ইসলামী সমাজ বিপ্লবের প্রধান দাবী হচ্ছে,অন্যায়, অবিচার, শোষণ-জুলুম এর বিরুদ্ধে একটি ন্যায় ভিত্তিক সমাজ কাঠামো প্রণয়ন করা । ফলশ্রুতিতে ইসলাম বরাবরই উপনিবেশবাদ, পুঁজিবাদ , আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে।
কিন্তু দু:খের বিষয় হলো ‘ইসলামপন্হী’ দাবীদাররা নিজেরাই পুঁজিবাদ,আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ধোয়াশা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারছেন না বা মুক্ত হওয়ার ইচ্ছাও পোষন করছেন না।
মুসলমানদের কেন্দ্রস্থল সৌদি আরব কিংবা সৌদি জোট ( সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আমিরাত ইত্যাদি মুসলিম দেশ) প্রকাশ্য পশ্চিমা ও সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল হিসাবে নিজেদেরকে তুলে ধরেছেন। তাদের দালালিত্ব অস্বীকার করার মত মৌখিক সৎ সাহসও তারা হারিয়ে ফেলেছেন।
অন্যদিকে মুসলিম ব্রাদারহুড ও তাদের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো নিজেদের আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দাবি করলেও তারা আসলে প্রচ্ছন্ন ভাবে সাম্রাজ্যবাদীদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহোযগিতাই করে যাচ্ছেন!
একথা আপনার হজম করতে কষ্ট হতে পারে কিংবা হওয়াই স্বাভাবিক! একটু ভেবে দেখলে এর বাস্তবতা পাবেন।
যেমন ধরুন বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী। হরতালে তাদের হামলায় মার্কিনিদের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হলো, জামায়াত আনুষ্ঠানিক ভাবে এর জন্য মার্কিনীদের কাছে ক্ষমা চাইল কিন্তু অন্য মানুষ কিংবা ব্যাবসায়ীদের শতশত গাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হলেও তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা নেই! অথাৎ জামায়াত ও মার্কিনীদের সাথে সুসম্পক বজায় রাখতে চায়! অথচ মার্কিনীরাই হচ্ছে ইসলামের প্রধান শত্রু। বলুনতো এই ক্ষমা প্রার্থনা দ্বারা জামায়াত কি অর্জন করেছে? মার্কিনীরা তাদের কি দিয়েছে?
এরপর দেখুন ইয়েমেন । সেখানকার ব্রাদারহুডপন্থি দল ‘আল ইসলাহ পার্টি’। আরব বসন্তের ঢেউয়ে প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ সালেহ এর পতন হয়। ক্ষমতায় আসেন সাম্রাজ্যবাদের দালাল সৌদিপন্হী মানসুর হাদি। মানসুর হাদি সৌদিপন্হী হওয়ায় তাকে সহোযগিতা করে আল ইসলাহ! আর মনসুর হাদির বিপক্ষে অবস্থান নেয় হুতি বিদ্রোহীরা।এই হুতিরা সালেহর বিরুদ্ধে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সৌদিজোট ও সাম্রাজ্যবাদের দালালদের একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুসলিম ব্রাদারহুড ও মধ্যপন্থী ইসলামিস্টদের উৎখাতের পরে ইয়েমেনে তাদের লক্ষ্যবস্তু হয় আল ইসলাহ পার্টি। প্রশাসন থেকে আল ইসলাহ সমর্থকদের বের করে দেয়া হয়।
ফলে সালেহ অনুগামী ও হুতিদের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য তৈরি হয়। অন্য দিকে আল ইসলাহের সাথে দূরত্ব এবং প্রশাসন ও দলের মধ্যে সালেহ অনুগতদের বিরোধিতায় হাদির সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হুতি বিদ্রোহীরা দেশের একাংশ নিয়ন্ত্রন নিয়ে নেয়। এমতঅবস্থায় সৌদি জোট ইয়েমেনে হামলা চালায়। আল ইসলাহ আবারও সৌদি জোটকে সমর্থন করে! তাহলে বলুন সাম্রাজ্যবাদের দালাল সৌদিজোটের সাথে সম্পর্ক রাখা কি প্রচ্ছন্নভাবে সাম্রাজ্যবাদের দালালী করার নামান্তর নয়?
এখন সাম্রাজ্যবাদীদের লাভ যা হলো তা এই যে,
১.আল ইসলাহ পার্টি সবকুল হারিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
২. সাম্রাজ্যবাদীরা ইয়েমেনকে অনন্তকালের জন্য গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিল।
৩. সাম্রাজ্যবাদীদের বিরোধীতা করায় জনসমর্থন হুথিদের দিকে চলে গেল।
৪.ইয়েমেনে কার্যত দু’টি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সূত্রপাত ঘটল। একটিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলো প্রেসিডেন্ট হাদির সমর্থক গোষ্ঠীর। আরেকটির নিয়ন্ত্রণে হুতিরা। আর আল ইসলাহ পার্টি বিতারিত!
এভাবেই সিরিয়া, লিবিয়া সহ বিভিন্ন স্থানে মুসলিম ব্রাদারহুড সাম্রাজ্যবাদীদের উপকারই করে দিচ্ছেন! কিন্তু তা তারা নিজেরাও উপলদ্ধি করতে পারছেন না! এটাই সাম্রাজ্যবাদীদের খেলা! তবে ব্যাতিক্রম শুধু ফিলিস্তিনের হামাস।
তবুও ব্রদারহুডের কেউ কেউ আশা করেন সৌদির বৈরী মনোভাবের অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেবেন নতুন বাদশাহ!!! সৌদিও সুযোগ বুঝে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ওপর একটি সেমিনার আয়োজন করে। আয়োজিত এ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের ইসলামি থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিনিধি ও স্কলারদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই সম্মেলনে মধ্যপন্থী ইসলামি দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। যাদের মধ্যে পাকিস্তান জামায়াতের আমির সিরাজুল হক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ইসলামি দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা যোগ দেন!
আমাকে যদি শতবার জিজ্ঞাসা করা হয়, বর্তমান সময়ে ইসলামের প্রধান শত্রু কে?? আমি শতবারই বলব সাম্রাজ্যবাদী আরব রাষ্ট্র ও তাদের প্রভু আমেরিকা ইসরায়েল।
সাম্রাজ্যবাদীরা সব সময় তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মিডিয়ার সহায়তায় প্রতিপক্ষ আবিস্কার করে। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো এর মাধ্যমে একদিকে নিজেদের রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আনুগত্য আদায় করে, অন্যদিকে পরদেশ লুণ্ঠনের জন্য যে যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করে। সুতরং আমাদের তথা ইসলামপন্থিদের এব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। আমরা যেন তাদের সহযোগী হয়ে না যাই।
মনে রাখতে হবে, ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় পাশ্চাত্যের শত্রু হয়ে দাড়ায় সমাজতন্ত্র এবং এই সমাজতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে রীতিমত তারা লড়াই চালিয়ে যায়। দেশে দেশে সামরিক জোট গঠন করে এবং সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পশ্চিমা দুনিয়া । সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক যুদ্ধের সূচনা করে। তখন সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়ার তখন প্রধান কাজ হয়ে ওঠে সমাজব্যবস্থা হিসেবে সমাজতন্ত্র কত খারাপ তা প্রমান করা। এখন সমাজতন্ত্র নেই আছে শুধুই ইসলাম।তাই মিডিয়া মানেই মুসলমানদের জঙ্গি তৎপরতা!
তাই সম্রাজ্যবাদীরা কখনই ইসলামপন্থিদের বন্ধু হতে পারে না। সম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন রূপ চিনতে হবে। তাদের ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।