এদিকে ইরান…

ইরানে ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্র উদযাপন করতে শাহ ব্যাপক আয়োজন করলো। ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে বহু রাষ্ট্রপ্রধান, রাজাসহ উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলো। গ্র্যান্ড প্যারেড শেষে ভোজসভার আয়োজন করা হলো। সেখানে ৬৯ টা দেশের ৫০০ অতিথির খাবারের আয়োজন করা হয়েছিলো। সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বিলাসবহুল ভোজসভা ছিলো সেটা। সিল্ক ও মখমলের তৈরী স্বর্ণখচিত ১৭টি তাঁবুতে চলছিলো ভোজ উৎসব। ফ্রান্সের Maxim’s রেস্টুরেন্ট থেকে বিমানযোগে আনা হয়েছিলো খাবার। কল্পনাতীত বিলাসিতায় মেতে উঠেছিলো শাহ। আর ওদিকে খোদ তেহরানেই রাস্তার পাশে তাঁবু খাটিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে মানুষ মরছিলো অন্ন–বস্ত্রের অভাবে। সেদিনের ভোজসভায় শাহ ও তার সুন্দরী স্ত্রী ফারাহ দিবার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা যে আর মাত্র আট বছর পরেই চির মলিন হবে, সেটা কি তারা কল্পনা করতে পেরেছিলো ?

শাহ তার স্বৈরশাসন চালিয়ে যেতে লাগলো। ওদিকে ইরাকের নাজাফে বসে ইমাম খোমেনী শাহের সাথে লড়াই করতে থাকেন। আর এই লড়াই অস্ত্রের মাধ্যমে ছিলো না। এই লড়াই ছিলো জনগণকে সচেতন করার লড়াই। মুসলমানদের সচেতন করতে করতে এমন পর্যায়ে উন্নীত করা, যেনো শাহের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও ধোঁকাবাজিতে প্রতারিত হবার মত একটি মানুষও না থাকে। আর সেই পর্যায়ে পৌঁছালে শাহের উৎখাত ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়ে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ত একটি প্রক্রিয়া। যাহোক, নাজাফ থেকে ইমাম খোমেনী শাহের এই ব্যাপক বিলাসী ভোজসভার তীব্র নিন্দা করে বক্তব্য পাঠালেন।
ইমামের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বিপ্লব চলতে লাগলো একাধারে ইমামের নির্দেশনা ও কোমে তাঁর ছাত্রদের উদ্যোগে। আয়াতুল্লাহ বেহেশতী, আয়াতুল্লাহ মুতাহারি, আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী, হাশেমী রাফসানজানিসহ আরো অনেক আলেম বিভিন্ন শহর ও গ্রামে যেতেন, মানুষকে সচেতন করতেন সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে, এবং জানাতেন শাহ কর্তৃক ইমাম খোমেনীকে বহিষ্কারের ঘটনা। গোটা ইরানে ইমাম খোমেনী তখন ইরানের অবিসংবাদিত মুসলিম নেতা।
ইরাকের সাথে ইরানের বর্ডার থাকায় সহজেই ইমামের লিখিত বক্তব্য গোপনে ইরানে পাঠানো সম্ভবপর হয়। গোপনে প্রিন্ট করা এসব বক্তব্য অতি সতর্কতায় বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে ইরানে পাঠানো হতো। এছাড়াও তিনি টেপ রেকর্ডারে বক্তব্য রেকর্ড করে ক্যাসেট পাঠিয়ে দিতেন। সেখান থেকে তাঁর বক্তব্য লিখে প্রচার করা হতে থাকে। এর জন্য বিশেষায়িত টিম ছিলো। ইমামের বক্তব্য পাওয়ার সাথে সাথে তারা সেগুলোর অসংখ্য কপি করে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতেন।
ইমাম তাঁর নিজের ছেলে সাইয়্যেদ আহমাদ এর কাছে চিঠি লিখতেন, এবং সাইয়্যেদ আহমাদও তার উত্তর পাঠাতেন। তবে এগুলো কোডেড (coded) চিঠি ছিলো। অর্থাৎ চিঠির বক্তব্য ইমাম খোমেনী ও তাঁর ছেলে ছাড়া আর কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিলো না। শাহের হাতে পড়ে চিঠি গুম হবার ভয়ে সরাসরি ইরান–ইরাক কিংবা নাজাফ–তেহরান চিঠি না পাঠিয়ে প্রয়োজনে তাঁরা কুয়েত, লেবানন, সিরিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন দেশ হয়ে চিঠি নিয়ে যেতেন, কখনোবা ডাকযোগে এইসব দেশ হয়ে ইমামের কাছে পাঠাতেন। ইমামও সেই চ্যানেলেই জবাব পাঠাতেন। এভাবে নানান প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ইমাম খোমেনী ইরানের গণ মুসলমানের জন্য কাজ করে যেতে থাকেন সুদূর নাজাফ থেকে।
সেসময়ে ইরাকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্দুল সালাম আরেফ। ইমাম নাজাফ থেকে ইরানে এত বেশি চিঠি ও অডিও টেপ পাঠাতেন যে, আব্দুল সালাম আরেফ ঘোষণা দিলেন ইমামের জন্য প্রাইভেট রেডিও স্টেশন প্রতিষ্ঠা করে দেবার। কৌশলগত কারণে ইমাম তা গ্রহণ করেন এই শর্তে যে, রেডিওর কার্যক্রমে ইরাক সরকার কোনো বাধা দেবে না কিংবা কোনো শর্তারোপ করতে পারবে না। কিন্তু ১৯৬৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্ট ক্ষমতাসীন হবার পর এ স্বৈরশাসকের সাথে ইমামের কোনো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হবার সুযোগ থাকলো না।

এরও বেশ কয়েক বছর পর সাদ্দাম হোসেনের সরকার ইমামের সাথে কথা বলার জন্য আলোচক পাঠালো। যেহেতু ইরান সরকারের সবচেয়ে বড় বিরোধী হলেন ইমাম খোমেনী, এবং যেহেতু তাঁর ব্যাপক জনসমর্থন আছে, তাই ইমামের এই অবস্থানটাকে কাজে লাগিয়ে তারা ইরান সরকারের বিরুদ্ধে ইরাককে সহায়তা করার আহবান জানালো। ইমাম স্পষ্টভাষায় তাদেরকে না করে দিলেন। উপরন্তু বললেন যে, সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে বন্দী করে তারা খারাপ কাজ করেছে।
এমতাবস্থায় ইরাক সরকারের সাথে ইমামের আর সহাবস্থান সম্ভব হলো না। ইমাম ইরাক ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। একথা জানতে পেরে তাঁকে গৃহবন্দী করা হলো। রাজনীতির খেলা এমনই যে, এসময়ে আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ইরান–ইরাক বৈরী সম্পর্ক দূর হলে উভয়পক্ষই দুই দেশে তাদের বিরোধী মতকে দমন করতে সম্মত হলো। ইরাকি ইন্টেলিজেন্স ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করে বললো : “আপনি আপনার বক্তব্য লিখে, মুখে বলে কিংবা অডিও ক্যাসেটের মাধ্যমে ইরানে পাঠাতে পারবেন না, কারণ এটা আমাদের (ইরান–ইরাক) দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাইরে।” ইমাম উত্তরে বললেন:
“এটা আমার ধর্মীয় দায়িত্ব যে আমি ডকুমেন্টস তৈরী করবো এবং প্রয়োজনসাপেক্ষে বক্তব্য দেবো। অডিও টেপ রেকর্ড করবো এবং ইরানে পাঠাবো। এটা আমার ধর্মীয় দায়িত্ব।…”
ইমামের বড় ছেলের শাহাদাত
সেপ্টেম্বর ১৯৭৮। ইমাম খোমেনীর বড় ছেলে সাইয়্যেদ মুস্তাফার সাথে কয়েকজন দেখা করে রাত আড়াইটার দিকে ফিরে গেলো। সকালে সাইয়্যের মুস্তাফার বন্ধুরা এসে তাঁকে ডাকলেন। জবাব না পেয়ে তাদের একজন উনার কাঁধে নাড়া দিলেন। সাইয়্যেদ মুস্তাফা পড়ে গেলেন : মৃত। মাঝরাত থেকে ভোরের মাঝে তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো। হসপিটালে নেবার পর ডাক্তার বললেন বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে।
ইমাম খোমেনী এর কিছুই জানতেন না। ইমামের ছোট ছেলে সাইয়্যেদ আহমাদ বাড়ি ফিরে উপরতলায় দরজা আটকে কান্না করছিলেন। আর অন্যান্যেরা যখন ইমামের সামনে বসলেন, তীব্র কষ্ট ও বেদনায় তারা মুখ দিয়ে কিছুই বলতে পারলেন না। ইমাম বুঝতে পারলেন কিছু একটা হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলেন, আহমাদ কোথায় ? এরপর তিনি দ্বিতীয়বার তাঁর ছোট ছেলের নাম ধরে ডাকেন। এরপর সবাইকে উদ্দেশ্যে করে বললেন : “আমি বুঝতে পারছি কী ঘটে থাকবে। তাই আমাকে বলো, মুস্তাফার কিছু হয়েছে ?”
তখন উপস্থিত সবাই মাথা নিচু করলেন। ইমাম খোমেনী সবসময় মেঝেতে বসে বৈঠক করতেন। ইমাম তাঁর আঙুল মেঝেতে স্পর্শ করে কিছুক্ষণ হাতের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। এরপর বললেন মৃতদেহকে ২৪ ঘন্টা পরে দাফন করতে। উপস্থিত যাঁরা ইমামের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁরা পরে বলেছিলেন যে ইমাম যখন মেঝেতে আঙুল স্পর্শ করে সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন, তিনি যেনো তাঁর হৃদয় থেকে ছেলের প্রতি সমস্ত ভালোবাসা শূন্য করে দিচ্ছিলেন, আর সেটাকে আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টি দিয়ে প্রতিস্থাপন করছিলেন। এরপর তিনি খুব শান্ত হয়ে গেলেন।
ইমাম খোমেনী তাঁর বড় ছেলের মৃত্যুতে কান্না করেননি। এমনকি দাফনের সময়ও তাঁকে কাঁদতে দেখা যায়নি। কিন্তু যখন ইমাম হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের ঘটনার বর্ণনা করা হয়, তখন ছাড়া। এমনকি যেদিন তাঁর বড় ছেলের মৃত্যু হলো, মসজিদের সবাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলো, যখন ইমাম জামাতে নামাজ আদায় করলেন, অথচ তখনও তাঁর ছেলের দাফন হয়নি। এরপর তিনি নিয়মমতো মিম্বরে বসে লেকচার–ও দিলেন।
এসব ঘটনা প্রতিটা মানুষের জীবনেই আসে। কিন্তু আল্লাহর সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্কের উচ্চতায় পৌঁছালে মানুষের জীবন দর্শন বদলে যায়, এবং আপাতঃ দুঃখ–কষ্টকে তখন মহান আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ হিসেবে উপলব্ধি হয়। এজন্যেই ইতিহাসে ইমাম খোমেনীর মত মানুষকে দেখা যায ছেলের শাহাদাতেও দৃঢ় থাকতে, বড় বড় আলেম–ওলামাকে দেখা যায় জালিমের ফাঁসিকাষ্ঠে প্রশান্তচিত্তে স্মিতহাস্যে দাঁড়িয়ে থাকতে। কারণ এটাকে তারা এক দুনিয়া থেকে আরেক দুনিয়ায় গমন মনে করেন মাত্র, আর সেই দুনিয়া হলো আল্লাহর একনিষ্ঠ খাদেমের পরম পাওয়া।
ফ্রান্সে গমন : বিজয় অত্যাসন্ন
মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মুসলিম দেশ–ই ইমাম খোমেনীকে গ্রহণ করতে রাজি হলো না। বাধ্য হয়ে তিনি ফ্রান্সের টিকিট কাটলেন এই ভেবে যে, সেখানে কিছুদিন থাকার পর কোনো মুসলিম দেশে গিয়ে হয়তো থাকতে পারবেন। অথচ তাঁর ফ্রান্সে অবস্থান–ই হয়ে উঠলো বিপ্লবকে সফল করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ইমাম খোমেনী প্লেনে ওঠার ঠিক আগ দিয়ে ইরাকের বাথ পার্টির সরকার ইমামের ইরাকে ফেরার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে একটা ডিক্রি জারি করলো। এই ভয়ে যে, ফ্রান্স সরকার যদি আবার ইমামকে ফেরত পাঠায়, তবে ইমামকে নিয়ে তারা আবার ঝামেলায় পড়ে যাবে।
৬–ই অক্টোবর, ১৯৭৮ সালে ইমামকে বহনকারী প্লেন প্রথমে কুয়েত পৌঁছালে কুয়েত সরকার তাঁকে এক মিনিটও থাকতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ইমাম কিছুদিন নো ম্যানস ল্যান্ড – এ এমন অবস্থায় থাকেন, যখন কোনো সরকারই তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। এরপর ইরাক সরকার আবার তাঁকে প্রবেশ করতে দেয়। কিন্তু কিছুদিন পর ইমাম ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলে তাঁর ইরাকে ফেরা নিষেধ করে ডিক্রি জারি করে। আর এর কয়েক মাস পরই ইমাম খোমেনী বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরেছিলেন। নিয়োগ দিয়েছিলেন সরকার, ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী সর্বজন মান্য অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু এর জন্য নিজে কোনো ক্রেডিট নেয়া তো দূরের কথা, বরং ইমাম বলেছিলেন :
“আমাদের প্যারিসে যাবার কোনো প্ল্যানই ছিলো না। আমাদের কোনো ইচ্ছা কিংবা হস্তক্ষেপ ছিলো না যা যা ঘটেছিলো তার উপর। অতীতে যা ঘটেছে এবং এখন যা ঘটছে, তার সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আমি নিজস্ব কোনো ভূমিকা দেখি না এতে, কিংবা যা যা ঘটেছিলো তার উপর কোনো দাবীও করি না, কিংবা আপনারাও না, কারণ যত যা ঘটেছিলো, তার সবই ছিলো আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন। কারণ এমন সব ঘটনা ঘটতো, যা আমরা চাইনি, কিন্তু শেষমেষ তা আমাদের পক্ষে সাহায্যই করেছিলো।”

যাহোক, ফ্রেঞ্চ সরকার তাঁকে ওয়েলকাম করলো এই বলে যে, ইমাম খোমেনী শাহ বিরোধী কোনো কাজ করতে পারবেন না। কিন্তু ইমাম তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “আমি ফ্রান্সকে কোনো বক্তব্য বা ইন্টারভিউ দেবো না, বরং আমি ইরানে বক্তব্য পাঠাবো। এবং আমি বিপ্লব ও ইরানী জনগণের জাগরণের নেতৃত্ব দেবো।”
যেহেতু ইমাম কোন ইন্টারভিউ দেবেন না বলেছিলেন, সুতরাং সাংবাদিকেরা বাড়ির বাহির থেকে তাঁর ছবি তুলে এই বলে প্রকাশ করলো যে, ইমাম খোমেনীকে বন্দী করে রাখা হয়েছে এবং তাঁকে কোনো পলিটিকাল বক্তব্য দিতে দেয়া হচ্ছে না। এর ফলে মত প্রকাশের স্বাধীনতার দাবীদার ফরাসি সরকার চাপের মুখে পড়লো। ইরানী জনগণ, বিশেষতঃ তেহরানের মানুষেরাও ফরাসি সরকারের মত পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিলো। অসংখ্য মানুষের মিছিল ফরাসি দূতাবাসের সামনে ফুল নিয়ে গেলো ইমামকে আশ্রয় দেবার জন্য কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে। ফরাসি সরকার দেখলো যে ইরানি জনগণের মাঝে তাদের জনপ্রিয়তা আছে, সুতরাং ইমামের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলো। শুরু হলো ইমামের নওফেল–এ–শাতুর সেই বাড়িতে সংবাদকর্মীদের মিছিল। বাড়িটা হয়ে উঠলো বিপ্লবের সাময়িক হেডকোয়ার্টার। সেইসাথে প্রবাসী ইরানীরাও এসে তাঁকে সমর্থন জানাতে শুরু করলো। ফ্রান্সে ইমামের অবস্থানের কয়েক মাসে গড়ে প্রতিদিন ৪–৫ টি করে ইন্টারভিউ দিতেন তিনি। এসময়েই ইরান পরিচিত হয়ে উঠলো বিশ্ববাসীর কাছে। এবং সারা দুনিয়ার সচেতন ব্যক্তিরা ভাবতে শুরু করলো : কী ধরণের মানুষ এই ইমাম খোমেনী ?

পরবর্তীতে ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করা সাংবাদিকদের অনেকে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। অনেকের মূখেই যা শোনা গিয়েছে, তা অনেকটা এমন যে, ইমাম খোমেনীর সাথে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ বিরাজ করতো। তিনি রুমে ঢোকামাত্র প্রশান্ত, পবিত্র এবং নীরব এক পরিবেশের সৃষ্টি হতো। ইমাম খোমেনী স্বল্পভাষী ছিলেন। তিনি কথা বলতেন ধীরে, এবং মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। সামগ্রিকভাবে তাঁকে দেখলে কেবল ভালোবাসতে এবং সম্মান করতেই ইচ্ছা করবে। বিপ্লবের পরপর আহমদ দীদাত ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করে সাউথ আফ্রিকায় ফিরে শিয়া–সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এভাবে :
“আমরা ইমামের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ আল মুসাভি আল খোমেইনী। আমরা প্রায় চল্লিশজনের মত ছিলাম। আমরা ইমামের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ইমাম এলেন, তার থেকে দশ মিটার মত দূরে ছিলাম আমি; আমি ইমামকে দেখলাম। তিনি আমাদেরকে প্রায় আধাঘন্টার একটি লেকচার দিলেন, আর কুরআনের বাইরে এতে কিছু ছিলো না। এই মানুষটা যেনো কম্পিউটারাইজড এক কুরআন। আর তিনি যখন পাশের একটা রুম থেকে হেঁটে এসে ভিতরে ঢুকলেন, সবার উপর তাঁর যে প্রভাব (আহমদ দীদাত এখানে “electric effect” কথাটি ব্যবহার করেছেন – অনুবাদক।), তাঁর যে কারিশমা – বিস্ময়কর ! তাঁর দিকে তাকানোর সাথে সাথে কোনো ভাবনা ছাড়াই চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। আপনি তাঁর দিকে তাকান : আপনার চোখ অশ্রুসজল হয়ে যাবে। এর চেয়ে বেশি হ্যান্ডসাম মানুষ আমি জীবনে কখনো দেখি নাই। কোনো ছবি, ভিডিও বা টিভি তাঁকে উপযুক্তভাবে তুলে ধরতে পারবে না : আমার সারা জীবনে দেখা সবচে‘ হ্যান্ডসাম মানুষ হলেন তিনি। (“No picture, no video, no TV could do justice to this man, the handsomest old man I ever saw in my life was this man, Imam Khomeini.” – Ahmed Deedat)”
শুরু হলো চূড়ান্ত আন্দোলন
ইমাম খোমেনীকে ১৯৬৪ সালে নির্বাসনে পাঠানোর পর শাহ মোটামুটি স্বস্তিতে ছিলো এই কারণে যে, ইমামের অনুপস্থিতিতে একদিকে যেমন সরকার উৎখাতের আশঙ্কা ছিলো না, অপরদিকে তেমনি বিপ্লবীদের উপর সর্বাত্মক নজরদারী ও জেল–জুলুমের ফলে সরকারের প্রতি হুমকিও স্তিমিত হয়ে এসেছিলো। কিন্তু ইমামের ফ্রান্স গমনের পর সবকিছু যেনো আকস্মিকই বদলে গেলো। ইমাম খোমেনী পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে বক্তব্য পাঠাতে লাগলেন ইরানে। আর গোটা বিশ্বও জেনে গেলো : একটি বিপ্লব অত্যাসন্ন।
শেষের দিকে ইমামের নাম উচ্চারণ করাও নিষিদ্ধ ছিলো। কোনো জনসভায় ইমামের নাম উচ্চারিত হতে পারতো না বর্বর সাভাক বাহিনীর ভয়ে। আর এই সাভাক বাহিনী তাদের নিষ্ঠুরতার প্রশিক্ষণ পেয়েছিলো মার্কিন ও ইহুদি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে, আগেই বলেছি। প্রসঙ্গত, আমাদের দেশেও বর্তমানে বিদেশী বাহিনীর হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী অনুরূপ জুলুম–নির্যাতনেই নিয়োজিত। যাহোক, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বরে (১৯৭৮ সালে) ইমাম খোমেনীর বড় ছেলেকে বিষ প্রয়োগে হত্যার ঘটনা ইরানে আবারও ইমাম খোমেনীর নাম ধ্বনিত করলো। সাধারণ মানুষ ইমামের ছেলের শাহাদাতে শোকসভা করতে শুরু করলো। বর্বর সাভাক বাহিনীকে উপেক্ষা করে চারিদিকে উচ্চারিত হতে থাকলো বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনীর নাম। শাহ বিষয়টাকে ছাড় দিতে পারতো : এমনিতেই কিছুদিন পর মানুষের শোক স্তিমিত হয়ে আসতো। কিন্তু শাহ উল্টা পথ বেছে নিলো : স্বৈরশাসকের চিরাচরিত নিপীড়নমূলক পথ। সিভিল গভর্নমেন্ট বাতিল করে সেনা শাসন নিয়ে এলো মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী। নিরস্ত্র শোকাচ্ছন্ন জনতার বিপরীতে রাস্তায় নেমে পড়লো সশস্ত্র সেনা, ট্যাংক, অস্ত্র, গোলাবারুদ।
এযাবৎকাল পর্যন্ত ইরানে যত রাজা–ই শাসন করেছে, তারা ধর্মীয় নেতাগণকে সম্মান করতো। এর মূল কারণ ছিলো জনগণের মাঝে ধর্মীয় নেতাগণের শক্তিশালী প্রভাব। তবে যেহেতু ধর্মীয় নেতাগণ রাষ্ট্র ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ ও সরকার উৎখাতের কোনো চেষ্টা করতেন না, বরং শরিয়ত শিক্ষাদানের মাঝেই নিজেদের কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ রাখতেন, সেহেতু কোনো বড় ধরণের কনফ্লিক্টের সৃষ্টি হতো না। রেজা পাহলভী প্রথম চেষ্টা করে তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের অনুকরণে ইরানে সেক্যুলারিজম আমদানী করতে। অথচ ইসলামী চেতনায় দৃঢ় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় সেক্যুলারিজম কখনোই টিকবে না, ইন ফ্যাক্ট, সেক্যুলারিজম জিনিসটাই একটি দুর্বল ব্যবস্থা যা ভেঙে পড়তে বাধ্য – এই ঐতিহাসিক এবং দার্শনিক সত্যটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলো সে। ফলস্বরুপ আলেমগণের উপর নির্যাতন শুরু করলো, এবং আঘাত হানলো ইসলামের উপর, আর যা চালিয়ে গিয়েছিলো তার ছেলে মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী। ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। স্বৈরশাসকেরা সবসময়ই ভুল করে থাকে, আর সত্য স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং শোকাচ্ছন্ন জনগণের উপর শাহের জালিম বাহিনীর নির্যাতন শোককে শক্তিতে পরিণত করলো। শুরু হলো রাজপথে সরাসরি আন্দোলন। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে এলো। আর বর্বর বাহিনীও চালিয়ে যেতে লাগলো প্রকাশ্য গণহত্যা। এলো সেই বিপ্লবী ডাক :

“জেগে উঠুন হে জনগণ ! সাবধান হোন, কারণ আপনাদের শত্রু শক্তিশালী। সে ট্যাংক ও মেশিনগান নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু এসব অস্ত্রকে ভয় পাবেন না। আপনারাই সঠিক পথে আছেন। হক আপনাদের সাথে আছে। আর সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা আপনাদের সাথে আছেন। ভয় পাবেন না, কারণ আপনারাই বিজয়ী হবেন ইন–শা–আল্লাহ।”
টর্চারিং সেলে নিয়ে সাধারণ মানুষ, বিশেষতঃ ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টদের উপর নিষ্ঠুরতম নির্যাতন চালানো হলো, যার চিহ্ন এখনও অনেকে বয়ে বেড়াচ্ছেন। লোহার বিছানায় তরুণ ছেলেদের বেঁধে রেখে নিচে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করাসহ বর্ণনার অযোগ্য সব নির্যাতন চালিয়েছিলো শাহের জাহান্নামী বাহিনী। ইরানের বেহেশতে যাহরা কবরস্থানে বিপ্লবের এই হাজার হাজার শহীদ ঘুমিয়ে আছেন।
এর ঠিক এক বছর আগেই ডিসেম্বর ১৯৭৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানে গিয়ে বলেছিলো : “ইরান তার চমৎকার নেতৃত্বের মাধ্যমে এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে…।” ইরান থেকে সিআইএ যে রিপোর্ট পাঠাতো, তাতে ইরানের ব্যাপারে মোটামুটি সন্তুষ্ট ছিলো আমেরিকা। আর সিআইএ ইরানি সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে যখন তথ্য সংগ্রহ করতো, তারা বলতো যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণেই আছে। তাছাড়া সেসময়ে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি নিয়ে ব্যস্ত ছিলো আমেরিকা। সুতরাং… ইরানের বিপ্লব ছিলো তাদের উপর এক বিরাট আঘাত। আরো একটি বড় কারণ ছিলো, সিআইএ আর সমস্ত পরিবেশে অনুপ্রবেশ করতে পারলেও, ইসলামী পরিবেশকে তারা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়নি। তাদের ধারণা অনেকটা এরকম ছিলো যে : “এসব মোল্লা মৌলভি, এদের দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, এরা আর কদ্দুর কী করতে পারবে। আর যদি কিছু করেও, আমরা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আর আমাাদের অস্ত্রশস্ত্র ও ইন্টেলিজেন্সকে ব্যবহার করে এদেরকে উৎখাত করতে পাবরো সহজেই।” কিন্তু এ ছিলো এক চরম ভুল। প্রকৃতপক্ষে, নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল অত্যন্ত দুর্বল।

ইমাম খোমেনীর এক ছাত্রের ইমামতিতে ইদুল ফিতরের নামাজ শেষে লাখো মানুষ তাদের দাবী নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লো। তেহরানের কসাই বলে পরিচিত এক জেনারেল আদেশ দিলো যেকোনো মিছিল দেখামাত্রই গুলি করতে। পাশ্চাত্য মিডিয়াই সেদিনের মৃতের সংখ্যা ৪ হাজার বলে প্রকাশ করে, প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরো অনেক বেশি। আর্মির গুলির মুখে হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষ শহীদ হয়ে গেলেন। এই হাজার হাজার শহীদ চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বেহেশতে যাহরা কবরস্থানে।
৭ লক্ষাধিক সদস্যের ইরানি আর্মি ছিলো তৎকালীন বিশ্বের পঞ্চম শক্তিশালী আর্মি। এত বৃহৎ শক্তিশালী বাহিনীর সামনে মানুষ কী করবে ? ইমামের স্ট্র্যাটেজি ছিলো অত্যন্ত প্রাজ্ঞ। ইমাম বাণী পাঠালেন :
“আর্মির বুকে আঘাত কোরো না, বরং তাদের হৃদয়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করো। সৈন্যদের হৃদয় তোমাদের কামনা করতে হবে। এমনকি তারা তোমাদের গুলি করলেও। তোমাদের বুক পেতে দাও। কারণ যখন তোমরা আল্লাহর রাহে জীবন দিয়ে দিচ্ছো, তখন তোমাদের রক্ত এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা তাদেরকে প্রভাবিত করবে। একজন শহীদের রক্ত হলো হাজার মানুষকে জাগিয়ে তোলার ঘন্টা।”
বিক্ষোভকারীরা সৈন্যদের রাইফেলের মুখে গুঁজে দিলো ফুল, আর তাদের স্লোগান ছিলো : “আর্মি আমাদের ভাই, তোমরা কেনো ভাইকে হত্যা করো !” বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী নারীগণ ফুল ছুঁড়ে দিলেন সেনাদের দিকে, আর বললেন : “আমরা তোমাদেরকে ফুল ছুঁড়ে দিলাম, বিনিময়ে তোমরা আমাদেরকে গুলি করে শহীদ করে দাও।” সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ইমামের আহবান ছিলো :
“তোমরা শাহের কাজ আঞ্জাম দিও না, কারণ সে শয়তান। আর তোমরা হলে আল্লাহর সৈন্য। তোমাদের মুসলিম ভাইয়ের উদ্দেশ্যে অস্ত্র চালিও না। কারণ একজন মুসলিমের বুকে একটি বুলেট মানে কুরআনের বুকে একটি বুলেট। তোমাদেরকে নিজেদের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে হবে, নিজেদের বাড়িতে, শহরে। তোমাদেরকে মসজিদে ফিরে যেতে হবে, ফিরে যেতে হবে আল্লাহর কাছে।”
ইমামের সাথে ছিল আল্লাহর প্রতিশ্রুত সাহায্য। দলে দলে সৈন্য যোগ দিলো বিপ্লবে। ইমামের নেতৃত্ব মেনে নিলো। বিপ্লবী কমিটি থেকে নির্দেশ দিয়ে দেয়া হলো যাদের যা পোশাক আছে নিয়ে আসতে। বিপ্লবে যোগদানকারী সেনারা আর্মির পোষাক ছেড়ে ঐ পোষাক পরলেন। তবুও তাদেরকে আর্মি ছাঁটের চুল দেখে নিপীড়ক বাহিনী শনাক্ত করছিলো। এই দেখে বিপ্লবী কমিটি সব বিপ্লবী যুবককে আর্মি ছাঁটে চুল কাটাতে নির্দেশ দিলো। সৈন্যেরা মিশে গেলো বিপ্লবীদের সাথে। ইমামের আদেশ এলো :
“ছোটো ছোটো দলে আর্মি ত্যাগ করো। একা হোক, কিংবা দু‘জন তিনজন করে। তোমরা আল্লাহর সৈন্য। তোমাদের অস্ত্র সাথে নাও, সেগুলো আল্লাহর অস্ত্র।”
ইমামের সমর্থনে যখন বেশিরভাগ ব্যারাক খালি হয়ে গেলো, তখন ইমাম খোমেনী বাজারের দিকে মনোনিবেশ করলেন। “বাজার” হলো আমাদের এখানকার মতিঝিল এলাকার মতো, যা কয়েকদিন বন্ধ থাকলে গোটা অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। ইমামের আহবানে সাড়া দিয়ে বাজার স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘটে গেলো, ইরানের অর্থনীতি হয়ে পড়লো স্থবির। এরপর তেলকূপগুলোর কর্মীদেরকে সম্বোধন করলেন ইমাম। নির্দেশ দিলেন দেশের চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদন বন্ধ করে দিতে। শাহ বললো, যদি তেলকূপের কর্মচারীরা ধর্মঘট বন্ধ করে কাজে ফিরে না যায়, তবে তাদের সবাইকে গুলি করা হবে এবং ইসরাঈল থেকে শ্রমিক ও টেকনিশিয়ান এনে তেলকূপ চালানো হবে।
ইরানের তেলকূপে ধর্মঘটের সুযোগে কাজ করতে আসা যেকোনো বিদেশী, হোক সে ইসরাইলী বা অন্য যেকোনো দেশের, তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়ে ফতোয়া জারি করলেন ইমাম খোমেনী। এছাড়াও ধর্মঘটের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদেরকে ধর্মীয় অথরিটির ফান্ড থেকে টাকা দিতে বলা হলো। সাথে সাথে ইমামের ছাত্ররা তেলকূপের কর্মচারীদের মাঝে টাকা বন্টন করে দিলেন, আর এদিকে ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা মার্কিন ও পশ্চিমা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা চালাতে লাগলো : ব্যাংক, হোটেল, এয়ারলাইনস…। গোটা তেহরান তখন জ্বলছিলো, কিন্তু শাহের কিছুই করার ছিলো না।
শাহের পলায়ন
এরপর ইমাম খোমেনী আশুরা উপলক্ষ্যে মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতে নির্দেশ দিলেন। সর্বোচ্চ জনশক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণ করার জন্য যে, এদেশের মানুষ আর শাহকে চায় না। তারা এই রাজতন্ত্র চায় না। সামরিক সরকার সকাল–সন্ধ্যা কারফিউ জারি করলো, এমনকি মসজিদের অভ্যন্তরে পর্যন্ত। ইমাম খোমেনী আদেশ দিলেন বাড়ির ছাদে বিক্ষোভ প্রদর্শনের। সেরাতে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর ছিলো এমন : “সারা তেহরানের বাড়িগুলোর ছাদ থেকে ভেসে আসা আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে তেহরানের মাটি কাঁপছে।“
শাহ ষড়যন্ত্র করলো এক ব্যাপক গণহত্যার। এর মূল টার্গেট ছিলো বিপ্লবের নেতৃস্থানীয় আলেমগণ। আজাদী স্কয়ারে সমবেত বিপ্লবের মূল আয়োজকদের হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হলো। কিন্তু আল্লাহর কী ইচ্ছা – সেই বিকেলেই লাভিযান এর ক্যাম্প থেকে বিপ্লবে যোগ দেয়া এক তরুণ সেনা এসে শাহের ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনাকারীদের গুপ্তহত্যা করলো।
এসময়ে শাহ বুঝতে পারলো দেশ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে, এবং ইরানে তার আর কোনো স্থান নেই। আর্মি সরকার কারফিউ তুলে নিলো, এবং সাথে সাথে তেহরানের রাস্তা পরিণত হলো জনসমুদ্রে। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এক অস্পষ্ট, বিভ্রান্তিকর ভাষণ দিলো শাহ। মিলিটারি সরকারকে প্রতিস্থাপিত করলো শাপুর বখতিয়ারের নেতৃত্বে নতুন এক সরকার দিয়ে। আর এসব পরিকল্পনা তাকে দেয়া হচ্ছিলো ওয়াশিংন থেকে। জনগণের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির জন্য তারা ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালালো যে, শাপুর বখতিয়ার হলো শাহের দীর্ঘদিনের শত্রু, একজন মানবতাবাদী কর্মী, ইত্যাদি।
দশদিন পর…। তেহরানের মেহরাবাদ এয়ারপোর্ট মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী ও তার স্ত্রী রানী ফারাহ দিবা পৌঁছে গেলো। প্রেসের কাছে নিতান্ত হাস্যকরভাবে বললো : “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক‘দিন বেড়িয়ে আসি।”
১৬ই জানুয়ারী, ১৯৭৯। প্লেনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ইরানের দিকে একবার ফিরে তাকালো এককালের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাহ এবং তার রানী। সারা দুনিয়া তখন সঙ্কুচিত হয়ে আসছিলো তার জন্য। প্লেনের উড্ডয়নের সাথে সাথে ইরানের ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটলো। পরবর্তীতে নানান দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করে ক্যান্সারে ভুগে এযুগের ফেরাউনের শেষশয্যা রচিত হলো মিশরে। এমনকি যেই আমেরিকার গোলামিতে সারাটা জীবন সে ব্যয় করলো, সেই আমেরিকাও তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো।
শাপুর বখতিয়ার সরকারের মার্কিন প্রভুরা ভাবলো, “এইসব “মোল্লারাই” আপাতত বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিক। এরা তো দুনিয়াবি বিষয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন নয় এবং রাজনৈতিক দূরদর্শীতাও এদের নেই; কিছুদিন পার হলে আমরাই আবার ক্ষমতা লাভ করবো।” কিন্তু আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনা ছিলো ভিন্ন। আর আল্লাহর পরিকল্পনার বিজয়ী হওয়া অনিবার্য। শাপুর বখতিয়ার তার মার্কিন প্রভুদের সাহসে এমনকি ইমাম খোমেনীকে “মাথা খারাপ বুড়ো” পর্যন্ত বলে বসলো। কিন্তু শাপুরের গদিলাভের একমাস যেতে না যেতে সেই “বুড়োই” তাকে সমূলে উৎখাত করে দিলেন। দেশত্যাগের সময় প্রধানমন্ত্রী, সেনা প্রধান ও প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে যে রাজপরিষদ গঠন করে গিয়েছিলো শাহ, সে পরিষদের সভাপতি প্রধান বিচারপতি নিজে প্যারিসে গিয়ে ইমামের আনুগত্য ঘোষণা করেন। ইরানের রাস্তায় রাস্তায় তখন আনন্দ মিছিল আর মানুষের হাতে ইমামের ছবি।
ইমামের দেশে ফেরার প্রস্তুতি
এবার প্যারিস থেকে ইমাম আরেকটি ডাক দিলেন। তা ছিলো শাপুর বখতিয়ারের একমাস বয়সী সরকারকে উৎখাত করা। ১৪ বছরের “ধ্বংস হোক শাহ” শ্লোগান বদলে গেলো “ধ্বংস হোক বখতিয়ার” – এ। আবারও রাস্তায় নেমে এলো জনগণ।
ইমাম আকস্মিকই দেশে ফেরার ঘোষণা দিলেন। সেই সংবাদে বখতিয়ার সরকার এয়াপোর্ট বন্ধ ঘোষণা করলো। অবশিষ্ট যেসব শাহপন্থী সৈন্য ছিলো, তাদের ট্যাংক, অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ঘেরাও করে রাখলো এয়ারপোর্ট। ইমাম ঘোষণা দিলেন যে এয়ারপোর্ট খোলামাত্রই তিনি দেশে ফিরবেন।
মেহরাবাদ এয়ারপোর্ট। চারিদিকে ঘিরে রেখেছে শাহপন্থী সৈন্য ও তাদের ট্যাংক। এবার তাদেরকে ঘিরে ধরলেন ইরানী জনগণ। লক্ষ লক্ষ লোক এয়ারপোর্টের চতুর্দিক ঘেরাও করে ফেললো। ইমাম খোমেনীর নামে শ্লোগান দিতে থাকলো তারা।
ইরান ফিরতে গেলে বিমানে গুলি করে ইমামকে হত্যা করা হতে পারে, এই আশঙ্কায় প্যারিসে ইমামের সঙ্গী সাথী সকলেই এই পরিস্থিতিতে ইরান যাওয়ার বিরোধিতা করলো। কিন্তু ইমাম যেনো আল্লাহর আদেশ পেয়েছিলেন ইরানে ফিরে যাবার জন্য। তাই তিনি বললেন : “তোমাদের বিপদ হতে পারে। আমি আমার সাথে আসার জন্য কাউকে বলবো না।” কিন্তু ইমামের ভক্তরা ইমামকে রক্ষায় নিজেদের জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিলেন। সুতরাং তারা সকলেই ইরান যাত্রায় ইমামের সঙ্গী হলেন। ১৫০ জন সাংবাদিক ও ৫০ জন উপদেষ্টাকে নিয়ে ইমাম যাত্রা করলেন ইরানের উদ্দেশ্যে। উৎকণ্ঠিত প্লেনের সব যাত্রী। কিন্তু প্রশান্ত ইমাম তাঁর কেবিনে নামাজ আদায় করছেন। এ যেনো নূহ (আ.) এর সেই নৌকা, আল্লাহর ইচ্ছায়ই যার গতি ও আল্লাহর ইচ্ছায়ই যার স্থিতি।
………………………………………….
(চলবে)
(অখণ্ডভাবে মূল লেখাটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।)
ফেইসবুকে নোট আকারে দেখুন : ( প্রথম খণ্ড।) ( দ্বিতীয় খণ্ড।) ( তৃতীয় খণ্ড।) ( চতুর্থ খণ্ড।)
সম্পূর্ণ লেখাটি ডাউনলোড করুন (ওপেন হবার পর Ctrl+S চাপতে হবে) : ( Complete PDF (15 MB)) ( Text-only PDF )





