সংগঠন ছাড়া ইসলাম হতে পারেনা?
সংগঠন কি মানুষের স্বাধীন বিচার বিবেচনাবোধকে নষ্ট করে দেয়? চিন্তার মুক্তির কথা বলে নতুন করে চিন্তার দাসত্বের বেড়াজালে আটকে দেয়? গবেষণা মুলক মন নিয়ে কোরআন হাদীস অধ্যয়নের কথা বলে নির্দিষ্ট একটি পথে চিন্তাকে প্রবাহিত করতে বাধ্য করে? একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছুকে দেখতে, ব্যাখ্যা করতে প্ররোচিত করে?
আজ দুপুরে একজন ভাইয়ের সাথে কথা হল। তিনি কথা প্রসংগে হজরত উমর রা: বর্ণিত ‘লা ইসলামা ইল্লা বিল জামায়াতি‘ বক্তব্যটি উল্লেখ করে বললেন; জামায়াত বা সংগঠন ছাড়া ইসলাম হতে পারেনা। আপনি কোনো সংগঠনে সক্রিয় না থেকে তো ইসলাম নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে পারেননা। বললাম, কথাটি বলেছেন হজরত উমর রা:। তাহলে হজরত উমর রা: কি কোনো সংগঠন করতেন? তিনি খেলাফত, জমিয়ত নাকি আন্দোলন কোনটা করেছেন? তাহলে যারা দল করেননা তারা কি ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে গেছেন? তিনি নিরুত্তর হয়ে গেলেও যেভাবে মাথা নাড়ালেন তাতে মনে হল আমার চিন্তাটা ভুল। উনারটা সঠিক।
আসলে হজরত উমর রা: এর বর্ণিত এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসীনে কেরাম উম্মাহ কেন্দ্রিক সংঘবদ্ধতা বুঝিয়েছেন। কিন্তু আমরা আমাদের দলের সমর্থনে বলতে গিয়ে এর ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছি। কোরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেওয়াটা তো অপরাধই। বরং কোরআন ও হাদীসের দৃষ্টিকোণ থেকেই তো দলকে বিবেচনা করা উচিত। দ্বীন থেকে দল বড় হয়ে গেলে এইসব দলের প্রয়োজনীয়তা কি আদৌ রয়েছে?
আমরা‘ এবং ‘ওরা‘ শব্দের ব্যাখ্যা
ইসলামী সংগঠন সমুহের নেতা কর্মীদের বক্তব্য,স্ট্যাটাস, কমেন্ট দেখে, কথা বলে যা বুঝা গেল তাহল, ‘আমরা‘র ব্যাখ্যা হচ্ছে প্রথমত আমার দলের লোকজন। তারপর দলের ভেতরে আমার গ্রুপের লোকজন। আর ‘ওরা‘ শব্দের ব্যাখ্যা হচ্ছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কর্মরত অপর সংগঠনের নেতা কর্মীরা। খুব স্বাভাবিক কারনেই ‘আমরা‘ আমাদের মধ্যে খুবই হৃদ্যতাপুর্ণ এবং ‘ওরা’ যারা তাদের ক্ষেত্রে শত্রুতামুলক মনোভাব পোষণ করা হয়।
অবশ্য পবিত্র কোরআন শরীফে ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’র শত্রুতার এবং হৃদ্যতার বর্ণনা দেয়া আছে স্পষ্ট ভাবে। সেখানে বলা হয়ে হয়েছে: ”আশিদ্দাউ আলাল কুফফার, রুহামাউ বাইনাহুম” অর্থাৎ, নবী করীম সা. এর সংগী সাথী ও অনুসারীদের অন্যতম পরিচয় হচ্ছে তারা কুফরী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর রহমদীল এবং প্রীতিময়। সত্যিই ইসলামী দলগুলোর এই প্রবণতা, কোরআন প্রতিষ্ঠার কথা বলে কোরআনের বিরুদ্ধে চলার এই মানসিকতা বিস্ময়কর।
আত্মসমালোচনা বিহীন সংগঠন স্রোতহীন নদী
বাংলাদেশে ইসলাম পরাজিত হয়নি কিন্তু ইসলামপন্থীরা পরাজিত হয়েছেন। যে যাই বলুন, যে ব্যাখ্যাই দেননা কেনো এটাই তো সত্য কথা। প্রায় এক দশক আগে প্রখ্যাত দার্শনিক ফরহাদ মজহার এক আলাপচারিতায় বলেছিলেন, বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় প্রধান বাধা হচ্ছে ইসলামী দলগুলো। বেশ অবাক হয়েছিলাম কথাটা শুনে। মনে করেছিলাম তিনি একজন বামপন্থি চিন্তাবিদ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই হয়ত কথাটা বলেছেন। কখনো সুযোগ পেলে এই কথাটার ব্যাখ্যা তার কাছে জানতে চাইব।
আমাদের প্রচুর আত্মসমালোচনার প্রয়োজন – এই কথাটা বলতে গিয়ে এক নেতার কাছ থেকে রীতিমত ধমক খেয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আপনি তো শুধু থিওরি দেন। কাজ করেননা। থিওরি বাদ দিয়ে কাজ করেন। কিছু বলি নাই। কারণ উনি কাজ বলতে মনে করেন প্রতি সপ্তাহে একদিন ক্লাব ঘরের মত একস্থানে সবাই বসে আড্ডা দেওয়া, ডালপুরি, আলুপুরি খাওয়া, মাসিক বৃদ্ধি ঘাটতির হিসেব করা, মাঝে মধ্যে সেমিনার করা, পত্রিকায় বিবৃতি পাঠানো ইত্যাদি ইত্যাদি। শুধু বলেছিলাম, আমি কতজনকে সংগঠনে যোগদান করিয়েছি আর আপনি কতজনকে করিয়েছেন তা পরিমাপ করলেই তো আসল সত্যটা বেরিয়ে আসবে। যে নদীতে স্রোত নেই সেই নদীকে আমরা বলি মরা নদী। যেসব সংগঠনে আত্মসমালোচনা নেই, আত্মসমালোচনা শুনার মত মন মানসিকতা নেই তারা তো বারবার পরাজিতই হয়।
একটা বিল্ডিংয়ের জন্য প্রথম কাজ হচ্ছে তার ডিজাইন বা নকশা। এখন মিস্ত্রীরা যদি বলেন, ইঞ্জিনিয়ারা কি করেছেন? ওরা তো শুধু ডিজাইন করেছেন। কিভাবে কি করতে হবে তার থিওরি দিয়েছেন। আমরা হচ্ছি আসল লোক। আমরা ইটের গাথুনি করেছি। সিমেন্ট এর সাথে পানি ও বালু মিক্সচার করেছি। ছাদ ঢালাই করেছি।এইসব কথাগুলো যেমন অযৌক্তিক তেমনি আত্মসমালোচনাকে থিওরি বলে ফেলে দেয়াটাও অযৌক্তিক। কয়েক দশক আগে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, গবেষক মাওলানা আবদুর রহীম রহ. বলে গেছেন; বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর অবস্থা হচ্ছে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত। শুধু লাফায় এবং দৌড়ায়।
নিজেরা নিজেদের মর্যাদা না বুঝলে, ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে, দুরদর্শী প্ল্যান ও প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার ভুমিকা ললাটের লিখন হিসেবেই চিরস্থায়ী হবে।
সংগ্রহঃ ফেইসবুক থেকে




