ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো ইতিহাস থেকে যারা শিা গ্রহণ করে না তাদের মানচিত্র বদলে যায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের মানচিত্র বদলে গেছে। তখন দেশটি দুই টুকরো হয়ে গেছে। তার পরেও এখানকার শাসকগোষ্ঠী ইতিহাস থেকে শিা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানকে শুধু রাজনৈতিক মতবিরোধের অপরাধে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করে পাকিস্তান ভাঙার ভিত রচনা করেছিল। এ দু’জনের ‘অপরাধ’ হলো তারা পাকিস্তানের প্রথম সেনাশাসন মেনে নেননি। তাদের ‘অপরাধ’ এটাও ছিল যে, তারা উভয়েই সেনাশাসক জেনারেল আইয়ুব খানের বিপরীতে ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন দেন। আর তাদের সবচেয়ে বড় ‘অপরাধ’ হলো, তারা উভয়েই ছিলেন বাঙালি। সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ১৯৪৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করতে জোরাল প্রস্তাব পেশ করেন। নিখিল ভারত মুসলিমলীগ সে প্রস্তাব গ্রহণ করে। জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করার পর সোহরাওয়ার্দীকে ‘দেশের শত্র“’ আখ্যায়িত করে করাচির কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী করেন। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শেখ মুজিবুর রহমান তার দল আওয়ামী লীগের প্রধান হন। শেখ মুজিবুর রহমান ফাতেমা জিন্নাহর প নেন। ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা দেখুন, ১৯৬৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেনারেল আইয়ুব খানের মোকাবেলায় মুহতারামা ফাতেমা জিন্নাহর প্রতি সমর্থনকারীদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া ওয়ালী খান, আতাউল্লাহ মেঙ্গাল, আকবর বুগতি, নবাবজাদা নাসরুল্লাহ খান ও মাওলানা মওদূদীও শামিল ছিলেন; কিন্তু ১৯৭০ সালের আগে সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ ও মাওলানা মওদূদীর জামায়াতে ইসলামী মুখোমুখি হয়ে পড়ে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। জেনারেল ইয়াহইয়া খান আওয়ামী লীগের কাছে মতা হস্তান্তরের পরিবর্তে সেনা অভিযান শুরু করেন। সেনা অভিযান বিদেশী হস্তেেপর পথ সুগম করে দেয়। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি বাহিনীর প নেয়। এ দিকে পাকিস্তান ভেঙে যায়। এভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। সেই বাংলাদেশে আজো আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যুদ্ধ চলছে।
গত বছর জামায়াতে ইসলামীর প্রবীণ নেতা গোলাম আযমকে যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। আর আবদুুল কাদের মোল্লাকে দেয়া হয় ফাঁসি। কয়েক দিন আগে গোলাম আযম দীর্ঘ অসুস্থতার পর ইন্তেকাল করেছেন। তার ইন্তেকালের কয়েক দিন পরেই জামায়াতে ইসলামীর আরো এক নেতা, মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতর এ বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেণ করছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান। পাকিস্তানের বড় বড় রাজনৈতিক দল এ ব্যাপারে নীরব। তবে কিছু পত্রিকার কলামে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদের কড়া সমালোচনা করা হয়। কোনো কোনো সমালোচক আগুনে পানি ঢেলে মতিউর রহমান নিজামীকে বাঁচানোর রাস্তা খোঁজার চেষ্টা না করে বরং তারা নিজেদের বিষাক্ত কলম দ্বারা আগুনে তেল ছিটিয়ে দিয়েছেন; যাতে আবদুল কাদের মোল্লার পর মতিউর রহমান নিজামীও অতি দ্রুত ঘৃণা ও বিদ্বেষের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যান। তার পরেও বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর লড়াই চলতেই থাকবে। শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়া অতীতে মতালাভের জন্য জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট করেন; কিন্তু যখন গোলাম আযমের ইন্তেকাল হলো, তার দল নামাজে জানাজায় পর্যন্ত শরিক হয়নি। পরে যখন মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হলো তখনো খালেদা জিয়া চুপ থাকলেন। নিজামী ছিলেন মুহতারামা খালেদার মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য।
২০০২ সালে খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আর নিজামী ছিলেন মন্ত্রী। পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ বাংলাদেশে সফরে গেলে খালেদা জিয়া তাকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে নিয়ে যান। এই স্মৃতিসৌধ সেই বাঙালিদের স্মরণে নির্মিত, যারা ১৯৭১ সালে সেনা অভিযানে মারা গেছেন। স্মৃতিসৌধে রাখা রেজিস্টার বুকে জেনারেল মোশাররফ স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন- ‘১৯৭১ সালে যে বাড়াবাড়ি হয়েছে তা দুঃখজনক। আসুন, পুরনো তিক্ততা ভুলে গিয়ে সামনে এগিয়ে যাই।’ খালেদা জিয়ার সরকার জেনারেল মোশাররফের ওই বাক্যকে নিজেদের বড় সফলতা বলে দাবি করে। কেননা বাংলাদেশে বরাবরই এ দাবি উঠেছে, পাকিস্তান সরকারিভাবে ১৯৭১ সালের সেনা অভিযানের ঘটনায় মাপ্রার্থনা করুক। আওয়ামী লীগের বক্তব্য হচ্ছে, ‘মোশাররফ মাপ্রার্থনা করেননি, শুধু দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আর তিনি এটাও স্পষ্ট করেননি, ১৯৭১ সালে বাড়াবাড়ি কে করেছে।’ ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ ও পাকিস্তানের মাপ্রার্থনার বিষয়টি বড় ইস্যুতে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে অঙ্গীকার করে, ‘১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করা হবে।’ আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন। পাঁচ বছর অতিবাহিত হতে চললেও যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তির সাজা না হওয়ায় ২০১৩ সালের ৫ ফেব্র“য়ারি শাহবাগে এক আন্দোলন শুরু হয়। ওই আন্দোলনের পেছনে আওয়ামী লীগের মধ্যে লুকিয়ে থাকা হাসিনাবিরোধী লবি ছাড়াও এমন গোষ্ঠী তৎপর ছিল, যারা জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করতে চাচ্ছিল। ওই আন্দোলন বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়লে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সাজা ঘোষণা করতে থাকেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাজাকে ‘ন্যায় বিচারের পরিপন্থী’ বলে অভিহিত করেছে; কিন্তু হাসিনা সরকার কারো কথাই শুনছে না।
শেখ হাসিনা ওয়াজেদের পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৯ ফেব্র“য়ারি ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারকে একটি সাাৎকার দিয়েছিলেন। ওই সাাৎকারে বলেছিলেন, তিনি পাকিস্তানের সাথে তিক্ততা ভুলে গিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান; কিন্তু কিছু দিন পর তিনি নিহত হন। পুরনো ঘৃণা-বিদ্বেষ আবার জেগে ওঠে। এই বিদ্বেষ অবসানের জন্য সবাইকে ইতিহাসের বাস্তব সত্য স্বীকার করে নিতে হবে। আমরা আমাদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল খাদেম হোসাইন রাজার গ্রন্থকে কি অস্বীকার করতে পারি? সেখানে তিনি লিখেছেন ‘জেনারেল নিয়াজি আমাদের বললেন, বাঙালিদের নির্বংশ করে দাও।’
আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, পুরনো তিক্ততা নিরসনের লক্ষ্যে পাকিস্তানকে ১৯৭১ সালের সেনা অভিযানে বাড়াবাড়ির জন্য মা প্রার্থনা করা উচিত। এই মা প্রার্থনা দ্বারা পাকিস্তান দুর্বল হবে না বরং শক্তিশালী হবে। এ অঞ্চলের একটি বড় মুসলিম দেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে এবং আগামী দিনের ফাঁসি ও সাজার ধারাবাহিকতা বন্ধ হবে। আমাদের এটা বোঝা দরকার যে, শাহবাগে আন্দোলন কেন শুরু হয়েছিল এবং আন্দোলনকারীরা ফাঁসি ও সাজার দাবি কেন করছিল? নিউ জেনারেশনের ভুলবোঝাবুঝি ও বিদ্বেষের অবসান ঘটানোর জন্য প্রয়োজন আমাদের নিজের ভুল স্বীকার করা। নিজের মুসলমান ভাইয়ের কাছে মা প্রার্থনা করা তো কঠিন কোনো কাজ নয়।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত) পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ০৬ নভেম্বর, ২০১৪
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক
[দৈনিক নয়া দিগন্ত প্রকাশিত ১৬-১১-২০১৪ তারিখ]




