চার তলায় সিঁড়িতে উঠে সুজন এবং তৃতীয় জনের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করছিলাম। কোন বাসার কলিং বেলে চাপ দিব, নেম প্লেটের নাম তো মিলছেনা। চার ফ্লাটের চার দরজার দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম, যে কোন একটি দরজা খোলা হচ্ছে। দরজা খুলতেই চোখে পড়ল বহুল কাংখিত ব্যক্তি। যদিও কখনো মুখোমুখি দেখা হয়নি, তবে বোধ হয় কোন বই অথবা আর্টিকেলে ছবি দেখেছিলাম। চিনতে অসুবিধা হলোনা এতটুকু।
সালাম বিনিময়। স্যার, আবু সুলাইমান। জ্বি জ্বি আসুন। স্যার, আমার সাথে ছোট ভাই সুজন, সে পলিটিক্যাল সাইন্স ডিপার্টমেন্টে মাস্টার্স পরীক্ষা দিল। আর, ও, স্যার উনি আমার ওয়াইফ। এক সাথে এসেছিলাম পরীক্ষা দিতে, পপুলেশন সাইন্স এর ডিপ্লোমার ফাইনাল এক্সাম। ও আচ্ছা। আসুন আসুন।
বছর খানেক আগে থেকেই The Vision and Impact of Fetullah Gulen: A New Paradigm for Social Activism বই এর লেখক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ড মাইমুল আহসান খান স্যারের সাথে পরিচয়। তবে নানাবিধ কারণে এই পরিচয় মেইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ধন্যবাদ জয়নাল, তোহা সেলিম, মিজান এবং এনামুল হক হুমাইদ কে। গুলেনের চিন্তা ও দর্শনের উপর লিখা বইটি তারাই স্যারের নিকট থেকে সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। আর এ বইটির সন্ধান দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক প্রিয় স্যার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক।
প্রফেসর ড মাইমুল আহসান খান লিখিত The Vision and Impact of Fetullah Gulen: A New Paradigm for Social Activism বইটি পড়ার পর কোন মতেই আমার বিশ্বাস হচ্ছিলনা, লেখক বাংলাদেশের কোন ব্যক্তি এবং ঢাবির এক্স স্টুডেন্ট কাম বর্তমান টিচার। ইসলাম বিষয়ক দেশি-বিদেশি বিভিন্ন লেখকদের বই পড়ার কারণে দেখেছিলাম- দেশের বাইরের লেখকদের সাথে বাংলাদেশি লেখকদের রয়েছে একটি ভিশনগত পার্থক্য। গুণগত পার্থক্য। ভেবেছিলাম, শিক্ষা দীক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থেকে কোন জাতির পক্ষে সার্বজনীন কিংবা বৈশ্বিক চিন্তা করা সম্ভব নয়। আমার আরো একটি ধারণা হয়েছিল, পশ্চিম থেকেই যেহেতু সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিস্কার হচ্ছে, ইসলাম বিষয়ক জ্ঞানের আকরও হয়তো পশ্চিমে অবস্থারত কোন স্কলারদের নিকট হতে বেরিয়ে আসবে (প্রকৃত সত্য যাই হোক না কেন)।
গুলেনকে ব্যক্তিকভাবে কিংবা গুলেন-ইন্সপায়ার্ড আন্দোলনকে নিকট থেকে জানার সূযোগ আমার হয়নি। যতটুকু জানা তার আর্টিকেলের ইংরেজী অনুবাদ, কিংবা তাকে নিয়ে লিখা অন্যদের আর্টিকেল পড়ে। (প্রকৃত সত্য যদিও আল্লাহই জানেন) প্রফেসর ড মাইমুল আহসান খান লিখিত The Vision and Impact of Fetullah Gulen: A New Paradigm for Social Activism বইটি গুলেনের চিন্তাকে জানার জন্য অনবদ্য এক বই। বই হিসাবে, কিংবা কোন ব্যক্তির চিন্তাকে তুলে ধরার প্রয়াস হিসাবে এটি অসাধারণ। বেশ কম্প্রিহেন্সিভ । এই বই পড়ার পরই লেখকের অন্যান্য বই পড়ার ইচ্ছা আমার হয়েছিল।
আর সে ইচ্ছার বাস্তব রুপ দিতেই হাজির হয়েছিলাম সেদিন স্যারের সাউথ ফুলার রোডের বাসায়। একাকী দেশে অবস্থান করছেন। পুরো পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে। এ্যাকাডেমিক কাজে অ্যামেরিকা যাওয়া দরকার- কিন্তু ফেরত আসার ভিসা পাবেন কিনা- এমন সন্দেহের আশংকায় আর বাইরে যাওয়া হচ্ছেনা, জানালেন কথার মাঝে।
বেশ কিছু দিন থেকেই স্যারের উপর একটু রাগ করছিলাম, ঢাকায় বসে বসে শুধু অলস সময় কাটান এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে টাকা কামান। নূতন লোক তৈরীর কোন খোঁজ-খবর নেই। ভাবছিলাম, এবার দেখা হলে একটুখান বকে দিব।
তবে বকা না দিয়েই সেদিন বিদায় নিতে হল। আমি আর কি বলব, যখন তিনি কথাই শুরু করলেন এভাবে- “হতাশ হবার কিছুই নেই। আমরা শুধু আমাদের পুরো সামর্থ দিয়ে কাজ করে যেতে পারি, বাকিটুকু দায়িত্ব আল্লাহর।… … … আমরা তো আর সবটুকু দেখে যেতে পারবনা, আমরা কিছু কাজ করে যাই, আমাদের কাজের পর থেকে অন্যরা এসে কাজ শুরু করবে।”
অন্যান্য অনেক কথার মাঝে The Vision and Impact of Fetullah Gulen: A New Paradigm for Social Activism বইটির বাংলা অনুবাদ করা প্রসঙ্গে বললেন- আমার সিদ্ধান্ত- আমি আমার লিখিত কোন ইংরেজী বই এর বাংলা অনুবাদ আমি নিজে করবনা।… … … আমি যতটুকু পেরেছি, করেছি। বাকিটুকু আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিলাম। অন্য কেউ এগিয়ে এসে করতে চাইলে করবে। আমি অন্য কাজ করতে চাই, যে কাজে আজ কিংবা আগামীতে জাতির খেদমত হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি জানালেন- চরম পিঠব্যাথা নিয়েও তিনি সম্প্রতি মার্কিন অধ্যাপক লরেঞ্জ জিরিং এর Bangladesh: From Mujib to Ershad: An Interpretive Study বইটি “বাংলাদেশ- মুজিব থেকে এরশাদঃ একটি বিশ্লেষণধর্মী ইতিহাস” শিরোনামে অনুবাদ করেছেন। বইটি প্রকাশিতও হয়েছে।
কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, আমার খুব ইচ্ছা হয় – আমার দুটি ইংরেজী বই এর বাংলা অনুবাদ যদি কেউ প্রকাশ করতো। একটি- The Vision and Impact of Fetullah Gulen: A New Paradigm for Social Activism এবং অন্যটি Human Rights in the Muslim World- Fundamentalism, Constitutionalism and International Politics ।
জীবনে অনেকবার অনেক মানুষের ভাল গুণের দিকে শুধু ঈর্ষাকাতর হতে চেয়ে থাকতে হয়েছে। এখানে আরেকবার ঈর্ষাকাতর হতে হলো। আর ঈর্ষার ব্যক্তিটি হলেন- কামারুজ্জামান বাবলু ভাই। তিনি গত কয়েকমাস ধরে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা কতশত ব্যস্ততার মাঝে স্যারের বাসায় হাজির হয়ে “বাংলাদেশ- মুজিব থেকে এরশাদঃ একটি বিশ্লেষণধর্মী ইতিহাস” বইটির কম্পোজের কাজ করতেন। স্যার মূল বই দেখে বাংলা বলতেন, আর বাবলু ভাই কম্পিউটারে সরাসরি টাইপ করতেন।
স্যারের সাক্ষাতে যে জিনিসটি সবচেয়ে ভালভাবে উপলব্ধ হলো- সচেতন কোন ব্যক্তিই আসলে সময় নষ্ট করেন না, বরং প্রত্যকেই আপন আপন উপায়ে সময়ের সদ্ব্যবহার করেন। স্যারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। তার লক্ষণ হলো সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর কয়েকটি বই। যেমন- Islamic Financing and Banking: From Traditional Views to Arab Spring; বাংলাদেশ- মুজিব থেকে এরশাদঃ একটি বিশ্লেষণধর্মী ইতিহাস; Introductin to Legal Theroies: Basic Jurisprudential Studies (BIIT); বাংলার হেমন্তে আরব বসন্ত (উত্তরণ প্রকাশনী ২০১৪); এবং রাষ্ট্রনীতি-রাজনীতি, আইন ও মানবাধিকার। এছাড়া রয়েছে স্যারের উদ্যোগে ও সম্পাদনায় প্রকাশিত ম্যাগাজিন- Bangladesh Worldview. এছাড়া তিনি বিদেশের বেশ কিছু পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক এবং কোন কোন পত্রিকার সম্পাদক হিসাব কাজ করেন।
কথার মাঝে প্রশ্ন ছিল- কেন এবং কিভাবে তিনি পেয়েছিলেন The Vision and Impact of Fetullah Gulen: A New Paradigm for Social Activism বইটি লিখার চিন্তা। উত্তরটি ছিল- তিনি যখন এ্যামেরিকায় ছিলেন তখন এ্যাকাডেমিক কাজের কারণেই তার পরিচয় ঘটে গুলেনিক চিন্তা এবং গুলেনবাদী আন্দোলনের সাথে। এর পর শুরু হয় এ্যামেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ক সভা-সেমিনার-আলচনায় অংশগ্রহণ। পরে তাঁর মনে হলো- যে সকল তার্কিশ এ্যামেরিকানরা তাঁকে গুলেন এবং গুলেনিক চিন্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন- তাদের অনেকেই গুলেন এবং গুলেনের চিন্তা ভালভাবে বুঝতে পারেননি। তাদেরকে অর্থাৎ তার্কিশ এ্যামেরিকানদের গুলেন এবং গুলেনিক চিন্তার সাথে সঠিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যই আমি লিখেছিলাম এই বইটি। বাংলাদেশের জন্য আমি এ বই লিখিনি। আপনাদের পড়া আমার জন্য বোনাস পাওয়া। আলহামদুলিল্লাহ।
বই প্রকাশ সম্পর্কে আরেকটি কথা না বললেই নয়। বই প্রকাশের বিড়ম্বনা সম্পর্কে তিনি বললেন, Islamic Financing and Banking: From Traditional Views to Arab Spring বইটি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি প্রচুর বাধার সম্মুখিন হয়েছেন দেশের মূলধারার ইসলামপন্থীদের নিকট থেকে। একমাত্র শাহ আব্দুল হান্নান ব্যতিরেকে আর কেউই তাকে এ বইটি প্রকাশ করার পক্ষে মত দেননি। শাহ আব্দুল হান্নান সাহেবই শুধু বলেছিলেন, বইটি প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন। এই বিশ্লেষণটি যেন হারিয়ে না যায়। অন্যদের ধারণা ছিল, এটি প্রকাশিত হলে দেশের প্রচলিত ধারার ইসলামি ব্যাংকগুলোর অনেক ক্ষতি হবে। অবশেষে উপায় না পেয়ে তিনি মালয়েশিয়ার Lincoln University College হতে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন।
জিআরই-খ্যাত আরিফ ভাইকে ধন্যবাদ দিতে চেয়েছিলাম একটু বেশি, পারলামনা শেষ পর্যন্ত। কারণ আমার হাতে The Vision and Impact of Fetullah Gulen: A New Paradigm for Social Activism বইটি দেখে এবং আমার মুখে বইটির প্রশংসা শুনেই তার দাবী- বইটির ০৫টি কপি তাকে যেভাবেই হোক ম্যনেজ করে দিতে হবে। সে বই সংগ্রহ করতে গিয়ে এবং পুরানো ইচ্ছার বাস্তবায়নেই স্যারের সাথে সেদিনের সাক্ষাত এবং সাক্ষাত শেষে মাসিক বেতনের অর্ধেকটা শেষ করে ব্যাগভর্তি বই নিয়ে স্যারের নিকট হতে সেদিন (০৬ ডিসেম্বর ২০১৪) বিদায় নেয়া।
স্যার বেঁচে থাকুন দীর্ঘদিন- তাঁর কর্মচাঞ্চল্যসহ । এটিই সর্বতো কামনা।
……………………………………………………





