অত্যাচার, নির্যাতন, অপশাসন, দূর্নীতি

মুহাম্মাদ রেজা শাহ পাহলভীর অপকর্মের ফিরিস্তি দিলে আলাদা একটি বই–ই হয়ে যাবে। একদিকে দেশের সম্পদ আমেরিকার হাতে তুলে দেয়া ও সামরিক বাহিনীর পিছনে বিপুল ব্যায়ের মাধ্যমে জনগণকে পথে বসানো, আরেকদিকে মিশরের সেক্যুলার জামাল আবদুল নাসের এর ভিশন অনুযায়ী ইরাকের সাথে মৈত্রীচুক্তি, অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাঈলের সাথে গোপন চুক্তি, সিআইএ ও মোসাদ (যথাক্রমে আমেরিকান ও ইসরাঈলী গোয়েন্দা সংস্থা) এর কাছে নিবর্তনমূলক বাহিনী সাভাকের প্রশিক্ষণ, যার কাজ ছিলো সচেতন মানুষদের ধরে গুম–খুন–নির্যাতন করা – ইত্যাদি সবই আসলে শাহের পতনকে ত্বরান্বিত করছিলো। ইমাম খোমেনী তাই তাঁর এক ভাষণে শাহকে বলেছিলেন :
“সেই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা কোরো না, যেদিন তোমার পতনে এদেশের মানুষ উল্লাস করবে।”
ইমামের সেই ভবিষ্যৎবাণীই সত্য হয়েছিলো শেষ পর্যন্ত।

মার্কিন ট্রেনিং, অস্ত্রসহায়তা, ইত্যাদির মাধ্যমে ইরান ব্যাপক সামরিক শক্তি অর্জন করলো এবং গালফ এর পুলিশ হিসেবে খ্যাত হলো। চুক্তি হলো যে, ইরানের যেকোনো বিপদের সময়ে মার্কিন সেনাবাহিনী সেখানে প্রবেশ করতে পারবে। বিজয়ের পর দেশে ফিরে এই আর্মির উদ্দেশ্যে ইমাম বলেছিলেন :
“আমরা আমাদের আর্মিকে স্বাধীন দেখতে চাই। ওহে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, তোমরা কি চাও না স্বাধীন থাকতে ? তোমরা কি স্বাধীন কর্নেল হিসেবে থাকতে চাও না ? তোমরা কি অন্য দেশের সহযোগী হিসেবে থাকতে চাও ? আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি, জনগণের বাহুবন্ধনে ফিরে আসো। আর জনগণ যা বলে, তা–ই বলো। বলো যে আমাদের অবশ্যই স্বাধীন হতে হবে। জনগণও তা–ই চায়। আর্মির উচিত না আমেরিকার অনুগত থাকা। আমরা এটা তোমাদের ভালোর জন্যই বলছি। সুতরাং তোমরাও নিজেদের জন্যে একথা বলো। বলো যে তোমরাও তা–ই চাও।”
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিপ্লবের পরপর দেশে ফিরে ইমাম যখন এই ভাষণ দেন, তখনও ইরানি আর্মি জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ত্যাগ করেনি, হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছিলো।
রুহুল্লাহ খোমেনী থেকে আয়াতুল্লাহ খোমেনী, অতঃপর সর্বস্তরের মানুষের কাছে ইমাম খোমেনী হয়ে ওঠা
১৯৬১ সালে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ বুরুজারদীর মৃত্যু কোমের হাওজাকে এক ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্টের মুখোমুখি করলো। শাহ ভাবলো, আয়াতুল্লাহ বুরুজারদীর মৃত্যু কোমের হাওজাকে দুর্বল করে দিয়েছে। সুতরাং যেভাবে সে তিনজন গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহী আয়াতুল্লাহ কাশানি, আয়াতুল্লাহ নবাব সাফাভি ও সেক্যুলার মোসাদ্দেককে পথের কাঁটা হিসেবে সরিয়ে দিয়েছিলো, সেভাবেই তার সর্বশেষ পথের কাঁটা ইমাম খোমেনীকে সরিয়ে দেবার কূপমণ্ডূকতায় লিপ্ত হলো। হযরত মাসুমার (রহ.) মাজারে গিয়ে শাহ এক দীর্ঘ বক্তৃতায় বললো, এতদিন তার পথে এক দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তি ছিলো, এখন সে চলে গিয়েছে। সুতরাং শাহ তার পিতার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেব। (অর্থাৎ আয়াতুল্লাহ বুরুজারদীর মৃত্যুতে সে আবার ইরানকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করবে, যা তার পিতার স্বপ্ন ছিলো।) সে দম্ভোক্তি করে বলেছিলো : “কেউ আমাকে থামাতে পারবে না। কেউ আমার পথে এসে দাঁড়াতে পারবে না।” কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনা ছিলো ভিন্ন, যা মুশরিক শাহের অনুধাবন করার কোনো ক্ষমতাই ছিলো না।
সুতরাং অপরিণামদর্শী শাহ তার স্বৈরশাসনকে দৃঢ় করলো এবং মুসলমানদের উপর সেক্যুলারিজমকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলো। সেমতো বছরখানেক পরেই নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থীর মুসলমান হবার শর্তটি সংবিধান থেকে উঠিয়ে দিলো। এছাড়াও কুরআন হাতে শপথের নিয়মও তুলে দেয়া হলো। ইমাম খোমেনীসহ বড় বড় আলেমগণ শহীদ আয়াতুল্লাহ হায়েরী আল ইয়াজদির ছেলের বাসায় জরুরি বৈঠকে বসলেন। প্রার্থীদের মুসলমান হওয়ার শর্ত উঠিয়ে দেয়ায় বাহাই সম্প্রদায়ের লোকেরা রাষ্ট্রের অ্যাডমিনিস্ট্রেশানে প্রবেশ করবে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করলেন এবং সংবিধান সংশোধনের বিরোধিতা করলেন। ইমাম লিখলেন :
“ধর্মীয় নেতা ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা কি কখনো সভ্যতার অগ্রগতি এবং বৈজ্ঞানিক উন্নতির সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন ? … কখনো কি এমন হয়েছে যে তোমরা একটা ফ্যাক্টরি বানাতে চেয়েছো আর তারা তোমার বিরোধিতা করেছে ? তোমরা স্পেসে ঘুরে বেড়ানোর মেশিন তৈরী করতে চেয়েছো আর ধর্মীয় নেতাগণ তোমার পথে এসে দাঁড়িয়েছে ? আমাদের দাবী হলো নারীদের ধ্বংস ও ব্যাভিচারের পথে টেনে আনা হবে না। গত ২০ বছর যাবৎ হিজাবের উপর নিষেধাজ্ঞা আছে। মানুষ ও দেশের জন্য তাতে কী লাভ হয়েছে ? এই খেলা বন্ধ করো, কুরআন ও ঐশী ধর্মের উপর থেকে তোমার হাত উঠিয়ে নাও (হস্তক্ষেপ করা বন্ধ করো), এবং ডেভেলপমেন্ট, সিভিলাইজেশান ইত্যাদির নামে দেশের সংবিধান লঙ্ঘন কোরো না ।“
উত্তরে শাহ লিখলো, তোমরা আলেমরা সাধারণ মানুষকে শরীয়ত শিক্ষা দাও, কিন্তু পলিটিক্সের মধ্যে নাক গলাতে এসো না। আর এই বক্তব্যে আয়াতুল্লাহগণকে অপমানজনকভাবে সম্বোধন করা হয়েছিলো।
ইমাম খোমেনী তক্ষুণি ছাত্রদেরকে বিপ্লবী কমিটি তৈরী করার নির্দেশ দিলেন। এই কমিটির দায়িত্ব ছিলো ইমামের বক্তব্য প্রচার ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা। প্রথমেই প্রচার করতে বলা হলো আয়াতুল্লাহগণকে অপমান করে দেয়া শাহের চিঠি। এই চিঠির অসংখ্য কপি ছড়িয়ে দেয়া হলো মানুষের মাঝে। এই চিঠিকে মানুষজন ওলামাগণের উপর সরাসরি আঘাত ও অপমান হিসেবে দেখলো। মুহুর্তের মধ্যে ইরানের রাস্তায় বিক্ষুব্ধ জনতা নেমে এলো। ইমাম কঠোর ভাষায় শাহকে হুঁশিয়ার করলেন :
“(শাহ !) যেহেতু তুমি আমাদেরকে বলেছো সাধারণ মানুষকে শিক্ষাদান করতে, সুতরাং আমি সধারণ মানুষকে বলছি – হে জনগণ ! (শোনো।) সেইসাথে তোমার সরকারকেও বলছি : অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে তুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছো ধর্মীয় নেতাগণের উপদেশকে সম্মান ও তোয়াক্কা করবে না। ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হলো জাতির খুঁটিস্বরূপ, জনগণের আশ্রয়। আর তুমি মনে করছো যে তুমি কুরআন, দেশের সংবিধান এবং মুসলমানদের অনুভূতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে টিকে থাকতে পারবে। কুরআনের শিক্ষাকে উপেক্ষা ও অপমান করার পরিণতির ব্যাপারে আমি তোমাকে সতর্ক করছি। যদি সতর্ক না হও, তাহলে মুসলিম স্কলার এবং ধর্মীয় নেতাগণ তা–ই করবেন, যা করা দরকার।”
ছয়মাসেও বিক্ষোভ–সভা–সমাবেশ–মিছিল থামলো না, বরং যেনো বেড়েই চললো। এর মূল কারণ ছিলো নাস্তিক্যবাদ দ্বারা ইসলাম–প্রিয় মানুষের চিন্তা–চেতনার উপর আঘাত করা।
এবার ইমাম খোমেনীকে বাদ দিয়ে অন্যান্য আলেমগণের উদ্দেশ্যে টেলিগ্রাম করলো শাহ। অথচ তখন মিছিলে মিছিলে শুধু ইমাম খোমেনীর নাম ও ছবি। যাহোক, সেই টেলিগ্রামে আলেমগণকে মিথ্যা কথা বলা হলো। শাহ তার টেলিগ্রামে বলেছিলো যে সংবিধানের সংশোধনীগুলো বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু ইমাম খোমেনী বললেন যে না, সংশোধনীগুলো আসলে বাতিল হয়নি। আর যদি হয়েই থাকে, তাহলে তা সরকারীভাবে ঘোষণা করতে হবে। শাহ বাধ্য হলো সরকারী গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সংশোধনী বাতিলের কথা প্রকাশ করতে।
এভাবে, শাহের অপকর্মগুলোর সমালোচনা, জনগণকে তা জানানো এবং শাহকে আলেমগণের বক্তব্য মানতে বাধ্য করা – ইত্যাদির মাধ্যমে ইমাম খোমেনীর প্রকাশ্য বিপ্লব প্রাণ পেতে শুরু করলো। আর খোমেইন প্রদেশের রুহুল্লাহ খোমেনী হয়ে উঠলেন অবিসংবাদিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী, আর সর্বস্তরের জনসাধারণের মুখপাত্র – ইমাম খোমেনী।
শাদা বিপ্লব (White Revolution)

শাহের পরপর কয়েকটি সরকার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সঙ্কট ও অচলাবস্থা নিরসনে ব্যর্থ হলো। ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাহ ১৯৬৩ সালে “শাদা বিপ্লব” বা white revolutoin এর ঘোষণা দিলো, যা কার্যত ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। মার্কিন দালাল হিসেবে জনগণকে শোষণ করা ও দেশের তেলসম্পদ আমেরিকার হাতে তুলে দিয়ে জনগণকে শাদা বিপ্লবের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাহ কার্যতঃ তার পতনকেই ত্বরান্বিত করছিলো। বিপ্লবের পরে ইমাম খোমেনী তাঁর এক ভাষনে বলেছিলেন :
“যখন আমি পত্রিকায় সেই ছবি দেখলাম যে মুহাম্মাদ রেজা পাহলভী আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সামনে অসহায় বাচ্চার মত দাঁড়িয়ে আছে, আর সে (মার্কিন প্রেসিডেন্ট) তার (শাহের) দিকে অশ্রদ্ধা ভরে তাকিয়ে আছে – আল্লাহ জানেন আমার কী অনুভুতি হয়েছিলো। আল্লাহ জানেন আমার কেমন লেগেছিলো। সম্ভবত এখনও সেই তিক্ততা রয়ে গিয়েছে। আমাদের অবস্থা কী দাঁড়াতো, যখন আমাদের লোক (শাসক) বলে : “আমিই সব, আমি দেশকে এই করবো সেই করবো, আমরা জাপানের চেয়েও এগিয়ে যাবো।” (অথচ) আমি তাকে দেখলাম এক দুর্বল এবং মান সম্মানহীন লোক হিসেবে, যে কিনা আমেরিকায় যায়, আর তারপর অনুমতি পেলে সেই প্রেসিডেন্টের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আর সেই প্রেসিডেন্ট তার দিকে তাকায়ও না, বরং বিরক্তিভরে তাকায়।”
শাদা বিপ্লবের নামে শাহের লোক দেখানো ট্রাক্টর চালানো, কিছু কৃষককে তাদের জমি ফেরত দেয়া, ইত্যাদি কাজের আড়ালে সে আসলে কৃষিকে ধ্বংস করছিলো, যেনো আমেরিকার জন্য বাজার তৈরী করা যায়। প্রসঙ্গতঃ, বাংলাদেশেও ঘটে চলেছে অনুরূপ ঘটনা : কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য বাজার তৈরী করার লক্ষ্যে নিজস্ব শিল্প ধ্বংস করা। যাহোক, বিপ্লবের পর দেশে ফিরেই বেহেশতে যাহরা কবরস্থানে প্রথম ভাষণ দেন ইমাম খোমেনী। তখন তিনি এই শাদা বিপ্লবের প্রকৃত চেহারা সম্পর্কে বলেছিলেন :
“তারা ভেবেছিলো (বলেছিলো) যে কৃষি সংস্কার ও কৃষক পুনর্বাসনের নামে, কৃষকদের দারিদ্র থেকে উদ্ধার করার নামে তারা কৃষকদের রক্ষা করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর, এখন তোমার এই সংস্কারের ফলস্বরূপ কৃষকই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের কৃষিই শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন দেশ সবদিক দিয়ে বাইরের সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে। সুতরাং, মুহাম্মাদ রেজা পাহলভী এই পদক্ষেপ নিয়েছিলো আমেরিকার জন্য এদেশে বাজার তৈরী করতে, এবং চাল–গমসহ সবকিছুর জন্য আমেরিকার উপর নির্ভরশীল হতে। কিংবা ইসরাঈল থেকে ডিম কেনা, আমেরিকা থেকে যন্ত্রপাতি কেনার উদ্দেশ্যে। তাই এই সংস্কারের নাম করে সে যা যা করেছিলো, তার সবই ছিলো দুর্নীতি। এই কৃষি সংস্কার এদেশকে চপেটাঘাত করেছে। হয়তো আমরা বিশ বছরেও এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবো না।”
তো শাহ যখন শাদা বিপ্লব ঘোষণা করলো, এর প্রকৃত চেহারা বুঝতে পেরে ইমাম খোমেনী আলেমগণকে ডেকে বলেন যে এখন সময় এসেছে দৃঢ় শপথ নিয়ে সরাসরি শাহের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করার। সুতরাং কোম থেকে জারি করা হলো এক ফতোয়া। এই ফতোয়ায় শাহের কর্মকাণ্ডকে ইসলাম বিরোধী ও সংবিধান বিরোধী বলে ঘোষণা করা হয়। জনগণকে রাস্তায় নামিয়ে আনার জন্য এই ফতোয়াটিই যথেষ্ট ছিলো। শহরগুলোর সব দোকানপাট স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ রাখা হলো। লাখো নারী–পুরুষের মিছিলের এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো।
জনগণের সরাসরি বিপক্ষে যাবার পরিবর্তে শাহ তার শাদা বিপ্লবের দফাগুলির উপর এক গণভোটের প্রস্তাব করলো। সেইসাথে এ–ও বললো যে সে কোমে গিয়ে ধর্মীয় নেতাদের সাথে দেখা করবে পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য। জবাবে কোম নগরীতে শাহের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন ইমাম খোমেনী। এই সংবাদও সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লো। এসময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন ইমামের ছাত্ররা, যেনো ইমামের বক্তব্য দেশের মানুষের কাছে বিভিন্নভাবে পৌঁছে দেয়া যায। শাহের দুঃশাসনের প্রতি গণ–অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য ইমাম আরেকটি কাজ করলেন এ সময়ে। ইরানে নওরোজ উৎসব, অর্থাৎ নববর্ষ পালন অত্যন্ত ঐতিহ্যগত একটি সার্বজনীন অনুষ্ঠান। কিন্তু সে বছর নববর্ষের দিনকে ইমাম খোমেনী শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করলেন। কৌশল হিসেবে নিষেধ করেছিলেন রমজান মাসের খুৎবা। সুতরাং লোকজন মসজিদে গিয়ে সবকিছু বন্ধ পেলো। এতে এই অনুভূতি মানুষের মাঝে আরো প্রকট হলো যে, শাহ ইসলামী কর্মকাণ্ড বন্ধের ষড়যন্ত্র করছে।
ফায়জিয়া মাদ্রাসায় কারবালার ঘটনার পুনরাবৃত্তি

ইরানি জনগণ হাজার বছর ধরে নওরোজ অনুষ্ঠান পালন করে আসছে। কিন্তু সেবার নওরোজের দিনে মানুষ শোক দিবস পালন করলো। যেনো ইরানের ইতিহাসের হাজার বছরের সকল শাসকের চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে আবির্ভূত হলেন ইমাম খোমেনী। গোটা ইরানজুড়ে যেদিন আনন্দ উৎসব চোখে পড়ার কথা, সেদিন দেখা গেলো উল্টো দৃশ্য। এ ছিলো শাহের শাসনক্ষমতার উপর এক সরাসরি আঘাত। এ ছিলো হাজার বছরে রাজতন্ত্রের উপরে ইসলামী নেতৃত্বের বিজয়। ছিলো বেলায়েতে ফকীহ, অর্থাৎ ফিকাহবিদের শাসনের পূর্বাভাস, যার ছক ইমাম এঁকেছিলেন আরো প্রায় ত্রিশ বছর আগে। শাহের টনক নড়লো। অসহিষ্ণু শাহ বেছে নিলো গণহত্যার পথ।
২২শে মার্চ, ১৯৬৩ সাল। ইরানী নববর্ষের দ্বিতীয় দিন। হযরত ইমাম জাফর সাদেক (আ.) এর শাহাদাৎ দিবস উপলক্ষে শোকসভার আয়োজন করা হয়েছে। মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ইসলামপ্রিয় মানুষের ভীড়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। এমন সময় সেখানে সামরিক যান, বাস, ট্যাক্সি ইত্যাদিতে করে পৌঁছে গেলো মেশিনগানে সজ্জিত শাহের সন্ত্রাসী সাভাক বাহিনী সহ বিভিন্ন বাহিনী। ইসলামবিরোধী শ্লোগান দিয়ে তারা নিরস্ত্র মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত করলো ফায়জিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গন। আহতদের যারা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তাদেরও জোরপূর্বক বের করে দেয়া হলো। এ যেনো কারবালার ঘটনার–ই পুনরাবৃত্তি ! শাহের বাহিনীর এই নৃশংসতার খবর ইমামের কানে পৌঁছলে তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনতার উদ্দেশ্যে বলেন :
“আপনারা শান্ত থাকুন। আপনারা এমন সব পবিত্র ধর্মীয় নেতার অনুসারী, যাঁরা এর চাইতে আরো বেশী নির্যাতন ভোগ করেছেন। যারা এ ধরণের দৌরাত্ম্য ও নির্যাতন চালায় শেষ পর্যন্ত তা বুমেরাং হয়ে তাদের কাছেই ফিরে যায়। ইসলামের ইজ্জত–কদর বজায় রাখার জন্য আপনাদের অনেক ধর্মীয় নেতাই মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁরা এর দায়িত্বভাবর এখন আপনাদের উপর ন্যস্ত করে গেছেন। সুতরাং, তাঁদের পবিত্র উত্তরাধিকার হিফাজত করার দায়িত্ব আপনাদেরই।”
সেদিন রাতে ইমামের বাসায় যখন তাঁর ছাত্র ও আলেমগণ জড়ো হলেন, তিনি তাদেরকে সাহস দিলেন। শাহকে উদ্দেশ্য করে বললেন :
“আমি নিজেকে প্রস্তুত করেছি। প্রস্তুত করেছি আমার দেহ ও এই বুক – তোমার বর্ষা ও তীর গ্রহণ করার জন্য। ইন–শা–আল্লাহ, আমি তোমার কাছে মাথা নত করবো না। এবং আমি তোমার দুঃশাসন ও নির্যাতনের মুখে পিছু হটবো না কিংবা আত্মসমর্পনও করবো না। আমি তোমার দেশ ও ইসলামবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডের ব্যাপারেই চুপ করে থাকবো না। এবং যতদিন আমার হাতে কলম আছে, আমি ততদিন তোমার মোকাবিলায় ফতোয়া জারি করবো এবং লিফলেট লিখতে থাকবো।”
ইমামের গ্রেফতার : শুরু হলো এক দীর্ঘ বিপ্লব
শাহ কর্তৃক ইরানে অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাঈলের দূতাবাস চালুর ঘোষণাকে ইমাম অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিলেন। ফিলিস্তিন ইস্যু ইমামের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। আর এই শাহ সেই ইসরাঈলের দূতাবাস চালু করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের উপর ইহুদি নিপীড়নকে বৈধতা দিলো।

ইমাম তাঁর বাসভবনে আলেমগণকে ডাকলেন। আশুরার খুৎবায় শাহের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে সকলে একমত হলেন।
৫ই জুন, ১৯৬৩ সাল। আশুরার বক্তৃতায় ইমাম খোমেনী বললেন :
“(হে শাহ !) তোমাকে ইসলামের নিয়ম–নীতি মেনে চলতে হবে। এবং ধর্মীয় নেতাগণের কথা শুনতে হবে। তাঁরা এদেশের ভালো চান। ইসরাঈল থেকে ফিরে আসো, কারণ ইসরাইলের পক্ষে থাকাটা তোমার কোনোই কাজে আসবে না। দুর্দশাগ্রস্ত, নীচ ! তোমার জীবনের ৪৫ বছর পার হয়ে গিয়েছে, আজ পর্যন্ত কখনো একটু গভীরভাবে চিন্তা করো নাই, তোমার কাজের প্রতিক্রিয়া ভেবে দেখো নাই, অতীত থেকে শিক্ষা নাও নাই। তারা তোমাকে যে মিথ্যাবাদিতা ও ধোঁকাবাজি শিক্ষা দিচ্ছে, তা শুনো না। নির্বোধ কে ? অসহিষ্ণু কে ? ইসলাম আর আলেমগণ, নাকি তুমি আর তোমার শাদা বিপ্লব ? কীসের এই বিপ্লব ? এর গোড়া কোথায়, তা বলো। উন্মোচন করো। তুমি কতদিন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চাও ? তুমি কতদিন মানুষকে ভুলপথে চালিত করতে চাও ?”
পাহলভী রাজবংশের ইতিহাসে আর কেউ কখনো শাহকে এভাবে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলেন নাই। ইমাম খোমেনীই সেই ব্যক্তি ছিলেন, যিনি অত্যাচারী শাসককের তার গর্জনের চেয়েও বহুগুণ বেশি শক্তিতে প্রতি–উত্তর করেছিলেন। সেটা এমন এক সময়, যখন শাহের রাজনৈতিক বিরোধিতা বলতে আর কিছু অবশিষ্ট ছিলো না। এমনই এক সময়ে আয়াতুল্লাহ খোমেনী তার বিরুদ্ধে কার্যতঃ যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তাঁর আশুরার ভাষণ ম্যাজিকের মত কাজ করলো।
স্বৈরশাসক শাহ তার ক্ষমতার হুমকি হিসেবে দেখলো ইমাম খোমেনীকে। গভীর রাতে ইমাম গ্রেফতার হলেন। খবর ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। সকালে রাস্তায় নেমে এলো দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ, তাদের অবিসংবাদিত নেতা ইমাম খোমেনীর জন্য। এর শুরু হলো শাহের অত্যাচারী বাহিনীর গুলি। সেনাবাহিনী, নিয়মিত পুলিশ ও মোসাদ–সিআইএর হাতে বর্বরতার বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত সাভাক বাহিনী একযোগে হামলা করলো। খোদ তেহরানেই ১৫,০০০ এর উপরে মানুষ শাহাদাৎ বরণ করেন। কোম নগরীতে শহীদ করা হয় চার শতাধিক লোককে। প্রথমদিকে তারা নিয়ম মেনে পায়ে গুলি করছিলো। এরপর সরাসরি মাথায়। যে দৃশ্য আমরা বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ করছি আজ। এমনকি সেসময়ে শাহের জারি করা সামরিক শাসন এতটাই বর্বর হয়ে উঠেছিলো যে, মাথায় গুলি করতে যে সেনা অস্বীকৃতি জানাবে, সেই সেনাকে গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ দিলো শাহ। হেলিকপ্টার থেকে পর্যন্ত বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণ করা হলো। হত্যাযজ্ঞ শেষে হেলিকপ্টারযোগে অসংখ্য লাশ গুম করার জন্য তুলে নিয়ে কোমের নিকটবর্তী লবণ হ্রদে ফেলে দিয়েছিলো জালিম বাহিনী। সেই লবণ হ্রদ এখন শহীদদের স্মৃতিচারণের জায়গা হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
ইমামের গ্রেফতার কেবল বিপ্লবকেই বেগবান করলো। বাণিজ্যিক ধর্মঘট, রাস্তায় সভা–সমাবেশ বিক্ষোভ, ইত্যাদি চলতে লাগলো অব্যাহতভাবে। নয় মাসের মাথায় শাহ বাধ্য হলে ইমামকে মুক্তি দিতে, যদিও প্রাথমিকভাবে তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিলো।
যে নয় মাস ইমাম বন্দী ছিলেন, তখন হাওজায় আরেকটি ধারার সৃষ্টি হয়, যারা বিপ্লবের সফল হওয়ার চান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চেয়েছিলো শাহ। কিন্তু মুক্ত হবার পরপরই ইমাম সেই আগের মত করেই কঠোর ভাষায় শাহের সমালোচনা শুরু করেন। এবং হাওজায় সম্ভাব্য বিভক্তিকে ঐক্যে পরিণত করেন। কোমের আজম মসজিদে গিয়ে ইমাম এক হেকমতপূর্ণ ভাষণ দিলেন। বললেন :
“কেউ যদি আমাকে অপমান করে কিংবা আমাকে চপেটাঘাত করে, আল্লাহর কসম ! আমি চাইবো না আর কেউ এসে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াক আমার পক্ষ নিয়ে। আমি তা গ্রহণ করবো না। আমি জানি যে কিছু লক্ষ্য, হোক তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিংবা অজ্ঞতাপ্রসূত, এসব লক্ষ্য হলো সমাজে বিভক্তি সৃষ্টির জন্য। কিন্তু আমার পক্ষ থেকে আমি সকল ধর্মীয় নেতৃত্বের হস্ত চুম্বন করবো। তা তিনি নাজাফ, মাশহাদ তেহরান কিংবা যেকোনো জায়গারই হোন না কেনো। আমি ইসলামের সকল উলামার হস্ত চুম্বন করি (সম্মান করি)। আমাদের লক্ষ্য এসবের উর্ধ্বে। আমি বিশ্বের সকল মুসলিমের উদ্দেশ্যে ভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে চাই।”

এর প্রায় সাতমাস পর আমেরিকার সাথে এক চুক্তি করলো শাহ। এই চুক্তি অনুযায়ী যত বড় অপরাধীই হোক, যদি সে আমেরিকান হয় তবে ইরানের মাটিতে তাকে কোনো ধরণের শাস্তি প্রদান করা হবে না। ইমাম খোমেনী এর তীব্র বিরোধিতা করে ধর্মীয় এক সভায় বক্তব্য দেন। সেদিন রাতেই আবার গ্রেফতার হলেন তিনি। গভীর রাতে উঁচু উঁচু দেয়ালে দড়ি লাগিয়ে কমান্ডো স্টাইলে তাঁর বাড়িতে ঢুকে পড়লো শাহের বাহিনী। এরপর দরজা ভেঙে ঢুকলো ইমামের ঘরে। ইমাম বলললেন : “যদি তোমরা রুহুল্লাহর খোঁজে এসে থাকো, তবে এইযে আমি রুহুল্লাহ।” এই কথা বলে তিনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে গ্রেফতারের ব্যাপারে নিষেধ করলেন শাহের বাহিনীকে। এরপর তারা ইমামকে নিয়ে গেলো। এবার আর তাঁকে জেলে রাখা হলো না। গাড়িতে করে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হলো তেহরান এয়ারপোর্টে। সেখানে তিনি জানতে পারেন যে তাঁকে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শাহ। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে, তা হলো, দেশব্যাপী ইমামের জনপ্রিয়তার কারণে ইমামের ডাকে বিভিন্ন সময়ের বিক্ষোভ মিছিল, শোকদিবস পালন ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মসূচীতে জনতার যে ঢল নেমেছিলো, তা থেকেই বোঝা গিয়েছিলো ইমামকে হত্যা করলে শাহের মসনদ–ই ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই গুপ্তহত্যার ইচ্ছা সত্ত্বেও নিজ স্বৈরাচারী ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ইমামকে নির্বাসনে পাঠালো মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী।
ইমামের গঠন করে যাওয়া বিপ্লবী কমিটির দ্বীনি ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিলেন, ইমামের বহিষ্কারাদেশে সাক্ষর করা প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করার। সেমতে প্রধানমন্ত্রী গাড়ি থেকে নামার সময় চিঠি দেবার নাম করে সামনে এগিয়ে গেলেন এক বিপ্লবী। সাথে লুকানো ছিলো পিস্তল। তার সাথে যোগ দিলেন রাস্তার অপর পাশের কয়েকজন বিপ্লবী। দুনিয়া থেকে বিদায় দেয়া হলো শাহের অত্যাচারের এক হাতিয়ারকে। তারপর সেই বিপ্লবীকে যখন গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হলো, সেখানে এক বিস্ময়কর কনভার্সেশান হয়। সেই বিপ্লবী সরাসরি বললেন : “আমি আমার ধর্মীয় ইমামের বহিষ্কারের প্রতিশোধ নিয়েছি।”
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো : “তুমি কি মুসলিম ?”
– হ্যাঁ।
তুমি কি ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান ?
– হ্যাঁ।
তুমি কি জানো মানুষকে হত্যা করার জন্য অনুমোদন লাগে ?
– হ্যাঁ।
কে তোমাকে সেই অনুমোদন দিলো ?
উত্তরে সেই বিপ্লবী বললেন : “ইমাম খোমেনী।“
প্রশ্ন করা হলো : কখন ?
বিপ্লবীর উত্তর : “যখন তিনি (ইমাম) বললেন যে আল্লাহ জানেন যে তারা বিশ্বাঘাতকতা করেছে, আর এর শাস্তি হলো বুলেট।”
শুরু হলো নির্বাসনে ইমামের জীবন। যার ১৪ বছর পর দেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি। ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঘটনাবহুল ছিলো এই ১৪ বছর, যার মাঝে অল্প কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করবো, যা না করলেই নয়।
নির্বাসনে ইমাম

১৯৬৪ সালে ৬২ বছর বয়স্ক ইমামকে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠানো হয়। সেক্যুলার টার্কিশ গভর্নমেন্ট প্রথমেই ইমামের পাগড়ি পরার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষিদ্ধ করা হয় ধর্মীয় পোষাক পরাকেও। বড় ছেলে মুস্তাফাকে চিঠি লেখেন ইমাম, যার গুরুত্ব বিবেচনা করে এখানে তুলে ধরছি :
“প্রিয় সাইয়্যেদ মুস্তাফা ! আল্লাহ তোমার সাহায্যকারী হোন এবং তাঁর সন্তুষ্টির দিকে তোমাকে পরিচালিত করুন – আলহামদুলিল্লাহ ! আমি নিরাপদে আঙ্কারায় পৌঁছেছি গত সোমবার। আলহামদুলিল্লাহ ! আমার স্বাস্থ্য ভালো আছে, চিন্তার কিছু নেই। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য কোনো অনিষ্টকে পূর্বনির্ধারিত করে দেন না। এইখান থেকে আমি আমার পরিবারের সকল সদস্য এবং আত্মীয়–স্বজনকে শুধু আল্লাহর দ্বারস্থ হতেই উপদেশ দিচ্ছি, এবং তারা যেনো আর কারো সাহায্যপ্রার্থী যেন না হয়। আর আমি তোমাকে ধৈর্য ধরার ও দৃঢ় থাকবার উপদেশ দিচ্ছি। আল্লাহর ইচ্ছা অবশ্যই পূর্ণ হবে।”
এদিকে টার্কিশ সরকার একটা নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিলো, যেখানে ইমাম তাঁর বাকী জীবন কাটাতে পারবেন। কিন্তু ইমাম টার্কিশ ভাষা শেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। তুরস্কের ভাষা শিখলে সাধারণ মানুষের সাথে ইমামের যোগাযোগ সম্ভব হবে, এই আশঙ্কায় গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা তাঁকে আরেক শহরে নিয়ে গেলেন এবং সেখানে সার্বক্ষণিক নজরদারীতে রাখলেন, যেনো ইমাম খোমেনী টার্কিশ ভাষা শিখতে না পারেন।
নির্বাসনে থেকেই ইমাম বিভিন্ন ধর্মীয়–রাজনৈতিক ইস্যুতে দেশের জনগণকে বার্তা পাঠাতেন, ফতোয়া জারি করতেন। ইসলামবিদ্বেষী এই সরকারের সাথে যেকোনোরূপ সহযোগীতা করা, সরকারের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা, সরকারের কর্মকাণ্ড প্রচার করাকে হারাম ঘোষণা করলেন তিনি।
ইমামের উপর নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল হলে তিনি মসজিদে যেতে শুরু করলেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তুর্কী ভাষায় মসজিদে এক ভাষণ দিলেন ইমাম, যার ফলশ্রুতিতে ভীত টার্কিশ সরকার তাঁকে দেশে রাখতে অস্বীকৃতি জানালো। ৫ই অক্টোবর ১৯৯৫ সালে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ইমাম খোমেনী প্লেনে উঠলেন।

ইরাকের বাগদাদ এয়ারপোর্ট পৌঁছালেন ইমাম খোমেনী। শুরু হলো ইরাকে দীর্ঘ নির্বাসন জীবন।
ইমাম খোমেনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে নাজাফ ও কারবালাসহ ইরানের বিভিন্ন স্থান থেকে দ্বীনি ছাত্ররা তাঁর সাথে দেখা করতে এলেন। কিছুদিন পর কারবালায় পৌঁছালে সেখানের আয়াতুল্লাহ মুহাম্মাদ আল শিরাজির অতিথি হিসেবে কিছুদিন থাকেন এবং সেখানেও নামাজের নেতৃত্ব দেন। এরপর ইমাম নাজাফে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। নির্বাসন জীবনের ১৩ বছর ইমাম এখানেই ছিলেন। আর নাজাফ ছিলো ইসলাম ধর্মচর্চার এক বিখ্যাত কেন্দ্র। সেখানেও ইমাম শিক্ষকতাসহ আলেমগণের মাঝে তাঁর বৈপ্লবিক চেতনার প্রচার করেন। ইমামের স্ত্রী এবং বড় ছেলেও তাঁর সাথে সেখানে এসে থাকেন। ইরান সরকার ভেবেছিলো যে প্রচলিত ধারার রাজনীতি থেকে দূরে থাকা নাজাফি আলেমগণের মাঝে ইমাম খোমেনীর থাকাটা ইরান সরকারের পক্ষে সুবিধাজনক হবে। কিন্তু ইমাম নিজস্ব হাওজা খুলে বসলেন এক মসজিদে, এবং সেখানে ফিকাহ শিক্ষা দিতে শুরু করেন। বছরখানেকের মাঝেই তাঁর বিপ্লবী চিন্তাধারা, বেলায়েতে ফকীহ, অর্থাৎ ইসলামী সরকার নিয়ে লেকচার দেয়া শুরু করেন। এসব লেকচার থেকেই পরবর্তীতে ইরানের সংবিধানের মূলনীতি তৈরী করা হয়। পলিটিকাল ইসলাম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইমাম বলেন :
“ইসলাম শুধুমাত্র মানুষের সাথে স্রষ্টার সম্পর্কের আলোচনায় সীমিত নয়। ইসলাম একটি পলিটিকাল ধর্ম। ইসলামের পলিটিক্স এর অন্যান্য নিয়ম–নীতি ও ইবাদতের সাথে জড়িত। যেহেতু সরকারের একটি পলিটিকাল দিক আছে, ইসলামেরও বিভিন্ন পলিটিকাল দিক আছে।”

ইরাকে অতি সতর্কতার সাথে নিজের হাওজা পরিচালনা করেন ইমাম। সেখানের কোনো আলেম কিংবা কারো যেনো এটা মনে না হয় যে তিনি সেখানে কর্তৃত্বশীল হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন, সে জন্যে ইমাম তাঁর শিক্ষকতা ও অন্যান্য বক্তব্যকে সুকৌশলী করেন, এবং মূলতঃ ইরানের সাথে যোগাযোগ রেখে বিপ্লব পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন। তা সত্ত্বেও তাঁর চিত্তাকর্ষক বক্তব্যের কারণে এমনকি নাজাফেও ছাত্রের সংখ্যা বাড়তে লাগলো, এবং ইরান, ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে, এমনকি ইন্ডিয়ানরা পর্যন্ত তাঁর ক্লাসে আসতে শুরু করলেন।

ইমাম খোমেনী তাঁর কঠোর নিয়মতান্ত্রিক জীবনের জন্য নাজাফে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। সত্তরোর্ধ বয়সেও তিনি নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন করতেন। চারটায় তাহাজ্জুদ নামাজ ও কোরআন পড়া থেকে শুরু করে ফজর পার করে ছয়টা পর্যন্ত ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এরপর আধাঘন্টামতন বিশ্রাম নিয়ে মসজিদে চলে যেতেন, যেখানে তাঁর হাওজা (শিক্ষাদান কেন্দ্র)। সেখানে লেকচার দেয়া শেষে সাড়ে এগারোটায় ঘরে ফিরে খাবার খেতেন ও বিশ্রাম নিতেন। এরপর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে দেয়া লেকচারগুলো নিজে লিপিবদ্ধ করতেন। তারপর ভিজিটরদেরকে সময় দিতেন পাঁচ থেকে দশ মিনিট করে। যোহরের নামাজ তিনি মসজিদে আদায় করতেন। একটার দিকে বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার খেতেন। এরপর আধাঘন্টা থেকে পৌনে এক ঘন্টা ঘুমাতেন। চারটার দিকে নিজ হাতে বানানো চা খেতেন। সোয়া চারটায় ছাদে কিংবা পিছনের উঠানে আধাঘন্টা হেঁটে পড়াশুনায় বসতেন। সন্ধ্যায় নামাজ শেষে বাড়ির উঠানে ৪৫ মিনিট একাকী বসতেন। রাত একটার দিকে হযরত আলীর কবরে যেতেন, এবং ফিরে এসে দুটো পর্যন্ত স্টাডিতে সময় কাটান। এরপর দু–ঘন্টা ঘুমিয়ে তিনি আবার চারটা থেকে দিন শুরু করতেন। সর্বমোট চার ঘন্টারও কম ঘুমাতেন তিনি। ইরাক থেকে শুরু করে জীবনের শেষ পর্যন্ত এই রুটিন অনুসরণ করেছিলেন ইমাম।
………………………………………….
(চলবে)
(অখণ্ডভাবে মূল লেখাটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।)
ফেইসবুকে নোট আকারে দেখুন : ( প্রথম খণ্ড।) ( দ্বিতীয় খণ্ড।) ( তৃতীয় খণ্ড।) ( চতুর্থ খণ্ড।)
সম্পূর্ণ লেখাটি ডাউনলোড করুন (ওপেন হবার পর Ctrl+S চাপতে হবে) : ( Complete PDF (15 MB)) ( Text-only PDF )




