিশাল ভৌগোলিক প্রতিবেশীদের অবস্থান। এ অঞ্চলে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিরও বিশাল সুযোগ রয়েছে। নিরাপত্তাগত সমস্যার কারণেই দেশগুলো পিছিয়ে রয়েছে। এ অঞ্চলে যেকোনো সঙ্কট তা অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক যা-ই হোক না কেন তুরস্ক এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর তার প্রভাব পড়ে। এ কারণে এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার মধ্যেই তুরস্কের স্বার্থ সর্বোত্তমভাবে নিহিত। এ জন্য তুরস্ক শান্তি ও নিরাপত্তা বিকাশে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। আমাদের ‘প্রতিবেশীদের সাথে শূন্য সমস্যা’ নীতির মূলে এই ধারণাই কাজ করছে। আমরা আমাদের সাধ্য অনুযায়ী তাদের অভ্যন্তরীণ, দ্বিপীয় বা আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানে সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করি।
আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের মাধ্যমেও আমাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয়। তুরস্কের জনসংখ্যা বিপুল, এর অর্ধেক তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশটির অর্থনীতি গতিশীল, তুর্কি প্রজাতন্ত্রের শতবর্ষ ২০২৩ সাল নাগাদ শীর্ষ ১০-এ উন্নীত হওয়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। তার আলোকে তুর্কি বেসরকারি খাত অত্যন্ত সক্রিয়, উদ্যোক্তা চেতনা জোরালো। এর জন্য আমাদের প্রয়োজন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আমাদের পরিধি বাড়ানো। যত বেশি সম্ভব দেশের সাথে অর্থনৈতিক পর্যায়ের সহযোগিতা বাড়ানো তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। এই প্রয়োজনের আলোকেই আমরা বৈশ্বিক পর্যায়ে আমাদের সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। আর এ কারণেই আমরা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকার উদীয়মান শক্তিগুলোর সাথে সহযোগিতা বাড়িয়েছি। আমাদের কৌশলগত স্বার্থের পরিভাষায় সব দেশই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকায় পরিণত হয়েছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পাশাপাশি আমাদের স্বার্থ দিয়েও পরিচালিত। এটা সর্বোত্তমভাবে দেখা যায় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সংস্কার প্রয়াসে আমাদের সমর্থনে। তুরস্ক সবসময়ই সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণের ন্যায়সঙ্গত প্রত্যাশা পূরণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে। অবশ্য বর্তমানে এ অঞ্চলে আরো গণতন্ত্রের প্রতি অভ্যন্তরীণ ও অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন সৃষ্টির ফলে তুরস্ক এই প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জোরদার করেছে। পুরো অঞ্চলের স্বার্থ সর্বোত্তমভাবে রা করা সম্ভব হবে গণতন্ত্র সুসংহতকরণের মাধ্যমে, এসব দেশে জনগণকে মতায়িত ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। আর এটা করতে হবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে, নতুন করে গোষ্ঠীগত বা সাম্প্রদায়িক ধরনের কোনো বিভাজন না ঘটিয়ে। জনগণ এ বিভাজন চায় না, এ ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য আমাদেরকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। এই ল্েযই এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের সাথে তুরস্ক সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
আফ্রো-আটলান্টিক সম্প্রদায়ের সাথে মিত্রতাকে তুরস্ক অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। আমাদের ন্যাটোর (উত্তর আটলান্টিক ট্রিটি অরগানাইজেশন) সদস্যপদ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের সাথে আমাদের কৌশলগত সম্পর্ক তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক স্তম্ভ। অধিকন্তু ইইউর (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সদস্যপদ পাওয়ার জন্য তুরস্ক দীর্ঘ দিন ধরে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য এখনো কৌশলগত ল্য।
কায়রো রিভিউ : ইতিহাসের এই সন্ধিণে পরিবর্তিত বৈশ্বিকব্যবস্থায় তুরস্কের ভূমিকা কী?
দাভুতুগ্লু : বিশ্বায়িত পৃথিবীতে কোনো দেশই এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়। আমরা এখন এমন এক বিশ্বে বাস করছি যেখানে রাষ্ট্র, নেতৃবৃন্দ ও জনগণ ক্রমবর্ধমান হারে দৈনন্দিন ভিত্তিতে একে অপরের সাথে যোগাযোগ রা করে চলেছেন। প্রায় প্রতিটি জিনিস (পণ্য, ব্যক্তি, পুঁজি ও আইডিয়া) সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে, বিনিময় হচ্ছে। বিশ্বের একটি অংশের কোনো ঘটনা অন্য অংশে একই সাথে শ্র“ত হচ্ছে এবং দেশে দেশে দ্রুত তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এসব কারণে কোনো দেশই আর বিচ্ছিন্নভাবে টিকে থাকতে পারে না বা সমৃদ্ধ হতে পারে না। আসলে নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে এবং এই অন্তর্বর্তীকাল সফলভাবে সম্পন্ন হতে তুরস্ক সর্বোত্তম অবদান রেখে চলেছে। এ প্রোপটে আমরা বিশ্বাস করি যে নতুন ব্যবস্থাটি হবে: ষ বৈধ, ন্যায়সঙ্গত, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক; ষ প্রতিনিধিত্বমূলক ও অংশগ্রহণের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত; ষ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা হুমকিগ্রস্ত করতে পারে এমন সব সুপ্ত বা সক্রিয় বিরোধগুলো সমাধানে সর্বাত্মক উদ্যোগী; ষ বৈষম্য নির্মূল করতে কার্যকর; ষ সবার নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ধারণাভিত্তিক।
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে সেই ল্য বাস্তবায়নের সহায়তা করার জন্য আমাদের হাতে প্রয়োজনীয় নরম ও শক্ত উভয় ধরনের শক্তিই রয়েছে। আর এ ল্য বাস্তবায়নে আমাদের সুবিধাজনক ব্যবস্থা প্রয়োগে আমরা দ্বিধাপ্রকাশ করব না। আমাদের ভূকৌশলগত অবস্থান, বিকাশমান অর্থনীতি, বিশাল ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গতিশীলতা উপলব্ধির সামর্থ্য, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
তুরস্ক এই দর্শন প্রচার ও বাস্তবায়ন করার জন্য যা চায় তা হলো : সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সহযোগিতা, সমঝোতা ও সহিষ্ণুতা। সঙ্ঘাত বা সম্ভাব্য সঙ্ঘাত নিরসনের ল্েয সংশ্লিষ্ট পগুলোকে একত্র করা, সার্বজনীন মূল্যবোধ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের শিকারদের প্রতি সমর্থন দান, পশ্চাৎপদ দেশগুলোতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়ার নীতি অনুসরণ করে তুরস্ক।
এ ল্েয তুরস্কের সক্রিয় প্রয়াসের উদাহরণ হলো স্পেনের সাথে মিলে ‘অ্যালায়েন্স অব সিভিলাইজেশন’ উদ্যোগ গ্রহণ। একইভাবে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে তুরস্ক ও ফিনল্যান্ড ‘পিস থ্রো মেডিয়েশন’ উদ্যোগ গ্রহণ করে। আমরা জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার একটি প্রস্তাবও দিয়েছি, যা ২০১১ সালের জুনে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। ২০১২ সালের ২৪-২৫ ফেব্র“য়ারি তুরস্ক মধ্যস্থতাবিষয়ক ইস্তাম্বুল সম্মেলনেরও আয়োজন করে। এ সম্মেলনের ল্য ছিল সব পকে একে অপরের সাথে মতবিনিময়ের ও তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থা করে দেয়া, যাতে শান্তি স্থাপনে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করে তারা পরস্পরকে বুঝতে পারেন।
একইভাবে তুরস্ক উদীয়মান দাতা দেশেও পরিণত হয়েছে, বিভিন্ন দেশে নিজস্ব সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পও করে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্র“তির আলোকে তুরস্ক সবচেয়ে কম উন্নত দেশগুলোকে সহায়তা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এসব দেশে টেকসই উন্নয়ন সমর্থন করতে তুরস্ক এলডিসি শীর্ষ সম্মেলনেরও আয়োজন করে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, নতুন বৈশ্বিকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার েেত্র তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সম একটি দেশ। আমরা আমাদের সামর্থ্য এবং কী করা উচিত সে সম্পর্কে সচেতন। আমাদের বন্ধু ও অংশীদারদের সহযোগিতায় আমরা আমাদের অঞ্চল এবং অন্যান্য এলাকায় ইতিবাচক ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখব।
কায়রো রিভিউ : আপনি যেমনটি চাইছেন তেমন ‘কৌশলগত গভীরতা’ কি তুরস্ক অর্জন করেছে?
দাভুতুগ্লু : তুরস্কের কৌশলগত গভীরতার ভিত্তি হলো এর ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক গভীরতা। আমাদের দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের চার পাশের দেশ ও সম্প্রদায়গুলোর সাথে আমাদের অনন্য সম্পর্ক গড়ে দিয়েছে। অন্য দিকে বিশাল ভূগোলজুড়ে আমাদের ভূকৌশলগত অবস্থান পৃথিবীর ভবিষ্যতকে প্রভাবান্বিত করার মতো অবস্থানে আমাদেরকে স্থাপন করেছে। ফলে বিষয়টা কৌশলগত গভীরতা অর্জনের নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য তা ব্যবহারের। এ জন্য অভিন্ন অতীত ও ভূগোল-সংবলিত দেশগুলোর সাথে এমনভাবে কাজ করা যাতে সহযোগিতা ও সংলাপের জন্য পারস্পরিক কল্যাণমূলক অবস্থা তৈরি হয়। বর্তমানে শক্তিশালী গণতন্ত্র, প্রাণবন্ত অর্থনীতি ও সক্রিয় পররাষ্ট্রনীতির কারণে তুরস্কের সামনে তার কৌশলগত গভীরতাকে কাজে লাগানোর আরো বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত পরিষদ ও ভিসামুক্ত ভ্রমণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আমাদের উদ্যোগটি এ কৌশলগত গভীরতাকে কাজে লাগানোর ল্েয প্রণীত। সংশ্লিষ্ট সব দেশ ও জনগণ এই বর্ধিত সহযোগিতা থেকে উপকৃত হবে। আর রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক সমঝোতার মাধ্যমে এ অঞ্চলকে একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করার নীতির আলোকে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
অন্য দিকে পারস্পরিক স্বার্থ ও অভিন্ন আদর্শের ভিত্তিতে আঞ্চলিক মালিকানার অনুভূতি সৃষ্টির ওপরও কৌশলগত গভীরতা নিহিত। আর সেটা করা সম্ভব কেবল আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর আঞ্চলিক ব্যবস্থায় আরো বেশি কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সক্রিয় আলোচনার মাধ্যমে।
আমরা বিশ্বাস করি যে এর ফলে প্রতিবেশী দেশগুলো বাইরের বিশ্ব থেকে সমাধান চাপিয়ে দেয়ার জন্য প্রতীা না করে আঞ্চলিক সমস্যাগুলোর আঞ্চলিক সমাধান খুঁজে নিতে উদ্যোগী হবে।
কায়রো রিভিউ : ‘আরব বসন্ত’ আসন্ন এটা কি আপনারা বুঝতে পেরেছিলেন?
দাভুতুগু : আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ছিল প্রত্যাশিত, আমরা এ অঞ্চলে পরিবর্তন এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জরুরি প্রয়োজন অনুভব করছিলাম। আপনার হয়তো মনে আছে যে আমার বই ‘স্ট্যাটেজিক ডেপথ’ (এপ্রিল, ২০০১)-এ আমি জোর দিয়ে বলেছিলাম যে আরব দেশগুলোতে স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সামাজিক বৈধতাভিত্তিক নয়, ফলে এ ধরনের স্থিতিশীলতা মূল্যহীন। একইভাবে আমি দৃঢ়ভাবে বলেছিলাম যে আরব বিশ্বে আরব জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক সঙ্কটের বৈধতার রূপান্তর ওই সব দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাঠামোতে ধাক্কা দেবে। এ কারণে গত দশকের প্রথম দিকে আমরা এ অঞ্চলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন এবং মর্যাদা, মানবাধিকার ও স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা এবং একই সাথে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নারী-পুরুষ সাম্যের মতো সার্বজনীন মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলাম।
কায়রো রিভিউ : মোটা দাগে, কোন কোন বিষয় আরব বসন্ত সৃষ্টি করেছে?
দাভুতুগু : প্রতিবাদ অভ্যন্তরীণভাবে সৃষ্ট বিষয়। বছরের পর বছর ধরে স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের যে আকাক্সা জনগণ লালন করেছিল, তা থেকেই সহজাতভাবেই স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে। জনপ্রিয় আন্দোলনের চালিকাশক্তি হয় তরুণ সদস্যরা। চাপ ও নিয়ন্ত্রণে থেকে থেকে এবং একই সাথে অর্থনৈতিক জটিলতার মুখে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোর মাধ্যমে সবার মধ্যে বিরাজমান ােভ বৃহত্তর পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
কায়রো রিভিউ : আরব বসন্ত কি মধ্যপ্রাচ্যকে মৌলিকভাবে বদলিয়ে দিতে পারবে?
দাভুতুগু : এ অঞ্চলে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগবে। এটা সরলরেখায় হবে না, নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে হবে। তবে এটা অপরিবর্তনীয়। ঘড়ির কাঁটা উল্টাপথে চালানো যায় না। কারণ সোজাÑ পরিবর্তনের চাপ আসছে জনগণের কাছ থেকে। বর্তমানে প্রায় ৬০ শতাংশ আরবের বয়স ৩০-এর নিচে। তাদের বিপুলসংখ্যকই শাসকদের ওপর ুব্ধ। এসব শাসক তাদের অপোকৃত ভালো জীবনের দিকে চালিত করার চেষ্টা পর্যন্ত করে না। স্থিতিশীলতার উন্নয়নের জন্য স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার মধ্যে সুষ্ঠু ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা থেকে আরব বসন্তের উৎপত্তি। জনগণের স্বাধীনতার আকাক্সার আলোকে এ ধরনের প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য শাসক ও শাসিতের মধ্যে বৈধতার ব্যবধান দূর করা দরকার। এটা করা আগে কখনোই সহজ ছিল না এবং এটা এখন অনেক সহজ হবেÑ এমনটি মনে করারও কোনো কারণ নেই।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা েেত্র একই সাথে সংস্কার সাধন করা। এক দিকে আপনার প্রয়োজন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা এবং সেগুলো কার্যকর রাখা এবং অন্য দিকে চাকরি, শিা, খাদ্য ও স্বাস্থ্যবিষয়ক চাহিদাগুলোর স্থায়ী সমাধান করা। অনিবার্যভাবেই আগামী দশক হবে সত্য আর অসত্যের মধ্যে কঠোর লড়াইয়ের সময়। হয়তো কেউ জয়ী হবে, কেউ হবে না। তবে যারা জয়ী হবে, তারাই তাদের চেয়ে কম সৌভাগ্যবানদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। অন্য কথায় বলা যায়, জনগণই গতি নির্ধারণ করবে, তারাই মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তনের সুযোগ করে দেবে।
কায়রো রিভিউ : আরব বসন্তের প্রতি তুর্কি সরকারের ভূমিকা আপনি ব্যক্তিগতভাবে কিভাবে দেখেন?
দাভুতুগু : আমরা এ অঞ্চলের গণ-আন্দোলনের ব্যাপারে নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছি। এই নীতি দু’টি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত : আরো স্বচ্ছতা, বৈধতা ও জবাবদিহিতার জন্য সংস্কারকে সমর্থন করা এবং তাদের শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা। আমরা সবসময় শাসকদের বলি, তারা যাতে নিজেরাই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেন। এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা যেহেতু জনগণের বৈধ আকাক্সার মাধ্যমেই সম্ভব, তাই আমরা আমাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের সময়মতো প্রয়োজনীয় সংস্কারকার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য উৎসাহিত করি।
তুরস্ক সবসময়ই বলে আসছে জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও শক্তিপ্রয়োগ অগ্রহণযোগ্য। প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক ঐক্য অবশ্যই রা করতে হবে, এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। এসব প্রক্রিয়া যাতে চরমপন্থীরা হাইজ্যাক করতে না পারে সে দিকেও ল রাখতে হবে। কারণ তারা এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক, গোষ্ঠীগত ও আদর্শগত বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। তুরস্ক আরো মনে করে, পরিবর্তনের অবকাশ ও গতিশীলতা দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে। ফলে একটি মডেলই সব দেশের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না। প্রয়োজন হলে তুরস্ক নিজের অভিজ্ঞতা আগ্রহী দেশগুলোর সাথে শেয়ার করতে পারে।
কায়রো রিভিউ : আরব বিশ্বের বর্তমান বিদ্রোহ তুরস্কের জন্য সঙ্কট নাকি সুযোগ?
দাভুতুগু : আমরা চাই আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক, যাতে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের লোক বহুসাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সম্প্রীতি ও শান্তিতে বসবাস করতে পারে। এ অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এটাই একমাত্র পন্থা। চলমান গণ-আন্দোলন গণতান্ত্রিকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তা নিশ্চিতভাবেই তুরস্কের স্বার্থ পূরণ করবে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এ অঞ্চলের পরিবর্তনে সহায়তা করতে তুরস্ক কোনো দ্বিধা করবে না।
কায়রো রিভিউ : আপনার ‘স্ট্যাটেজিক ডেপথ’ আসলে নব্য-উসমানিয়াবাদ তথা আরব অঞ্চলের ওপর তুরস্কের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সৃষ্টি করে বলে যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, সে ব্যাপারে কিছু বলুন।
দাভুতুগু : কোনো কোনো মহল নব্য-উসমানিয়াবাদ এজেন্ডার জন্য আমাদের অভিযুক্ত করছে। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। এ অঞ্চলের ঘটনাবলি নিশ্চিতভাবেই অভিন্ন ভূগোল ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক অনুসরণ করতে তুরস্ককে সক্রিয়ভাবে বাধ্য করবে। তুরস্ক এ অঞ্চলে গণতন্ত্রের ভিত্তিতে নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ অঞ্চলে তুরস্কের কোনো গোপন এজেন্ডা নেই। আমাদের ল্য সীমান্তগুলোতে শান্তি, স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সম্পদের বেষ্টনী গড়ে তোলা। আরব দেশগুলোর সাথে তুরস্কের সম্পর্কের ভিত্তি হলো ‘পারস্পরিক সহযোগিতা’, ‘আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠা নয়। ফলে এ ধরনের আশঙ্কা ভিত্তিহীন।




