ইসলামী আন্দোলনের সফলতার জন্য প্রয়োজন মানুষের কাছে যাওয়া , বেশি বেশি জনমুখী হওয়া । যতবেশি মানুষের কাছে যাওয়া যাবে তত লাভ । কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াত এবং তার সহযোগী ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের সিস্টেম তার জন্য কতটা উপযোগী ?
প্রথমে যে বিষয়ে কথা বলতে হবে তা হলো – জামায়াত ও শিবির আসলেই জনবিচ্ছিন্ন কিনা ? একেবারে জন ‘বিচ্ছিন্ন’ বলা ঠিক হবে না । জনসম্পৃক্ততা আছে বটে , তবে সেটা ব্যাপকভিত্তিক নয় । একজন জামায়াত নেতা বা কর্মী যদি সারাদিনে ১০ জন মানুষের সাথে যোগাযোগ করেন , তার মধ্যে ৯ জনই থাকেন ভেতরের লোক । ১-২ জন বাইরের লোক । অর্থাৎ নতুন একজনের সাথে যোগাযোগ হলো । হওয়া উচিৎ ছিল কমপক্ষে ৫-৭ জন নতুন মানুষ ।
একটি এলাকায় যদি ১ লাখ মানুষ থাকে , তার ১০% হবে ১০ হাজার । ১০ হাজার কিন্তু খুব নগন্য সংখ্যা না । একটা মিছিলে, একটা সভায় ৫-৭ হাজার মানুষ থাকলেই অনেক দেখায় । ‘আমাদের তো অনেক মানুষ’ ! কিন্তু এর বাইরে যে ৯০ লাখ মানুষ রয়ে গেছে সেটা হয়তো সেই মুহূর্তে নাও মনে আসতে পারে । জামায়াতের জনসমর্থন কত ? ১০% ? একটা মুসলিমপ্রধান দেশে , ৬০ বছর ধরে কাজ করার পর যদি সমর্থন সাকুল্যে ১০% হয় – তাহলে সেটাকে জনবিচ্ছিন্নতা বলা যেতেই পারে ।
এটা স্বাভাবিকভাবেও হতে পারে , হতে পারে দা’য়ীদের কোন সমস্যা ছিলনা, হতে পারে জনগন এক্সেপ্ট করেনি । হতে পারে , কিন্তু সেটা ভেবে বসে থাকার তো সুযোগ নেই । নিজের ভেতরে কোন দুর্বলতা আছে কিনা সেটা খুঁজে দেখতে হবে । কারণ থাকতে পারে অনেক । কারণ হিসেবে থাকতে পারে বিরুপ পরিস্থিতির কথা , কারণ হিসেবে থাকতে পারে ইসলামের রাজনৈতিক রূপ সম্পর্কে এই উপমহাদেশের মানুষের অজ্ঞতা বা অন্য কিছু । সেই কারণগুলো আওতার বাইরে । চিন্তার বিষয়, বিদ্যমান কাঠামোর কর্মপন্থায় কি কোন সমস্যা আছে ? থাকলে সেটা কী ?
জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে একজন রুকন এবং ছাত্রশিবিরের ক্ষেত্রে একজন সাথী ও সদস্য মূল দা’য়ী হবার কথা।কিন্তু বাস্তবে কী হয়? সাথী, সদস্য ও রুকনদের সময়ের বেশিরভাগই ব্যয় হয় ‘ম্যানেজমেন্টে’ । হিসাব রক্ষায় ও বৈঠকে । সাথী বৈঠক, কর্মী বৈঠক, সদস্য বৈঠক, দায়িত্বশীল বৈঠক, জরুরী বৈঠক, আলোচনা চক্র , পাঠচক্র, এটা সেটা বৈঠক। রিপোর্ট লেখ, রিপোর্ট সংগ্রহ করো ইত্যাদি । মাস শেষে রিপোর্টে কী দেখা যায় ? দাওয়াতী কাজ ১০ ঘন্টা , সাংগঠনিক কাজ ১০০ ঘন্টা । এই মোট ১১০ ঘন্টা কার সাথে ব্যয় করেছেন ? এই সময়ের নব্বই ভাগেরও বেশি সময় ব্যয় হয়েছে সাংগঠনিক ভাইদের সাথে । অসাংগঠনিক লোকদের সাথে সর্বোচ্চ ৫% সময় ব্যয় হয়েছে ।
ফলে নিজেদের ভেতরেই ঘুরপাক খাচ্ছে সাথী- সদস্য-রুকনদের জীবন । তাঁর সময় হয়না বন্ধুদের সাথে বিকালে কোথাও ঘুরতে যাবার । বৈঠক আছে । তাঁর সময় হয়না – বিকালে গ্রামের চায়ের দোকানে বসে কামলাদের সাথে কথা বলার । বৈঠক আছে । হ্যা , একদিন তিনি কথা বলতে যান , এবং সেদিন তাঁকে গুরুগম্ভীর তত্ত্বীয় কথাবার্তায় ভরা দাওয়াতী কথা বলতে হয় । আলোচনা চক্র, পাঠচক্র, টিসি- টিএস হয় । কারা এসব আলোচনা চক্রের আলোচক ? একটা সাথী আলোচনা চক্রের আলোচক ঐ সাথী ভাইদের এক-দুই বছর আগে মানোন্নয়ন করা সদস্য ভাই । তিনি নিজেও ব্যস্ত । অনেক সময়ই দেখা যায় , আলোচক নিজেও খুব বেশি প্রস্তুত নন । ইসলামী বিপ্লবের পথ বইয়ের আলোচককে যদি প্রশ্ন করা হয় – বলুন তো , ‘কীভাবে ইসলামী বিপ্লব সাধিত হবে ?’ হয়তো তিনি নিজেও ঐ বই থেকে নোট করে মুখস্ত করা কয়েকটি হেডলাইন আউরিয়ে যাবেন । পাঁচ বছর সাথী থাকার পর , ৬০ টি আলোচনা চক্রে অংশগ্রহণ করার পরও একজন সাথী কতটুকু জ্ঞান অর্জন করেন ?
এতে করে কিছু লোক তৈরি হচ্ছে- যারা কিছুটা সংগঠন বোঝেন , কিছুটা কুরআন বুঝেন , কিছুটা হাদীস বোঝেন , কিছুটা ফিকাহ বোঝেন । কিন্তু কোনটাই ভালো বোঝেন না । মাস্টার অব নান । দাওয়াতী কাজ যতটা ফলপ্রসূ হবার কথা ছিল , যতটা বিস্তৃত হবার কথা ছিল কোনটাই হচ্ছে না । হাতে সময় নেই , মাথায় জ্ঞান নেই।দাওয়াতী কাজ আসলে কারা করছে ? প্রান্তিক লেভেলের কর্মীরা । যতই উপরের দিকে আসেন , ততই তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন ম্যানেজমেন্টে । বৈঠকে । রিপোর্টিং এ ।
প্রয়োজন একাডেমিক প্ল্যান
রাসুলের সাঃ যুগে কী হয়েছে ? ঈমান আনার পর , জ্ঞান লাভের পর সাহাবীগন ছড়িয়ে পড়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে । দাওয়াতের প্রেরণা নিয়ে । মিশন নিয়ে ।একইভাবে লোকদেরকে জ্ঞান দিয়ে ছড়িয়ে দিতে হবে জমিনে । তাদের গলায় শপথের দড়ি, আনুগত্যের দড়ি , রিপোর্টিং এর দড়ি নয় – থাকবে শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে জবাবদিহীতার দড়ি ।
একাডেমিক কোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে । স্কলারদের মাধ্যমে ক্লাস নিতে হবে । নির্দিষ্ট সিলেবাস অনুযায়ী দাওয়াত প্রাপ্ত ব্যক্তি , আগ্রহী ব্যক্তিরা যারা এইসব কোর্সে ভর্তি হবেন , তাদেরকে জ্ঞান দেয়া হবে কেন ইসলাম শ্রেষ্ঠ । কেন ইসলামের বিধিবিধান অনুযায়ী চলতে হবে । কেন মানুষকে দাওয়াত দিতে হবে । কীভাবে দাওয়াত দিতে হবে । কেন ইসলামকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রয়োজন । ফিকাহ সম্পর্কে বেশি জ্ঞানের দরকার নেই সবার । ফিকাহ সম্পর্কে আলাদাভাবে স্পেশালিস্ট তৈরি হবে ।
এভাবে জ্ঞান দিয়ে সবাইকে ছেড়ে দিতে হবে । যাও , মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকো । যাও যেভাবে পারো ইসলামের পক্ষে কাজ করো । যদি কখনো কাজ করতে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখী হও, যদি আরো জ্ঞানের প্রয়োজন হয় – দরজা খোলা । ফিরে এসো । আমরা উত্তর দেবার চেষ্টা করবো । আমরা সমাধান দেবার চেষ্টা করবো । কী কাজ করছো- কোন প্রয়োজন নেই আমাদের রিপোর্ট দেবার । আল্লাহর কাছে রিপোর্ট দাও ।
এইসব মানুষ ছড়িয়ে পড়বে বিভিন্ন সেক্টরে , নিজের যোগ্যতায় । তাঁরা ইসলামের জন্য সংগ্রাম না করুক , বিপক্ষে থাকবে না । তাঁরা চেষ্টা করবে ভালো থাকার । সুযোগ পেলেই ইসলামের কথা বলার । এভাবে একদিন দেখা যাবে এই লোকদের মধ্যেই আমলা , শিক্ষক, রাজনীতিক হবে । সবাই জামায়াতে ইসলামী করার দরকার নেই , যেখানেই যাক – তাঁরা ইসলামের অনুশাসন বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে । এই লক্ষ্য নিয়েই চলতে হবে একাডেমিক এই শিক্ষা কার্যক্রম ।
এই কাজ জামায়াতে ইসলামীর অংগ সংগঠন হিসেবে করলে এটাও মুখ থুবড়ে পড়বে । সফল হবে না । এটা করার জন্য জামায়াতের ভেতর থাকা স্কলারগণও আসতে পারেন , মুফতি কাজী ইব্রাহীমের মত লোকেরাও আসতে পারেন । তবে এই কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট স্কলারদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকা যাবেনা । তাঁরা ইসলামের শিক্ষা দিবেন । সেই শিক্ষা গ্রহণ করার পর কেউ যদি আওয়ামী লীগেও যোগ দেয় – কোন কথা বলা যাবে না । আশা করতে হবে , একদিন সেও কোন না কোনভাবে ইসলামের খেদমতে কাজ করবে ।




