ব্যক্তিগত গুণাবলী:
(ক)ইসলামের যথার্থ জ্ঞান:
১.যা প্রতিষ্ঠা করতে হবে- তা ভালোভাবে বুঝতে হবে।
২.ইসলামের বিশ্বাসকে জাহেলী চিন্তা (বা মূর্খতা) থেকে আলাদা করে জানতে হবে ।
৩.জীবনের বিভিন্ন বিভাগে ইসলাম মানুষকে কি পথ দেখিয়েছে তা জানতে হবে।
৪.বিস্তারিত জ্ঞান ছাড়া মানুষ নিজেকে এবং অন্যকে পথ দেখাতে পারে না।
৫.বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে হবে এবং শিক্ষিত লোকদের সকল সন্দেহ নিরসন করতে হবে।
৬.বিরুদ্ধবাদীদের প্রশ্নের যুক্তিপূর্ণ ও সন্তোষজনক জবাব দিতে হবে।
৭.ইসলামের চিরন্তন ভিত্তির ওপর নতুন সভ্যতা গড়তে হবে।
৮.আধুনিকতার ত্রুটিপূর্ণ অংশকে ত্রুটিহীন অংশ থেকে আলাদা করার যোগ্যতা থাকতে হবে।
(খ)ইসলামের প্রতি অবিচল বিশ্বাস:
১.জীবনব্যবস্থার সত্যতা ও নির্ভুলতা সম্পর্কে নি:সংশয় হতে হবে। দোদুল্যমান অবস্থায় থাকা যাবে না।
২.সন্দেহহীনভাবে আল্লাহকে তাঁর গুণাবলী, ক্ষমতা ও অধিকারসহ মানতে হবে এবং আখিরাতে সঠিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে।
৩.বিশ্বাস করতে হবে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রদর্শিত পথই একমাত্র সত্য পথ এবং তাঁর বিরোধী প্রত্যেকটি পথই ভ্রান্ত।
৪.সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের একটি মাত্র মানদণ্ড মানতে হবে এবং তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত (পথ)। এ মানদণ্ডে যে উতরে যাবে সে সত্য ও অভ্রান্ত আর যে উতরে যাবে না সে বাতিল ও ভ্রান্ত।
(গ)চরিত্র ও কর্ম:
১.ভালো কথা অনুযায়ী ভালো কাজ থাকতে হবে।
২.যে ইসলামের দিকে বিশ্বাসীকে আহবান জানানো হয় সর্বপ্রথম নিজে তার আনুগত্য করতে হবে।
৩.বাইরের প্রভাব ও চাপের মুখাপক্ষেী না হয়ে স্বত:স্ফূর্তভাবে আল্লাহর সন্তোষ অর্জনে কাজ করতে হবে।
৪.অস্বাভাবিক বিকৃত পরিবেশে সকল প্রকার ভয়-ভীতি ও লোভ-লালসার মোকাবেলা করে সত্য পথে অবিচল থাকতে হবে।
৫.অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় থেকে ইসলামের প্রতি ভক্তিসম্পন্ন কোটি কোটি সাহায্যকারীও জাহেলিয়াত দমনে ব্যর্থ হবে।
(ঘ)দ্বীন হচ্ছে জীবনোদ্দেশ্য:
১.দ্বীনের প্রতিষ্ঠা নিছক আকাঙ্খা হলে চলবে না বরং তা হতে হবে জীবনোদ্দেশ্যে।
২.জাহেলী ও ভ্রান্ত জীবনব্যবস্থা সরিয়ে ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে নিছক সৎলোকেরা কোনো কাজে আসে না বরং সেখানে এমন সব সৎ লোকের প্রয়োজন যাদের কাছে দ্বীনের বিজয়ের কাজই জীবনোদ্দেশ্যরুপে বিবেচিত হয়।
৩.দুনিয়ার অন্যান্য কাজ অবশ্যই করা হবে কিন্তু জীবন একমাত্র দ্বীনের উদ্দেশ্যের চারিদিকে আবর্তন করতে হবে।
৪.দ্বীনের উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্যে নিজেদের সময়, সামর্থ, সম্পদ, দেহ ও প্রাণের সকল শক্তি এবং মন-মস্তিষ্কের পরিপূর্ণ যোগ্যতা ব্যয় করতে হবে। এমনকি যদি জীবন উৎসর্গ করার প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে তাতে পিছপা হওয়া যাবে না।
দলীয় গুণাবলী
(ক)ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা
১.দলের অর্ন্তভূক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে পরস্পরের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।
২.অন্তরগুলো পরস্পরের সাথে একসূত্রে গ্রথিত থাকতে হবে। দিলগুলোকে একসূত্রে গ্রথিত করতে পারে আন্তরিক ভালোবাসা, পারস্পারিক কল্যাণাকাঙ্খা, সহানুভূতি ও পরস্পরের জন্য ত্যাগ স্বীকার।
৩.ঘৃণা, মুনাফিকী, স্বার্থবাদিতা, শুষ্ক-নিরস ব্যবসায়িক সম্পর্ক, পার্থিব স্বার্থ ইত্যাদি কখনো প্রকৃত ভাতৃত্ব ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে না।
৪.যথাযথ সৌহার্দ ও সহযোগিতাই পারে একটি মজবুত দলের সৃষ্টি করতে।
(খ)পারস্পারিক পরামর্শ
১.পারস্পারিক পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।
২.প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের ইচ্ছামতো চললে সেটা দল হয়না বরং হয় জনমন্ডলী।
৩.যে দলের এক ব্যক্তি বা কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তির একটি গ্রুপ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসে এবং বাদ বাকি সবাই তার ইঙ্গিতে পরিচালিত হয় এ জাতীয় দল বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না।
৪.পরামর্শের উপকার: এক:দল মানসিকভাবে নিশ্চিন্ত থাকে এবং কোনো বস্তু চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে কেউ মনে করে না। দুই:ব্যক্তিগণ কাজে আগ্রহ পোষণ করে এবং গৃহীত সিদ্ধান্তকে নিজের মনে করে।
৬.পরামর্শের নিয়মনীতি: এক:প্রত্যেক ব্যক্তি ঈমানদারীর সাথে নিজের মত পেশ করবে এবং মনে মধ্যে কোনো কথা লুকিয়ে রাখবে না। দুই:আলোচনায় কোনো প্রকার জিদ, হঠধর্মিতা ও বিদ্বেষের আশ্রয় নেবে না। তিন:সংখ্যাধিক্যের মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে যাওয়ার পর ভিন্ন মতের অধিকারীরা নিজেদের মত পরিবর্তন না করলেও দলীয় সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করার জন্যে সানন্দে অগ্রসর হবে। এ তিনটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য না রাখলে এটিই পরিশেষে দলের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে।
(গ)সংগঠন ও শৃঙ্খলা
১.সংগঠন, শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, পারস্পারিক সহযোগিতা সহকারে একটি টিমের মতো (টিমস্পিরিটসহ) কাজ করতে হবে।
২.ধ্বংসমূলক কাজ হৈ-হাঙ্গামার সাহায্যেও সমাধা হতে পারে। কিন্তু গঠনমূলক কাজ সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া হয় না।
৩.দলের মধ্যে যে ব্যক্তিকে কর্তৃত্বশীল করা হয় তার নির্দেশাবলী মেনে চলতে হবে।
৪.প্রত্যেক ব্যক্তিকে অর্পিত দায়িত্ব যথাসময়ে নিষ্ঠার সাথে সম্পাদন করতে চেষ্টা করতে হবে।
৫.দায়িত্বপ্রাপ্তদের পরস্পরের মধ্যে পূর্ণ সহযোগিতা থাকতে হবে।
(ঘ)সংস্কারের উদ্দেশ্যে সমালোচনা
১.দলের মধ্যে সংস্কারের উদ্দেশ্যে সমালোচনা করার যোগ্যতা থাকতে হবে।
২.অন্ধ অনুসারী ও সরলমনা ভক্তবৃন্দ যতোই সঠিক স্থান থেকে কাজ শুরু করুক না কেনো এবং যতই নির্ভুল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সামনে রেখে অগ্রসর হোক না কেনো, অবশেষে তারা সমগ্র কাজ বিকৃত করে যেতে থাকে।
৩.মানবিক কাজে দুর্বলতার প্রকাশ স্বাভাবিক। কিন্তু যেখানে দুর্বলতার প্রতি নজর রাখার কেউ থাকে না অর্থাৎ তা চিহ্নিত করা দোষরূপে বিবেচিত হয়, সেখানটা গাফলতি বা অক্ষমতা পূর্ণ নীরবতার কারণে সব রকমের দুর্বলতা, নিরুদ্বেগ ও নিশ্চিন্ততার আশ্রয়স্থলে পরিণত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
৪.দলের সুস্থ-সবল অবয়ব ও রোগমুক্ত দেহের জন্যে সমালোচনার অভাবের চাইতে ক্ষতিকর আর কিছু নেই।
৫.সমালোচনামূলক চিন্তাকে দাবিয়ে দেয়ার চেয়ে দলের জন্যে বড় অকল্যাণাকাঙ্খা আর কিছুই হতে পারে না।
৬.সমালোচনার মাধ্যমেই দোষ-ত্রুটি যথাসময়ে প্রকাশিত হয় এবং তার সংশোধনের চেষ্টা চালানো যায়।
৭.সমালোচনার অপরিহার্য শর্ত: এক:দোষ দেখাবার উদ্দেশ্যে হতে পারবে না বরং পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে সংশোধনের উদ্দেশ্যে হতে হবে। দুই:যথার্থ সমালোচনার পদ্ধতিতে সমালোচনা করতে হবে। বেয়াড়া, বেকায়দা, অসময়োচিত ও বাজে সমালোচনা দলকে ক্ষতির সম্মুখীন করতে পারে।
মূল: ইসলামী আন্দোলন: সাফল্যের শর্তাবলী- সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী





সালাম।
এই ব্লগে সরাসরি কোন লেখকের বহুল প্রচলিত, আলোচিত কিংবা সহজলভ্য কোন লিখা না দিয়ে বরং এর উপর আপনার মতামত দিলে ভাল হয়। আপনি বরং মওদুদী সাহেবের এই লিখাটি কেন প্রাসঙ্গিক তা আলোচনা করলে পাঠকের জন্য ভাল হত। তবে হাঁ, আপনি যদি মাওলানার এমন কোন লিখা পান যা বাংলা ভাষায় অনুদিত হয়নি, বা সহজলভ্য নয় তা সরাসরি পোস্ট করতে পারেন। ধন্যবাদ, আপনার অংশগ্রহণের জন্য।