‘ইসলাম’ এর অর্থ কমবেশী সবার জানা। পারিভাষিক অর্থে ইসলাম হলো পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, ইংরেজীতে যাকে বলে System of life অর্থাৎ,জীবন পদ্ধতি বা জীবন ব্যবস্থা। সাধারনতঃ একজন মানুষের জীবন থেকে মৃর্ত্যু পর্যন্ত মধ্যবর্তি সময়টাকে (life -জীবন-হায়াত)বলে জানি। মানুষ সামাজিক জীব ” Man cannot live alone” তাই মানুষের প্রয়োজনের তাগিদে সংঘবদ্ধভাবে বসবাসের ফলেই ”সমাজের সৃষ্টি হয়। সমাজ বিজ্ঞানী Gisbert বলেন – ”সমাজ হলো সামাজিক সম্পর্কের জটিল জাল, যা পারস্পরিক সম্পর্ক দ্বারা প্রত্যেক মানুষ তার সঙ্গীদের সাথে সম্পর্কযুক্ত” তাই সমাজে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়, প্রয়োজন অনুভূত হয় একটি সিস্টেম বা পদ্ধতির, যার মাধ্যমে মানুষেরা, তাদের জীবন বা হায়াতে জিন্দেগী পরিচালিত করবে। এই সিস্টেমের রূপরেখা সম্বলিত প্রেসক্রিপশণকেই জীবন ব্যবস্থা বলে।
বস্তুতান্ত্রিক আইডলজিতে Re-birth বলতে কোন কিছুকে স্বীকার করা হয়না। বলা হয় এই দৃশ্যপটে যা কিছু আছে তাহাই সত্য। এই জীবন ও জগত প্রকৃতির দান।তবে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর উপর ভিত্তি করে যত ইজম প্রচার করা হয়েছে তার সব কটিতেই ন্যাচারাল পাওয়ার নামে একটি সত্বা শক্তিকে স্বীকার করা হয়েছে। আধুনিক দর্শণ প্রমান করেছে এই ন্যাচারাল পাওয়ার, আর কিছু নয় একজন সুনির্দিষ্ট প্রডিউসার এর ইঙ্গিত বহন করে।এই প্রডিউসার আর কেহ নহেন তিনিই হচ্ছেন এই বিশ্ব জগতের একমাত্র সৃষ্টি কর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।
মানুষেরা জাগতিক জীবনকে পরিচালনার উদ্দেশ্যে দুইবার দুই ধরনের জীবন ব্যবস্থার কথা চিন্তা করেছেন। মানুষের প্রথমবারের চিন্তা চেতনা ধ্যান ধারনা ছিল আধ্যাত্মবাদের উপর ভিত্তি করে|| তাদের দীর্ঘদিনের আরাধনায়, তাদের মানস বোধে যে সকল সুষ্ঠ সুন্দর কল্যাণকর চিন্তাধারা জাগ্রত হয়েছে তা তারা মানবজাতির হায়াতী জিন্দেগীতে মানুষের জীবনের জন্য উত্তম পদ্ধতি মনে করেছে তাই হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, এসব আদি লৌকিক ধর্মের কথা বললাম, এছারাও আছে যীশুর খ্রীষ্ঠীয় বা খ্রীষ্ঠান ধর্ম, ইহুদী ধর্ম, আবার এদের মধ্যে প্রচলিত প্রায় ৪০ চল্লিশ রকমের বাইবেল অনুসারী, যারা আল্লাহ প্রেরীত বার্তাবাহকদের কারো না কারো অনুসারী। অর্থাৎ আসমানী কিতাবের অনুসারী, আর ইসলাম হলো আল্লাহ প্রেরীত শেষ আসমানী কিতাব ও মুহাম্মদ সাঃ এর অনুসারী আল কুরআনের অনুসারী মুসলিম জনগোষ্ঠীদের বিশ্বাস।
এ ছাড়াও আরো বহুরকমের আধ্যাত্মিক ধর্মের অনুসারী রয়েছেন, তার নাম বলতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে, এত রকমের ধর্মীয় মতবাদ জন্মলাভ করে। কিন্তু এতসব ধর্মের প্রচলন থাকার পরও মানজাতির সাময়িক কল্যাণ বয়ে আনতে পারলেও দীর্ঘকায় ধরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।কেন পারেনি সেটা এখন খুটিয়ে দেখা উচিত।একেবারে কিছুই করতে পারেনী বললে ভুল হবে, কেননা এসব বিষয় আল্লাহর নির্দেশ কিছুকাল মানলেও নতুন সামাজিক প্রয়োজনে এগুলো হয়ে পড়ে যুগ বা সময়ের সাথে বেমানান।
কোন কোন ধর্ম যখন সমাজের কাঠামোতে প্রবেশ করে তখন অসাড় প্রমানিত হয়। যেমন; যখন থেকে মানুষ সংস্কার প্রয়োজন মনে করেছে ধর্মের মৌলিক কিছু বিষয় ঠিক রেখে বাকি সব কিছু নিজের প্রয়োজনে সংযোজন করে এতে বিভিন্ন আসমানী কিতাবের অনুসারিরা তাকে বিকৃত করে ফেলে তা মানব জীবনের সার্বিক কল্যাণ সাধন করতে ব্যর্থতায় পর্যবেশিত হয়, মহান স্রষ্ঠার অমোঘ নিয়মেই।গীর্জাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা যাজকতন্ত্রের শোষনের হাতকেই শক্তিশালী করেছে, এ ছিল খ্রীষ্ঠবাদের কথা।
অপরদিকে লৌকিক বা সনাতন ধর্ম হিসাবে হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতায় জাতি বৈষম্য, বিদ্ধেষ, বর্ণ বৈষম্য মারাত্মক আকার ধারন করে সমাজের ব্যাধি হিসাবে আত্মপ্রকাশ লাভ করে। এই ব্যাধি সমাজকে আকড়ে ধরে, যাতে করে সমাজের সার্বিক বিকাশ ব্যাহত হয়। আধুনিক পশ্চিমী সভ্যতা গীর্জা পরিচালিত কলুষিত যাজকতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি প্রকাশ্য বিদ্রোহ। মানব পরিচালিত বিশেষ জ্ঞানের আলোয় গীর্জার আলো ফিকে হয়ে আসতে থাকে। বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর থিওরী অফ দ্যা ইউনিভার্স থেকে যখন ঘোষিত হয় যে ”পৃথিবী” সূর্যের চারিদিকে ঘুড়ে তখন যাজকদের গাত্রদাহের সৃষ্ঠি করে যাতে করে গ্যালিলিও এর মতো লোকদেরকেও পলাতক ফেরারী জীবনে চলে যেতে হয় তার খোজ আজ অবধি অজ্ঞাত রয়ে গেছে, তখন বিশেষ জ্ঞানের প্রসারে যাজকতন্ত্র কোনঠাসা হয়ে পরে।
ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদীরা প্রকাশ্য বিদ্রোহ করে ধর্মের বিরুদ্ধে সমালোচনার স্তুপ তৈরী করল। সবচাইতে বহুল আলোচিত যে অপবাদটি তাহলো ”ধর্ম অসহনশীলতার জন্ম দেয়, মানুষের বর্বর অতীতের ধ্বংসাবশেষ হলো ধর্ম, গোড়ামী এবং ধর্ম পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলে, ধর্ম যুদ্ধ সমূহে মানব রক্তের শ্রোত বয়ে গেছে, ধর্মাধিকারীরা রাজনৈতিক স্বাধীনতার কন্ঠে ছুড়ি চালিয়েছে, ধর্মীয় রাষ্ট্রে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা বা মুক্তবুদ্ধির চর্চার কোন স্থান নেই, ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পরের মধ্যে দা-কুড়াল সম্পর্ক এবং যে কেউ এ দুটির মধ্যে যে কোন একটির সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে, এক সঙ্গে দুটির সাথে নয়”।
মূলত এ সমস্ত অভিযোগের সৃষ্টি হয় খ্রীষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে, কারন খ্রীষ্ট্রীয় যাজকতন্ত্র ইহুদী সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করেছিল এবং মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে করেছিল শৃংখলিত।বিজ্ঞান ও খ্রীষ্ট ধর্মের মধ্যকার যে সংঘর্ষ তা ছিলো রক্তক্ষয়ী, গীর্জার সাথে দ্বিমত পোষণ করার অপরাধে মানুষকে মৃত্যু মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল।জন উইলিয়াম ড্র্যাপার” তার ” A History of the Intellectual Development of Europe Volume- 1 (London 1891) গ্রন্থে দাবী করেছেন 1481 খ্রীষ্ঠাব্দ থেকে 1808 খ্রীষ্ঠাব্দ পর্যন্ত পরিচালিত তদন্ত অভিযানে তিন লক্ষ চল্লিশ হাজার মানুষকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল, এর মধ্যে 32 হাজার মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল ” মধ্যযুগে ধর্ম নিয়ে রক্তক্ষয়ী দন্ধ সংঘাত সংঘর্ষের ফলে ইউরোপে ধর্ম আর রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে পৃথক হয়ে গেছে।মধ্যযুগে খ্রীষ্ঠান সম্প্রদায়ের সংঘটিত যুদ্ধ অপরিসীম রক্তপাত ও ধ্বংসের কারণ হয়েছে এবং তা পিছনে ফেলে গেছে চরম নৈরাশ্য আর ধর্ম বিরুধী মনোভাব বা বিক্ষোভ।
ইসলামী আন্দোলন
এই বিষয়ের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ আলোচনার দাবী রাখে। অনেকেই এই সম্পর্কে সঠিক ধারনা রাখেননা। এই ধারনা না রাখা সত্বেও বিষয় গুলো বার বার প্রাসঙ্গিক ভাবে সামনে আসছে, আর জানা-না জানা সকলেই মনের মাধুরী মিশিয়ে কেউ পক্ষে লিখছেন আর কেউ বিরুদ্ধে লিখছেন, একথা আমার ব্যাপারেও একথা সত্য।এ বিষয়ে একটি তথ্যবহুল লেখা প্রকাশের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আমার মনে বার বার নাড়া দিচ্ছে। তাই শুধু সঠিক পদক্ষেপ কি, ইসলামপন্থিদের কি করা উচিত হবে এই বিষয়ের মধ্যে আমার লেখাটা সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করবো, ওয়ামা তৌফিকি ইল্লাহ বিল্লাহ।
আন্দোলন একটি বাংলা শব্দ এ শব্দটি দোলন শব্দ থেকে এসেছে, দোলন শব্দের অর্থ হলো নড়াচড়া করা, একটি বস্তু সরিয় অন্য একটি বস্তু প্রতিস্থাপন করাকে ”আন্দোলন” বলা হয়, তাহলে ”ইসলামী আন্দোলন” মানে দুনিয়ার সকল বিষয়ে অন্য যে বিষয়বস্তু প্রতিস্থাপিত অবস্থায় রয়েছে তা সরিয়ে সেখানে ইসলাম প্রতিস্থাপন করার নামই বলা যায় ”ইসলামী আন্দোলন”।
প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে মুজাদ্দিদ বা সংস্কারকদের কথা। ইসলাম ধর্মমতে জিবরাইল আঃ আর কোন অহি নিয়ে আসবেনা, তাই বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন অঞ্চল ভিত্তিক যুগসংস্কার পৃথিবীতে এসেছেন এবং অবিকৃত কোরআনের যুগোপযুগি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। আরেকটা কথা এব্যপারে না বললেই নয়, সেটা হলো কোন লোক নিজে দাবী করবেনা সে মুজাদ্দিদ। তার কর্মকান্ড বিবেচনা করে তার জীবদ্দশায় অথবা তার ইন্তেকালের পর মুসলিম জাতি স্বীকার করবে যে ঐ লোকটা মুজাদ্দিদ ছিলো। দেখা যাবে তাঁর দেখানো পথ মানুষ অনুস্মরণ করবে, তবে তাদের প্রচেষ্টা শুধু ইসলামের জন্যই হবে। ইসলাহ করে তিনি ইসলামের সঠিক বিধান সমাজে কায়েম করবেন বা মানুষকে এটা করার জন্য ঐক্যবদ্ধ করবেন। ঐক্যবদ্ধ এই কাজ করার প্রচেষ্টাকেই ইসলামী আন্দোলন বলে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি
আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণ যুগ তৈরী করেছিলেন খলীফা হারুন অর রশিদ। জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে ইউরোপের স্পেন নগরীতেও ইসলামের বিরাট বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ধারা প্রচলিত হয়। খলীফা হারুন অর রশিদের পর খিলাফতের জ্ঞানের আলোক বর্তিকা সহ আবির্ভূত হন খলিফা আল মামুন। তার সময়ে স্পেনের রাজধানী ছিল ”কর্ডোভা” নগরী।খলীফা যে বিজ্ঞানাগার ও মান মন্দির সমূহ নির্মান করেছিলেন তাহা আজও জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎস হিসাবে মানা হয়। ক্রুসেডে মুসলিমরা যখন পরে পরাজিত হয় তখন বিজয়ী শক্তি বুজতেও পারেনাই এগুলো কি। অথচ তখন খলীফা আল-মামুনের গড়া এবং বিভিন্ন স্থান থেকে কালেকশণ করা বিজ্ঞানের অনেক থিওরীর সূতিকাগার ছিল সেই বিজ্ঞানাগারগুলো, যা আধুনিক বিজ্ঞানে অনেক কিছু সহজ করে দিয়েছে।বড় বড় অনেক কিছুই মুসলিম বিজ্ঞানীগন আবিষ্কার করেন বা করতে পেরেছিলেন।
যা হউক, বিশ্ব পরিক্রমায় ইসলাম বিরোধী শক্তি বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, গোয়েবলসীয় কায়দায় ইসলামের বিরোদ্ধে মিথ্যাচার করতে করতে ইসলামের অর্থই পাল্টে ফেলেছেন।গীর্জাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরোদ্ধে যা বলা হয়েছিল তাহা ইসলামের বিরোদ্ধে চালিয়ে দিয়ে কিছু এজেন্টের মাধ্যমে মুসলিম দেশ গুলোতে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাতে করে বহু শিক্ষিত মুসলিমও অজান্তে ইসলাম বিরোধীদের সাথে মেল বন্ধন তৈরী করে ফেলেছে। তাদের নিকট বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাধারার বিপরীত হলো ইসলাম। এই ধারনা ডেভেলপ করায় ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলনের উপর একটা বানানো অপবাদ দিয়ে ইসলামী আন্দোলনকে সমাজের ভিলেন হিসাবে প্রচার করে কোন কোন জায়গায় এই মত প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েও গেছেন।
শ্লোগান হলো ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার, যা খৃষ্ঠীয় বা অন্য যে কোন ধর্ম বা ইজমের ব্যাপারে মেনে নেওয়া যায় কিন্তু ইসলামের পক্ষে মেনে নেওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারেনা। কেননা দুনিয়াতে এমন কোন বিষয় নাই যার সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য নাই। তাই দেখা যায় শতো বাধা বিপত্তির পরও ইসলামী আন্দোলন কখনো থেমে থাকেনি। বিগত 100/150 বছরের ইতিহাসে ইসলামী আন্দোলন পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে গেছে, বিভিন্ন যুগসস্কারকের আবির্ভাব হয়েছিল। এইসব ইসলামী আন্দোলন যুগে যুগে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। বিভিন্ন যুগসস্কারকদের আদর্শিক প্রভাব যেসব ইসলামী দলে রয়েছে তার একটি আলোচনা এবং এইসব ইসলামী আন্দোলনের বিরোধী কারা, তাদের কুচক্রি কর্মের আঘাতে কিভাবে ইসলামী আন্দোলন ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে বা হয়েছে এবং হবে, তা নিয়েও আলোকপাত করবো পরবর্তি আলোচনায় ইনশাআল্লাহ
(চলবে)




