তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রজব তাইয়েব এরদোগান তার তিন মেয়াদের ক্ষমতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। গাজি পার্কের বিক্ষোভের সময় যে চ্যালেঞ্জ তার সামনে এসেছিল এবারের সঙ্কট তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। আকস্মিকভাবে তার ক্যাবিনেটের তিন প্রভাবশালী সদস্যের পুত্র, শাসক একেপি দলের আঙ্কারার একজন মেয়র এবং একটি সরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এবং একজন শীর্ষ ঠিকাদার-ব্যবসায়ীসহ ৫০ জনকে তিনটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। যে তিনটি মামলার তদন্তের জন্য তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তা সম্পূর্র্ণ গোপন রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এরদোগান এটাকে সরকারের ভেতরে থাকা অশুভ চক্রের সাথে বাইরের যোগসাজশে ঘটানো ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন।
এর আগে গাজি পার্কে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর তা একসাথে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল। এর পেছনে সেকুলার গ্রুপগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সেনাচক্রের হাত ছিল বলে বিশ্বাস করা হতো। এরদোগান কিছুটা শক্তি প্রয়োগ করে বাকিটা কৌশলে মোকাবেলা করেন এ বিক্ষোভ। কিন্তু এ বিক্ষোভ মোকাবেলার কৌশলের ক্ষেত্রে বিরোধিতা আসে একে পার্টির অভ্যন্তর থেকে। প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল ও উপপ্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি মোকাবেলায় অধিকতর নমনীয়তার পক্ষ নেন। তুর্কি ধর্মীয় নেতা ফতেহ উল্লাহ গুলেনের অনুসারীদের মিডিয়া থেকেও একই লাইনে এরদোগানের সমালোচনা করা হয়। গাজি পার্কের বিক্ষোভের ঘটনার পর নানা ইস্যুতে এরদোগানের সাথে গুলেন গ্রুপের দূরত্ব আরো বৃদ্ধি পায়।
ফতেহ উল্লাহ গুলেন হলেন এখনকার তুরস্কের সবচেয়ে প্রভাবশালী মডারেট ধর্মীয় নেতা। ১৯৯৯ সাল থেকে তিনি স্বেচ্ছানির্বাসনে আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ায় বসবাস করে আসছেন। সেখানে থেকেই তিনি তুরস্ক ও অন্যান্য মুসলিম দেশে তার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। এ নেটওয়ার্কে রয়েছে সহস্রাধিক প্রিপারেটরি স্কুল, বিভিন্ন মিডিয়া গ্রুপ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর ৯০ শতাংশ রয়েছে তুরস্কে।
ফতেহ উল্লাহ গুলেন ও তাইয়েব এরদোগান দু’জনের ধর্মীয় চিন্তাধারার উদ্দীপক ব্যক্তিত্ব অভিন্ন। তিনি হলেন বিখ্যাত তুর্কি ইসলামি চিন্তাবিদ বদিউজ্জামান নুরসি। নুরসির চিন্তা চেতনায় উজ্জীবিত নাজিমুদ্দিন আরবাকানের পথ ধরে এরদোগান এগিয়ে যান রাজনৈতিক ময়দানে। নাজমুদ্দিন আরবাকানের ওয়েলফেয়ার পার্টি নিষিদ্ধ হওয়ার পর রজব এরদোগান আবদুল্লাহ গুলের সাথে মিলে একে পার্টি গঠন করেন। আরবাকানের মূল ধারা গঠন করে সাদাত পার্টি। এরদোগানের দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০০২ সালে তুরস্কে সরকার গঠন করে। এরপর আরো দুই মেয়াদে সরকার গঠনে সক্ষম হয় দলটি। প্রতিবারই দলের পক্ষে ভোটসংখ্যা বাড়তে থাকে।
অন্য দিকে ফতেহ উল্লাহ গুলেনের মনোযোগ ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইসলামের দিকে। তিনি শত শত প্রিপারেটরি স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এসব স্কুলের কারিকুলাম ও শিক্ষামান উচ্চমানের হওয়ায় সমাজের প্রভাবশালী অংশের ছেলেমেয়েরা এতে পড়াশেনা করে। এক দিকে এসব স্কুল গুলেন আন্দোলনের জন্য অর্থের উৎস হিসেবে কাজ করে, অন্য দিকে তার চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিরা বিচার বিভাগ, পুলিশ ও সরকারের অন্যান্য পদে ছড়িয়ে পড়ে। সেকুলারিস্ট সামরিক কর্তৃত্বের সাথে প্রত্যক্ষ সঙ্ঘাত তৈরি হয় গুলেন আন্দোলনের। আরবাকানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সেনা জান্তা ফতেহ উল্লাহ গুলেনের বিরুদ্ধে মামলাও করে যা ২০০৮ সালে খারিজ হয়।
তুরস্কের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে গুলেন আন্দোলন ও একে পার্টি একসাথে কাজ করে। বিগত তিনটি সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তাদের ভূমিকা ছিল একই ধারায়। এর ফলে একে পার্টি প্রতিবারের সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহজে বিজয় লাভ করে। বড় ধরনের বাধাহীনভাবে দলের সংস্কার কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। আর অনুকূল সরকারের সুযোগে গুলেন নেটওয়ার্কের লোকজন শাসক দল, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ, বিচার বিভাগ, গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগ লাভ করে।
গুলেন আন্দোলন বা নেটওয়ার্কের আনুষ্ঠানিক কোনো কাঠামো বা সাংগঠনিক অবয়ব দৃষ্টিগোচর হয় না। গুলেনের ভাষণ ও নির্দেশনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গুলেন ভক্তরা কাজ করেন। এর বাইরে অদৃশ্য কোনো এক নেটওয়ার্ক হয়তো কাজ করে যার কারণে এই আন্দোলনে সক্রিয় ব্যক্তির সংখ্যা ১০ লাখ থেকে ৮০ লাখ পর্যন্ত বলে ধারণা করা হয়। সংখ্যায় যাই হোক না কেন এই নেটওয়ার্কের ব্যক্তিরা তুর্কি সমাজ ও প্রশাসনে কতটা প্রভাবশালী তার প্রমাণ পাওয়া যায় স্বরাষ্ট্র, অর্থ ও পরিবেশ মন্ত্রীর মতো তিন প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিবারকে নিয়ে ১০ মাসের গোপন তদন্তের ঘটনা এবং তাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে ঘটা করে গ্রেফতার ও আটকাদেশ দেয়ার মাধ্যমে। এ ঘটনার তদন্তের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সরকার বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী এরদোগান এ ঘটনাকে তুরস্কের সরকারের ভেতরে থাকা অশুভ ও অন্ধকার চক্রের কাজ এবং গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলার প্রয়াস বলে উল্লেখ করেন। নির্বাচনের বাইরে ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি লক্ষ্যও এর পেছনে রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। এরদোগান এর সাথে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তার বরখাস্ত ও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার পদক্ষেপ নেন। এই কথিত দুর্নীতি তদন্তের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী এরদোগান গুলেন আন্দোলনের প্রতি ইঙ্গিত করলেও তিনি কোনো সময় ফতেহ উল্লাহ গুলেনের নাম বা আন্দোলনের কথা সরাসরি উল্লেখ করেননি। তবে শীর্ষ তুর্কি দৈনিক জামান ও টুডে’স জামানসহ গুলেন আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত মিডিয়াগুলো এ ব্যাপারে ব্যাপক নিউজ কাভারেজ দেয়ার ফলে এরদোগান সরকারের বিরুদ্ধে এই উদ্যোগে গুলেন আন্দোলনের ভূমিকার বিষয়টি অপ্রকাশ্য থাকেনি। প্রথম কয়েক দিন এ ঘটনার সাথে গুলেন আন্দোলনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে উল্লেখ করা হলেও ফতেহ উল্লাহ গুলেন নিজেই এ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। তিনি বলেন, কে চোর ধরিয়ে দিয়েছে তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে চুরির ঘটনা ঠিক কি না তাতে মনোযোগী হওয়া উচিত। কারো বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ উঠলে সেই খুনের তদন্ত করা উচিত, কে এ অভিযোগ তুলল সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ফতেহ উল্লাহ গুলেনের এই বক্তব্যের পর এখন লড়াইটা দাঁড়ালো এরদোগান বনাম গুলেনের মধ্যে। এটি শুরু হয়েছিল বছরখানেক আগে রাষ্ট্রের নীতি ও নেতৃত্ব নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের মধ্য দিয়ে। এরগোদান শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের পর আগামী মেয়াদে প্রেসিডেন্টর দায়িত্ব নিতে চান। অন্য দিকে গুলেন আন্দোলন চায় আবদুল্লাহ গুলই প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকুন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে এরদোগানের ঘোষণাটি বাস্তব রূপ পাক। অর্থাৎ একেপি থেকে এরদোগানের কর্তৃত্বের অবসান কামনা করেন গুলেন। বিস্ময়করভাবে ত্রাণবাহী জাহাজ ফোটিলায় ইসরাইলি অপারেশনের পর তেল আবিব, আরব বসন্তের পর সৌদি আরবও এরদোগানের শাসনের অবসান কামনা করছে বলে নানা সূত্র থেকে বলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী শিবিরগুলোতেও একই ধরনের অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটছে। তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইইউ রাষ্ট্রদূতের সাথে এক বৈঠকে দুর্নীতির ঘটনার তদন্ত চেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি বাস্তবে হয়ে থাকলে রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করা হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য দিকে তুরস্কের অভ্যন্তরে সামরিক কর্তৃত্বের বিপক্ষে এরদোগান যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তাতে তাদের মধ্যেও প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। সেকুলার রাজনৈতিক দল ও গ্রুপগুলোর মনোভাব গাজি পার্কের ঘটনায় প্রকাশ পেয়েছে। এর সাথে গুলেন আন্দোলনের যুগসূত্র এরদোগানের সামনে চ্যালেঞ্জকে আগ্রাসী রূপে আবির্ভূত করেছে।
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার এ লড়াইয়ে এরদোগান সফল হতে পারবেন কি না তা অনেকগুলো যদির ওপর নির্ভর করে। এই যদির প্রথমেই রয়েছে গুলেন আন্দোলনের সাথে লড়াইয়ের প্রভাব তার দল একেপিতে কতটা পড়বে তার ওপর। ইতোমধ্যে শাসক দলের একাধিক নেতা দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের পদত্যাগ দাবি করেছেন। এরদোগানের আসন্ন মন্ত্রিসভা বিন্যাসে তিনি বিষয়টিকে আমলে নিচ্ছেন কি না তা স্পষ্ট হবে। এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট গুলের সাথে তার মতভেদ দলের মধ্যে বড় ধরনের বিভাজন তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনিবার্যভাবে পড়তে পারে। এমনকি একেপি ডেপুটিদের মধ্যে পদত্যাগীর সংখ্যা বাড়লে সরকারও ভেঙে পড়তে পারে। দ্বিতীয় যদিটি হলো সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর এরদোগানের কর্তৃত্ব কতটা বহাল থাকছে সেটি। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ পর্যন্ত সরকারকে টেনে নিতে পারবেন কি না তাতে সংশয় রয়েছে। তৃতীয় যদি হলো এরদোগান ও একেপি সরকারের ব্যাপারে আরো কী কী বিষয় আবির্ভূত হচ্ছে সেটি। উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগের পর এ ধরনের আরো কিছু প্রকাশের জন্য অপেক্ষমাণ বলে অনেকে মনে করছেন। সেটি বাস্তবে ঘটে থাকলে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পরিস্থিতি থামবে সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রজব তাইয়েব এরদোগান এমন একজন ক্যারিশমেটিক তুর্কি নেতা যার সাথে কামাল আতাতুর্কের তুলনা করা হয়। তিনি এ পর্যন্ত যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন তা একেবারেই ছোট ছিল না। তবে এবারের চ্যালেঞ্জ খানিকটা বেশি পরিসরে ব্যাপ্ত মনে করা হচ্ছে এর সাথে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো যুক্ত হয়ে পড়ায়। ইরানের সাথে বিরোধ কমিয়ে আনা, সৌদি আরবের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক নির্মাণ, ইসরাইলের বৈরিতা কমিয়ে আনা, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নানা ইস্যুতে সমঝোতা করার মধ্য দিয়ে এরদোগান এক ধরনের ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছেন। অর্থনীতিতে নতুন করে গতি আনার চেষ্টায়ও তিনি বেশ সফল হচ্ছিলেন। এরপরও দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন তার ওপর নির্ভর করবে এ দফায় এরদোগানের টিকে যাওয়া। এরদোগানের বড় সঙ্কট হলো তার চিহ্নিত শত্রুপক্ষে মিত্রদের একটি অংশের যুক্ত হয়ে পড়া। তিন মেয়াদের কোনো সময় এটি মোকাবেলা করতে হয়নি তাকে।





দীর্ঘদিন পত্রিকা না পড়ায় অনেক কিছুই মিস করছি। মাসুমুর রহমান খলীলীর কলাম নয়াদিগন্তে নিয়মিত পড়ি। বেশ ভালই লেখেন। ধন্যবাদ এডমিন শেয়ার করার জন্য। অনেক কিছু নতুন করে জানা হল। ইনশাআল্লাহ আপনাদের সাথেই নিয়মিত আমাকে পাবেন ইনশাআল্লাহ