ড. মোহাম্মদ নূরুল আমিন
চার দলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে বুশ প্রশাসনের নিকট আওয়ামী লীগের তরফ থেকে একটি স্মারকলিপি পেশ করা হয়েছিল। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরানুযায়ী এই স্মারকলিপিতে এই দলটি তার প্রথাগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ তথা ইসলাম অনুসারীদের শক্তি বৃদ্ধিকে ‘সন্ত্রাসবাদের উত্থান’ হিসেবে চিহ্নিত করে তা দমনের জন্য মার্কিন হস্তক্ষেপ কামনা করেছিল এবং জোট সরকার থেকে জামায়াতে ইসলামীর দু’জন প্রতিনিধিকে বাদ দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে বুশ প্রশাসনের সহায়তা কামনা করেছিল। একটি স্বাধীন দেশের জন্য বিষয়টি শুধু লজ্জাকর নয় বরং অনেকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বৈদেশিক হস্তক্ষেপের এ ধরনের আমন্ত্রণকে তখন আওয়ামী লীগের ন্যায় একটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল অবস্থানের দায়িত্বহীন অপব্যবহার বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আওয়ামী লীগ তার স্মারকলিপিতে জামায়াতকে সন্ত্রাস এবং সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে চিত্রিত করার সকল প্রকার অপকৌশল প্রয়োগ করেছিল বলে জানা গেছে। হত্যার রাজনীতিতে সিদ্ধহস্ত কেউ যদি নিরপরাধ প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘাতক বলে গালি দেয় তখন হাসি আর কাশি সংবরণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে।
পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন খবর অনুযায়ী এমনি অনেক ঘটনা নজরে পড়ে। উল্লেখ্য গত ২০০২ ইং সালের ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষ্যে জামায়াত আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের কথিত একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে একটি উকিল নোটিশ দেয়া হয়েছিল। জনাব মুজাহিদ নাকি তার মন্তব্যে ‘বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে আওয়ামী লীগ জড়িত’ এ মর্মে তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। বলা বাহুল্য আওয়ামী লীগ ও এই দলের অঙ্গ সংগঠন এবং তাদের সমর্থক ও পোষ্য রাজনীতিক বুদ্ধিজীবীরা জামায়াত ও তার নেতাদের ঘাতক বলে গালি দিয়ে আসছিল। হঠাৎ করে হত্যার এই দায় জনাব মুজাহিদ তার কথিত বক্তব্যে আওয়ামী লীগের উপর ছুড়ে দেয়ায় সম্ভবত: বিব্রত বোধ করেই আওয়ামী লীগ এই উকিল নোটিশ দিয়েছিল। নোটিশের বক্তব্যও প্রণিধানযোগ্য। এতে বলা হয় যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের নেতৃত্বে আল বদর বাহিনীই নাকি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে।
যে কোন দেশের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা একটি জাতীয় সম্পদ। তারা জাতীয় আদর্শ, স্বাধীনতা, মূল্যবোধ এবং মর্যাদার রক্ষক ও প্রতীক। তাদের অবমাননা জাতির অবমাননা। তাদের হত্যা অমার্জনীয় অপরাধ। এই অপরাধে যারা অপরাধী বিনা বিচারে তাদের ছেড়ে দেয়া যায় না; যারা ছেড়ে দেয় তারাও সমান অপরাধী।
উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের গোধূলী লগ্নে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবি হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে। এই হত্যার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত না করেই বিজয়ের দিন থেকে ক্ষমতা গ্রহণকারী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও তাদের সুহৃদরা জামায়াত ও তার সমর্থক ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে এর জন্য দায়ী করে আসছিল। উল্লেখ্য যে ১৯৭০ সালে নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতই ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, বৃহত্তম দল। ঐ সময় আওয়ামী লীগের গণহত্যার প্রতিবাদ মিছিলে জামায়াতের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ প্রতিবাদী প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা এবং তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার হরণের সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয়। তার নেতা কর্মীদের গ্রেফতার করে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বেশ কিছু সংখ্যক নেতাকর্মীর জন্মগত নাগরিকত্বের অধিকার হরণ করে নেয়া হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে তাদের অভিযোগের সমর্থনে আওয়ামী লীগ কখনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোর্টে তারা মামলাও দায়ের করেনি। যে কয়টি মামলা হয়েছে প্রমাণের অভাবে সেগুলো খারিজ হয়ে গেছে এবং নাগরিকত্ব হরণের বিরুদ্ধে রুজু করা মামলা গুলোতে আওয়ামী লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু কথায় বলে যার এক কান কাটা সে রাস্তার এক ধার দিয়ে হাটে কিন্তু যার দু’কান কাটা সে মাঝখান দিয়ে হাটে। তাই কোর্টে পরাজয়ের পর এমনকি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের বিষোদগার বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত ভাবেই চলছে। আগে পরিস্কার না হলেও আস্তে আস্তে এটি দিনের আলোর ন্যায় পরিস্কার হয়ে গেছে যে বুদ্ধিজীবী হত্যা ইস্যুটিকে আওয়ামীলীগ পরিকল্পিতভাবেই কলঙ্কিত করেছে। একটি মানবিক ইস্যুকে শুরু থেকেই তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কাজে ব্যবহার করে এসেছে।
বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ যখন চুড়ান্ত পর্যায়ে। ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে এই দলের নেতাকর্মী এবং পোষ্য সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীরা গোয়েবলসীয় কায়দায় একটি মাত্র দলকে এর জন্য দায়ী করে একতরফাভাবে রেডিও টেলিভিশন পত্র পত্রিকাসহ সকল গণমাধ্যমে প্রচার প্রপাগান্ডা চালায়। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় ছিল। এসময় তারা বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে কোন তদন্তের ব্যবস্থা করেনি। করলেও জনগণের সামনে আনেনি। উপরন্তু তারা জহির রায়হান হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দিয়ে প্রমাণ করেছে যে বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে তারা বা তাদের এমন কোনও মুরুব্বী জড়িত ছিল যাকে বা যাদেরকে তারা দিনের আলোতে আনতে চায় না।
একুশ বছর পর আওয়ামীলীগ পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল। ঐ সময়ও তারা হত্যাকারীদের চিহ্নিতকরণ এবং তাদের শাস্তি প্রদানের কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। অবশ্য ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় যাবার জন্য জামায়াতের সমর্থন না পেয়ে ক্রুব্ধ হয়ে রেসকোর্স ময়দানে তাদের নির্দেশনায় তথাকথিত গণ আদালতের নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। এবং তারা জামায়াতের তৎকালীন আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ফাঁসির রায় ঘোষণা করে। তাদের এই চটুলতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হাস্যরসের উদ্রেক করে। পরবর্তীকালে ৫ বছর ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এই তথাকথিত রায় কার্যকর না করে তারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চরিত্র হরণ এবং তাদেরকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য আইনকে হাতে তুলে নেয়ার ব্যাপারে তারা কত সিদ্ধহস্ত। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত পাতানো নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে সেনাবাহিনী এ দেশের সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত আধা সামরিক বাহিনীর দেশপ্রেমিক চৌকস কর্মকর্তাদের হত্যা করে পৈশাচিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নিধনের কাজ শুরু করে এবং তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
আমি বুদ্ধিজীবী হত্যা বিচারের কথা বলছিলাম। এই হত্যার তদন্ত ও বিচারের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সামনে কোনও প্রতিবন্ধকতা ছিল ন্ াএর জন্য কোনও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ হত্যার তদন্ত ও বিচারের কোনও উদ্যোগ আওয়ামী লীগ সে সময় গ্রহণ করেনি। তাদের দু’দুবার ক্ষমতার মেয়াদের কোনও সময়েই নয়। ক্ষমতায় থাকাকালে এবং ক্ষমতার বাইরে তারা একটি দলকেই এজন্য অপবাদ দিয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। শেখ হাসিনা ও তার দলের পিতার অত্যাচারে অতিষ্ঠ মজলুম জাতিকে রক্ষা করার জন্য কিছু সংখ্যক সামরিক কর্মকর্তা এবং তারই দলের এক শ্রেণীর বিবেকবান নেতা কর্মীর উৎসাহে অনুষ্ঠিত সার্থক সামরিক বিপ্লবের প্রক্রিয়ায় ক্রসফায়ারে নিহত শেখ মুজিবর রহমানের মৃত্যুর জন্য দায়ী তাদের দৃষ্টিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের শাসনতান্ত্রিক বাধা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার বিচারের ব্যবস্থা করতে পারলো। কিন্তু বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচারের পথে শাসনতান্ত্রিক কোনও প্রতিবন্ধকতা না থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এ ক্ষেত্রে বিচারের ব্যবস্থা করতে পারলো না এই দায় কি জাতির না তাদের? বার বার আওয়ামী লীগ তাদের অপরাধ প্রতিপক্ষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের যে কৌশল অবলম্বন করেনি তা কিভাবে প্রমাণ করবে? অনেকে বলে আওয়ামী লীগ করলে বুদ্ধি বিবেক মাথা থেকে হাটুতে নেমে আসে এটা কি তার পরিচায়ক নয়?
মাওলানা নিজামী, কামারুজ্জামান ও মীর কাসিম আলীসহ জামায়াত নেতৃবৃন্দকে পাতানো বিচারে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেয়া তারই প্রমাণ। মানুষের আসল চরিত্র কখনো গোপন থাকে না। নিবন্ধের শুরুতে আমি আওয়ামী লীগকে হত্যার রাজনীতিতে সিদ্ধহস্ত বলেছিলাম। কোনও প্রকার আবেগ তাড়িত হয়ে এ কথা বলিনি। ১৯৫২-৫৩ সালে তারা আদমজীতে রায়ট লাগিয়ে মানুষ হত্যা করেছিল। তাদের এই অপকর্মের সূত্র ধরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ৯২ ক ধারা জারী হয়েছিল এবং মানুষের উপর দুর্যোগ নেমে এসেছিল। পাকিস্তান আমলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অনুষ্ঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অজুহাত তুলে এ অঞ্চলে যত দাঙ্গা প্রচেষ্টা হয়েছিল তাতে বেশীর ভাগ লাঠিয়াল বাহিনীর কাজ করেছিল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। দেশেত্যাগী সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি এ দেশের কোনও আলেম উলেমা বা ইসলামী আদর্শের অনুসারী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা দখলে নেয়নি, নিয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারী দল উপদলের ছোট বড় নেতাকর্মীরা। ১৯৫৮ সালে প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার শাহেদ আলীর রক্তে যার বা যাদের হাত রঞ্জিত তিনি/তারা আওয়ামী লীগেরই নেতা। এই হত্যাযজ্ঞকে পুঁজি করেই জেনারেল আইয়ুব খান সারা দেশে সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। পরবর্তীকালে ষাট-এর দশকে যত হত্যাযজ্ঞ হয়েছে দেশবাসী তার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করে। ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের সশস্ত্র সেনাদের সামনে দেশবাসীকে ঠেলে দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতে পালিয়েছিলেন। তারা সেখানে মুক্তিযুদ্ধ করেননি, তিন তারা/পাঁচতারা হোটেল সমূহে কি ধরনের বিলাসবহুল জীবন-যাপন করেছিলেন দেশবাসী সে সম্পর্কে অজ্ঞ নয়।
জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা ও দিকদর্শন না পেলে এবং দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সমর্থন, সহযোগিতা ও প্রটেকশন যদি না থাকত তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সময় আরো কত লক্ষ লোক মারা যেত একমাত্র দেশের ভুক্তভোগী মানুষই তা অনুমান করতে পারেন। এ সম্পর্কে কোন রকমের খোঁজ-খবর না নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য স্বাধীনতার প্রথম সূর্যোদয় থেকেই আওয়ামী লীগ উঠে পড়ে লেগে যায়। ১৬ ডিসেম্বর পরবর্তী তিন মাসে তারা সারা দেশে বিনা বিচারে লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করে তাদের সহায়-সম্পত্তি দখল করে। মা-বোনদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। তাদের লুটপাট ও অত্যাচার অবিচারের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক প্রতিরোধ গড়ে উঠে। এবং প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও আরো কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। এই বিরোধী কণ্ঠকে আওয়ামী লীগ সহ্য করতে পারেনি। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, লাল বাহিনী, মুজিব বাহিনী প্রভৃতির নামে অসংখ্য বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু এতেও যখন তাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ থামানো যায়নি তখন রক্ষী বাহিনী দিয়ে একদিকে হাজার হাজার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয়, অন্যদিকে সমস্ত রাজনৈতিক দল বেআইনি ঘোষণা করে শেখ হাসিনার পিতা ও তার সহেযাগী আওয়ামী লীগ নেতারা দেশে বাকশাল নামে একটি মাত্র দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্বৈরাচারী একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করেন।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরে অসংখ্য মানুষের হত্যার জন্য তারা দায়ী ছিলেন। যার অপরিহার্য পরিণাম হিসেবে স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান যখন নিহত হলেন তখন কাউকে ইন্নালিল্লাহ পড়তে কিংবা প্রকাশ্যে আফসোস করতে দেখা যায়নি। দেশের কথা দূরে থাকুক বিদেশের মাটিতেও আওয়ামী সমর্থকদের কেউ এর বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ মিছিল পর্যন্ত বের করেছে, তা শোনা যায়নি। হত্যা নির্যাতন যে দলের বৈশিষ্ট্য সে দল পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা করে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে দিলে কিংবা ব্রিটিশ টেলিভিশনের চ্যানেল ফোর-এর কতিপয় বিভ্রান্ত সাংবাদিককে পয়সা দিয়ে সিনেমা তৈরী করে প্রচার করলে মানুষ কি সহজে তা বিশ্বাস করবে?
আমি আগেই বলেছি বুদ্ধিজীবী হত্যার বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক। ১৯৭১ সালের নভেম্বর শেষার্ধে ও ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ঘটনাটি ঘটেছে। আওয়ামীলীগ রাজাকার আল-বদরদের এর জন্য দায়ী করে এবং তাদের ভাষায় এদের সবাই জামায়াতের লোক কিংবা জামায়াতের নেতৃত্বে গঠিত একটি ফোর্স ছিল। তাদের অজ্ঞতার জন্য দুঃখ হয়। তারা কখনো আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে কখনো চৌধুরী মঈন উদ্দিনকে আবার কখনো জামায়াতের অন্যান্য নেতাদের রাজাকার আল বদরের কমান্ডার হিসেবে অভিহিত করে। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাজাকার নামে বেসামরিক একটি বাহিনী গঠন করেছিল। একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এ ফোর্সটি গঠিত হয়েছিল থানার মাধ্যমে। বিজ্ঞাপন দিয়ে মাসিক ৯৩ টাকা বেতনে এদের রিক্রুটমেন্ট করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং আর্মিতে যারা এদের নিয়োগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন, ছোট কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বড় কর্মকর্তা এদের কেউই জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আর্মি অপারেশনে যে সমস্ত জেনারেল জড়িত ছিলেন অবসর গ্রহণের পর যারা রাজনীতিতে এসেছেন তাদের মধ্যে কেউই জামায়াতে যোগ দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া যায়নি। বরং তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের সুহৃদ পিপলস পার্টিতে যোগ দেয়ার তথ্য রয়েছে। পিপলস পার্টি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি দল ছিল। আদর্শগত কারণে জামায়াত বা তার সমর্থনপুষ্ট ছাত্র সংগঠনের সেবা তারা গ্রহণ করবে এটা বোকাও বিশ্বাস করার কথা নয়। আবার জামায়াত নেতৃবর্গ কিংবা তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতাকর্মীরা ৯৩.০০ টাকা বেতন নেয়ার জন্য রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন এটা বাস্তবতা বিবর্জিত।
১৯৭০-৭১ সালে সাংবাদিকতায় জামায়াতের অবস্থান ছিল অত্যন্ত দুর্বল। দৈনিক সংগ্রাম সবেমাত্র বের হয়েছে। রাজধানীর দৈনিকগুলোতে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে জামায়াত সমর্থক বা সরাসরি তার সাথে জড়িত সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। অবজারভারে ১জন, পূর্বদেশে ২ জন, আজাদে ২/৩ জন মাত্র। বুদ্ধিজীবীর সংখ্যাও তথৈবচ। এই সংখ্যালঘু শক্তি নিয়ে তারা কারোর উপর অত্যাচার করতে পারে না এবং অত্যাচারে কেউ বিশ্বাসীও ছিলেন না। সাংবাদিকতাসহ বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে তখন চরম এলার্জির অবস্থা বিরাজমান ছিল। এবং এ ক্ষেত্রে এই আদর্শের কেউ এগিয়ে যাক অনেকেরই কাম্য ছিল না। বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে আওয়ামী লীগ যাদের জড়িয়েছে তারা এই এলার্জি তাড়িত জিঘাংসার শিকার। প্রসঙ্গক্রমে চৌধুরী মইনুদ্দিনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তার সাথে আমি কাজ করেছি। এবং ঐ সময়েই দৈনিক পূর্বদেশের রিপোর্টিং শাখায় কর্মরত অনেকের সাথেই আমার কথা হয়েছে। মইনুদ্দিন প্রতিহিংসা-পরায়ণ বা খারাপ লোক ছিলেন একথা কেউ বলেন নি। বরং প্রত্যেকেই স্বীকার করেছেন যে তিনি প্রতিশ্রুতিশীল একজন সাংবাদিক ছিলেন। ১৯৭০ সালে ঘূর্ণীঝড় উত্তরকালে তার তৈরী রিপোর্টসমূহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। অল ইন্ডিয়া রেডিওর দেব দুলাল বন্দোপাধ্যায় এবং ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদদাতারা নিয়মিত তাকে উদ্ধৃতি দিতেন। এতে অনেক সহযোগিরই গাত্রদাহের সৃষ্টি হয়েছিল।
পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা এবং নিজেদের কলংকিত অতীতকে আড়াল করে ভবিষ্যতকে নিষ্কন্টক করার জন্য স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ও তার পোষ্য তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা, তথ্য সন্ত্রাসকে পুঁজি করে যাকে যা ইচ্ছা তাই বানিয়েছে। তখনকার পরিবেশে প্রতিবাদ করার অবস্থা যেমনি ছিলনা, প্লাটফরমও ছিল না। শুধু ‘জয় বাংলা’ না বলার অপরাধে হাজার হাজার নিরপরাধ লোককে তারা ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করেছিল। ১৯৭২ সাল জুন মাসের মধ্যে সারা দেশে চিহ্নিত ১৫৯টি গণকবর ও বধ্যভূমির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ছিল স্বাধীনতার অব্যবহিত পর মুজিব বাহিনীর গণহত্যার শিকার হতভাগ্য নিরপরাধ দাড়ি টুপিওয়ালা মানুষের। এই সময়ে রাজাকার আল বদর বাহিনীতে যোগদানের সন্দেহে ও পাকিস্তানী বাহিনীর দালালীর অভিযোগে লক্ষ লক্ষ লোককে পাইকারী গ্রেফতার করে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রত্যেক থানায় সার্কেল অফিসারদের আহ্বায়ক করে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছিল। শতকরা ৯৮টি ক্ষেত্রে এই কমিটির রিপোর্টগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখনো মওজুদ থাকার কথা। এগুলো খুঁজে বের করে পর্যালোচনা করলে নিরপরাধ লোকদের উপর আওয়ামী লীগের অত্যাচারের মাত্রার অনুদঘাটিত একটি দিগন্ত খুলে যেতে পারে। হাজার হাজার আলেম ওলামা, শিক্ষক, ছাত্র, পীর-মাশায়েখ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী তাদের হাতে নিগৃহিত হয়েছেন। তাদের অপরাধ তারা জয় বাংলার অনুসারী ছিলেন না। এই অপরাধে তারা হয়েছেন রাজাকার আলবদর।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চের কালো রাত্রির পূর্বে তারা সারা প্রদেশে অবাঙ্গালীদের উপর গণ্যহত্যা চালিয়েছে; অবাঙ্গালী মহিলারা তাদের গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল। আর্মি ক্র্যাকডাউনের পর সেনাবাহিনীর ছত্র ছায়ায় এই অবাঙ্গালীরাই অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে অনেক নিরপরাধ বাঙ্গালীকে হত্যা করেছে। লুটপাট ও ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটিয়েছে। জামায়াত নেতা-কর্মীরা তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জামায়াতের এমএনএ প্রার্থী অধ্যাপক রফিক উদ্দিন আহমদকে এই অবাঙ্গালীরাই মিরপুরে টুকরা টুকরা করে হত্যা করেছে। বলাবাহুল্য এই অবাঙ্গালীরা কখনো জামায়াতের ভোট ব্যাংক ছিল না। তারা আওয়ামী লীগকেই ভোট দিত। মীরপুর মোহাম্মদপুরের অবাঙ্গালী অধ্যুষিত এলাকা থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা আওয়ামী লীগেরই প্রার্থী ছিল। শহীদ বুদ্ধিজীবীরা আওয়ামী লীগের প্রতিশোধ স্পৃহার শিকার ছিল; জামায়াত বা তার সমর্থকদের টার্গেট ছিল না। বিচারের প্রক্রিয়া বা নিরপেক্ষ তদন্তে জামায়াতের অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে শুরু থেকেই একটি দল ও তার সমর্থকদের পাইকারী অপবাদ প্রদান ও আওয়ামী লীগের রাখ-ঢাক নীতির অনুসরণ অনেক সন্দেহের জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পর পর আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের ব্যবস্থা করতে পারতো। ঐ সময়ে তাদের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে তারা তা করেনি। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেও বিচার বিভাগীয় তদন্তের তারা ধারে কাছেও গেলেন না; বাংলাদেশের কারোর উপর তারা আস্থা রাখতে পারলেন না, বৃটিশ টেলিভিশনের ‘চ্যানেল ফোর; ( যে চ্যানেলটি অশ্লীলতা এবং নোংরা সাংবাদিকতার জন্য ইতোমধ্যে কুখ্যাতি অর্জন করেছে) এর কিছু নায়ক-নায়িকাকে দিয়ে চৌধুরী মঈনুদ্দিন এবং মাওলানা আবু সায়ীদকে ইনভলব করে একটি মুভি তৈরী করে টিভিতে মানুষকে দেখালেন। মানুষ তা বিশ্বাস করেনি। অনেকেই বলেছে এতই প্রমাণ যদি থাকে চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়ে দেশে এনে তার বিচার করা হচ্ছে না কেন? আওয়ামীলীগ ওদিকে যেতে পারে না। এর তিনটি কারণ। এক. তাদের হাতে সন্দেহাতীত কোনও প্রমাণও নেই। দুই. এতে আওয়ামী লীগের অনেক কীর্তি বেরিয়ে যাবে যে সম্পর্কে মুঈনউদ্দিন সহ অনেকে অবহিত আছেন। তিন. অপরাধ যদি প্রমাণিত না হয় তাহলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মোক্ষম অস্ত্রটি হাত ছাড়া হয়ে যাবে। ফলে তাদের হাতে আরতো কোনও পুঁজিই রইলো না।
১৯৭১ সালের ২৮ শে জুন জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। এই ভাষণে তিনি আওয়ামী লীগকে বেআইনী ঘোষণা করেন। তিনি এও ঘোষণা করেন যে, আওয়ামী লীগ বেআইনি হওয়া সত্ত্বেও তার টিকেটে নির্বাচিত এমএনএ/এমপিএদের সদস্যপদ বহাল থাকবে যদি তারা ফৌজদারী অপরাধের সাথে জড়িত না থাকেন। এর পরই অনেক মজার ঘটনা ঘটে। আজকে যারা শেখ মুজিবর রহমান ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন বলে উচ্চকণ্ঠ তাদের অনেকেই লাইন ধরে আর্মীর কাছ থেকে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে পাকিস্তানের খেদমতগার হবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। তাদের এই তদবির সম্পর্কে নিহত বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই জানতেন। এ ব্যাপারে ১৯৭১ সালের ৭ই আগস্ট পাকিস্তানের তথ্য সচিব জেনারেল রোয়েদাদ খান কর্তৃক রাওয়ালপিন্ডিতে আহুত সাংবাদিক সম্মেলনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এ সম্মেলনে অন্যান্যদের সাথে ইত্তেফাক থেকে ব্যারিষ্টার মঈনুল হোসেন, অবজারভার থেকে নজরুল ইসলাম, মর্নিং নিউজ থেকে বদরুদ্দীন, আজাদ থেকে শাহাদৎ হোসেন, সংগ্রাম থেকে অধ্যাপক আখতার ফারুক, দৈনিক পূর্বদেশ থেকে এই নিবন্ধকার স্বয়ং এবং চট্টগ্রামের আজাদী থেকে আব্দুল মালেক অংশ গ্রহণ করেছিলেন। এই সম্মেলনে পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগে টিকিটে নির্বাচিত ৮৮ জন এমএনএকে ক্লিয়ার করে তাদের সদস্যপদ বহাল থাকার ঘোষণা দেন। ক্লিায়ারেন্স প্রাপ্ত এই ৮৮ জন নেতার মধ্যে মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিশ, সালাহউদ্দিন ইউসুফ, বেগম সাজেদা চৌধুরী, সৈয়দ কামাল বখত, একে ফয়জুল হক, ব্যারিস্টার শওকত আলী খান, হাতেম আলী তালুকদার, সৈয়দ আব্দুস সুলতান, আসাদুজ্জামান খান, আশ্রাফ আলী চৌধুরী, আব্দুল মালেক উকিল, চট্টগ্রামের মোহাম্মদ খালেদ এবং ফজলুল হক বিএসসিও ছিলেন। এখানে একটি রহস্য এখনো অনুদঘাটিত রয়ে গেছে। ২৬শে মার্চ যদি শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই থাকেন তাহলে তার দলকে বেআইনী ঘোষণার জন্য পাকিস্তানীরা তিনমাস সময় নিল কেন? আবার এর ৪০দিন পর এই দলের ৮৮ জন এমএনএ প্রকাশ্য রাজনীতির ক্লিায়ারেন্স পান কি করে? মুক্তিযুদ্ধের নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনার জন্য এ দু’টি প্রশ্নের জবাব পাওয়া খুবই জরুরী।
আমার মূল আলোচ্য বিষয় ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা। আগেই আমি বলেছি এই মানবিক বিষয়টিকে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এর গভীরে গিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের খুজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা না করে বন্য দোষারোপের মাধ্যমে জাতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে বিভ্রান্ত করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ও আচরণে তারা কখনো অকৃত্রিম ও আন্তরিক ছিল না। এই দলের প্রথম সাড়ে তিন বছর ও দ্বিতীয় পাঁচ বছরের শাসনামলে তারা নিহত বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করতে পারেনি। ১৯৭২ সালে তথ্য মন্ত্রণালয়ে এক প্রকাশনায় ২২ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ৫৯ জন কলেজ শিক্ষক, ২৭০ জন মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক, ৬৩৯ জন্য প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, ১৩ জন সাংবাদিক, ৫০ জন ডাক্তার এবং অন্যান্য পেশার ১৭ জন মিলিয়ে ১০৭০ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এই তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমী পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে তাদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংগ্রহের চেষ্টা করে কিন্তু তা কখনো পাওয়া যায়নি। ঐ বছরই ১৪জন বুদ্ধিজীবীর স্মৃতির একটি প্রদর্শনী হয়। ১৯৮৫ সালে একাডেমীর তরফ থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিকোষ নামক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় এবং এতে ২৫০ জনের অনেকেরই আবাসিক ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর তারা ১০ খন্ডে স্মৃতি গ্রন্থ প্রকাশ করেন যাতে ২৩৮ জনের স্মৃতি ও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় স্থান পায়। এই ২৩৮ জনের বাইরে একাডেমী আর কোনও তালিকা সংগ্রহ বা প্রকাশ করতে পারেনি। অনেকে আশা করেছিল দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ এই অসম্পূর্ণ কাজটি সম্পূর্ণ করবে। কিন্তু নোংরা রাজনীতি যেখানে প্রাধান্য পায় বিচার বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তির সেখানে স্থান কোথায়?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঘাতকরা বুদ্ধিজীবীদের হত্যার জন্য ডিসেম্বর মাসটিকে বেছে নিল কেন? ঘাতকরা কি সবাই রাজাকার-আলবদর? রাজাকারে কি আওয়ামী লীগের বা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী বা সমর্থক ছিল না? সেপ্টেম্বর, অক্টোবর মাসে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় রাজাকার রিক্রুটমেন্টে আওয়ামী প্রাধান্যের উপর দু’টি সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল এবং নিবন্ধগুলোতে রাজাকারদের আচরণের কড়া সমালোচনা করা হয়েছিল। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতির উপর প্রকাশিত শ্বেতপত্রে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সমূহের মধ্যে অন্যতম অভিযোগ ছিল ‘এই দলটি সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য, ইপিআর এবং সশস্ত্র রাজাকারদের ব্যবহার করে, বিদ্রোহাত্মক কর্মকান্ডে লিপ্ত রয়েছে। এই রাজাকাররা কারা?
ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারত যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো তখন পাকিস্তানীদের পতন নিশ্চিত হয়ে গেল। এই সময়ে বাছাই করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পেছনে উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দীদের ঘায়েল করার কুট কৌশল কি কাজ করেনি? আওয়ামী লীগের আচরণ থেকে একথাই প্রমাণিত হয়। তারা আগেও মানুষ হত্যা করেছে, পরেও করেছে, মাঝখানেও হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল। জামায়াত কখনো ছিলনা, এখনো নেই। এই অবস্থায় আমার স্থির বিশ্বাস যে বর্তমান ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে গঠিত নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে পারে।




