ইবনে তাইমিয়ার আস সিয়াসাতুশ শারিয়ার অনুবাদ পলিটিকাল শারিয়া করাটা ভুল-এটা সহজেই বুঝা যায়। তবে এই ভুলের একটা ইতিহাস আছে,অনুমান আছে।তুহিন খান এইটা নিয়া একটা ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিছে।
ওর নিজেরও এই বিষয়ে কিছু অনুমান আছে। মানে তুহিন যখন সমালোচনা করছে, তখন সে নিজের চিন্তার পর্যালোচনা করতেছেনা।
আশরাফ মাহদি এইগুলার ক্রিটিক করলো কমেন্টে। এর উপর কিছু মন্তব্য করবো, বিস্তারিত লেখার সময় পাচ্ছিনা, আপাতত ইশারা দিয়ে রাখছি।
১) রাজনৈতিক ইসলামের ধারণা ও তরিকাটা পূর্ণ ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করেনা। একই সাথে যে কোন চিন্তাকেই তার কোন বিশেষ দিকের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করলে এই সঙ্কটটা হবে।ছুফি ইসলাম বা গণতন্ত্র মানেই নির্বাচন করে বৈধতা ধরে রাখা।এদেরও একই ধরণের সঙ্কট।
২) আমরা যেমন করি, রাজনৈতিক ইসলামকে আক্রমণ শুরু করি, এতেও প্রশ্ন আছে। মানে এই আক্রমণের মধ্য দিয়া সঙ্কটের মীমাংসা হয়না। যেহেতু পূর্ণ ইসলামি সিস্টেম এখন হাজির নাই। অবশ্য বহু আগেই আদর্শ ইসলামি সিস্টেম ভেঙ্গে পড়েছিল। তবে, বাস্তবতা মেনে সিস্টেমের ইসলামি অনুমোদনের ব্যাখ্যা ফুকাহাগণ করেছেন, রাজনীতি ও ফিকাহের ভাষায় একে অয়াকে বা জরুরত বলে।
৩) পাকিস্তান রাষ্ট্র বা যে কোন মুসলিম আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাই হয়েছে এই জরুরতের ভিত্তিতে। তবে এই জরুরতের ব্যাখ্যা যে ভেঙ্গে পড়ছে এ নিয়ে কোন সন্দেহ নাই। এই জায়গার থেকেই রাজনৈতিক ইসলামের আগমন।
৪) ব্যাখ্যার একটা সমস্যা হচ্ছিল, আমরা দেখেছি। এর দুটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়; ট্র্যাডিশনাল ব্যাখ্যা থেকে বের হবার চেষ্টা এবং দেশের বৈধতা, নৈতিকতা ও ক্ষমতার ধারণায় ক্রমবিবর্তন-রাষ্ট্রের সাথে ইসলামের দূরত্ব। ট্র্যাডিশনাল ব্যাখ্যার সমস্যা ছিল, সন্দেহ নাই।তবে তার যে কোরআন-হাদিসের সাথে সম্পর্ক ছিল, দীর্ঘ চর্চা ছিল, ফলে তার মধ্যে ব্যাখ্যার যে ক্ষমতা ছিল তা আধুনিক ইসলামি চিন্তকদের মধ্যে ছিলনা। ফলে আধুনিক ইসলামি চিন্তকদের অনুসারিরাও রাজনৈতিক ইসলামের প্রস্তাবের অনুমানের গোঁড়ার জায়গাগুলোর চর্চা না করে কীভাবে রাজনৈতিক ইসলাম ট্র্যাডিশনাল চিন্তার বিরোধী নয় এই কাজেই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। ফলে সঙ্কট ও সম্ভাবনা আর অগ্রসর হয়নি। তবে, মূল অনুঘটকের কাজ করেছে আধুনিক চিন্তা আরও স্পষ্ট করে বললে খৃস্টান ধর্মীয় চিন্তা। বিশেষত মুকাদ্দাস ধারণা, তার চিন্তা ও কর্মের শাখায়, ধর্মতত্ত্বের ভাষায় আকিদা ও আমল।
৫) আধুনিক চিন্তায় এই খৃস্টান ধর্মীয় চিন্তা কীভাবে প্রভাব সৃষ্টি করছে? মোটাদাগে তিনটে প্রভাব সৃষ্টি করেছে;
এক, খৃস্টান ধর্মীয় সার্বভৌমত্ব ধারণা থেকে আধুনিকতা বের হতে পারেনি, শুধু বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। এতে সমস্যা শেষ হয়নি, আরও বেড়েছে। আগে মানুষ ধর্মের নামে জুলুম করতো। এখন করে রাষ্ট্র ও আধুনিকতার নামে বা সেই সংশ্লিষ্ট বৈধতা, নৈতিকতা ও ক্ষমতার মাধ্যমে।
দুই, খৃস্টান ধর্মীয় চিন্তার মুকাদ্দাস বা পবিত্রকরণ থেকেই বের হতে পারেনি। বরং দার্শনিকতার মধ্য দিয়ে যে টার্মগুলো সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে ধর্মীয় পবিত্রতার ম্যাটাফিজিক্সের মধ্যেই আটকে গেছে। এই দুই বিষয়ে ইসলামের সাথে খৃস্টান ধর্মের গুরতর তর্ক ছিল। কালামি কিতাবগুলো দেখলেই বুঝা যাবে। তাইমিয়ার একটা বই আছে, বুদ্ধি ও বর্ণনার মধ্যে বিরোধের নিরসন। এই বইয়ের মূল অনুমান হচ্ছে, দার্শনিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবতা ব্যাখ্যায় বিরোধ দূর করা। মানে দার্শনিক চর্চার ফলে যে অনুমানগুলো সৃষ্টি হয়েছে, তাকে সত্য মনে করার ফলে বাস্তবতা ব্যাখ্যায় যে সমস্যা হয়েছে, তাকে রোধ করা।
তিন, ক্ষমতা ও চিন্তার সঙ্কটের ফলে দেখা যাচ্ছিল, ইউরোপে মধ্যযুগে সবাই দার্শনিকতা বা ধর্মচর্চার নামে বাটপারি করতেছেন। এমনকি চেরাগায়ন কালের দার্শনিকরাও বাটপারি করছেন-হেগেল বিশেষত। তো, এই জায়গার থিকাই নিতশের উত্থান হইছে। নিতশের শেরেকি ও মুক্তির ধারণাগুলা ধর্মীয়ভাবে পাঠ করা জরুরি। এমনকি মার্ক্সের ব্যাখ্যায় দার্শনিকভাবে যত সমস্যাই থাকুক (দেখুন; শিয়া তাত্ত্বিক সাইয়েদ বাকের ছদর ও রামাদান বুতির মার্ক্স পাঠ।) মুক্তির ধারণাটাও মজার-ফিকশন আকারে হলেও।
৬) তো, আমরা দেখলাম আধুনিকতার মাধ্যমে পৃথিবীতে একটা বিশাল পরিবর্তন এসেছে-ক্ষমতায় ও চিন্তায়। ফুকাহাগণ আর জরুরতের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারছেননা। ইসলাম এই প্রথম সিস্টেম থেকে সামগ্রিকভাবে হাজিরি থেকে বিদায় নিল। এখন কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? প্রত্যেকে তার নিজের সক্রিয়তা ও বর্তমান সঙ্কট-ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে ইসলামকে ভাগ করা শুরু করলো। সামান্য সংখ্যক আলেম বা চিন্তক ছাড়া সকলেই এই সমস্যায় পড়েছে। আমরা যদি রাজনৈতিক ইসলামের সঙ্কটের কথা বলি, তাহলে একই সাথে মাদরাসা-ইসলাম ও তাবলীগি ইসলামের সঙ্কটের কথাও বলতে হবে।স্মরণ করিয়ে দেই, থানবির একটা বই পড়তেছিলাম যেখানে উনি লেখছেন; সমন্ধ করে রশিদি বা আশরাফি বলা-এক ধরণের শেরেকি!
অবশ্যই, মাওলানা মওদুদি এবং সাইয়েদ কুতুব রাজনৈতিক ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করেন।
৭) কুতুব ও মাওলানার সাথে বেশ ফারাক আছে। প্রখ্যাত আলেম ইউসুফ বিন্নুরি একটা তুলনামূলক পর্যালোচনাও করে দেখিয়েছেন। একই সাথে কুতুবের দেশের আলেমরাও পর্যালোচনা করে অগ্রসর হয়েছেন ফলে তার সাথে অনেকটা মীমাংসা করা গেছে । তার প্রমাণ হচ্ছে, আল-কায়দাকে ভাল লাগুক বা নাই লাগুক আল কায়দা কুতুবের থেকেই বের হওয়া চিন্তা। দেখো, আবদুল্লাহ আজ্জামের কুতুব স্মরণে প্রবন্ধ।
আগে বলি তাদের সমস্যার জায়গাটা কি?
৮) মোটাদাগে দুইটা অনুমানে। আধুনিকতার সমস্যা ও বিস্তারের মধ্যে তারা দেখলেন নয়া ব্যাখ্যা করা দরকার। কারণ, নিতশে ইউরোপিয়ান চিন্তার যে শেরেকির ছায়ার কথা বলেছেন তার মধ্যে ইসলামের ক্ষমতার ধারণা ও অধিকার-বিশ্বাসের ধারণা যায়না।ফলে ট্র্যাডিশনাল জরুরতের ধারণার মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করলে শেরেকি মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু, আমরাও অনেক সময় ভাগ করে বিচার করতে পারিনা। ইসলামের সাথে সেকুলারিজমের মিলও তো আছে- ক্ষমতা ও অধিকার ব্যাখ্যায়। আবার অমিলও আছে, যেমন অমিল আছে ট্র্যাডিশনাল খৃস্টান ক্ষমতা ও অধিকার ব্যাখ্যায়।
ইসলামতো তাওহিদের ধর্ম-মানবিক সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়না।তাওহিদ সার্বভৌমত্বকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়; ধর্মীয় ও মানবিক।মানুষকে আল্লাহ হইতে বলেনা, আবার আল্লাহকেও মানুষ বানায়না। নিমেষেই ইউরোপের হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা জাহেলিয়াতকে নাকচ করে দেয়।
আধুনিক রাজনৈতিক ইসলামের প্রবক্তা যখন দেখলেন ট্র্যাডিশনাল আলেমরা জরুরতের নামে তাওহিদ প্রশ্নে শিথিলতা করছেন, তখন তিনি তাওহিদ ধারণা জামাআহ ও হাকেমিয়াতের মাধ্যমে ইসলামের ব্যাখ্যা করলেন।কিন্তু তার ব্যাখ্যার ক্ষমতা থাকলেও, হাজার বছর ধরে চর্চিত আশআরি, ইসফারাইনি ও তাইমিয়ার ব্যবহার হওয়া পরিভাষা পরিবর্তন করে ফেললেন।তাওহিদের মধ্যে ঐশ্বরিক ক্ষমতাকে জামাআহ ও বয়ানের মধ্যে হাজির করলেন-এতটুকুই তাদের ভুল, একই সাথে সেকুলারিজমের সমস্যাগুলোও।কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক মুখতার শানকিতি ইম্পসিবল স্টেট বই (The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity’s Moral Predicament by Wael B. Hallaq) বিষয়ে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় এর ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন। তাদের অবদানও আছে, আধুনিক শেরেকির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া ,তাওহিদের মধ্যে শিথিলতাকে নাকচ ও ট্র্যাডিশনাল ভাষার জড়তা থেকে বের হয়ে আসা।
৯) কুতুবের ব্যাখ্যাকার ইউসুফ আল কারজাবি বলেছেন, যেমন বলেছিলেন মওদুদির সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যাকার মোহাম্মদ আম্মারাহ- মাওলানা বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন ঠিকই। তবে তাদের অবদানটা ভুলা উচিত নয়। এটা ঠিক যে, আলেমদের মধ্যেও ক্রিটিকগুলো ছিল কিন্তু কুতুবের শৈল্পিক ভাষা ও মাওলানার বিশ্লেষণী ভাষা ছিলোনা। সে শাহ ওয়ালি উল্লাহ থেকে শুরু করে এ অঞ্চলে, সাইয়েদ শহীদ, ইসমাইল শহীদসহ অনেকের মধ্যেই ছিল। শাব্বির আহমদ উছমানি এ অজুহাতেই দেওবন্দ থেকে ইস্তেফা দিয়েছেন।মরহুম মোল্লা উমরের নাম তো জানাই আছে!!
১০) অনেক আলেমই বর্তমানের জিহাদ নিয়ে প্রশ্ন তোলছেন। তবে এর আগে, রাজনৈতিক ইসলামের পাঠ করে নেয়া জরুরি। নিছক নাকচের মাধ্যমে রাজনৈতিক ইসলামের নাকচ করা সম্ভব নয় যতক্ষণ না আধুনিক শেরেকির ছায়া ও তাওহিদের সচেতনতার সামগ্রিক প্রয়োগ সম্ভব হয়। আসলে রাজনৈতিক ইসলামকে অস্বীকার করা অসম্ভব যেহেতু ইসলাম থেকে তাওহিদকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ইসলামের রাজনীতি অংশকে অস্বীকার করা গেলেও তাদের দাওয়াতি ও তাওহিদি কাজের মূল্যায়ন প্রত্যেকের জন্য জরুরি মোমিন হিসেবে। একই সাথে, আগেই যেমন বলেছি আধুনিক ইসলামি চিন্তকদের অনুসারিরাও রাজনৈতিক ইসলামের প্রস্তাবের অনুমানের গোঁড়ার জায়গাগুলোর চর্চা না করে, কীভাবে রাজনৈতিক ইসলাম ট্র্যাডিশনাল চিন্তার বিরোধী নয় এই কাজেই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। ফলে সঙ্কট ও সম্ভাবনা আর অগ্রসর হয়নি। অথচ আমাদের তো অবশ্যই অগ্রসর হতে হবে!
সোর্সঃ ফেইসবুক






