ক্যাডার বেইজড হওয়া সত্বেও পশ্চিমবঙ্গে মার্কসবাদিরা কিভাবে ক্ষমতায় গেলো? প্রায় ৩৪ বছর তারাতো ক্ষমতায় ছিলো?
মার্কসবাদ এবং ইসলাম কিন্তু এক কথা না। ইসলাম কায়েম করার চেয়ে মার্কসবাদ কায়েম করা অনেক সহজ। কারণ মার্কসবাদে ধর্মীয় বিধি-বিধান অনুসরণ করার মতো কোনো ব্যাপার নাই। মার্কসবাদীরা বলে যে, এটা একটা সাইন্স। যুগোপযোগিতাই হলো মার্কসবাদ।
বদরুদ্দীন উমররা তো বলেন যে, মার্কসবাদ কখনো ফেইলিউর হবে না। কারণ রাশিয়াতে কমিউনিজম আসেই নাই, কী ফেইল করবে? ওরা বলে যে, রাশিয়াতে তো মার্কসের ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে। মার্কসবাদের যে সাম্যবাদী পর্যায়- সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটাকেও এখন তারা শেষ বলছে না। এরপরেও আবার বিবর্তন হতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নব নব উন্নতিতেনতুন নতুন সিচুয়েশন ফেস করবে মার্কসবাদ। আমরা যেটা দেখেছি, সেটা মার্কসবাদের একটা সাময়িকরূপ। এটা হলো মার্কসবাদের একটা ব্যাখ্যা।
দ্বিতীয় কথা হলো, মার্কসবাদ তো মানব রচিত মতবাদ। এটাকে আপনি ভাঙতে পারেন যে কোনো সময়। কিন্তু ইসলাম তো ওই রকম না। ইসলামকে তো ভাঙতে পারবেন না।
প্রশ্নটা ছিল, ক্যাডার পার্টি হলে পপুলার হতে পারবে না। তাহলে পশ্চিমবঙ্গে সেটা কিভাবে সম্ভব হলো?
পশ্চিমবঙ্গে যখন যেটা দরকার, তারা সেটা করেছে। পশ্চিমবঙ্গে তো তারা আদি মার্কসবাদ কায়েম করে নাইকখনো। ওরা সেটা দাবিও করে নাই। ওরা বলে যে, একটা পুঁজিবাদী সমাজে যদ্দুর পারা যায় আমরা গরিব মানুষের কল্যাণ করার চেষ্টা করছি। ওরা এটাকে মার্কসবাদী রাষ্ট্র বলে না তো। তারা সর্বক্ষেত্রে আপস করেছে এবং সেটা তারা বলে-কয়েই করেছে। ওরা বলেছে যে, ভারতীয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সারা ভারতের ক্ষমতা দখল না করে একটা অঞ্চলে মার্কসবাদ কায়েম করা সম্ভব নয়।তার মানে তাদেরকে ভারতের, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সংবিধান মেনে চলতে হয়েছে। ভারতীয় পুঁজিবাদী আর্মির ছত্রছায়ায় কাজ করতে হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় শাসন জারি হওয়ার ঝুঁকি রেখেই কাজকরতে হয়েছে।
তারা কি পরিমাণ আপস করেছে সেটি দেখেন। সিপিএম-এর আমলে ভারতের অন্য যে কোনো অঞ্চল থেকে শিল্প-কারখানাগড়ার জন্য ভারতীয় পুঁজিপতিরা পশ্চিমবঙ্গকে আগে বেছে নিতো। কারণ ট্রেড ইউনিয়ন সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে শ্রমিকরা কারখানা কন্ট্রোল করতে পারে না। ফলে তাদের কথিত মার্কসবাদ পুঁজিবাদকেই সহায়তা করেছে এক অর্থে। এমনকি সিপিএম-এর নেতারা স্বাধীনভাবে আমেরিকায় গিয়ে বাণিজ্যিক সফর করে পুঁজি আনার চেষ্টা করেছে।
দেশের আয় বাড়ানোর জন্য তারা এটা করেছে। সোজা কথায়, তারা অ্যাডাপ্ট করেছে।
ওরাতো সেখানে কমিউনিজম কায়েমের কথা বলেনি। নাকি বলেছে?
তাহলে জামায়াতে ইসলামী যদি ক্যাডার সিস্টেম বহাল রেখে অ্যাডাপ্ট করার দিকে অগ্রসর হয়…
না,পারবে না। কারণ অযোগ্য ‘রোকন’রা সব সময় যোগ্যদের উপর কর্তৃত্ব করবে। তাহলে যোগ্য লোকেরা সেখানে কেন কাজ করবে?
তো এখন জামায়াতের একাংশ যদি জামায়াতকেরেখেই কিছু একটা করে…
জামায়াতের উচিত ছিল ১৯৭১ সালের লিগ্যাসিকে চাপা দেওয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামীর নামে একটা আন্ডারগ্রাউন্ডপার্টি করা। অথবা সেমি-আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি করা, যেটা ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট হিসেবে থাকবে। বাহ্যিকভাবে উচিত ছিল একটা mass party করা। যেখানে ইসলামবিদ্বেষী নয় এমন যেকেউ স্পেস ও প্রপার এপ্রিসিয়েশান পেতে পারে। যেমন, যখন ভারতে বিজেপি আরএসএস করে, হিন্দু মহাসভা করে দেখেছে যে, ইন্ডিয়ান হিন্দুদের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার মতো জনপ্রিয়তা অর্জন করা যাচ্ছে না, তখন তারা বিজেপি নামে আধা-সেক্যুলার পার্টি করেছে। যার ফলে তারা ৫/৭ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় চলে গেছে।
জামায়াতে ইসলামী যদি ইসলামী ছাত্রশিবিরকে তাদের পার্ট না রাখতো, তারা কোনো ধরনের ভায়োলেন্সে আসতো না। তারা শুধু লোক রিক্রুট করে ওই পার্টিতে দিতো। সমস্ত জেলা কমিটিগুলো ওদের নিয়ন্ত্রণেথাকতো। সমস্ত কেন্দ্রীয় নেতারা ওদের নিয়ন্ত্রণে থাকতো। কিন্তু কেউ এটাকে সাম্প্রদায়িক দল বলতে পারতো না। কেউ এটাকে ১৯৭১ সালের দল বলতে পারতো না। বিজেপি তো তাই করেছে। বিজেপি’র সব key পোস্টগুলো আরএসএস’এর দখলে না? তাহলে এই কন্ট্রাডিকশনটা হতো না।
কিন্তু উনারা এটা অতীতেও করেন নাই, নিষিদ্ধ হওয়ার পরে বাধ্যগত পরিস্থিতি ব্যতিরেকে বর্তমান বা ভব্যিতেও করবেন না। জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের এসব শোনারও ধৈর্য নাই। উনারা মনে করেন যে, ইসলামের মনোপলী উনাদের হাতে। আসল কথা হচ্ছে এটা একটা vested স্বার্থ। উনারা ব্যবসা-বাণিজ্যনিয়ে ব্যস্ত আছেন। উনারা মনে করছেন যে, বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতেই হবে, এমন কোনো কথা নাই। তাদের দায়িত্ব হলো ইসলামের কথা বলে যাওয়া, প্রতিষ্ঠা করাটা আল্লাহর দায়িত্ব।
জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ব্যাপারে বলতে পারবো না। তবে মধ্যম পর্যায়ের অনেক নেতাসহ অনেক লোকজন আছে যারা একটা কিছু করার জন্য দৃশ্যত খুব সিরিয়াস। বর্তমান সংকটটা একটুখানি কেটে উঠলে বোধহয় একটাআউটবার্স্ট হবে। ইতোমধ্যেই জায়গায় জায়গায় বিভিন্নভাবে কিছু কিছু গ্রুপ বা পকেট সৃষ্টিহয়েছে।
আমি সবার আগ্রহ ও চেতনার প্রতি সিম্প্যাথি রেখেই বলছি, যদি কিছু করতেই হয়, তাহলে জামায়াতের সংস্কারের চেয়ে নতুন নাম দিয়ে করার চেয়ে কিছু করাটা সহজতর ও ফলপ্রশূ হবে। বাম ঘরানার অভিজ্ঞতাকে সামনে রাখলে দেখা যায় যে, এতকিছুর পরও কমিউনিজমের পতাকাকে কিছু লোক ছাড়ছেনা, ছাড়বে না। কমিউনিজমকে এখনো মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমরা কেন ধরে রেখেছে? যদিও তারা জানে যে, বাংলাদেশে কোনো দিন কমিউনিজম হবে না। এর পেছনে দুইটা কারণ।
একটা হলো, তারা ঐতিহ্যের ধারক হয়ে গেছে। মিডিয়াও তাদেরকে এক ধরনের সহযোগিতা করে টিকিয়ে রেখেছে, টকশোতে দাওয়াত করে, বামপন্থীদের তো কথা বলা সহজ। একটা আন্তর্জাতিক যোগাযোগও দূরতম ভাবে হয়তোবা আছে। এখনো WARSAWভুক্ত দেশগুলাতে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আসছে। এমনটা ভারতে আছে। সোশ্যালিস্টদের মধ্যেও কমিউনিস্টদের প্রতি এক ধরনের দূর্বলতা কাজ করে, যেমন আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের মধ্যে কমিউনিস্টদের প্রতি এক ধরনের ন্যাচারাল দূর্বলতা আছে, তাই না? যদিও তারা কোনোদিন কমিউনিজম করবে না। কিন্তু তারা মনে করে যে, তারা থাকলে আমাদের সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট জমজমাট থাকলো। এছাড়া কিছু সম্পত্তি আছে তাদের। সম্পত্তি নিয়ে মারপিট হয়েছে না সিপিবির সাথে, ওদের সাথে? এ কারণেই কিছুদিনপর পর বাসদ ভাঙছে।
আমি খারাপ অর্থে বলছি না, বামপন্থী দলগুলোর উদাহরণ দিলাম এজন্য যে, বামপন্থীরা যেখানে আছে সেখানে থাকলে কিছু সুবিধা ভোগ করে। জামায়াতে ইসলামীর এরচেয়ে বহু গুন বেশি সম্পত্তি আছে। বাংলাদেশে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়ে গেলেও বিদেশে জামায়াতের প্রচুর লোক থাকবে। সারা পৃথিবীতে। তারা আরো বেশি কমিটেড। তাদেরকে বোঝানো সম্ভব হবে না। সুতরাং এর সুযোগ নিয়েএখানে কিছু ঝান্ডাধারী থাকবে। কারণ তাদের সম্পত্তি আছে অনেক। এই সংগঠনের নেতা হিসেবে সৌদী আরব গেলে সেখানে এক মাস বিনা পয়সায় থাকতে পারছে, খেতে পারছে, কিছু দিরহাম পেয়েযাচ্ছে …
আমার কাছে মনে হয়েছে, নিবাসী বাংলাদেশীজামায়াত নেতা-কর্মীদের চেয়েও অনিবাসী বাংলাদেশী জামায়াত নেতা-কর্মীরা অনেক বেশি কমিটেড….
এটা এ কারণে যে, তারা নিরাপদ। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই এ রকম। বলা হয় যে,মনের দিক থেকে ইসরাইলে বসবাসকারী ইহুদীদের চেয়ে নন-ইসরাইলী ইহুদীরা আরো বেশি সিরিয়াস। তাই জামায়াতে ইসলামীর সব কিছু একেবারে অ্যাবুলিশ করে ফেলা বাস্তবে সম্ভব নয়। জামায়াত সদস্যদের মধ্যে একটা মানসিক ঐক্য তো গড়ে উঠছে। দশ জন একত্রিত হয়ে একটা বাড়ি করে ফেলেছে, দশ জন একত্রিত হয়ে একটা ফ্যাক্টরি করে ফেলছে, দশ জন একত্রিত হয়ে একটা প্রতিষ্ঠান করেফেলেছ। জামায়াত-বিশ্বাস অনেক জামায়াত নেতা-কর্মীদের মধ্যে বলা যায় এক ধরনের ঈমানের মতো হয়ে গেছে। শুনতে খারাপ লাগলেও এটি সত্য। এর ফল হলো, যে যাই বলুক, দরকার হলে আমি মরে যাবো, তারপরও জামায়াতে ইসলামী ছাড়বো না।
দেখুন, রাজনৈতিক ভুল হতেই পারে। কিন্তু কত গোয়ার হলে জামায়াতে ইসলামী তার চরম রাজনৈতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও গত ৪২ বছরে এটি পরিষ্কারভাবে স্বীকার করতে রাজি হয়নি যে, ১৯৭১ সালে তাদেরসিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
শুনেছি, গোলাম আযম সাহেব নাগরিকত্ব পাওয়ার পরে বাইতুল মোকাররমের উত্তর গেটে যে বক্তৃতা দিয়েছেন, সেখানে নাকি তিনি এ ব্যাপারে….
জামায়াতে ইসলামী একটা বুকলেট লিখে, একটা সাংবাদিক সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি বললে কি গোনাহ হতো নাকি? শুনেছি, কোনো এক রোকন সম্মেলনে একজন শীর্ষনেতা এমনও বলেছেন যে, ১৯৭১ সাল আমাদের জন্য বিপদ না, আমাদের জন্য কোনো সমস্যা না। বরঞ্চ, যারা ৭১ সালকে জামায়াতের সমস্যা হিসেবে মনে করছে, তারাই আমাদের জন্য বড় বিপদ…!
যাহোক,আমার মতে আপনারা নতুন করে চিন্তাভাবনা করুন। একেবারে ফ্রেশভাবে। যারা আসার আসবে।
একেবারে ফ্রেশ সংগঠন দাঁড় করানোর সম্ভাবনা কতটুকু? জামায়াত কি তাদেরকে বিভিন্নভাবে oppose করা বা গিলোটিন করার চেষ্টা করবে না?
তাতো করবেই। সিপিএম যে ধরনের চরম নির্যাতন নকশালপন্থীদের উপর করেছে, অন্য কেউ হলে ততটুকু হয়তোবা হতো না। ডিভোর্সি হাজব্যান্ড-ওয়াইফ পরষ্পরের সবচেয়ে বেশি শত্রু। তাই না?
নকশালপন্থীদের শেষ পর্যন্ত সাকসেসটা কি?
না, সাকসেস নাই। বিশ্ব প্রেক্ষাপটই তো পরিবর্তন হয়ে গেছে। আর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যে সময়েযে প্রেক্ষাপটে যেসব দেশে হয়েছে, ওই প্রেক্ষাপটই পাল্টে গেছে। পুঁজিবাদীরা ওয়েলফেয়ার মডেল সামনে এনে কৌশলে কমিউনিজম ঠেকিয়ে দিয়েছে। সর্বহারাই তো থাকছে না, সর্বহারার বিপ্লব কি জন্য হবে?
ইউরোপ কি করেছে? মার্কস তো আশা করেছে যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হবে উন্নত শিল্পায়িত সমাজে, যেখানে have nots সৃষ্টি হবে। এখন have nots’ই নাই, পুঁজিবাদীরা new economy চালু করে শ্রমিকদের ফ্যান,ফ্রিজ, গাড়ি, চিকিৎসাসহ সব নাগরিক সুবিধা প্রায় নিশ্চিত করেছে। তারপরও মানুষ কেন বিপ্লব করবে? বাক স্বাধীনতা? সেটাও তারা অন্তত আমাদের বা অন্য যে কারো থেকে বেশি দিয়েছে। বড়জোরএটা হবে যে, এখন ৫০০ টাকা গ্র্যাচুয়িটি আছে, এটা ১০০০ টাকায় উন্নীত করার নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করা, মাঝে মধ্যে ২/৩ দিন স্ট্রাইক করা। দরকার হলে মালিককে একটা পিটুনি দিলেও মেরে ফেলবে না। মেরে ফেললে গ্র্যাচুয়িটি বাড়াবে কে?
কমিউনিজম হলো একটা অস্বাভাবিক ব্যবস্থা, পুঁজিবাদ হলো একটা স্বাভাবিক ব্যবস্থা। সে জন্যই পুঁজিবাদ টিকে আছে। তাই কমিউনিজম সময়ে এসেছিলো, সময়ই তাকে রাষ্ট্র-চ্যূত করেছে। অথচ, পুঁজিবাদ কল্যাণ রাষ্ট্রে বিবর্তিত হয়ে টিকে আছে।
যেটা বলছিলাম, নতুন দলের সম্ভাবনা তাহলে কতটুকু?
নতুন দলের সম্ভাবনা বলতে যদি ক্ষমতা দখল করা হয়, তাহলে নিকট ভব্যিতে এটা হবে না, দেরি হবে।বাংলাদেশে বিএনপি-আওয়ামীলীগের বাইরে কেউ পারছে না কেন? তারমানে আমাদের দেশের লোকজন রাজনৈতিকতার দিক থেকেও আদতে পীরবাদী। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদেরকে পীর মর্যাদায় অনুসারীরা মনে করে। এই অর্থে এক একটি দল যেন ধর্ম হয়ে গেছে তো। যারা আওয়ামীলীগ করে তারা মনে করে,ধর্ম চেঞ্জ করার মতো আওয়ামীলীগ চেঞ্জ করাটা অসম্ভব। আওয়ামীলীগ বিরোধিতাও এক ধরনের ধর্ম হয়ে গেছে। এইসব বাস্তবতার মধ্যেই কাজ করতে হবে।
আমার ধারণা, বিএনপির লোকজন ভালো প্লাটফরম পেলে সুইচ করবে। বিএনপির যে অবস্থা, নড়তে-চড়তে পারছে না…
নতুন দল হলে বিএনপির লোক পাওয়া যাবে, কিন্তু জামায়াতের লোক কম পাওয়া যাবে। অবশ্য সাধারণ মানুষ এক পর্যায়ে আসবে। রাজনীতি তো একদিনের জন্য নয়। পাঁচ বছর পরেই ক্ষমতায় যেতে হবে, এ রকম তো না। রাজনীতি যদি মানুষের কল্যাণের জন্য হয়, তাহলে…
আরেকটা ব্যাপার হলো, ইসলামকে আদর্শিকভাবে আন্ডারস্ট্যান্ড করার বিষয়গুলোর মধ্যে যে বেসিক প্রবলেমগুলো, মাদ্রাসা সিস্টেমের মধ্যেও, তাবলিগ জামায়াতের মধ্যে তো অবশ্যই, এমনকি জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেও… । ইসলামকে রি-ইন্টারপ্রেট করার যে বিষয়টা, কনসেপ্চুয়াল অ্যাম্বিগুইটির যে বিষয়গুলো…
আমিমনে করি, নতুন রাজনৈতিক দলের ওইসব জটিলতায় যাওয়ার কোনো দরকার নাই। এগুলোর কোনোদিনই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে না। ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে এসব ফিলসফিক্যাল প্রশ্নের পেছনে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কোনোদিন এগুলোর মিমাংসা হয়নি, কোনোদিন হবেও না। এগুলো দার্শনিক বিতর্ক হিসেবে থাকুক। এগুলোকে সাংগঠনিক বিতর্ক হিসেবে আনার দরকার নাই।
তাহলে আমরা যদি বলি, নতুন ধারার রাজনীতি, তারা তো তাহলে তেমন কোনো আদর্শ নিয়ে কাজ করবে না। তারা শুধু জনকল্যাণের জন্য কাজ করবে।
রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিতর্কের কোনোদিন শেষ হবে না। রাষ্ট্রের প্রয়োজন আছে কিনা, এটা নিয়েও তো বিতর্ক আছে। রাজনীতি, সংগঠনের প্রয়োজন আছে কিনা। পৃথিবীতে এই আন্দোলনও তো আছে, আদিম অবস্থায় ফিরে যাও এবং সেখানেই শান্তি। আছে না? রুশো- এরাও তো বলেছেন, এসব তো যন্ত্র। রাষ্ট্র, সমাজ, আইন, পরিবার, বিবাহপ্রথা- এগুলো মানুষকে দাসত্বে আবদ্ধ করে ফেলে। মানুষজন্মগতভাবেই কেবল স্বাধীন, পরেই সে পরাধীন। এসব বিতর্ক তো কোনো দিন শেষ হবে না। এইসব ফিলসফিক্যাল বিতর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনো আগ্রহ নাই। দরকার কি? ওগুলো ফিলসফির কাজ।
সমস্যা হলো, যারা এ ধরনের কিছু করার জন্য মিনিমাম কম্পিট্যান্ট, তারা তাদের কমফোর্ট জোনের বাইরে আসতে তো রাজি নয় ….
কোনোদিনও মতাদর্শিক আন্দোলনে, টোটালেটারিয়ান আন্দোলনে কখনো কোনো বেশি মেধার জন্ম হয় না। রুশ বিপ্লবের পরে আর একজনও ম্যাক্সিম গোর্কি আসেনি, একজন টলস্টয় আসেনি। ওয়েস্টবেঙ্গলেও নামকরা, খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক, এক সময় যারা বামপন্থী আন্দোলনে যুক্ত ছিল, সিপিএম-এর২০ বছরের শাসনামলে তাদের ৯০ শতাংশ সিপিএম ছেড়ে দিয়েছে।
তারমানে তত্ত্বগতভাবে টোটালেটারিয়ানিজম এবং ক্রিয়েটিভিটেনিজম- দুইটা কন্ট্রাডিকটরি?
সিপিএম সারাজীবনে একটা আনন্দবাজার পত্রিকা বের করতে পারেনি, এতো বছর ক্ষমতায় থাকা সত্বেও। চট্টগ্রামে যখন কর্ণফুলি বের হয়, আল-মাহমুদ সাহেবের সভাপতিত্বে আমিও সেই মিটিংয়ে ছিলাম। সেখানে আমি বলেছিলাম যে, আপনারা কোনো অবস্থাতেই আরেকটা সংগ্রাম হতে দিয়েন না। কিন্তু এটা সংগ্রামের চেয়েও খারাপ হয়েছে। নয়াদিগন্ত এখন আমরা রাখি আরকি। নয়াদিগন্তে কিছু পড়ারআছে? আমরা দলীয় কারণে রাখি।
আমার কথা হচ্ছে, যদি ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট করতে চান, সেটি হতে পারে। কিন্তু রাজনীতি করতে হলে প্র্যাগম্যাটিক হতে হবে। রাজনীতি আর রাজনৈতিক সংগঠন করতে হলে ওইসব মিথ-এ যাওয়ার দরকার কি? একটা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রই তো লক্ষ্য …
Conceptual যেসব ambiguity আছে, ওইগুলোকে eradicate না করে প্র্যাকটিকাল ফিল্ডে কিছু করতে গেলে, একটা পর্যায়ে, ৫/১০বছর পরে, থিওরিতে যে প্রবলেমগুলো আছে…
ইসলামী রাষ্ট্র করতে গেলে এই সমস্যাটা হবে।
যেমন, আমি খুব প্র্যাকটিকাল একটা উদাহরণ বলি। যদি মনে করা হয়, ইসলামী শরিয়াহর রেফারেন্সগুলো require করে মেয়েদের মুখ ঢাকতে হবে। তাহলে বর্তমানে যে ধরনের একটা হেজেমনি আছে, প্রবলেম হচ্ছে- সেটা হবে। আর যদি থিওরিটিক্যালি এটাকে সলভ করা যায় যে, এটা required না, অপশন আছে। এখন সলভ করা বলতে আমি মনে করি না যে, সহস্রাব্ধ প্রাচীন এ বিষয়গুলো একদম settle for ever হয়ে যাবে। কিন্তু একটা ডমিন্যান্ট আইডিয়া হিসেবে মডারেট চিন্তাগুলো যদি থিউরিটিক্যালি enrich করা যায়…
মুখ ঢাকার দরকার আছে কি নাই- এই বিষয়টার রাষ্ট্রের সম্পর্ক কী? এটা একটা সোশ্যাল ব্যাপার। সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্র ও পরিধি আলাদা।
কিন্তু সমস্যার সমাধান না হলেও, বাস্তবে যারা পলিটিক্যাল মুভমেন্ট পরিচালনা করবে, তাদের পক্ষে কিন্তু এক ধরনের ফিলসফিক্যাল সাপোর্ট লাগবেই।
আমি একটা কথা বলি, ইসলামী রাষ্ট্র হলেও, ইসলামী বিপ্লব করে রাষ্ট্র গঠিত হলেও জোর করেই টিকে থাকতে হবে, যদি সনাতনী ধারায় এক রকমের ইসলামী রাষ্ট্রের কথা বিবেচনা করা হয়। কমিউনিজমওএকইভাবে জোর করে টিকে ছিল বা আছে। সেক্ষেত্রে সেটি হবে এক ধরনের পুলিশি রাষ্ট্র যা কাম্য নয়। তাই বাস্তববাদী হয়ে যতটুকু সম্ভব জনগণের ইচ্ছার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করতে হবে।




