মুজাহিদের ফাঁসি ও প্রতিক্রিয়া
সপ্তাহের প্রথম দিনটি ছিল রবিবার। এদিনের প্রথম প্রহরে ফাঁসি দেওয়া হয় আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে। মুজাহিদ বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। যদিও আদালতে তার বিরুদ্ধে সরাসরি কাউকে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৩ বছরের বেসামরিক তরুণ হওয়ায় তিনি সরকারি বাহিনী আলবদরের বাহিনীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, আমৃত্যু এ দাবিই করেছেন মুজাহিদ।
কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান ইসলামি দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার ফাঁসি থেমে থাকেনি। মুজাহিদের ছোট ছেলে আলী আহমাদ মাবররু জানিয়েছেন, তারা রাত ১১-২০ মিনিটে ফাঁসির ছেলে গিয়ে দেখেছেন ৬৭ বছর বয়সী লোকটি গভীর ঘুমে অচেতন। তারা বেশ ডাকাডাকি করে তার ঘুম ভাঙান এবং ওই রাতেই তার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কথা জানান। রাত ১২টা ১৮ মিনিটে মুজাহিদের স্ত্রী-ছেলে-মেয়েসহ ২৫ জন স্বজন কারাগার থেকে বের হওয়ার ৩৭ মিনিটের মাথায় তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
মুজাহিদ স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতের বেড়ে ওঠার প্রতীক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর দলটির প্রধান গোলাম আযম দেশে ফিরতে পারছিলেন না। এদেশ, ওদেশ ঘুরে ফিরছিলেন। নিজামী-মুজাহিদসহ ছাত্র সংঘের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু ১৯৭৮ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে সকল বাংলাদেশিকে রাজনৈতিক ও মৌলিক অধিকার দেওা হলে জামায়াত নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে কার্যক্রম শুরু করেন। তখন মুজাহিদ নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। গোলাম আযম তাকে ঢাকা নিয়ে আসেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানীতে মুজাহিদের নেতৃত্বে জামায়াত সংঘটিত হয়। যার সূত্র ধরে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তার সখ্যতা সৃষ্টি হয়। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ আন্দোলনও করেন তিনি। আবার চারদলীয় জোট গড়ে হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার আস্থাও অর্জন করেন তিনি। সেই মুজাহিদ স্কুল শিক্ষক থেকে পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন, তেমনি ১৯৭১ সালে মাত্র ২% ভোটের নিয়ন্ত্রক জামায়াতের সমর্থন শতকরা হারে দ্বিগুণ ও সংখ্যাগতভাবে অনেকগুণ বেড়েছে।
আর্থিকভাবে অনেকখানি স্বচ্ছল জামায়াত। দলটি তার কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে পরিবারের খরচ মেটাতে প্রতি মাসেই নির্দিষ্ট পারিতোষিক দেয়। মুজাহিদের ফাঁসি হলেও তার পরিবার প্রতিমাসে ৬৩ হাজার টাকা পারিতোষিক পাবে। কারগারে বন্দী সাঈদী ও নিজামী এবং প্রথম ফাঁসির শিকার আবদুল কাদের মোল্লার পরিবারও সমপরিমাণ পারিতোষিক পাচ্ছেন। ব্যতিক্রম মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের পরিবার। পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে দৈনিক সোনার বাংলা থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতন পেতেন বলে জীবিত থাকতে তিনি দলীয় পারিতোষিক নেননি। তবে আটকের পর জেলখানায় বসে দলের সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়ন করায় ফাঁসির পর তাকে পদ মর্যাদা অনুযায়ী নির্ধারিত পারিতোষিকের এক তৃতীয়াংশ হিসেবে ২১ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দল।
২০১৩ সালে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়। এ বছরের এপ্রিলে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের। সাত মাস পর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের। প্রত্যেকটি ফাঁসির ঘটনায় জামায়াত হরতাল ডেকেছে। যদিও প্রতিটি ফাঁসিতে হরতালের উত্তাপ কমে এসেছে। তবে লক্ষণীয় দলটির নেতাকর্মীরা নেতাদের জন্য কোনো শোক করেনি। দেশে-বিদেশে গায়েবানা জানাজা হয়েছে শুধু। পুলিশি বাধায় মূল জানাযায় ফাঁসি হওয়া নেতাদের স্বজন ও গ্রামবাসী ছাড়া বাইরের মানুষদের যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। তবে দণ্ডিত অবস্থায় প্রিজন সেলে মৃত্যুবরণকারী গোলাম আযমের ঘটনায় ব্যতিক্রম দেখা গেছে। তার মৃত্যুতে বায়তুল মোকারমে সমবেত হওয়া সুযোগ পেয়েছিলেন লাখ লাখ মুসল্লি। গোলাম আযমের এ জানাজা জিয়াউর রহমানের বিশাল জানাজার পর বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ জানাজা।
তবে মৃত কোনো নেতার জন্যই প্রতীকীভাবেও শোক করেনি জামায়াত। মুজাহিদর যখন ঢাকায় জামায়াতকে সংগঠিত করছিলেন তখন বেশ কিছু কবি-সাহিত্যিকেরও সমাহার ঘটিয়েছিলেন। যার মধ্যে আল মাহমুদও ছিলেন। কিন্তু জামায়াত সংশ্লিষ্ট কোনো কবি ফাঁসির শিকার নেতাদের জন্য শোকগাঁথা লেখেননি। বরং দলটি ফাঁসির ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে দ্রুততার সঙ্গে একঘেঁয়ে দলীয় ঐতিহ্য অনুসরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যেখানে মৃত নেতার চ্যাপ্টারটা ‘শহীদ’ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে চলমান রাজনীতিতে গা ভাসানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা থাকে।
আত্নপর্যালোচনায় অনীহা, নেতৃত্ব নিয়ে ভিন্নমত
জামায়াত নেতারা কখনোই নিজেদের অতীতের পর্যালোচনা করে না এবং কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সময় মতো নিতে ব্যর্থ হয়। বরং রাজনৈতিক বিপদ তাদের কাছে সুনামির মতো। হঠাৎ এসে সব কিছু লণ্ডভণ্ড করলেও এক সময় চলে যাবে। কোনো মতে বিপদে কাটানো গেলে সব কিছু আগের মতো ফিরে পাওয়া যাবে। তাই তাদের কাছে কোনোমতে টিকে থাকতে পারাই গুরুত্বপূর্ণ।
সংবেদনশীল যেকোনো মানুষই বিষ্মিত হবে যে, রবিবার রাতে মুজাহিদের ফাঁসির চার দিনের মাথায় দলটি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে পৌরসভা নির্বাচনের ভাগাভাগি নিয়ে। দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচনে জামায়াতের দলগতভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ নাই। কারণ নিবন্ধনের শর্ত পূরণ সংক্রান্ত এক মামলায় হাইকোর্ট তাদের নিবন্ধন বাতিল করে দিয়েছে। তারপরেও বৃহস্পতিবার রাত ৯টা রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে পৌর নির্বাচনে নিজেদের ভাগ নিয়ে কথা বলেছেন জামায়াতের প্রতিনিধি কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আবদুল হালিম। ওই বৈঠকে বিষয়টি সুরাহা না হওয়ার পরবর্তীতে আরো বৈঠক হওয়র কথা রয়েছে। জানা গেছে, জামায়াত কমপক্ষে ৫০টি পৌরসভায় মেয়র পদে ২০ দলীয় জোটের মনোনয়ন চায়। পৌর নির্বাচনের মাধ্যমে তারা নিজেদের জনপ্রিয়তাও প্রমাণ করতে চায়।
যদিও মুজাহিদের ফাঁসির পরপরই সরকার সমর্থিত নির্মূল সঙ্ঘ ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ ফাঁসির শিকার নেতাদের সম্পদ দখল করার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ‘ব্যবস্থা’ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এরকম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৬১টি বলে জানা গেছে। অবশ্য আইনগতভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গেই দল হিসেবে জামায়াতের সংশ্লিষ্টত নাই। এছাড়াও আগামী মার্চের মধ্যে জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে নিষিদ্ধ করা হবে বলেও সরকারি মহল থেকে ঘোষণা এসেছে। এ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের কাজও সম্পন্ন হওয়ার পথে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।
এই যখন পরিস্থিতি তখনো জামায়াতের ভবিষ্যত নিয়ে ঢাকার সংবাদমাধ্যমগুলো পুরনো খবরই নতুন করে প্রচার করেছে। যার সারমর্ম হলো, নিষিদ্ধ করা হলে জামায়াত নতুন নামে আসবে। নিষিদ্ধ না করলে বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো বজায় রেখে চলবে দলটি। এক্ষেত্রে ফাঁসির কারণে শূন্য হয়ে পড়া পদগুলোতে পরবর্তী নেতারা বসবেন। বিবিসি বাংলার খবর অনুযায়ী, নিষিদ্ধ না হলে সংবিধান ও নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী কিছু নীতির পরিবর্তন আনবে জামায়াত।
সাধারণতঃ জামায়াতের ঐতিহ্য অনুযায়ী কেউ দলের পদ-পদবীর জন্য প্রার্থী হতে পারে না। এমনকি এর জন্য ইচ্ছাও ব্যক্ত করতে পারে না। কিন্তু খুব কম সময়ের মধ্যে জামায়াতের শীর্ষ নেতারাদের ধারাবাহিক ফাঁসির ঘটনায় পরবর্তী নেতৃত্বের দাবি নিয়ে অনেকটাই বিভক্ত দলটির নীতি নির্ধারকরা। নতুন নেতৃত্ব নিয়ে জামায়াতে মোট চারটি শক্তিশালী মত রয়েছে;
- এক পক্ষ চায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমানকে স্থায়ীভাবে আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল করা হোক।
- আরেকটি অংশ চায় নায়েবে আমির মজিবুর রহমানকে দলের আমির ও ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাককে সেক্রেটারি করা হোক।
- একটি অংশ চায় শফিকুর রহমানকে জামায়াতের আমির ও ঢাকা মহানগরীর বর্তমান আমির রফিকুল ইসলাম খানকে দলের সেক্রেটারি জেনারেল করা হোক।
- শফিকুর রহমানকে আমির করে সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে সেক্রটারি করার মতও রয়েছে।
দলের পরিণতি নিয়ে তিনটি অনুমান করছেন জামায়াতের নীতি নির্ধারকরা। তাদের মতে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করবে। বিএনপি ছাড়লে জামায়াতকে বৈধতা দিয়ে রাজনীতির সুযোগ দেওয়া হবে। নিষিদ্ধ না করে এখনকার মত ঝুলিয়ে রেখে দল হিসেবে নিস্তেজ করে ফেলা হবে এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের আটক করে নানা অপবাদ দেওয়া হবে।
এই অনুমানের উপর ভিত্তি করেই নেতৃত্ব ও ভবিষ্যত নিয়ে জামায়াতের নীতি নির্ধারকরা নিজেদের মতো করে ভাবছেন। তারা ধরেই নিয়েছেন নিষিদ্ধ হলে বর্তমান সংগঠন নতুন নামে করবেন। নিষিদ্ধ না হলে বর্তমান অবস্থাকেই সুসংহত করে নেবেন। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গন্তব্য নির্ধারণ করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে প্রতিবেশী ভারতের নীতি নির্ধারকরা। তাদের মুখপত্র হিসেবে খ্যাত আনন্দবাজার পত্রিকা এরই মধ্যে জানিয়েছে নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে জামায়াতকে নির্মূল করার পরিকল্পনার কথা। নির্মূল করার ক্ষেত্রে জামায়াতকে যে কোন ছাড় দেওয়া হবে না তাও এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে।
বিপাকে সংস্কারপন্থিরা
২০১০ সালে ছাত্র শিবিরের মধ্যে ফাটল ধরলে সংস্কারপন্থীদের প্রতি প্রতিবেশী ভারতের আগ্রহ ছিল বলে কোনো কোনো সংস্কারপন্থী এই প্রতিদেককে জানিয়ে ছিলেন। তবে কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন না করে ইসলামী আন্দোলনের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ায় কার্যত যোগাযোগটি রক্ষা করতে পারেননি তারা। আর গত সাত বছর ধরে সংস্কারপন্থীদের পুলিশ-প্রশাসন থেকে তেমন কোনো চাপও মোকাবেলা করতে হয়নি। বিশেষ করে তেমন কোনো মামলা ও গ্রেপ্তারের শিকার হননি তারা। কিন্তু গত অক্টোবরের শেষার্ধ থেকে হঠাৎ করে চাপের মুখে পড়ে যান সংস্কারপন্থীরা। তাদের সকল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সরকারি মহলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নেতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়। বরং হঠাৎ সাড়াশি অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ জাহিদুর রহমান ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদ উদ্দিনকে। একই সময়ে শিবিরের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল শিশির মুহাম্মদ মুনিরসহ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হলেও তারা পালাতে সক্ষম হন।
মুজাহিদের রিভিউ আবেদনের শুনানির আগে এই গ্রেপ্তার অভিযানের কিনারা করতে পারছিলেন না সংস্কারপন্থীরা। এ সময় কেউ কেউ ধারণা করছিলেন মুজাহিদের রায়ের পর জামায়াতের সম্ভাব্য মেরুকরণকে সামনে রেখে পুরনো বিরোধের জেরে হয়তো শীর্ষ সংস্কারপন্থীদের পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ বলছে, সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান সরকারি নীতিরই অংশ। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারপন্থীদের উপর নজর রেখে তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও দল নিষিদ্ধ করার পর নতুন করে জামায়াতের সংগঠিত হওয়া ঠেকাতেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২৪ অক্টোবর রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন আসাদ গেটের সেভেন সেভেন রেস্টুরেন্টে অভিযান সাবেক শিবির নেতা জাহিদ ও আসাদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ডিবি পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে “তাদের মোবাইল ও ল্যাপটপ বিশ্লেষণ করে জামায়াত-শিবিরের নাশকতার নকশা ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে অনেক তথ্য পায়”। এই দুই নেতার মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, “তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল ও ডা. ইমরান এইচ সরকারকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে জামায়াত-শিবির।” এমন দাবি করে জাহিদ ও আসাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার অনুমতি চেয়ে ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে ডিবি পুলিশ।
ডিবি সূত্র দাবি করছে, “জামায়াত-শিবিরের অন্য একটি গ্রুপ তুরস্কের ‘গুলেন মুভমেন্টের’ আদলে প্রকাশ্য নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করছে। এই গ্রুপের অধিকাংশ সদস দলে ‘সংস্কারপন্থি’ হিসেবে পরিচিত। এর নেতৃত্বে রয়েছেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। এই গ্রুপের অধিকাংশ সদস্য ‘সহিংসতাবিরোধী’। ব্যারিস্টার আবদু রাজ্জাক এখন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন।” তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, জামায়াত-শিবিরের আরেকটি গ্রুপ তুরস্কের ‘গুলেন মুভমেন্টের’ আদলে নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করছে। এ লক্ষ্যে গত ২১ অক্টোবর তুরস্কে একটি সেমিনারের আয়োজন করে জামায়াত। ‘ক্রস কান্ট্রি ফিউশন’ নামে সেমিনারের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে।
জামায়াতের যে অংশটি তুরস্কের ‘একে’ পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে তাদের কারও কারও অতীত কর্মকাণ্ড স্বচ্ছ। আবার কেউ কেউ সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গোয়েন্দারা বলছেন, জামায়াত-শিবিরের এই গ্রুপকে পরামর্শ দিচ্ছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকসহ কয়েক জন। তারা হলেন সচিব শাহ আবদুল হান্নান ও ড. মিয়া মো. আইয়ুব, ডা. লকিয়াত উল্লাহ, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু, আহসান হাবিব ইমরোজ, আলম শরীফ, ড. আবু ইউসুফ, ড. মিনার, ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ।
সূত্র জানায়, দুই শিবির নেতার ল্যাপটপ ও মোবাইল থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, জামায়াত-শিবিরের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে দুটি ধারা বা গ্রুপ তৈরি করা হবে। প্রথমটি গোপনে সংগঠিত হবে এবং গোপনেই কার্যক্রম চালাবে। দ্বিতীয়টি প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালাবে এবং নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করবে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “বিশিষ্টজনকে হত্যার ষড়যন্ত্র, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। জামায়াতের একটি অংশ তুরস্কের ‘গুলেন মুভমেন্টের’ আদলে নেটওয়ার্ক করার চেষ্টা করছে।”
সোর্সঃ অনলাইন বাংলা,টার্গেট জামায়াত নির্মূল,২৯ নভেম্বর ২০১৫




