ইরানের ভূমিতে পদার্পন
এয়ার ফ্রান্স লেখা প্লেনটি যতই অগ্রসর হচ্ছে, ততই লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। অথচ যার জন্যে এত আয়োজন, সেই ইমাম ছিলেন খুবই শান্ত। দেশের মাটিতে নামার পর তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয়, আপনার অনুভূতি কী ? তিনি বলেছিলেন – কিছুই না।

প্লেনের চাকা মাটি স্পর্শ করলো। ইরানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো – ইসলামী ইরান। ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন ইমাম খোমেনী। সে এক অন্যরকম দৃশ্য। সাথে তাঁর ছোট ছেলে আহমাদ। ইরানের মাটিতে ইমাম খোমেনীর পদার্পনের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইচ্ছা পূরণ করলেন।
ইমাম এসে দাঁড়ালেন। তাঁর উদ্দেশ্যে সমবেতভাবে গাওয়া হলো বিপ্লবের সেই গান : “খোমেইনী এই ইমাম”।

তেরানের মেহরাবাদ এয়ারপোর্ট থেকে একটি গাড়িবহর বেরিয়ে এলো। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে সেদিন রাস্তায় ৭০ লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত হয়েছিলো। ইমাম গাড়ি নিয়ে এগুতে পারলেন না। এমনকি লাঠি দিয়ে পিটিয়েও মানুষকে দূরে সরানো যাচ্ছিলো না। গাড়ির উপরে, পাশে – চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। কয়েকবার মানুষ গাড়িকে উঁচু পর্যন্ত করে ফেলেছিলো। গাড়ির ভিতরে কেবল অন্ধকার – মানুষের কারণে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। গাড়ি আর ঠিকভাবে চালানো গেলো না, মানুষই যেনো গাড়িকে ঠেলে নিচ্ছিলো। মানুষের ধাক্কা ও চাপের কারণে পথিমধ্যে গাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে ইমামকে কোনোমতে একটা হেলিকপ্টারে উঠানো হলো। হেলিকপ্টার সরাসরি চলে গেলো বেহেশতে যাহরা কবরস্থানে, যেখানে ইসলামী ইরানের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতাগণ ঘুমিয়ে আছেন। শহীদদের কবরস্থানে পৌঁছে ইমাম তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা দিলেন। এর আগে একটা গান পরিবেশন করা হয়। “হে আল্লাহর পথের শহীদগণ ! জাগো ! তোমাদের নেতা তোমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন…” এই কথার মর্মস্পর্শী গানটি সমবেতভাবে গায় কিশোরদের একটি দল, আর মঞ্চে ইমামের চারিদিকের বিপ্লবীদের কাঁদতে দেখা যায়। এর মাঝেও ইমাম অত্যন্ত শান্ত থাকেন, এবং তারপর তাঁর বিখ্যাত সেই বক্তৃতা দেন, যেখানে ইসলামী হুকুমত কায়েমের ঘোষণা দেয়া হয়। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই বক্তৃতার শুধুমাত্র সেই বিখ্যাত ঘোষণাটি তুলে ধরছি, যখন ইমাম খোমেনী ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা দিলেন :

“আমি সরকার নিয়োগ করবো, আমি এ সরকারের মুখে মুষ্ঠাঘাত করবো, জনগণের সমর্থন নিয়ে এবং জনগণ আমাকে যেভাবে গ্রহণ করেছে সেই শক্তির বলে আমি একটি সরকারকে নিয়োগ প্রদান করবো।”
“একটা দেশে দুইটা সরকার থাকতে পারে না। অবৈধ সরকারকে বিদায় নিতে হবে। (হে সরকার !) তোমরা অবৈধ ! আমরা যে সরকারের কথা বলি, তা জনগণের মতামতের উপর নির্ভর করে। সেটা আল্লাহর আইনের উপর প্রতিষ্ঠিত। তোমাকে হয় আল্লাহ নয়তো জনগণের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত হতে হবে।”

অস্থায়ী হেডকোয়ার্টার হিসেবে তেহরানের একটি স্কুলে উঠলেন ইমাম খোমেনী। স্কুলপ্রাঙ্গন হাজার হাজার সমর্থকে ভরে উঠলো। কিন্তু তখনও বিপ্লব নিষ্কন্টকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তী দশদিন শাহের অতি অনুগত সেনাবাহিনী বিপ্লবী জনতাকে মোকাবিলা করার ব্যর্থ চেষ্টা চালাতে লাগলো। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছাই বিজয়ী হওয়ার ছিলো।
আমেরিকা থেকে এক জেনারেল এলো ইরানে, ইমামকে হত্যা ও সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা নিয়ে। ইমামের ছাত্র, হুজ্জাতুল ইসলাম আলী আকবর হাশেমী রাফসানজানি এসে ইমামকে স্কুল ত্যাগ করতে বললেন, কারণ আর্মির পরিকল্পনা ছিলো পুরো বাড়ি বম্বিং করে ধ্বংস করে দেয়ার। কিন্তু ইমাম বললেন :
“আমি এখান থেকে নড়বো না। আমি এখানেই থাকবো, কিন্তু তারা এই জায়গায় বম্বিং করতে সক্ষম হবে না। আর যদি করেও, মানুষ তাদেরকে ধরে ফেলবে। যাও, ব্যারাকগুলো দখল করো । কিছুই হবে না।”
রক্তপাত কমানোর জন্য ইমাম অত্যন্ত প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একদিকে তিনি যেমন বিপ্লবীদের বলেছিলেন সেনাদের হত্যা না করতে, বরং সেনাদের জন্য বুক পেতে দিয়ে তাদেরকে ভালোবাসা দিতে, তাদের হৃদয় জয় করতে, অপরদিকে তেমনি সেনাদেরকে বলেছিলেন মুসলিম ভাইকে হত্যা না করতে। কিন্তু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বেহেশতে যাহরার ভাষণে ইমামের আহবানেও যে সেনারা সাড়া দিলো না, তখন ইমাম তাদের ব্যারাক দখল করে নিতে বললেন। শুরু হয়ে গেলো সশস্ত্র জিহাদ। ছাত্ররা পুলিশ স্টেশন দখল করতে শুরু করলো। এক একটি স্টেশন দখলের সাথে সাথে আরো বেশি অস্ত্র ও যান–বাহন তাদের হাতে চলে আসছিলো। এই নিয়ে এয়ার বেইজে আক্রমণ চালানো হলো। দীর্ঘ যুদ্ধের পর তাদের সিকিউরিটি ভাঙতে সক্ষম হন বিপ্লবীরা।
বেশ কিছুদিন এই যুদ্ধ চললো। অবশেষে বারো দিন পর, ১২ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালে হতাশ আর্মি প্রধানরা পালিয়ে যাবার আগে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দিয়ে গেলো। দুপুরের পর রেডিও স্টেশন দখল করে নিয়ে বিপ্লবীরা ঘোষণা দিলেন :
এরপর ইসলামী ইরানের গল্প…
সেটা আরেকদিন হবে। তবে শেষ করতে চাই ১৯৮১ সালে ইসলামী ইরানের প্রতিষ্ঠাতা, অবিসংবাদিত নেতা, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ইমাম খোমেনী কর্তৃক ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রধান বিচারপতির নিকট জমা দেয়া সম্পত্তির বিবরণ দিয়ে। গোটা ইরানি জাতি যাঁর জন্যে জান কোরবান ছিলো, ১৯৮১ সালে সেই ইমাম খোমেনীর সম্পত্তির বিবরণ ছিলো নিম্নরূপ :
নাম : রুহুল্লাহ
বংশগত উপাধি : মোস্তফাভী, খোমেনী নামে পরিচিত।
আইডেনটিটি কার্ড নং : ২৭৪৪
ইস্যুর স্থান : খোমেইন
পেশা : ধর্মীয় নেতা / ধর্মতত্ত্ববিদ (clergyman)
১। স্থানান্তর অযোগ্য / স্থায়ী সম্পত্তি (বিস্তারিতভাবে) : ভিতরে ও বাইরে কিছু জায়গাসহ
ক. কোমের বাগ–ই–কালেহ তে একটি বাড়ি।
খ. আমার পিতা থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে একখণ্ড জমি (যৌথভাবে বড়ভাই জনাব মুর্তাজা পসন্দিদাহ, আমি ও আমাদের মরহুম ভাই জনাব হিন্দির সন্তানাদিসহ) পেয়েছি। আমার ভাইয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী আমার অংশ থেকে বার্ষিক আয় চার হাজার রিয়াল (৫৪ ডলার)।
(i) তেহরানে সামান্য কিছু অর্থ রয়েছে যা আমাকে ব্যক্তিগত উপহার হিসেবে দেয়া হয়েছিল।
(ii) আমার নিজের কোন আসবাবপত্র নেই। যে কয়েকটি আসবাব কোমে ও তেহরানে আছে এগুলো আমার স্ত্রীর। আমাকে ব্যবহারের জন্য হাদিয়া হিসেবে দুটো কার্পেট দেয়া হয়েছে, যদি আমি এগুলো ব্যবহার করা দরকার মনে করি। এগুলো আমার বা আমার বংশের কোনো সম্পত্তি নয় এবং এগুলো অবশ্যই অভাগ্রস্ত “সা‘দাত” (রাসূল (সা.) এর বংশের) লোকদের দিয়ে দিতে হবে।
আর আছে কিছু বই, যার অনেকগুলো শাহ আমলের নিরাপত্তা পুলিশ আমার বাসা অবরোধ করার সময় বাজেয়াপ্ত করেছিলো, কতকগুলো বই আমার তেহরানে থাকাকালে সেগুলোর লেখকগণ উপহার দিয়েছেন। এগুলোর মূল্য আমি জানি না, তবে তার পরিমাণ খুব বেশি হবে না।
আমার বাসার আসবাবগুলো (জামারানে) বাড়ির মালিকের।
(iii) উপরোল্লিখিত পরিমাণ ছাড়া যে সমস্ত অর্থ ব্যাংকে বা বাসায় রয়েছে তা আমি কতিপয় ব্যক্তিকে দিয়েছি। এগুলোতে আমার বা আমার সন্তানদের কোন অধিকার নেই। আমি তাদের অংশ আমার অসিয়তে নির্দিষ্ট করে দিয়েছি।
রুহুল্লাহ আল–মুসাভী আল–খোমেনী
জানুয়ারি ১৪, ১৯৮১
………………………………………….
(শেষ)
(অখণ্ডভাবে মূল লেখাটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।)
ফেইসবুকে নোট আকারে দেখুন : ( প্রথম খণ্ড।) ( দ্বিতীয় খণ্ড।) ( তৃতীয় খণ্ড।) ( চতুর্থ খণ্ড।)
সম্পূর্ণ লেখাটি ডাউনলোড করুন (ওপেন হবার পর Ctrl+S চাপতে হবে) : ( Complete PDF (15 MB)) ( Text-only PDF )




