প্রাসঙ্গিক লেখাঃশিবিরের ক্রান্তিকালঃ ১৯৮২ সালের কথকতা
একটা ঘটনা দিয়ে আজকের লেখা শুরু করতে চাই।
বিরাট ওয়াজ মাহফিল। ওয়াজ করছেন মাওলানা আশরাফ আলী থানভী। হঠাৎ একজন তাঁর হাতে একটি চিরকুট এনে দেয়। চিরকুট হাতে নিয়ে তিনি প্রথমে নিজে পড়লেন, পরে সবাইকে পড়ে শোনালেন। চিরকুটে লেখা, ‘তুমি কাফের, তুমি মুর্খ, তুমি সাবধানে কথা বলো।’
এর পর বললেন, ‘কালেমা পড়ার পর কেউ আর কাফের থাকে না। সে মুসলমান হয়ে যায়। একজন আমাকে কাফের বলে ফতোয়া দিয়েছেন। আমি আপনাদের সবার সামনে কালোমা পড়ছি। লা ইলাহা ইল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। আগে কাফের থাকলেও এখন আমি মুসলমান।’
‘তিনি বলেছেন, আমি মুর্খ। তিনি ঠিকই বলেছেন। আমার কোন জ্ঞান নেই। আমি যা বলি তা কুরআন-হাদিস থেকে আল্লাহ এবং রাসুল (স) যা বলেছেন তা-ই বলি। এখানে আমার কোন কৃতিত্ব নেই।’
‘তিনি বলেছেন, সাবধানে কথা বলো। আমি এমনিতেই সাবধানে কথা বলি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আমার সব কথা ফেরেশতারা লিখে রাখছেন। কেয়ামতের দিন সকল কথার জন্যে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। আপনার নসিহতের পর আমি আরো সাবধানে কথা বলবো।’
আমি মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর এ কথাগুলো মনে রাখার চেষ্টা করি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রথম এবং তৃতীয় জবাবটি খুব প্রাসঙ্গিক। কেউ আমাকে গোমরাহ বা ইসলাম থেকে খারিজ করে দিলে তওবা করে কালেমা পড়ে নিয়ে ভাবি, আমাকে কথা বলা এবং লেখার ব্যাপারে আরো সাবধান হতে হবে।
৮২ সালের কথকতা পড়ে কেউ কেউ হয়তো কষ্ট পেয়েছেন। কারো কারো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ থেকে তা বোঝা যায়। আমি তাদের কাছে ক্ষমা চাই। কাউকে কষ্ট দেয়ার জন্যে এ লেখা নয়। এ লেখা কাউকে প্রমোট করার জন্যেও নয়। কারো আত্মত্যাগ-অবদানকে ছোট করে দেখা অথবা কোন দায়িত্বশীলকে হেয় বা অবমূল্যায়ন করা আমার উদ্দেশ্য নয়।
লেখা প্রকাশিত হবার পর এ ব্যাপারে অসংখ্য প্রশ্ন এসেছে। সকল প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই। আমি ততটুকু-ই জানি যা আমার সামনে ঘটেছে এবং তা-ই বর্ণনা করেছি। এর বাইরে খুব একটা তথ্য আমার কাছে নেই। অসংখ্য মানুষ আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন। যারা যোগাযোগ করেছেন তাদের মধ্যে বৃটেনসহ বাংলাদেশ, কানাডা, সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে বসবাসকারী মানুষ রয়েছেন। অধিকাংশ মানুষ লেখাকে স্বাগতঃ জানিয়েছেন। অনেকে বলেছেন, শেষের দিকে এসে মনে হয়েছে আমি তাড়াহুড়া করছি। আরো লেখার প্রয়োজন ছিল। আমি স্বীকার করি, হয়তো আরো অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ ছিল। সময়ের সীমাবদ্ধতা, তথ্য-উপাত্তের অনুপস্থিতি এবং উৎসাহের অভাবের কারণে এমনটি হয়েছে।
কিছু পাঠক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ অশোভন ভাষায় আমার সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করেছেন। ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন। উল্লেখিত তথ্য সম্পর্কে কোন পাল্টা তথ্য উপস্থাপন না করে নানা অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে বালখিল্যতা দেখিয়েছেন। কেউ বলেছেন, এ লেখার মাধ্যমে আমি অপরাধ করেছি। সে জন্যে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসতে হবে। নতুবা আমাকে এ জন্যে দুনিয়া এবং আখেরাতে ক্ষতির সম্মূখীন হতে হবে। আরো বহু ধরণের নসিহত আমার প্রতি বর্ষিত হয়েছে। তওবা করার ব্যাপারে আমার কোন আপত্তি নেই। প্রত্যহ কমপক্ষে দু বার এবং সুযোগ পেলে কয়েকবার আমি তওবা করি। পাঠকের দেয়া নসিহত অনুসরন করে আবার তওবা করছি। হে আল্লাহ! জেনে না জেনে ছোট-বড় যত অপরাধ করেছি, তুমি তা মাফ করে দাও এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমার পথে অটল থাকার তওফিক দাও।
যারা পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাদের সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। পাঠকদের প্রশ্ন ও মন্তব্য থেকে আমি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পেরেছি, নতুন বিষয় অনুধাবন করেছি। আমার লেখায় যাদের নাম এসেছে তাদের কারো প্রতি আমার কোন ক্ষোভ নেই। ঘটনা বর্ণনার প্রয়োজনে তাদের নাম এসেছে মাত্র। যারা আমার প্রতি অশোভন আচরণ করছেন তারা হয়তো মহৎ উদ্দেশ্যে সেটা করছেন। আমি যদি তাদের মতো চিন্তা করতাম এবং তাদের অবস্থানে থাকতাম তা হলে আমিও হয়তো একই ধরণের আচরণ করতাম। তবে উদ্দেশ্য মহৎ হলেই কোন কাজ সঠিক হয়ে যায় না। ইসলামের দৃষ্টিতে কাজের পদ্ধতিও সঠিক হতে হবে। দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাদের অপরাধ সমূহ ক্ষমা করেন এবং সৎকর্মসমূহ কবুল করেন।
আমি যে বিষয় নিয়ে লিখেছি সে বিষয় সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্ম সরাসরি অবহিত নয়। ঘটনা ঘটেছে ৩৩ বছর আগে। সে সময় যারা জড়িত ছিলেন তারা বলতে পারেন, আমি ঠিক বলছি না ভুল বলছি। আমি মানুষ, ফেরেশতা নয়। আমার ভুল হতে পারে, আমার ভুল হয়। জীবনে বহু ভুল করেছি। আমার আশা ছিল, আমার লেখায় ভুল তথ্য থাকলে প্রত্যক্ষদর্শীর রেফারেন্স বা বিকল্প তথ্য দিয়ে কেউ তা খন্ডন করবেন। সে সময়ের কার্যকরী পরিষদের অনেক সদস্য মাঠে-ময়দানে আছেন। তাদের সাথে আলোচনা করে প্রদত্ত বিবরণ যাচাইয়ের সুযোগ আছে। কিন্তু কেউ তা করতে এগিয়ে এসেছেন বলে আমার চোখে পড়েনি। তথ্য খন্ডন না করে আজে-বাজে মন্তব্য করলে ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যায় না। তা ছাড়া কেউ বিজয়ী অথবা শক্তিশালী হবার অর্থ এ নয় যে প্রতিপক্ষের যুক্তি বা তথ্য ভুল ছিল। যুগে যুগে, দেশে দেশে সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখার ব্যর্থ প্রয়াস অতীতে অনেক হয়েছে, এখনো হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে চেষ্টা কখনো ফলপ্রসু হয় না। একদিন সত্য আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। আমাদের জানা ইতিহাস তাই বলে।
আমার লেখা পাঠ করে যারা অশোভন ভাষা ব্যবহার করেছেন তাদের নিকট থেকে আমার জন্যে শিক্ষনীয় দিক রয়েছে। আমি যদি আরো মধুর ভাষায় লিখতে পারতাম, আরো যৌক্তিক ভাবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে পারতাম তা হলে হয়তো তারা অশোভন ভাষা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতেন। তাদের ভাষা থেকে আরেকটা জিনিস আমি বুঝেছি। গত ১২ বছর আমি বাংলাদেশে যাইনি। অন্যান্য দলের অনেকের কাছ থেকে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আমার কাছে আসে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পড়াশোনার পরিধি এবং আচরণ। আমি ভাবতাম, ওরা বিরোধিতার খাতিরে তা বলছে। এখন তাদের ভাষা এবং বক্তব্য দেখে বুঝতে পারছি, উত্থাপিত অভিযোগের সবটুকু বানানো নয়। তাদের পড়াশোনা খুব সীমিত এবং কারো কারো আচরণ থেকে পরিস্কার বোঝা গেছে, তারা ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না।
‘মানুষের সাথে সুন্দর করে কথা বলো’ – এটা কুরআনের নির্দেশ। নবী মুসা (আ) এবং তাঁর ভাই হারুন (আ) কে আল্লাহ ফেরাউনের মতো খোদাদ্রোহীর কাছে গিয়ে দাওয়াত দিতে নির্দেশ দেন। সেখানে বলে দেন, ‘তার সাথে তোমরা নম্র ভাষায় কথা বলবে।’ সুতরাং কোথাও কেউ দোষ করলে নরম ভাষায় বলা ইসলামী আচরণের দাবি। মহানবী (স) বলেছেন, ‘মানুষের জন্যে সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, মানুষের মধ্যে বিরক্তি সৃষ্টি করো না।’
আমি আগেও বলেছি, এটা আমার আত্মকথা। এর আগেও আত্মকথা লিখেছি। সেটা ছিল কিশোর বয়সের কথা। ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে। আমার ওয়েব-সাইটে আছে। আলোচ্য লেখার নাম ছিল ‘৮২ সালের অকথিত কথকতা’। এক বন্ধু বললেন, শিবিরের নামটা যোগ হলে পাঠক বুঝবে আপনি কোন প্রসঙ্গে কথা বলছেন। ’৮২ সালের সংকট নিয়ে লেখার জন্যে অতীতে দেশ-বিদেশের অনেক বন্ধু ও শুভাকাঙ্খীর পক্ষ থেকে আমার কাছে বার বার অনুরোধ এসেছে। আমি এতদিন তাদের কথায় কান দেইনি। লেখাটি অনেক আগে তৈরি হলেও নানা দিক বিবেচনা করে এতদিন প্রকাশ করিনি।
লেখা পাঠ করে অনেকে এর পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন। র (RAW) এবং মোসাদকে টেনে আনছেন। ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বাংলাদেশী মানুষের প্রিয় প্রসঙ্গ। ইসলামী ঘরাণার লোক এর ব্যতিক্রম নয়। এর আগে আমরা মাওলানা আব্দুর রহীম সম্পর্কে শুনেছি, তিনি সিআইএ’র দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধির সাথে বৈঠক করেছেন। ভিন্নমতের লোকদের ব্যাপারে ‘র’ কানেকশনের কথা ইতোপূর্বেও প্রচার করা হয়েছে। আহমদ আব্দুল কাদের সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। আমার সম্পর্কে এতোদিন কিছু শুনিনি, এ লেখা প্রকাশের পর বলা শুরু হয়েছে।
আমি জানি আমি কেন লিখেছি এবং যা লিখেছি জ্ঞান-বুদ্ধি অনুযায়ী সত্য লিখেছি। আমরা দেখেছি, ৮২ সালে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে যে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছিল একই ধরণের সংকট পরবর্তীতেও হয়েছে। তাই বিষয়টা নিয়ে পর্যালোচনা হওয়া সময়ের দাবি বলে আমি মনে করি। এ প্রেক্ষিতেই এ সকল বিষয় এসেছে। কেউ চাইলে যারা সে সময় জড়িত ছিলেন তাদের নিকট থেকে এর সত্য-মিথ্যা যাচাই করে দেখতে পারেন। আমার বিবরণ বিশ্বাস করা বা না করা পাঠকদের বিষয়। কাউকে আমার কথা বিশ্বাস করার জন্যে বাধ্য করার অধিকার বা ক্ষমতা আমার নেই। তবে আমার লেখার প্রতিক্রিয়া হিসেবে যারা বাজে এবং অশালীন মন্তব্য করছেন সে দায়িত্ব তাদের। আমি বিশ্বাস করি, আমার ভাষা আমার পরিচয় বহন করে, তাদের ভাষা তাদের।
কেন আমি ৮২’র সংকট নিয়ে লেখার জন্যে বর্তমান সময় বাছাই করেছি, এ নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের উল্লেখ করে কোথাও কোথাও ‘ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইলিং’ চলছে। রাজনৈতিক সংকটের কথা বলে যে কোন ইসলাম-পছন্দ ব্যক্তিকে প্রভাবিত করা সম্ভব। এটা ঠিক, মানুষ যখন হত্যা, নির্যাতন, গুম এবং জুডিসিয়াল কিলিং এর মুখোমুখি তখন এ সব পুরাতন কথা শুনতে কারো ভালো লাগার কথা নয়। যারা আমার কাছাকাছি আছেন এবং যাদের সাথে আমার অন-লাইন যোগাযোগ আছে তারা ভালো করেই জানেন, চলমান নির্যাতন ও জুডিসিয়াল কিলিং এর কারণে আমার অশ্রুপাত ও রক্তক্ষরণ কারো থেকে কম নয়। কিন্তু এ সংকটের কারণ কী তা আমাদের অন্বেষণ করা দরকার। ধামাচাপা বা গলাবাজি নয়, সত্যিকার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। আমরা লক্ষ্য করছি, সংকট সৃষ্টির কারণ এবং তা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া অন্বেষণ শুরু হয়েছে। আমার এ আলোচনা সংকট উত্তরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।
৭১ নিয়ে আমি আজ হঠাৎ করে আলোচনা শুরু করিনি। ৮২’র আগে এবং পরে অনেক আলোচনা করেছি। সিলেট থেকে প্রকাশিত এবং মুকতাবিস-উন-নূর সম্পাদিত সাপ্তাহিক সিলেট কন্ঠে ’৮২ সালের শেষের দিকে একবার এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য লিড-নিউজ হিসেবে ছাপা হয়েছে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমায় ২০০৩ সালে এ বিষয়ে আমার লেখা ছাপা হয়েছে। ফাঁকে ফাঁকে অনেক অন-লাইন আলোচনাও আছে। এ প্রসঙ্গে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ড. আব্দুস সালাম আজাদী তাঁর ফেইস-বুক স্ট্যাটাসে খুব সুন্দর একটা মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘
মুহতারাম ফরিদ আহমাদ রেজা ভাইকে আমাকে একসময় ঘৃণা করতে শেখানো হয়েছিল। কারণ তারা শিবিরকে ভেঙ্গেছেন। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠতায় আসার পর মনে হয়েছে, যারা তাকে শিবির ভাঙ্গার অপবাদ দিয়েছিলো, যারা বলতো তিনি আর ইসলামে নেই, তারা অনেক ভুল কথা বলেছেন। ইদানিং তিনি ১৯৮২ এর শিবিরের ক্রান্তি কাল নিয়ে লিখছেন, আমার মত অনেকে কৌতুহলি হলেও বেশ কিছু তরুণ অতরুণ তাকে নিয়ে বিষোদ্গার করছেন। আমি বলি এই সব কথা আসা ভালো। ইসলামি আন্দোলনে এখন নতুন মোড়ের সময়, এই সময়ে আমাদের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে পা না বাড়াতে পারলে আমাদের গর্তগুলোতে আবারো আমরাই পড়তে পারি। আমাদের মত মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারিরা যদি আমাদের ই একজনের কথা সইতে না পারি……………!!!’
আমার লেখার ব্যাপারে অনেক অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এসেছে। এটা লেখার উদ্দেশ্য, আমার ব্যক্তিগত কাজ-কর্ম, ভাষার ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে সমালোচনার সাথে সাথে অনেক আপত্তিকর মন্তব্য এসেছে। এ সব প্রশ্ন বা মন্তব্যের জবাব দেয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।
৭১ এবং যুবশিবির নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং মূল্যবান মন্তব্য এসেছে। কেউ কেউ কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন। আরেকটা মৌলিক প্রশ্ন, ৮২ সালে সংকট সৃষ্টির কারণ কী? এ সকল প্রশ্নের কোনটাই এমন নয় যে এক কথায় বা সংক্ষেপে জবাব দেয়া যায়। প্রত্যেকটির ব্যাপারে স্বতন্ত্র আলোচনার প্রয়োজন। ৭১ প্রসঙ্গে শিবিরের কার্যকরী পরিষদের বৈঠকে এ নিয়ে কোন পর্যালোচনা হয়েছিল বলে আমি জানি না। আমার উপস্থিতিতে কোন মতবিনিময়ও হয়নি। ময়দানে কাজ করতে গিয়ে আমরা বুঝেছি, ৭১ ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটা সিদ্ধান্ত নেয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। শুরু থেকেই ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বলিষ্ঠভাবে কথা বলছি। আমরা বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উদযাপন করি। কিন্তু ৭১ সালে জামাতের ভূমিকা নিয়ে ময়দানে আমরা কিছু বলতে পারি না। জামাতের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে লিখিত বা অলিখিত কোন সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই।
অপরদিকে স্বাধীনতার পর থেকে মাঠে-ময়দানে এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে একতরফা ভাবে ৭১ ইস্যু নিয়ে জামাতের বিরুদ্ধে প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। এর প্রেক্ষিতেই বিষয়টা আলোচনায় এসেছে। জামাত রাজনৈতিক ভাবে অখন্ড পাকিস্তানের সমর্থক ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিল, এটা কোন গোপন বিষয় ছিল না। কিন্তু কেন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল তা কখনো পরিস্কার করে বলা হয়নি। আমাদের দাবি ছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিষয়টা নিয়ে পর্যালোচনা করা দরকার। পর্যালোচনা করে যদি জামাত মনে করে তাদের ভূমিকা সঠিক ছিল তা হলে এর কারণসহ তা জনগণের সামনে পেশ করতে হবে। যদি দেখা যায়, সে সিদ্ধান্ত ভুল ছিল তা হলে তাও জনগণকে অবহিত করতে হবে। যে কোন বিচারে এ দাবির যৌক্তিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।
৭১-এর ব্যাপারে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন, দায়িত্বশীল নিয়োগ, প্রশ্নপত্র তৈরি ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক কথা ময়দানে চালু আছে। কিন্তু এ মুহূর্তে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কোন তথ্য দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ২০০৬ সালে ‘পলিটিক্স এন্ড ডেভেলাপমেন্ট অব দ্যা জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ (BD-ISBN:984-8360-17-4) নামক একটি বই বাজারে এসেছে। বইয়ের লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ভূইয়াঁ মনোয়ার কবির। এর প্রকাশক এ এইচ ডেভেলাপমেন্ট পাব্লিশিং হাউস, ঢাকা। এ বইয়ে এ ব্যাপারে রেফারেন্স সহ আলোচনা করা হয়েছে। আগ্রহীরা বইটি পড়ে দেখতে পারেন। আগ্রহী কেউ প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাতকার গ্রহণ করে এ ব্যাপারে গবেষণা করতে পারেন।
২০০৩ সালের জুলাই মাসে লন্ডনের সুরমা পত্রিকায় প্রকাশিত আমার লেখায় বলেছিলাম, ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণে বাংলাদেশের অধুনিক প্রজন্মের সাথে ইসলামী আন্দোলনের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এরও একটা সমাধান হওয়া দরকার। শুধু বিজয় স্মৃতিস্তম্ভে ফুলদান করে সে দূরত্ব দূর করা যাবেনা। মরহুম খুররম মুরাদ তরজমানুল কুরআনে (জানুয়ারী, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ১৫-১৬) প্রকাশিত তার জীবনের সর্বশেষ লেখায় এ প্রসঙ্গ খুব সুন্দরভাবে অবতারণা করেছেন। তিনি সেখানে বলেছেন, জনগণের সাথে এবং জনগণের জন্য যারা কাজ করেন তাদের উচিত নিজেদের ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল কাজ গোপন না করে অথবা এর ভিন্ন ধরণের ব্যাখ্যা না দিয়ে প্রকাশ্যে জনগণের সামনে ভুলের স্বীকৃতি দেয়া। এর ফলে জনগণের সামনে তাদের সম্মান হ্রাস না পেয়ে আরো বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, খুররম মুরাদ বহু বছর ঢাকায় বাস করেছেন এবং ৭০-৭১ সালেও ঢাকায় ছিলেন। তখন তিনি ঢাকা শহর জামাতে ইসলামীর আমীর ছিলেন।
আমার মতে, পাক-বাহিনীর সাথে সহযোগিতার বিষয়টি ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন ফোরামে পর্যালোচনা হওয়া সময়ের দাবি এবং সে পর্যালোচনা জনসমক্ষে আসা দরকার। মহানবীর (সঃ) সমসাময়িক কোনো কোনো কাজের পর্যালোচনা কুরআনে খোলাখুলিভাবে এসেছে এবং তা কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। এতে মহানবী (স:) বা সাহাবাদের মর্যাদা কিছুমাত্র ক্ষুন্ন হয়নি।’
যুব শিবির গঠন, সময়কাল, এর যৌক্তিকতা, পরিধি, কর্মকৌশল, কেন যুবশিবির খেলাফত আন্দোলনের সাথে একীভূত হলো ইত্যাদি ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছে। আমি যুব শিবিরের কেউ-কেটা ছিলাম না। সংগঠনের দৈনন্দিন কাজের সাথেও জড়িত ছিলাম না। যারা এটা গঠন করেছেন তারাই এ সকল প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন। যুব শিবির প্রতিষ্ঠার যৌক্তিতা ব্যাখ্যা করা বা যুবশিবিরকে প্রমোট করা আমার এ লেখার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি শুধুমাত্র নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে ঘটনাবলীর একটা বিবরণ উপস্থাপন করেছি।
৮২ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যুব শিবিরের আলোচনা আসতে বাধ্য। যুবশিবির নিয়ে যে সকল প্রশ্ন এসেছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হলে আমাকে আরো পড়াশোনা করতে হবে এবং গঠন প্রক্রিয়ায় যারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন তাদের সাথে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু তা করার সময় বা আগ্রহ কোনটাই আমার নেই। যে কেউ তা করতে এগিয়ে আসতে পারেন। আমি যেটা জানি তা হলো, শিবিরের প্রাক্তন নেতৃবৃন্দ একটা যুব-সংগঠন গঠনের চিন্তা অনেক আগে থেকেই করছিলেন। পাঠকদের মনে থাকবে, শিবিরের প্রাক্তন সভাপতি মাওলানা আবু তাহেরের সাথে আলোচনার সময় আমি সে কথা তাঁকে বলেছি। আমার মতে, ৮২’ এর সংকট ভিন্ন কাঠামো দিয়ে এ প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করেছে মাত্র।
আমার মনে হয় এখানে আরেকটি কথা পরিস্কার করা দরকার। আমার বিভিন্ন লেখায় বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক অবস্থার বিশ্লেষণ থাকলেও বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।
লন্ডন, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫





১৯৮২ এর ফটোকপি হল ২০১০। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
আসসালামু আলাইকুম। সম্মানিত দ্বীনি ভাই। আপনার মত একজন ইসলামি স্কলার যদি বলেন যে আজকের দিনের ইসলামি আন্দোলনের উপর যে জুলুম, যে সংকট তা আগের কোনো ভুলের ফল তাহলে আপনার আন্দোলনের বুঝ নিয়ে প্রশ্ন আছে। ইসলামি আন্দোলনের উপর আপাতিত সংকট তো শ্বাশত, সব ইতিহাস এ কথাই বলে। নিজের অবস্থান clear করতে গিয়ে এমন একটি কথা বলা আপনার মত ব্যক্তির শোভা পায় না। আপনার লিখায় অনেক শক্ত যুক্তি রয়েছে কিন্তু লিখার জন্য উন্মুক্ত ব্লগ সঠিক জায়গা ছিল না। এরজন্য নির্দিষ্ট ফোরাম বেছে নিলেই ভালো হতো,কল্যান হতো।এখন যা অবস্থা তা থেকে ফাসাদ সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।যা নিশ্চয় আপনারও কাম্য ছিল না। ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর স্বার্থ প্রাধান্য দিলে ভালো লাগতো। অনেকের লিখায় আপনি কষ্ট পেয়েছেন এজন্য আমি দুঃখিত। আপনি যেমন আপনার আবেগ কে প্রশ্রয় দিয়েছেন তেমনি অন্যরাও হয়তো তার আবেগ কে ধরে রাখতে পারেন নি। আমার লিখায় যদি কষ্ট পান তাহলে আপনি ক্ষমাপ্রার্থী। আল্লাহ আপনার ভালো করুন।আমীন।।
তথ্যের বিপরীতে পাল্টা তথ্য না দিয়ে লেখককে গালি দেওয়া নিচু মানসিকতা । শ্রদ্ধেয় রেজা ভাই উনার । অন্যদের নিকট ভিন্ন তথ্য থাকলে পেশ করুন । আবেগবর্জিত নিরপেক্ষ লিখুন ।
তথ্যের বিপরীতে পাল্টা তথ্য না দিয়ে লেখককে গালি দেওয়া নিচু মানসিকতা । শ্রদ্ধেয় রেজা ভাই উনার নিজস্ব বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন । অন্যদের নিকট ভিন্ন তথ্য থাকলে পেশ করুন । আবেগবর্জিত নিরপেক্ষ লিখুন ।
aponar ja likhechen sob sotty
Jamaat shibirer dayeettoshilder ei ek gayemitar karone shibirer onek sokriyo kormi aste aste niskriyo jay atwopor ek samoy khove ,koste sangathon thekei mukh firiye ney
aponi ja likhechen sob sotty
Jamaat shibirer dayeettoshilder ei ek gayemitar karone shibirer onek sokriyo kormi aste aste niskriyo hoye jay abong ek samoy khove ,koste sangathon thekei mukh firiye ney
Ratification is a continuous process. There is always rooms to improve and we should understand these improvement. I think Shaheed Kamaruzzaman vhai wrote these topics in his last days.
সময় নিয়ে হলেও পড়া উচিত!
ছাত্র শিবিরের ১৯৮২ সালের সঙ্কট এবং কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়:
-অন্যান্য সংগঠন/আন্দোলনের নেতা/কর্মীদের তুলনায় কিছু অতিরিক্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জনশক্তির বেশিদূর এগিয়ে যাওয়া বা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে টিকে থাকা সম্ভব নয়. আন্দোলনে জড়িত হওয়ার উদ্দেশ্য থেকে শুরু করে আন্দোলনের অভ্যন্তরে আচরণ, আন্দোলন পরিচালনা, সহকর্মী-অধীনস্ত-দায়িত্বশীল ইত্যাদির মাঝে পারস্পরিক আচরণ ও ব্যবহার, পারস্পরিক আন্তরিকতা, সু-ধারণা, কল্যাণ কামনা, মতপার্থক্য ও সংকট মোকাবেলা ইত্যাদি বিষয়ে কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করতে হয়. এসব বিষয়ে অনেক লিটারেচার আছে যা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়. নিচে শুধু সংকট কালীন একটি বিষয় নিয়ে কিছু লিখছি।
সংকট কালীন সময়ে তাকওয়া ভিত্তিক আচরণ বনাম ‘ইগো’ কেন্দ্রিক আচরণ:
অন্যান্য সকল সংগঠন বা আন্দোলনের মত ইসলামী আন্দোলনেও ও সংকট আসবে এটাই স্বাভাবিক। অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য বা বিরোধ অসম্ভব কিছু নয়. সংগঠন ভাগ হওয়া বা ছেড়ে চলে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়. স্বয়ং খোলাফায়ে রাশেদীন এর যুগেও মারাত্বক ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। স্বয়ং রাসুলের স: অধীনেও সবাই টিকে থাকতে পারেনি। বাহ্যিক ভাবে এগুলো পীড়াদায়ক মনে হলেও অনেকে এধরনের সংকট কে পজিটিভলি দেখেন যার মাধ্যমে অনেক কিছু বের হয়ে আসে, কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়, এবং দেখা যায় একটা নতুন ধরনের জাগরণ বা গতি পায়. যারা সংকট সৃষ্টি করেন বা তার সাথে নানাভাবে জড়িত হয়ে পড়েন তাদের মূল উদ্দেশ্য কি থাকে তা তো কারো জানার কথা নয়. আন্তরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সবার সম্পর্কেই সুধারণা করতে হয়. যে যাই করেন না কেন এবং তাতে লাভ ক্ষতি যাই হোক না কেন- তারা হয়তো ভালো নিয়তেই কিছু করতে চেয়েছেন, আল্লাহর সাথে তাদের নিজস্ব সম্পর্ক নিয়েও কারো প্রশ্ন তোলা অবান্তর।
আমরা শুধু বাহ্যিক কাজ বা আচরণের কিছু বিশ্লেষণ করতে পারি। কোরান হাদিসে বর্ণিত নবী-রাসুল থেকে শুরু করে সালফে সালেহীন দের জীবনী থেকে আমরা দেখতে পাই যে কোন দুর্ঘটনায় বা সংকট মুহুর্তে জড়িতদের আচরণ দুই রকম হয়ে থাকে:
তাকওয়া ও ইখলাস ভিত্তিক আচরণ: কোন ঘটনা বা সিদ্বান্তের ব্যাপারে চরম মতপার্থক্য বা রিজার্ভেসন থাকা স্বত্তেও যাদের আচরণ পুরোপুরি তাকওয়া এবং ইখলাস দ্বারা পরিচালিত তারা সংকট বা সমস্যার কারণের জন্য অন্তর্মুখী রিফ্লেকশন বেশি করেন। প্রথমে নিজ থেকে শুরু করেন, নিজের ভুল ত্রুটি বা ভূমিকা দেখতে পান এবং স্বীকার করেন, ইস্তিগফার করেন, অন্য পক্ষের ভুল বেশি হলেও তাকে সন্মান করার জন্য দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নেন, অন্য কাউকে ব্লেইম করা থেকে বিরত থাকেন, এবং তার সার্বিক আচরণ সমাধান কেন্দ্রিক হয়. তিনি সমস্যা বাড়তে দেন না, তার প্রতি কেউ অন্যায় করলেও মনে ক্ষোভ পুষে রাখেন না; মনে এই ঘটনা, সমস্যা বা অন্যায় আচরণের বীজ বুনে রাখেন না ভবিষ্যতে ‘উপযুক্ত সময়ে প্রতিশোধ, জবাব বা শিক্ষা দেয়ার’ আশায়। অন্তর যত দ্রুত সম্ভব সব নেগেটিভিতিজ থেকে সাফ করে ফেলেন, আঘাত গ্লানি হজম করতে নিজের পক্ষে একটু কষ্ট হলেও বুঝতে পারেন যে এতেই আসল লাভ। নতুন ভাবে এগিয়ে যান ।
‘ইগো’ কেন্দ্রিক আচরণ: অন্য দিকে যারা প্রচন্ড ইগো তে ভুগেন তাদের দৃষ্টি হয় ছিদ্রন্বেষী । এক ধরনের অত্বম্ভরিতায় নিজেদেরকে সহকর্মীদের তুলনায় বেশি জ্ঞানী, যোগ্য ও মেধাবী মনে করতে শুরু করেন, নিজেকে বড় ভুল করতে পারেন এমন লোক মনে করেন না, নিজের কাজকে সর্বশক্তি এবং প্রয়োজনে অনেক বাঁকা যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করতে থাকেন। এধরনের লোকেরা সাধারনত সমাধান কেন্দ্রিক হন না, নানারকম প্যাচালের মাধ্যমে সমস্যা বাড়াতেই থাকেন। সব সংকটে তারা প্রথমে অন্যদের দোষ দেখতে পান বা খুঁজে বেড়ান। ইগো একটা সদা-বাড়তি রোগ, প্রথমেই চূড়ান্ত ভাবে একে দমন না করলে বাড়তেই থাকে, একসময়ে অনেক মানসিক রোগের কারণ হয়. একবার যদি মনের মধ্যে এই চিন্তা প্রশ্রয় দেয়া হয় যে, সমস্যার জন্য আমি দায়ী না বরং অন্য পক্ষ দায়ী- তাহলে ইগো কেন্দিক লোকের আর রক্ষা নাই. এটা একটা রোমান্টিক অব্সেসন এ রূপ নেয় যখন অতীতের কোন সমস্যার প্রেক্ষাপটে নিজেকে ‘ট্র্যাজিক হিরো’ হিসেবেই দেখতে পছন্দ করেন। এতে একধরনের আত্বপ্রসাদ লাভ করেন। এই বীজ বাড়তে বাড়তে ‘ভিক্টিম মেন্টালিটি (আমার প্রতি সবাই অন্যায় করে, আমি নির্দোষ)’ এবং ‘ব্লেইম অব্সেসন (সব দোষ অমুক তমুকের)’ থেকে শুরু করে প্যারানয়া এবং ডিপ্রেশন পর্যন্ত রোগ হতে পারে। এরা ইসলামী/সাংগঠনিক জীবনে যেমন হোচট খান, বাইরের জীবনেও এর থেকে সহজে রিকোভার করতে পারেন না. সব কিছু অন্তরের মাঝে পুষে রাখেন, মনের মধ্যে বীজ বাড়তে থাকে যাকে কেন্দ্র করে তার পরবর্তী জীবনও চালিত করেন।
জনাব ফরিদ আহমেদ রেজার লেখাটা পড়ে মনে হবে:
অধ্যাপক গোলাম আজম অস্বচ্ছ মনের দুই রকম মানসিকতার মানুষ ছিলে(চলবে)………..
মতিউর রহমান নিজামী মিথ্যুক লোক যিনি স্বয়ং গোলাম আজমের কাছে মিথ্যা বলেছেন, অথবা ডা: তাহের তার নামে মিথ্যাচার করেছেন।
আলী আহসান মুজাহিদ একগুয়ে হটকারী টাইপের লোক
মাওলানা আবু তাহের এবং মাওলানা ফরিদুদ্দিন চতুর ছোট মনের লোক
এনামুল হোক মঞ্জু, সাইফুল আলম খান মিলন ইত্যাদি অযোগ্য বা পদলোভি লোক
তখনকার বেশিরভাগ জনশক্তি – যাদের অনেকে তার নিজের তৈরী করা- তার বিরুদ্দ্বে ষড়যন্ত্র কারী
কিন্তু ফরিদ রেজা সাহেব নিজে ইনোসেন্ট মাইন্ডেড, পিউর হার্ট এর জীবন সংগ্রামী এক ট্রাজিক হিরো!
তার বিরুদ্ধে জামায়াত সমস্ত শক্তি দিয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল।
সবচেয়ে আশ্চর্য্য জনক কথা, ওই সময় যারা তার প্রতিপক্ষ ছিলেন তাদের প্রতি তার ক্ষোভ বিদ্বেষ অশ্রদ্ধা এখনো অনেক গভীর। শুধু স্মৃতি নয়- সমস্ত তিক্ত ফিলিংসও পুরোপুরি লালন করে চলছেন তিনি। এই ৩০ বছরেও তিনি তা থেকে রিকোভার করতে পারেন নি, অন্তর থেকে মুছতে পারেন নি. একসময় এসে মানুষ আর অতীত সম্পর্কে খুব ভাবেনা, ভবিষ্যতের চিন্তায় বেশি মগ্ন হয়, অন্তর থেকে নেগেটিভ চিন্তা ভাবনা দূর করে সুন্দর দিয়ে ভরতে চায়, পাকসাফ অন্তর নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে চায়. এত তীব্র ক্ষোভ বিদ্বেষ কি মৃত্যু পর্যন্ত লালন করে চলবেন? কারো অন্তরের অবস্থা আল্লাহ ভালো জানেন। আমরা কারো তাকওয়া-ইখলাস-পরহেজগারী সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করি না. কিন্তু তাকওয়া-ইখলাস নিঃসৃত আচরণ কোরান-হাদিসে সাধারনত এরকম নয়. আত্বজীবনীতে আমিত্ব থাকবে, একপেশে বর্ণনা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটা আমিত্ব ছাড়িয়ে ইগো সেন্ট্রিক ভিকটিম মেন্টালিটিতে পৌছে গেছে।
+++
১৯৮২ সালের সার সংক্ষেপ:
১৯৮২ সালের ঘটনার সাথে সরাসরি দিয়িত্বশীল পর্যায়ে জড়িত ছিলেন এমন প্রায় সবাই এখনো আছেন, তারা ইচ্ছে করলে বা সংগঠন প্রয়োজন মনে করলে বিস্তারিত লিখতে পারবেন। কিন্তু সরাসরি জড়িতগণ বা সংগঠন এঘটনাকে খুব বড় কিছু মনে করেন না. তার আগেও জামায়াতে ইসলামীতে অনেক বড় মতবিরোধ বা ভাঙ্গন ঘটেছিল- সংগঠন আনুষ্ঠানিক ভাবে সে গুলোকেও প্রকাশ্যে আলোচনা বা বিশ্লেষণের তেমন উপযুক্ত মনে করেন না. মাওলানা মউদুদী তার আমলের মতবিরোধ বা সংগঠন ছেড়ে অনেক বড় বড় আলেমদের চলে যাওয়া নিয়েও তেমন জোরালোভাবে কিছু বলেন নি বা লিখেন নি. এর পরবর্তী আমলেও এধরনের বিষয় নিয়ে সংগঠনের একই পলিসি। যেকোন সংগঠন করতে গেলে এধরনের ঘটনা ঘটবে তা অস্বাভাবিক কিছু নয়- কিন্তু এগুলোকে সেন্ট্রাল ইস্যু বানিয়ে ফেলে মৌলিক কাজেই বাধা সৃষ্টি করা বা রিসোর্সের অপচয় করা- তা জামায়াতের পছন্দ নয়. যথাসম্ভব নেগেটিভিটিজ এড়িয়ে সামনে ‘মুভ অন’ করাই তার পলিসি। জামায়াত সাংগঠনিক ভাবে কি করবে বা কি এড়িয়ে চলবে- এটা তাদের সাংগঠনিক পলিসি এবং প্রায়োরিটির ব্যাপার। তারা এটা করে কেন বা ওইটা করেনা কেন- এসব তাদের সংগঠনের বাইরে যারা আছেন তাদের পক্ষে পুরো বোঝা বা জানা সম্ভব নয়.
কিন্তু সংগঠনের বাইরে যাদের জামায়াতে ইসলামী নিয়ে কৌতুহল আছে তারা ইচ্ছেমত ব্যক্তিগত বা একাডেমিক আগ্রহে ইতিহাস অন্বেষন, পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ করছেন বা করবেন- তাদের সে অধিকার আছে. সে দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৮২ সালের ঘটনা নিয়ে তথ্য অনুসন্ধান করলে বোঝা যায় যে, জনাব ফরিদ রেজা অনেক কিছু এড়িয়ে গেছেন। জনাব এনামুল হক মঞ্জু কেন ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন তা বিস্তারিত বলেন নি. মূলত জনাব আব্দুল কাদের বাচ্চু এবং ফরিদ আহমেদ রেজা বক্তৃতা, বড় বড় যুক্তি দেয়া, ইমোশনাল কথা বলায় পটু ছিলেন। যাদের বাগ্মিতার কারণে একটা আবেগী ফ্যান গোষ্ঠী টাইপ তৈরী হয়েছিল। এই দুইজন- বিশেষ করে জনাব আব্দুল কাদের- উচ্চাভিলাষী ছিলেন। একই জেলার লোক হওয়াতে কিছুটা আঞ্চলিক বোঝাপড়াও হয়ত ছিল. অন্যদিকে জনাব মঞ্জু ঠান্ডা প্রকৃতির শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তারা জনাব মঞ্জু কে যথাযথ শ্রধ্বা করতেন না, নির্দেশ মানতেন না, একপ্রকার অকার্যকর করে ফেলেছিলেন। আব্দুল কাদের বাচ্চু যে নিজেকে সভাপতি পদের জন্য অধিকতর যোগ্য মনে করতেন এবং তার ফ্যান্গোষ্ঠী তাকে সভাপতি করার জন্য নানা কিছু শুরু করেছিল-এটা কোন গোপন বিষয় ছিলনা। কিন্তু যখন মিলন সাহেবকে সেক্রেটারি করা হল তখন তারা বুঝতে পারলেন স্বাভাবিক ভাবে আব্দুল কাদের সাহেব সভাপতি হতে পারবেন না. মিলন সাহেব সেক্রেটারি হলে তারা একপ্রকার বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন, প্রকাশ্যে মঞ্জু-মিলন সাহেবদের সমালোচনা করতে লাগলেন, সত্য-মিথ্যা নানা গসিপ ছড়াতে লাগলেন। মঞ্জু সাহেবের প্রতি তারা যে অনাচার করেছেন তা কোন মানদন্ডেই ক্ষমাযোগ্য নয়- তা স্রেফ বেয়াদবি এবং নিম্নমানের অসামাজিকতা। মিলন সাহেবকেও সেক্রেটারি হবার পরে ‘জুনিয়র’ এই অজুহাতে যেরকম তাচ্ছিল্য করা হয়েছিল তাও যেকোন সংগঠনেই গুরতর অপরাধ। অথচ পরে দেখা গেল মিলন সাহেব সংগঠনের ক্রান্তিকালে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, এবং কর্মজীবনেও অধিকতর সফলতা অর্জন করেছেন। (চলবে)……..
পরে দেখা গেল মিলন সাহেব সংগঠনের ক্রান্তিকালে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, এবং কর্মজীবনেও অধিকতর সফলতা অর্জন করেছেন। আসলে আব্দুল কাদের-ফরিদ রেজা গ্রুপ একপ্রকার সুপেরিয়রিটি কমপ্লেক্স এ ভুগতেন। গরম গরম যুক্তি দেয়া ও বাগ্মিতার জোরে জুড়ে যাওয়া একটা ফ্যানগোষ্ঠী তাদের সুপেরিয়রিটি কমপ্লেক্স কে অত্বম্ভরিতা, একগুয়েমি ও অহমিকায় পরিনত করেছে। তাদের বিপরীত মেজাজের কোমল ও শান্ত স্বভাবের লোকদের কে ইনফেরিয়র হিসেবে দেখতে শুরু করেন; যদিও বাস্তব কাজ, আচার ব্যবহার, তাকওয়া পরহেজগারী, ইখলাস ও আনুগত্য ইত্যাদি দিকে তারাই প্রশংসনীয় ছিলেন। এক ধরনের নোংরা চক্রান্তেই জনাব মঞ্জু পদত্যাগ করতে বাধ্য হন. পরে আব্দুল কাদের সাহেব সভাপতি হবার পিছনে ফরিদ রেজা সাহেবের ভূমিকা সক্রিয় ছিল. বিনিময়ে নিজে হয়েছিলেন সেক্রেটারি।
শিবির যে জামায়াত থেকে আলাদা একটি সংগঠন তা যেমন ঠিক, আবার এটাও ঠিক যে দুই সংগঠন একই লক্ষ্য উদ্দ্যেশ্য নিয়ে একই সাহিত্য ও দর্শনের উপরে প্রতিষ্ঠিত, এবং এটি ছাত্র সংঘেরই স্থলাভিষিক্ত। এর প্রতিষ্ঠাতাগণ আগে ছাত্র সংঘের দায়িত্বে ছিলেন এবং পরেও জামায়াতেই যোগ দেন. তাই এর উদ্দেশ্য লক্ষ্য বা কার্যক্রম কিরকম হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা সবারই ছিল. শুরুর দিকে ভিবিন্ন কার্যক্রম বিশেষ করে ৮১ সালের সন্মেলন থেকে জামায়াতের পরিচিত নেতাদেরকে একটু দুরে রাখার কৌশল তো জামায়াতের লোকেরাই ঠিক করেছিলেন। সামরিক বাহিনীর আমলে সরাসরি জামায়াতের জড়িত হবার মত পরিস্থিতি কি তখন ছিল? কিন্তু জামায়াত বা ছাত্র সংঘ যে উদ্দেশ্য বা দর্শন দ্বারা পরিচালিত- তার চাইতে ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য বা দর্শন কি শিবিরের ছিল? তাই এর উপরে জামায়াতের প্রভাব থাকবে- এটা অস্বিকার করা বা মানতে না পারা একধরনের ছেলেমানুষী। জামায়াতের নেতাদের কাছ থেকে যে কারণে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা হয়েছিল তা খুব সফল হয়নি। সরকারী মহল সত্যিই বুঝতে পেরেছিল যে এটি আসলে ছাত্র সংঘেরই স্থলাভিষিক্ত, তাই জামায়াতেরই অঙ্গ সংগঠন। তাই শুরু থেকেই কিছু গোয়েন্দা সংস্থা চেষ্টা করে আসছিল কিভাবে জামায়াত প্রভাব থেকে শিবিরকে বের করে আনা যায়. বিশেষ করে তখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছাত্রদল গঠন ও শক্তিশালী করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। বিএনপির কায়দায় ছাত্রদল কে সংগঠিত করার জন্য বিভিন্ন দলের লোকের উপর তার দৃষ্টি পড়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন ছাত্র শিবিরকে পুরোটাই গিলে ফেলতে, ছাত্রদলের সাথে একীভূত করে ফেলতে। সে অনুযায়ী এক সরকারী কর্মকর্তা বড় ইয়ানত দিয়ে ও ভালো ভালো ইসলামী কথাবার্তা বলে শিবিরের সভাপতিদের সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরী করে. তিনি প্রথম জনাব শহীদ কামারুজ্জামান সাহেব কে প্রস্তাব করেছিলেন যে শিবির যদি জামাত থেকে বের হয়ে আসে তাহলে তার মত অনেক সরকারী অফিসার এবং শিক্ষিত সমাজের সমর্থন পাবে। কিন্তু গভীর চিন্তাশক্তির ঠান্ডা মাথার মানুষ জনাব কামারুজ্জামান সেই ফাঁদে পা দেন নি. তিনি গভীর পড়াশুনা আর প্রজ্ঞার কারনেই বুঝতে পেরেছিলেন যে ওই দর্শন থেকে সরে গেলে শিবির আসলে বেশিদিন টিকে থাকবে না. এরপরের দায়িত্বশীলদের অনেককেই নানাভাবে সরকারের নানাজন এপ্রোচ করেছিল- কিন্তু তারা সেসব সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। জনাব আব্দুল কাদের সভাপতি হলে এক অফিসার তাকেও শুভাকাংখী সেজে একই প্ররোচনা দেয়- জামায়াত ত্যাগ করে স্বাধীন সংগঠন হলে শিবির সরকারি অনেক কর্মকর্তা সহ সব শিক্ষিত সুধী মহলের সহযোগিতা পাবে। মূলত সেভাবেই ৭১ ইস্যু আব্দুল কাদের সাহেবের মাথায় ঢুকে। সাথে যোগ হয় ইরানি বিপ্লবের ডামাডোল। সরকারী কোন মহল আর দেশের সুধীজনদের সহযোগীতে পেলে বঙ্গবন্ধুর মত গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দিয়ে ইরানি স্টাইলে ইসলামী বিপ্লব করে ফেলা যাবে- এই আর কি! হাইপার আবেগী মানুষ আব্দুল কাদের নিজের নেতৃত্বে যুবকদের নিয়ে ইসলামী বিপ্লব করবেন, জামাতের দরকার নাই যেহেতু জামায়াত বিপ্লব বিরোধী গনতান্ত্রিক সংগঠন- এই বিভ্রান্তিতে পড়েছিলেন, কোন ফাঁদ বোঝার মত গভীরতা তার ছিলনা। তিনি সাগরেদ হিসেবে পান আরেক আবেগী হাইপার লোক তার সেক্রেটারি জনাব ফরিদ রেজাকে। দুইজনই একই অঞ্চলের, তাই হয়ত বোঝাপড়া সহজ হয়েছিল। তারা চেষ্টা করেন জামাতের প্রভাব থেকে বের হয়ে আসতে। কিন্তু অধিকাংশ জনশক্তি তাদের মত ধোকায় পড়েন নি, কালেক্টিভ জনশক্তির কালেক্টিভ জাজ্মেন্ট তাদের সেই হঠকারিতা ভন্ডুল করে দেয়. তারা সংগঠন পরিচালনা করতে পারছিলেন না ( জনাব আব্দুল কাদের সভাপতি হবার আগে তেমন বড় দায়িত্ব পালন করেন নি-
(চলবে)……..
( জনাব আব্দুল কাদের সভাপতি হবার আগে তেমন বড় দায়িত্ব পালন করেন নি- মেধাবী ছাত্র, ফিগার ও বাগ্মিতার কারণে আবেগী তরুনদের কাছে তার একটা জনপ্রিয়তা ছিল তা ঠিক এবং সেকারণেই তাকে কোন সিরিয়াস দায়িত্বের পরীক্ষা ছাড়াই দ্রুত তুলে আনা হয়েছিল; ফরিদ রেজা মাত্র ৬ মাসের জন্য ঢাকা মহানগরীর এড-হক দায়িত্বে ছিলেন; তাদের বাগ্মিতা ছিল ঠিকই কিন্তু অন্যদের সাথে ব্যবহার কঠোরতা, সংগঠন পরিচালনা এবং ফিল্ড ওয়ার্ক এ ছিলেন দুর্বল), কার্যকরী পরিষদের সদস্যরাও তাদের কার্যক্রম দেখে হতাশ হয়ে পড়ে, মেম্বারদের অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হিমশিম খান. এর মাঝে আবার জেদ ধরেন যুব শিবির করার। যুব শিবিরের কথা এর আগেও উঠেছিল- তা ঠিক. কিন্তু বরাবরই তা নাকচ হয়ে যায়, যেকারণে আর কেউ এ নিয়ে মাতামাতি করেন নি. কিন্তু এরা ডেড ইস্যু কে আবার তুলে এনে নতুন বিতর্ক শুরু করে। এ এক আজব প্রস্তাব- ছাত্ররা সংগঠন করে দিবে যুবকদের কে! যদি যুবশিবির গঠন করতেই হয় তাহলে তা করবে যুবকদের চাইতেও সিনিয়র কেউ – অর্থ্যাত মূল সংগঠন বা জামায়াত। কিন্তু এরা নিজেরা ছাত্র হয়ে যুবকদের জন্য সংগঠন করে দেয়ার চিন্তা শুরু করে! আবার তা করার জন্য মুরুব্বি সংগঠন কে চাপ দিতে থাকে! এ যেন লেজ মাথা নাড়াতে চেষ্টা করা! এরকম অবাস্তব নানা আইডিয়া দিতেই থাকেন, কিন্তু বাস্তব কাজের বেলায় দেখা গেল জিরো। সংগঠনের পুরো রুটিন এন্ড ডিসিপ্লিন নষ্ট হয়ে যায়. অবশেষে যে পথে নেতৃত্বে এসেছিলেন সেপথেই তাদের কে সরে যেতে হয়. স্বাভাবিক পন্থায় দায়িত্বশীল হন নি, তাই স্বাভাবিক অবস্থায় যেতেও পারেন নি. এজন্যই এক সেশনে তিনবার নির্বাচন করতে হয়েছিল – যা জনাব ফরিদ রেজা তাচ্ছিল্যভাবে উল্লেখ করেছেন, যার জন্য মূলত তার গ্রুপ নিজেরাই দায়ী।
সংগঠন থেকে বের হয়ে স্বাধীন ভাবে বিপ্লব করার জন্য যুব শিবির গঠন করলেন, কিন্তু পুরোপুরি স্বাধীন চেতনা কি থাকলো? একবার হাফেজ্জী হুজুর তো আরেকবার চরমোনাই হুজুর। । ইরানি স্টাইলে বিপ্লব করার চিন্তা মাথায় ঢুকেছিল, সেজন্য ইরানের কাছে সাহায্যের জন্য ধরনা দিতে হলে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের বিরোধিতা করা দরকার। অতএব জামায়াত বিরোধিতার সাথে সৌদি আরবকেও জড়ানো হলো. জামায়াত নাকি সৌদি আরব থেকে শত শত কোটি টাকা পায় এবং তার সিংহ ভাগ জামায়াত নেতারা আত্বস্বাত করে নিজেদের ঘর বাড়ি বানায়! ইরান জোয়ারে তখর বেশ প্রখর স্রোত। বিপ্লব তো দেখি একেবারে সোজা- ঢাকার রাস্তায় নেমে গরম বক্তৃতা শুরু করে দিলেই হয়। যাইহোক-শেষ পর্যন্ত কাউকে না কাউকে মুরুব্বি মানতেই হলো. পার্থক্য এটুকুই যে ন্যাচারাল পিতা কে ছেড়ে অন্যকে বাবা ঢাকার মত. যে সমস্ত সুধী সমাজ শিবির কে জামায়াত থেকে আলাদা করলে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন, তারা জামায়াত-মুক্ত যুব শিবির করার পরে কতটা সহযোগীতে করেছিলেন? শিবির প্রথম দিকে জামায়াতের সাথে পরিচিত ছিলনা বলে নাকি অনেকেই আকৃষ্ট হয়েছিলেন, তারা কি যুব শিবিরের প্রতিও আকৃষ্ট হয়েছিলেন? নাকি প্রেমিক পুরুষের মিষ্টি আশ্বাসে স্বামীর সংসার ত্যাগ করে দেখা গেল যে প্রেমিক পুরুষ লাপাত্তা- সেরকম ঘটেছিল?
এরকম সংগঠন বেশিদিন টিকে থাকার কথা নয়, তাই থাকেও নি. মাঝখানে কয়েকহাজার যুবকের শিকড় হীন হয়ে পড়া, গতিহীন হয়ে উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়া. বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা ৩য় ঘটনা যে কিছু আবেগী ইমোশনাল যুবক বিপ্লবী মানসিকতায় বিভ্রান্তিতে পড়ে হঠকারী সিধ্বান্ত নিয়ে হাজার হাজার যুবকের সর্বনাশ করে. প্রথম ঘটনা মুক্তিযুদ্ধকালীন মনি-রাজ্জাক-তোফায়েল ইত্যাদির নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী গঠন- যেটা পরে রক্ষিবাহিনী নামে একটা ক্রিমিনাল গ্যাং এ পরিনত হয়; ২য় ঘটনা সিরাজ-ইনু-রব ইত্যাদির নেতৃত্ত্বে জাসদ গঠন করে অসংখ্য যুবককে মৃত্যু মুখে ঠেলে দেয়া; আর ৩য় ঘটনা আব্দুল কাদের-ফরিদ রেজা ইত্যাদির নেতৃত্বে যুব শিবির গঠন করা. তখন জামাত যদি সক্রিয় ভাবে যুব শিবিরের বিরোধিতা না করত তাহলে আব্দুল কাদের বাচ্চুগন হাজার হাজার ইসলামী যুবকদেরকে সেই ধ্বংসের পথেই নিয়ে যেতেন যেই পথে রব-ইনুরা বামপন্থী যুবকদের ডেকে নিয়ে সর্বনাশ করেছিলেন। বড় ধরনের সর্বনাশ হবার আগেই এদের আকর্ষণ শেষ করে দেয়ার জন্য জামাত নেতৃত্ব কে অবশ্যই ক্রেডিট দিতে হবে. আমি নিরপেক্ষ ভাবে বিশ্লেষণ করেই বলছি যে জামাত যে সক্রিয়ভাবে যুব শিবির, আব্দুর রহিম সাহেবের সংগঠন, এবং ৮৭ সালের জনাব সাইদী-চরমোনাই ইত্যাদির নেতৃত্বে ঐক্যজোট এর বিরোধিতা করেছিল তা একশত ভাগ সঠিক ছিল. কারণ এই তিন সংগঠনের গতিই ছিল হঠকারী বিপ্লব মুখি। এরা গঠন করার পরে আর কোন ক্ষেত্রেই মনোযোগ দেয়নি, কোন প্রতিষ্ঠান গড়তে চায়নি, কোন সামাজিক সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নেয়নি। এসব সংগঠনের একমাত্র কার্যক্রম ছিল রাজনৈতিক, তথা অতি বিপ্লবী চরিত্রের । (চলবে)………….
কোন প্রতিষ্ঠান গড়তে চায়নি, কোন সামাজিক সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নেয়নি। এসব সংগঠনের একমাত্র কার্যক্রম ছিল রাজনৈতিক, তথা অতি বিপ্লবী চরিত্রের । জামায়াত সক্রিয় ভাবে সবাইকে সতর্ক না করলে এদের নেতৃত্বে ইরানি আবেগে তখন ইসলামপন্থী যুবকরা ধংসের দিকেই লাফিয়ে পড়ত, যেমন পরে তালেবানি আবেগে এবং বর্তমানে আইসিস আবেগে শত সহস্র যুবক শেষ হয়ে গেছে। অথচ জনাব ফরিদ রেজা জামাতের সেই ভূমিকার সমালোচনা করছেন। অর্থ্যাত জনাব রেজার মাঝে এতদিনেও চিন্তাশক্তি বা বিশ্লেষণের কোন ম্যাচুরিটি/গভীরতা আসেনি, যুবক বয়সের ইম্যাচুরিটি রয়ে গেছে।
মূলত বাংলাদেশে কেন উপমহাদেশেও যুবকদের এককভাবে নির্ধারিত দর্শনে গড়ে উঠা কোন সংগঠনই শেষ পর্যন্ত পজিটিভ থাকেনি। একসময় না একসময় যুবকদের দ্বারা গঠিত এবং পরিচালিত আন্দোলনগুলো হঠকারিতার দিকে রূপ নিয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে মুরুব্বি সংগঠন তাদের সমস্ত দুর্বলতা ও শর্ট কামিংস সত্বেও অনেক বড় কিছু অর্জন করেছে, অনেক বেশি অবদান রেখেছে। তাই কোন সংগঠনের লেজুড়বৃত্তি করবনা, স্বাধীন ভাবে সুন্দর ছাত্র-যুব সংগঠন করব- এগুলো সুন্দর ও রোমান্টিক শোনালেও- এধরনের সংগঠন বা আন্দোলন বড় কিছু অর্জন করতে পারবে না. বড় কিছু করতে চাইলে ছাত্র যুবকদেরকে আলটিমেটলি বেশি অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ মুরুব্বিদের উপদেশ নিয়েই চলতে হবে.
এটা শুধু কো-ইন্সিডেন্স নয় যে বেশির ভাগ নবী-রাসুলদের কে দায়িত্ব প্রাপ্তির জন্য একটা নির্দিষ্ট বয়ষ ( অধিকাংশ ৪০ এর কাছাকাছি) পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২৫-৩০ বছরের কিছু ছাত্র-যুবক একটা দর্শন-আইডিওলোজি দাঁড় করাবে আর তার পিছনে দলবেধে সবাই ছুটে চলবে- এরা আলটিমেটলি ধ্বংসের পথেই যেত।
+++
জামায়াতের ইতিহাস বিশ্লেষকদের মৌলিক গলদ :
জামায়াতে ইসলামী মানুষদের তৈরী, মানব পরিচালিত একটা সংগঠন। এর নেতারা বা জনশক্তি যেমন পারফেক্ট নয়, তেমনি এই সংগঠন ও পারফেক্ট নয়. প্রতিষ্ঠাতা থেকে শুরু করে দায়িত্বশীল পর্যায়ের কেউ তা দাবিও করে না. অন্যান্য সবার মতই দৈনন্দিন সমস্যা ও বাস্তবতা মোকাবেলা করেই একে চলতে হয়. তাই সবার মত চিরন্তন মানবিক ন্যাচারের সাথে সংস্লিষ্ট মানবিক সমস্যা সংকট এখানে থাকবেই। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও এর প্রতিষ্ঠাতা বা দায়িত্বশীল গণ নবী-রাসুল এর মত মাসুম নন, বা সাহাবাদের সমপর্যায়ের নন; এবং জামায়াত নবী পরিচালিত সাহাবাদের সংগঠনের লেভেল এর নয়. তাই এর ধর্মীয় মান সেরকম নয়, এতে জড়িত হওয়া বা না হওয়া ঈমানের মাপকাঠি হতে পারে না. কোন অল্প বিদ্যার হুজুগী জামায়াত কর্মী এধরনের দাবি করলে সেটা ভুল এতে সন্দেহ নেই এবং এর দায়িত্ব তার উপরে বর্তায়। জামায়াত প্রতিষ্ঠাতা বা এর দায়িত্বশীলগণ এরকম দাবি করেন না. প্রমান ছাড়া তাদের কে এজন্য দোষ দেয়া অন্যায়।
জামায়াত যেটা দাবি করে এবং অন্যান্য সব সংগঠনের মত তা করার অধিকার তার আছে- তা হলো এটি বর্তমান সময়ে প্রচলিত সমাজে বিরাজমান সংগঠনগুলোর মাঝে শ্রেষ্ঠ। এটা আপেক্ষিক বিচার বিশ্লেষণের ব্যাপার- ইসলামের উপর সবার নিজস্ব বোঝাপড়া, কোন এঙ্গেল থেকে কে দুনিয়া বা ইসলামকে দেখে, এবং শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠির সম্পর্কে কার কি ধারণা- সেসবের ব্যাপার। সবার কাছে সব জিনিস একইরকম সুন্দর নয়, একই রকম শ্রেষ্ঠ নয়.
জামায়াত দুনিয়া এবং দ্বীন কে একই জীবনের অবিছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে, ইসলামকে একটি কম্প্রেহেন্সিভ প্রো-একটিভ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে দেখে, আধুনিক সময়ের ম্যাটেরিয়েল উন্নয়ন ও সর্বকালীন স্পিরিচুয়াল ভ্যালুজ এর সমন্নয় সাধনকে সম্ভব মনে করে. এসমস্ত ধারণা কে একই সাথে লালন করে এরকম সংগঠনগুলোর মাঝে জামায়াত শ্রেষ্ঠ- তা তারা দাবি করতে পারে, অন্যরাও দাবি করতে পারে। এ দাবি করা কোন অন্যায় নয়- মানা না মানা অন্য ব্যাপার।
আরেকটি বিষয়ে জামায়াত কে অভিযুক্ত করা হয় যে, জামায়াত খোলাফায়ে রাশেদীন এর যুগের পর থেকে অন্য সমস্ত ইসলামী আন্দোলন কে অস্বিকার করে, এবং গত ১৩০০ সালের মাঝে কেবল জামায়াত কেই একমাত্র ইসলামী আন্দোলন মনে করে. এটি সৃষ্টি হয়েছে কিছু টার্ম এর ভুল বোঝাবুঝির কারণে। ইসলামী সংস্কার আন্দোলন সর্ব কালেই ছিল, ব্যক্তিগত সীমিত পর্যায়ে হোক বা কালেকটিভলি হোক. গত ১৩০০ সালে অনেক বড় রিফর্মার এসেছিলেন এবং অনেক অন্দোলন ও জন্ম নিয়েছিল। অতীতের আন্দোলন সমূহ কে অস্বিকার নয়, বরং সেগুলোর দুর্বলতা চিন্হিত করে তা থেকে শিক্ষা নেয়াই ছিল মাওলানা মউদুদীর উদ্দেশ্য। এটি শুধু এই আন্দোলনের এই নেতাই করেছেন তা নয়. সব রিফর্মার এর কার্যক্রম শুরু হয় এভাবে। একাডেমিক সমালোচনার দৃষ্টিতে তা করতে পেরেছেন বলেই জামায়াতের সাথে তিনি কিছু ইউনিক বৈশিষ্ঠ্য যোগ করতে পেরেছিলেন, তাই এর সাথে তীতের আন্দোলনগুলোর কিছু তফাত আছে. এই বৈশিষ্ট গুলো ইসলামী আন্দোলন কে নতুনত্ব দিয়েছে এবং আধুনিক সময়ের উপযোগী করেছে তা স্বীকার করতে হবে. যেমন: (চলবে)……………….
এবং আধুনিক সময়ের উপযোগী করেছে তা স্বীকার করতে হবে. যেমন:
একটা সুনির্দিষ্ট দার্শনিক ভিত্তির উপরে সুচিন্তিত চিন্তাধারা এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে জামায়াত প্রতিষ্টিত। জাস্ট কোন ঘটনার প্রেক্ষাপটে তাত্ক্ষণিক রিয়েক্শন হিসেবে নয়.
আন্দোলন ধারাবাহিক, ক্রমাগত, অবিচ্ছিন্ন, অনির্দিষ্ট কাল-সমাজ-সময়ের উদ্দেশ্যে। একক বা সাময়িক কোন নির্দিষ্ট অবস্থা মোকাবেলার জন্য নয়.
জামায়াতই এর জনশক্তির মূল কাজ এবং লক্ষ্য; নিয়মিত ভাবে এবং আজীবনের জন্য।
জামায়াতের কম্প্রেহেনসিভ এজেন্ডা এবং মাল্টি-লেভেল এর সাংগঠনিক স্ট্রাকচার।
সাংগঠনিক বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।
সর্বোপরি, ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা থেকে সরে এসে সংগঠন কেন্দ্রিক কার্যক্রম: এটি বলতে গেলে একটি অভাবনীয় ব্যাপার। মাওলানা মউদুদী সবদিক দিয়ে এটির মূল ছিলেন, সব কিছুর উদ্যোক্তা ছিলেন, জামায়াতের জন্য তার নিজস্ব চিন্তাধারা ছিলো; তথাপি এটি লক্ষ্যনীয় যে তিনি নিজেও প্রেফার করতেন জামায়াত তার ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র না করে বরং কিছু সাংগঠনিক কাঠামো কে কেন্দ্র করে এগিয়ে যাক. তিনি তো বারবার অন্যদেরকে আমিরের দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ করেছিলেন, নিজেকে আমিরেরের পদ থেকে অব্যাহতি দিতে অনুরোধ করেছিলেন কয়েকবার, এবং শেষ বয়সে আমির ছিলেন না. তার উদাহরণ পরবর্তী কালে তার অনুসারী অন্য আমিরগণ ও ফলো করেছেন। জামায়াতের কোন সাবেক আমির ইমারতের পদে আসীন থাকা অবস্থায় ইন্তিকাল করেন নি- তার পূর্বেই দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কেউ নিজেকে জামায়াত বা ইসলামী আন্দোলনের জন্য অপরিহার্য্য মনে করেন নি. এটি ইউনিক এবং অসাধারন একটি ব্যাপার। সম্ভবত এর আগে আর কোন ইসলামী রিফর্মার বা সংগঠক এরকম বলেন নি যে আমাকে অব্যাহতি দিয়ে অন্যকে সংগঠকের দায়ত্ব দিন. যারা সাংগঠনিক মেজাজের ছিলেন না তারা সংগঠন প্রতিষ্ঠাই করেন নি, অন্যভাবে খেদমত করেছেন। কিন্তু সংগঠন বা আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তা নিজ কেন্দ্রিক না করে সাংগঠনিক কাঠামো কেন্দ্রিক করেছেন- এমন উদাহরণ বিরল। সম্ভবত এজন্যই জামায়াত পূর্ববর্তী ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন গুলোর তুলনায় অধিকতর স্থায়ী হবে.
উপরের বৈশিষ্ঠ্য গুলোর কিছু কিছু অতীতের আন্দোলনগুলোতে বিক্ষিপ্ত ভাবে পাওয়া যায়. কিন্তু সবগুলো একসাথে নয়. আর যেগুলো পাওয়া যায় তাও ফর্মাল অংশ হিসেবে নয়, ক্যাজুয়াল বিষয় হিসেবে। অতীতে এই বৈশিষ্টগুলো না থাকলেও চলতো, কিন্তু বর্তমানে মেইনস্ট্রিম কোন আন্দোলন/সংগঠন এগুলো ছাড়া চলতে পারেনা। সেভাবে চললে তা ফ্রিঞ্জ মুভমেন্ট হবে, অথবা আধুনিক পরিভাষায় ক্লান্ডেসটাইন আন্দোলন/সংগঠন হিসেবে গন্য হবে. মাওলানা মউদুদী যা করেছেন তা হলো এই সব বিষয়গুলোকে সমন্নিত করে ইসলামী আন্দোলন কে একটি ফর্মাল স্ট্রাকচার বা ইন্সটিটিউশোনালায়জড রূপ দেয়া। তাই ইসলামী আন্দোলন বা সংগঠনের উদ্ভাবক হিসেবে নয়, বরং ইসলামী আন্দোলন/সংগঠন কে ক্লান্ডেসটাইন ফর্ম থেকে ইন্সটিটিউশনাল ফর্মে রূপান্তর করা এবং ফ্রিঞ্জ মভ্মেন্ট থেকে মেইনস্ট্রিম মুভ্মেন্ট এ নিয়ে আসাই মাওলানা মউদুদীর মূল অবদান বলে আমি মনে করি. এর নতুনত্ব এবং সফলতা অস্বিকার করার কোন উপায় নাই.
এ বৈশিষ্ট্য গুলো যে একত্রিত ভাবে সর্বপ্রথম জামায়াতেই পাওয়া যায়- তা ইসলামী দাওয়া বা আন্দোলনের ইতিহাস যারা বিস্তারিত জানেন তারা স্বীকার করবেন। এমনকি ইসলামী আন্দোলন তো দুরের কথা, অধিকাংশ অনৈসলামিক আন্দোলন/সংগঠনেও এগুলো অনুপস্থিত। পাশ্চাত্যের অনেক ঐতিহ্যবাহি দলেও এগুলোর কিছু কিছু রিসেন্টলী মাত্র এডপ্ট করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে ইসলামী আন্দোলনের জন্য এগুলোর আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা। তা আপেক্ষিকভাবে নিজস্ব বোঝাশুনার ব্যাপার, বিস্তারিত বিশ্লেষণ এখানে প্রাসঙ্গিক নয়. কিন্তু এটা স্বীকার করতেই হবে যে যে সময়ে যে সমাজে এবং যে পরিস্থিতিতে জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং অদ্যাবদি তার কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে সে কন্টেক্স্ট এ এধরনের বৈশিষ্ঠ্য গুলো এডপ্ট করা এবং তার উপর কমবেশি টিকে থাকা- একটি ইউনিক, এক্সেম্প্লারি এবং অভাবনীয় ব্যাপার।
তাছাড়া অতীতের আন্দোলনগুলো পার্মানেন্ট বেসিসে সমাজের মেইনস্ট্রিম অংশ হিসেবে ধারাবাহিক ভাবে ছিলনা। অনেক বড় আন্দোলন হয়েছে, অনেক সংস্কার বা জিহাদী সংগঠন হয়েছে, অনেকগুলোর বড় সার্বজনীন অবদান আছে. কিন্তু প্রায় সবগুলোই কোন না কোন নির্দিষ্ট ঘটনা, সমাজ, বা ইস্যু কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, যার ফলে নির্দিষ্ট সময়ের পরে এগুলো ম্রিয়মান হয়ে গিয়েছে (যদিও তাদের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে এখনো অনেক জোরালো ভাবে আছে, কিন্তু আন্দোলন নিজে অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে। ইসলামী সংস্কারক ও সংস্কার আন্দোলনের বিস্তারিত ইতিহাস নিয়ে মাওলানা সাইয়েদ আলী আহসান নাদাবির ‘স্যাভীয়রস অব দ্যা ইসলামিক স্পিরিট’ নামের বিশাল বই পড়ে দেখার অনুরোধ রইলো).
(চলবে)…………
স্পিরিট’ নামের বিশাল বই পড়ে দেখার অনুরোধ রইলো). মাওলানা মউদুদী এমন পরিকল্পনা করেছেন যাতে জামায়াতে ইসলামী পার্মানেন্ট বেসিসে মেইনস্ট্রিম সমাজের অংশ হিসেবে থাকে। এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে তা আছে. ভবিষ্যতের কথা আল্লাহ ভালো জানেন।
তাই যেকোন আন্দোলন বা সংগঠনের মতই জামায়াতে কে বিশ্লেষণ করতে হলে তার কন্টেক্স্ট বিবেচনা করতে হবে, এবং অন্যদের সাথে কম্পেয়ারিটিবলি বিবেচনা করতে হবে. কিন্তু এই বিষয়ে আমাদের বিশ্লেষক বন্ধুদের মাঝে একধরনের অদ্ভূত আচরণ লক্ষ্য করা যায়, যারা জামায়াত কে বিশ্লেষণ করার সময় একাকিভাবে বিচ্ছিন্নভাবে তা করেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, প্রেজেন্ট কন্টেক্স্ট এবং রিয়ালিটি সীমাবদ্ধতা , তুলনামূলকভাবে বর্তমান প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্ধি অন্যদের অবস্থা ইত্যাদি বিষয় গুলো থেকে বিচ্ছিন্নভাবে তারা জামায়াতের বিশ্লেষণ করেন। তাই তাদের কাছে জামায়াতের কোন রুকনের দল ছেড়ে যাওয়া অনেক বড় প্রশ্নবোধক হয়ে দাড়ায়, কিন্তু তারা যদি জানতেন যে স্বয়ং রাসুল স: এর জমানায় কেউ ইসলাম ত্যাগ করে ক্রিস্টান হয়েছিল তখন তারা এটিকে একটি স্বাভাবিক মানবিক ব্যাপার বলে তেমন গণনায় আনতেন না। যারা জামায়াতের মজলিশে সুরার সাধারণ তর্ক-বিতর্ক কে রসালো ভাবে উপস্থাপন করেন তারা যদি অন্যদল গুলোর সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া জানতেন তাহলে তাদের রসবোধ অনেক শুকিয়ে যেত. যারা জামায়াতের কোন প্রজেক্ট বাস্তবায়ন না করতে পারার জন্য একে অথর্ব বা ব্যর্থ হিসেবে বিবেচনা করেন তারা জানেন না যে অন্যরা এর চেয়ে কয়েকগুন বেশি রিসোর্স ব্যবহার করেও তা করতে পারেনি। জামায়াতের লোকেরা অন্যদের বিরোধিতা কিভাবে করেছে তা বড় করে চোখে পড়ে, কিন্তু তারা কিভাবে জামাতের বিরোধিতা করেছে, বা নিজেদের মধ্যকার মতবিরোধই কিভাবে সমাধান করেছে সেসব থেকে যায় উহ্য। এভাবে সমস্ত প্রেক্ষাপট, কন্টেক্স্ট থেকে বিচ্ছিন্ন করে জামায়াত কে স্পটলাইটের নিচে নিয়ে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে বিশ্লেষণ করলে জামায়াতের পেটের ভিতর মশা পর্যন্ত দেখতে পাবেন, কিন্তু অন্যরা যে এরমধ্যে আস্ত হাতি সাবাড় করে ফেলেছে তা ইচ্ছাকৃত হোক অনিচ্ছায় হোক দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়; ফলে জামায়াতের মশা অনেক বড় হয়ে স্ক্রিনে আসে, অন্যদের আস্ত হাতি কোথায় হাওয়া হয়ে যায়.
কন্টেক্স্ট বাদ দিয়ে বা কম্পেয়ারিটিবলি বিশ্লেষণ না করলে তা অন্যায্য হবে, অপূর্ন হবে. নির্দিষ্ট উপসংহার বা উদ্দেশ্য হাসিল করা যাবে, কিন্তু বিবেকসম্মত হবে না, সঠিক গবেষনা বা বিশ্লেষণের ক্রাইটেরিয়া পূর্ণ হবে না.
এধরনের বিশ্লেষণের কারণেই জামায়াত সবার কাছে এক নন্দ ঘোষ. ভালি রেজা নসর সহ বেশিরভাগ বিশ্লেষক এই এটিচ্যুড নিয়ে জামায়াতকে স্টাডি করেছেন (একই ওয়েব সাইটে জামায়াতের ইতিহাস নামে যা বিশ্লেষণ চলছে তা ভালি রেজা নসর ইত্যাদির লেখা দ্বারা প্রভাবিত এটা স্পষ্ট, এবিষয়ে আলাদাভাবে লেখার ইচ্ছা আছে পরবর্তিতে)। একটা নির্দিষ্ট সিনিক্যাল সন্দেহমূলক দৃষ্টিকোন থেকে উপসংহার ঠিক করেই তারা গবেষণা শুরু করেছেন, ফলে অনেক তথ্য উপাত্ত যোগাড় করে অনেক সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করলেও উপসংহার ছিল পূর্ব নির্ধারিত। এই তথাকথিত বিশ্লেষকরা ধরেই নেন যে, জামাতে ইসলামী এক নন্দ ঘোষ. তাকে ঘিরে যাই ঘটুক না কেন- সব দোষ তার এবং তার নেতাদের। মাওলানা মৌদুদি র: এর সাথে তত্কালীন অন্যান্য আলেমদের মতবিরোধ বা জামায়াতে ইসলামীতে যত ভাঙ্গন, সব দোষ মাওলানা মৌদুদির; তার প্রতিপক্ষ যে সময় যেই বা ছিল দল-মত-ঘটনা নির্বিশেষে – তারা সবাই নিষ্পাপ।
ফলে জামায়াত এর বিরুদ্বে সব অভিযোগকেই সত্য ও যুক্তিসঙ্গত বলে ধরে নেয়া হয়, বিপরীতে জামায়াতের সকল জবাব যুক্তি কেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে দেখা হয়. মাওলানা মউদুদীর সাথে মাওলানা নুমানি, মাওলানা নাদাবি বা মাওলানা ইসলাহির বাহাস কে এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন মাওলানা মউদুদী কাঠগড়ায় দাড়ানো এক আসামী অপরাধী; আর তার প্রতিপক্ষ- যখন যিনিই হন না কেন, তার গ্রহণযোগ্যতা মউদুদির তুলনায় যতই ম্রিয়মান হোক না কেন- অভিযোগকারী তাই একপ্রকার নির্দোষ। এভাবে সমস্ত এনালায়সিসের সময় মাওলানা মউদুদীকে আন্ডারডগ, গিল্টি মাইন্ডেড, নিজেকে রক্ষা করতে চিন্তিত বা ব্যতিব্যস্ত লোক হিসেবে দেখানো হয়, তার প্রতিপক্ষকে সাইকোলজিক্যাললি সুপেরিয়র হিসেবে দেখানো হয় (এমনকি- মাওলানা মউদুদীর সাথে তার নিজের তৈরী ছাত্রদেরও কোন মতবিরোধ উপস্থাপনের সময় সেসব ছাত্রদেরকে (যেমন ডা ইসরার আহমেদ বা মাওলানা কাওসার নিয়াজি) সুপেরিয়র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাদের অভিযোগের প্রতি অধিকতর রোমান্টিক বিশ্বাস রাখা হয়, কিন্তু মাওলানা মওদুদী কে আন্ডারডগ দেখানো হয়. কি আজব এটিচ্যুড!) এধরনের রিপ্রেজেন্টেশন মাওলানা মউদুদীর অনুসারী বনাম তাদের সম-সাময়িক প্রতিপক্ষদের মাঝেকার মতবিরোধ বিশ্লেষনেও। সব রকমের রিবেলিয়াস (বিদ্রোহী) মানসিকতা বা আচরনকে একধরনের রোমান্টিক ও
(চলবে)……
(বিদ্রোহী) মানসিকতা বা আচরনকে একধরনের রোমান্টিক ও ইন্টেলেকচুয়াল রূপ দেয়া হয়- সে রিবেলিয়ন যতই অযৌক্তিক বা চাইল্ডিশ হোকনা কেন (এধরনের এটিচ্যুড ইসলামী ইতিহাসের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও ওরিয়েন্টালিস্টরা দেখিয়ে থাকেন। প্রান্তিক বিদ্রোহী গ্রুপ যেমন মোতাজিলা ইত্যাদি সম্প্রদায়কে ইন্টেলেকচুয়াল সুপেরিয়র হিসেবে দেখানো হয়, আর মেইনস্ট্রিমকে একধরনের জড়তার রূপ দেয়া হয়. অথচ প্রান্তিক গ্রুপগুলোর তুলনায় মেইনস্ট্রিমদের ইন্টেলেকচুয়াল লেগেসি অনেক গুন বেশি গভীর ও সমৃদ্ধ।) এই মানসিকতার কারণেই প্রতিপক্ষের একধরনের সুপেরিয়রিটি কমপ্লেক্স এবং ‘নিজেরা ইনোসেন্ট’ মেন্টালিটি তৈরী হয়. আর জামায়াতের যেন জন্মই পাপ- তাই তাকে আজীবন জবাবদিহি করে যেতে হবে. এই অবস্থাকে ডিফল্ট বা যথাযথ ধরে নিয়েই এই বিশ্লেষকরা এনালাইসিস শুরু করেন, ফলে তথ্য উপাত্ত যাই সংগৃহিত হোক বা যুক্তি-এভিডেন্স যাই বলুক না কেন, শেষমেষ জামায়াতই দোষী।
বাংলাদেশ আমলে জামায়াতে যত সমস্যা, যত মতবিরোধ বা ভাঙ্গন, যত লোক জামায়াত ছেড়ে চলে গেছেন, সবার পিছনে দায়ী গোলাম আজম বা যারা শেষ পর্যন্ত জামায়াতে টিকে থাকেন। মরহুম মাওলানা আব্দুর রহিম র:, মাওলানা আব্দুল জাব্বার, যুব শিবির সহ যারা জামায়াত ছেড়ে চলে যান তারা নিষ্পাপ। অর্থ্যাত নিরবিচ্ছিন্নভাবে সব সেক্রিফাইস মেনে নিয়ে টিকে থাকলেই দোষ; নির্দোষ হতে চাইলে চুপচাপ অন্য কিছু করেন।
জামায়াত তার সমালোচনাকারী বা বিরোধীদের প্রতি কঠোর? দয়া করে গত ৫০ বছর জামায়াতের বিরুদ্দ্বে প্রকাশিত সাহিত্যের লিস্ট করুন, বিপরীতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জামায়াতের সমালোচনা বা বিরোধিতামূলক সাহিত্যের লিস্ট করুন। সাধারণ তথাকথিত ফতোয়া-ওয়াজ মাহফিল বা নিউজ-ভিউজ এর কথা বা মাদ্রাসার প্রতি দারস/বয়ানের শুরুতে ‘লানাতুল্লাহী আলা মউদুদী’ (মউদুদীর উপর আল্লাহর লানত) ইত্যাদি ‘সুন্নাতে আকাবির’ বাদই দিলাম। তারপর এনালাইসিস করে বলুন কারা কাদের প্রতি অধিকতর কঠোর, বিদ্বেষমূলক, প্রতিহিংসামূলক ও নিম্নমানের সমালোচনা বা বিরোধিতা করেছে।
কন্টেক্স্ট বাদ দিয়ে বা সমসাময়িক অন্যদের সাথে কম্পেয়ারিটিবলি না করে শুধু আলাদা এককভাবে জামায়াতের বিচার করা- এধরনের আচরণ একপেশে তো হবেই, এককথায় অবিচার।
একবার ছাত্রলীগের হামলায় শিবিরের ৩ জন শহীদ হন চট্রগ্রামে, তার কিছুদিন পরে ছাত্রদলের হামলায় ৩ জন শহীদ হন খুলনায়। আবার কিছুদিন পরে ছাত্রমৈত্রীর হামলায় কয়েকজন শহীদ হন রাজশাহীতে (একজাক্টলি এই সিরিয়ালে ঘটেছিলো কিনা মনে নেই, তবে কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিলো)। কে যেন মন্তব্য করেছিল- শিবিরের সাথে সবাই লাগে কেন, এতেই প্রমাণিত হয় সব দোষ শিবিরের, আর বেশি কিছু জানার দরকার নাই ! জনাব ফরিদ রেজা সেই মানসিকতায় যে আক্রান্ত তাতো স্পষ্ট। এটা ইতিহাস নয়; ব্যক্তিগত ক্ষোভ আর বিদ্বেষের বহিপ্রকাশ মাত্র। এটা একপেশেই হবে তা বলাবাহুল্য। জনাব রেজা যেভাবে বর্ণনা করেন তাতে হাফেজ্জী হুজুর, চরমোনাই পীর সহ যারা জামাতের বিরুদ্বে গায়ে পড়ে লাগেন তাদের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ বোঝা যায় (যা আমাদেরও কাম্য)। অন্যদিকে গোলাম আজম, নিজামী, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, তাহের গোষ্ঠির প্রতি তার বিতৃষ্ণা এবং সিনিক্যাল এটিচ্যুড স্পষ্ট।
+++
ছাত্র সংগঠন পরিচালনা, সংবিধান, মজলিশে শুরা, মেধা ইত্যাদি প্রসঙ্গ:
যে সমস্ত সংগঠন একেবারে নতুন নয়, তাদের পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধানের বিশেষ কোন ধারার প্রয়োগ কিভাবে হবে তা প্রেসিডেন্ট বা অতীত ঐতিহ্য দ্বারা অনেক সময় নির্ধারিত থাকে। একই ধারার ভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে। কখনো ব্যখ্যায় মতবিরোধ দেখা দিলে সঠিক ব্যাখ্যার জন্য অতীতে এই ধারার প্রয়োগ কিভাবে হয়েছিল- তা গুরত্ব পূর্ণ ভূমিকা রাখে। ছাত্র শিবির তো একেবারে নতুন কোন সংগঠন ছিলনা, ছাত্র সংঘের ই স্থলাভিষিক্ত, যার ইতিহাস ২০/২৫ বছর. ছাত্র শিবির নিজেও ৮২ সালে ৪/৫ বছর- অর্থ্যাত এর আগে ৩ জন সভাপতি-সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাই সংবিধানের যেসমস্ত ধারা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল- সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ বা ব্যাখ্যার জন্য পূর্বেকার ঐতিহ্য এবং সর্বোপরি সংগঠনের আদর্শ এবং স্পিরিট মনে রাখতে হবে, পূর্ববর্তীদের ভিউজ কে আমলে নিতে হবে. একই ভাবে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেও সংবিধানের সাথে সাথে ওভার অল কন্টেক্স্ট এবং আকল বা কমন সেন্স এর সাথেই বিবেচনা করতে হবে. এধরনের সংগঠন কোন মিলিটারি ফোর্স নয় যে শুধুমাত্র লিখিত আক্ষরিক ধারার উপর এমনভাবে নির্ভরশীল হতে হবে যারফলে সংগঠনটি একটি নির্মম শুষ্ক জিনিসে পরিনত হয়. এগুলো মানবিক সামাজিক সংগঠন, সংবিধানিক ধারার সাথে সাথে অতীতের অভিজ্ঞতা, ইন্টারপার্সোনাল রিলেশন, এমপ্যাথী, সংগঠনের ওভারল স্পিরিট ইত্যাদি বিষয় ও গুরত্বপুর্ন। ইসলামী আন্দোলন কোন মেশিন নয়- শুধু একটা সুইচ টিপে দিলাম- আইন মত চলতে থাকবে। এজন্যই সংবিধান বা নির্দিষ্ট বিধান আক্ষরিক প্রয়োগের চাইতে (চলবে)…….
এমন একটা সময় ছিল যখন জামায়াত এবং শিবির কর্মীদের হাতে থাকত হাকিক্বত সিরিজ, সত্যের সাক্ষ্য, সাফল্যের শর্তাবলী, ভাঙা ও গড়া ইত্যাদি কালজয়ী মৌলিক বইগুলো ।
এখন তাদের হাতে থাকে শুধু রশিদ বই ।
কদিন আগে এক ভাই জামায়তের এক রুকনের কাছে জিজ্ঞেস করছিলেন “ভাঙা-গড়া” বইটি পড়েছেন কিনা ? প্রত্যুত্তরে রুকন ভাইটি নাকি জিজ্ঞেস করছিলেন ওটা অধ্যাপক গোলাম আজম সাহেবের লেখা কিনা ?
(বিদ্রোহী) মানসিকতা বা আচরনকে একধরনের রোমান্টিক ও ইন্টেলেকচুয়াল রূপ দেয়া হয়- সে রিবেলিয়ন যতই অযৌক্তিক বা চাইল্ডিশ হোকনা কেন (এধরনের এটিচ্যুড ইসলামী ইতিহাসের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও ওরিয়েন্টালিস্টরা দেখিয়ে থাকেন। প্রান্তিক বিদ্রোহী গ্রুপ যেমন মোতাজিলা ইত্যাদি সম্প্রদায়কে ইন্টেলেকচুয়াল সুপেরিয়র হিসেবে দেখানো হয়, আর মেইনস্ট্রিমকে একধরনের জড়তার রূপ দেয়া হয়. অথচ প্রান্তিক গ্রুপগুলোর তুলনায় মেইনস্ট্রিমদের ইন্টেলেকচুয়াল লেগেসি অনেক গুন বেশি গভীর ও সমৃদ্ধ।) এই মানসিকতার কারণেই প্রতিপক্ষের একধরনের সুপেরিয়রিটি কমপ্লেক্স এবং ‘নিজেরা ইনোসেন্ট’ মেন্টালিটি তৈরী হয়. আর জামায়াতের যেন জন্মই পাপ- তাই তাকে আজীবন জবাবদিহি করে যেতে হবে. এই অবস্থাকে ডিফল্ট বা যথাযথ ধরে নিয়েই এই বিশ্লেষকরা এনালাইসিস শুরু করেন, ফলে তথ্য উপাত্ত যাই সংগৃহিত হোক বা যুক্তি-এভিডেন্স যাই বলুক না কেন, শেষমেষ জামায়াতই দোষী।
বাংলাদেশ আমলে জামায়াতে যত সমস্যা, যত মতবিরোধ বা ভাঙ্গন, যত লোক জামায়াত ছেড়ে চলে গেছেন, সবার পিছনে দায়ী গোলাম আজম বা যারা শেষ পর্যন্ত জামায়াতে টিকে থাকেন। মরহুম মাওলানা আব্দুর রহিম র:, মাওলানা আব্দুল জাব্বার, যুব শিবির সহ যারা জামায়াত ছেড়ে চলে যান তারা নিষ্পাপ। অর্থ্যাত নিরবিচ্ছিন্নভাবে সব সেক্রিফাইস মেনে নিয়ে টিকে থাকলেই দোষ; নির্দোষ হতে চাইলে চুপচাপ অন্য কিছু করেন।
জামায়াত তার সমালোচনাকারী বা বিরোধীদের প্রতি কঠোর? দয়া করে গত ৫০ বছর জামায়াতের বিরুদ্দ্বে প্রকাশিত সাহিত্যের লিস্ট করুন, বিপরীতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জামায়াতের সমালোচনা বা বিরোধিতামূলক সাহিত্যের লিস্ট করুন। সাধারণ তথাকথিত ফতোয়া-ওয়াজ মাহফিল বা নিউজ-ভিউজ এর কথা বা মাদ্রাসার প্রতি দারস/বয়ানের শুরুতে ‘লানাতুল্লাহী আলা মউদুদী’ (মউদুদীর উপর আল্লাহর লানত) ইত্যাদি ‘সুন্নাতে আকাবির’ বাদই দিলাম। তারপর এনালাইসিস করে বলুন কারা কাদের প্রতি অধিকতর কঠোর, বিদ্বেষমূলক, প্রতিহিংসামূলক ও নিম্নমানের সমালোচনা বা বিরোধিতা করেছে।
কন্টেক্স্ট বাদ দিয়ে বা সমসাময়িক অন্যদের সাথে কম্পেয়ারিটিবলি না করে শুধু আলাদা এককভাবে জামায়াতের বিচার করা- এধরনের আচরণ একপেশে তো হবেই, এককথায় অবিচার।
একবার ছাত্রলীগের হামলায় শিবিরের ৩ জন শহীদ হন চট্রগ্রামে, তার কিছুদিন পরে ছাত্রদলের হামলায় ৩ জন শহীদ হন খুলনায়। আবার কিছুদিন পরে ছাত্রমৈত্রীর হামলায় কয়েকজন শহীদ হন রাজশাহীতে (একজাক্টলি এই সিরিয়ালে ঘটেছিলো কিনা মনে নেই, তবে কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিলো)। কে যেন মন্তব্য করেছিল- শিবিরের সাথে সবাই লাগে কেন, এতেই প্রমাণিত হয় সব দোষ শিবিরের, আর বেশি কিছু জানার দরকার নাই ! জনাব ফরিদ রেজা সেই মানসিকতায় যে আক্রান্ত তাতো স্পষ্ট। এটা ইতিহাস নয়; ব্যক্তিগত ক্ষোভ আর বিদ্বেষের বহিপ্রকাশ মাত্র। এটা একপেশেই হবে তা বলাবাহুল্য। জনাব রেজা যেভাবে বর্ণনা করেন তাতে হাফেজ্জী হুজুর, চরমোনাই পীর সহ যারা জামাতের বিরুদ্বে গায়ে পড়ে লাগেন তাদের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ বোঝা যায় (যা আমাদেরও কাম্য)। অন্যদিকে গোলাম আজম, নিজামী, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, তাহের গোষ্ঠির প্রতি তার বিতৃষ্ণা এবং সিনিক্যাল এটিচ্যুড স্পষ্ট।
+++
ছাত্র সংগঠন পরিচালনা, সংবিধান, মজলিশে শুরা, মেধা ইত্যাদি প্রসঙ্গ:
যে সমস্ত সংগঠন একেবারে নতুন নয়, তাদের পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধানের বিশেষ কোন ধারার প্রয়োগ কিভাবে হবে তা প্রেসিডেন্ট বা অতীত ঐতিহ্য দ্বারা অনেক সময় নির্ধারিত থাকে। একই ধারার ভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে। কখনো ব্যখ্যায় মতবিরোধ দেখা দিলে সঠিক ব্যাখ্যার জন্য অতীতে এই ধারার প্রয়োগ কিভাবে হয়েছিল- তা গুরত্ব পূর্ণ ভূমিকা রাখে। ছাত্র শিবির তো একেবারে নতুন কোন সংগঠন ছিলনা, ছাত্র সংঘের ই স্থলাভিষিক্ত, যার ইতিহাস ২০/২৫ বছর. ছাত্র শিবির নিজেও ৮২ সালে ৪/৫ বছর- অর্থ্যাত এর আগে ৩ জন সভাপতি-সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাই সংবিধানের যেসমস্ত ধারা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল- সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ বা ব্যাখ্যার জন্য পূর্বেকার ঐতিহ্য এবং সর্বোপরি সংগঠনের আদর্শ এবং স্পিরিট মনে রাখতে হবে, পূর্ববর্তীদের ভিউজ কে আমলে নিতে হবে. একই ভাবে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেও সংবিধানের সাথে সাথে ওভার অল কন্টেক্স্ট এবং আকল বা কমন সেন্স এর সাথেই বিবেচনা করতে হবে. এধরনের সংগঠন কোন মিলিটারি ফোর্স নয় যে শুধুমাত্র লিখিত আক্ষরিক ধারার উপর এমনভাবে নির্ভরশীল হতে হবে যারফলে সংগঠনটি একটি নির্মম শুষ্ক জিনিসে পরিনত হয়. এগুলো মানবিক সামাজিক সংগঠন, সংবিধানিক ধারার সাথে সাথে অতীতের অভিজ্ঞতা, ইন্টারপার্সোনাল রিলেশন, এমপ্যাথী, সংগঠনের ওভারল স্পিরিট ইত্যাদি বিষয় ও গুরত্বপুর্ন। ইসলামী আন্দোলন কোন মেশিন নয়- শুধু একটা সুইচ টিপে দিলাম- আইন মত চলতে থাকবে। এজন্যই সংবিধান বা নির্দিষ্ট বিধান আক্ষরিক প্রয়োগের চাইতে (চলবে)…….
এজন্যই সংবিধান বা নির্দিষ্ট বিধান আক্ষরিক প্রয়োগের চাইতে স্পিরিচুয়াল প্রয়োগ করতে হয়. জামায়াতের কিছু সদস্য আছেন যারা আসলে এর সদস্য হবার শর্ত পুরোপুরি পূরণ করেন না. এখন তাদের কি পাইকারী ভাবে সদস্যপদ কেনসেল করে দিতে হবে? এটা কি মিলিটারী বা মেশিন? সবসময় সব বিধান আক্ষরিক অর্থে মানা সম্ভব নয়. তার স্পিরিট দেখতে হবে.
ছাত্র শিবির মজলিশে শুরার সদস্যদের পরামর্শেই প্রেসিডেন্ট সব সিদ্বান্ত নিবেন, কিন্তু মজলিশে সুরার সদস্যদের গড় বয়স কত? তাদের ম্যাচুরিটি কেমন? ২৫-৩০ বছরের ছাত্রের সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক প্রগ্গা কেমন থাকে? আমার মনে হয় না এই বয়সে কোন বৃহত কমপ্লেক্স সিচুয়েশন মোকাবেলা করার মত ম্যাচুরিটি হয়. ছাত্র শিবির তো শুধু চ্যারিটি বা রাস্তা পরিষ্কার করা বা বস্তির ছেলেমেয়েদের অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা দেয়ার কোন সংগঠন নয়- এর ভিশন অনেক দূরদর্শী এবং কর্মসূচি অনেক কম্প্রেহেনসিভ। না চাইলেও একে অনেক কমপ্লেক্স সিচুয়েশনে জড়াতে হবে. নিজেরা চোখ বন্ধ করে এটা অগ্রাহ্য করতে চাইলেও প্রতিপক্ষরা ঠিকই জানে শিবিরের জেনেটিকাল উত্স কি এবং বড় হয়ে সে কি হবে। তাই ষড়যন্ত্র এবং কমপ্লেক্স সিচুয়েশন তার উপরে আসবেই। এধরনের সিচুয়েশন মোকাবেলা করা ২৫-৩০ বছরের ছাত্র যুবকদের একটা গ্রুপ দিয়ে সম্ভব নয়. ইংল্যান্ড আমেরিকার মত দেশেও অনেক বিখ্যাত লোক এই বয়সে ছেলেমানুষী করে বেড়াতো। এদের উপর সব কিছু ছেড়ে দেয়া যাবে? দীর্ঘমেয়াদী সিরিয়াস পলিসি মেকিং শুধু ছাত্র শিবিরের মুজ্লিশে শুরা সদস্যদের দিয়ে সম্ভব নয়. এজন্য আক্ষরিক অর্থে সব সময়ের জন্য এদের কে স্বাধীনতা দেয়া উচিত নয়. মুরুব্বিদের ইনপুট এখানে মাস্ট থাকতে হবে, ফর্মাল ভাবে হোক ইনফরমাল ভাবে হোক.
সংগঠন পরিচালনায় মেধার সাথে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা, সহকর্মী-মুরুব্বি-অধীনস্তদের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ের ভারসাম্য না থাকলে ইফেক্টিভ দায়িত্বশীল হওয়া যায়না। শুধু মেধা বা গলার জোরের উপর ভিত্তি করে কাউকে হাইব্রীড পন্থায় ফাস্টট্রাক করে ফিল্ড ওয়ার্ক এর প্রসেস এড়িয়ে দায়িত্বশীল পর্যায়ে নিয়ে আসা হলে তাদের দ্বারা পরবর্তিতে সমস্যার সৃষ্টি হয়, ইম্ম্যাচুরিটি ধরা পড়ে. ছাত্র শিবিরের সংকট গুলো বিশ্লেষণ করলে এর প্রমান পাওয়া যায়. একথা বলা হয়ে থাকে যে বিভিন্ন সময়ে ইসলামী সংগঠনে রিবেলিযাস বা সঙ্কট সৃষ্টিকারিগন নাকি অন্যদের তুলনায় বেশি মেধাবী ছিলেন; কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের ব্যক্তিগত এচিভমেন্ট বিবেচনা করলে এর তেমন প্রমান পাওয়া যায়না। বরং যারা টিকে ছিলেন এবং যাদেরকে ইন্টেলেকচুয়াল ইনফেরিয়র হিসেবে চিত্রিত করা হয়- তাদের সামষ্টিক এচিভমেন্ট বা সফলতাই অধিকতর ভারী ও সমৃদ্ধ।
+++
ইসলামী ব্যক্তিত্বের ‘দুর্বলতা’:
ইসলামী নেতৃত্বের একটি সার্বজনীন ‘দুর্বলতা’ আছে যে তারা অন্যের প্রতি বেশি কঠোর হৃদয়ের হতে পারেন না. হজরত উমার রা: এর মত শক্ত মানুষও খিলাফতের দায়িত্ব লাভের পর কেমন নরম কোমল হয়ে গেলেন। লুলুয়া নামের এক দাস তাকে প্রকাশ্যে টিটকারী করে তাচ্ছিল্য করে- অর্ধেক দুনিয়ার শাসক হজরত উমার দাসটিকে কিছুই করেন না, তা এড়িয়ে যান, বিনিময়ে সেই লুলুয়া তাকে ছুরিকাঘাত করে মৃত্যুমুখে ফেলে দেয়. হজরত উসমান রা: নিশ্চিত ছিলেন যে তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র চলছে, তিনি ইচ্ছে করলে সেনাবাহিনী ডেকে সব ষড়যন্ত্রকারীদের চৌদ্দগুষ্ঠি নির্মূল করে দিতে পারতেন। কিন্তু সব চিন্তা বাদ দিয়ে তিনি কোরান তেলাওয়াত করতে লাগলেন। মাওলানা মউদুদী কে সবাই পরামর্শ দিয়েছিল যে মাওলানা কাউসার নিয়াজি সংগঠনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছেন- তাকে বহিষ্কার করা হোক বা অন্তত শহরের আমিরের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হোক. তিনি কঠোর হতে পারলেন না, বিনিময়ে কিছুদিন পরে জনাব নিয়াজি নিজেই ঘোষণা দিয়ে জামায়াত ত্যাগ করলেন এবং স্বয়ং মাওলানা মউদুদীর বিরুদ্ধে কুত্সা রটাতে লাগলেন। বাংলাদেশে জামায়াতের এক এমপির কর্মজীবনে আর্থিক কেলেঙ্কারী প্রকাশ হবার পরে পরামর্শ দেয়া হলো যে তার পদ ক্যান্সেল করা হোক, জামায়াত নেতৃত্ত কঠোর হতে পারলেন না, বিনিময়ে এমপি সাহেব চরম সময়ে চরম নাটক করে জামায়াত ত্যাগ করলেন, এবং বলতে লাগলেন যে জামায়াত মজলিশে শুরায় গণতন্ত্র চর্চা হয় না, জামায়াত ইসলামী আদর্শ থেকে দুরে সরে গেছে ইত্যাদি। জনাব ফরিদ রেজা বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি বড় সংকট জন্ম দেয়ার পরেও জামায়াতের তাঁর বাবার বয়সী আমির থেকে শুরু করে অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা তাকে অত্যন্ত সন্মানের সাথে ট্রিট করতে লাগলেন, তার প্রতি কোন ক্ষোভ বা বিদ্বেষের লেশমাত্র নেই তাদের মনে, কোন শত্রুতার প্রকাশ নেই, তাকে আদরের সাথে কাছে ডেকে নিয়ে যান, আবেদন করেন জামায়াতে ফিরে আসতে। বিনিময়ে তিনি যে প্রতিদান দেয়া শুরু করেছেন আল্লাহ মালুম তার সার্বিক চূড়ান্ত রূপ কি দাঁড়ায়.
আসলে কোরান হাদিস
(চলবে)……
আসসালাম….. বারাকাতুহ
সংক্ষিপ্ত নামে আমি আপনাকে শণাক্ত করতে পারছিনা!
আবুসাঈদ মাহফুজ ভাই-র মত আপনি যদি নিজের পরিচয় দিয়ে লেখতেন তবে পাঠকের জন্য সুবিধা হতো!
আপনার বর্তমান ও ততকালীন পরিচয় দিতে অনুরোধ করছি!
আসলে কোরান হাদিস পড়ে আল্লাহর ক্ষমা দয়ার আশায় যারা থাকেন- তারা অন্যের প্রতি – সে যত বড় ক্ষতিই করুক- বেশি কঠোর বা নির্দয় হতে পারেন না, যদিও এতে অনেক সময় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়. কোমল হৃদয় এবংসহকর্মীদের প্রতি এমপাথী ইসলামী নেতৃত্বের একটি শর্ত। যে অন্তর কোরান-হাদিসের সরল কোমল স্নিগ্ধ ঝর্নাধারার সাথে নিয়মিতভাবে যুক্ত সে অন্তরে ম্যাকিয়াভেলিয়ান চতুরতা, কঠোরতা, বক্রতা, ইগো ইত্যাদি বেশি সুবিধা করতে পারেনা- যদিও এগুলো দিয়ে দুনিয়াবী অনেক কিছু হাসিল করা যায়। হিউমিলিটি, কোমলতা, ক্ষমা করার প্রবণতা, শত্রুতা ভুলে যাওয়া ইত্যাদি ইসলামী ব্যক্তিত্বের চিহ্ন। কার অন্তরে তাকওয়া আছে, কার নিয়ত মুখলিস সহিহ- সেগুলো দেখা না গেলেও এসব আচরণের মাধ্যমে টের পাওয়া যায়.
জামায়াত শিবিরের জনশক্তির প্রতি :
জামায়াত শিবিরের জনশক্তিকে এ কথাগুলো মনে রাখতে হবে:
১) জামায়াত শিবির কোন পারফেক্ট সংগঠন নয়. এর মাঝে ত্রুটি বিচ্যুতি থাকতে পারে। আমাদের নেতৃবৃন্দ ও পারফেক্ট বা ভুল ত্রুটির উর্ধে নন. তারা নবী-রাসুল-সাহাবাদের সমপর্যায়ের নন, সংগঠনটি ও নবী স: পরিচালিত সাহাবীদের সংগঠনের পর্যায়ের নয়. জামায়াত করা বা না করা ঈমানের মাপকাঠি বা শর্ত নয়. এটি করতে কেউ বাধ্য নন, বা কেউ এই সংগঠন ছেড়ে গেলেও কোন অসুবিধা নেই.
২) মাওলানা মউদুদী ইসলামী আন্দোলন বা সংস্কারের উদ্ভাবক নন. তিনি ইসলামী আন্দোলনকে আধুনিকায়ন করেছেন।
৩) জামায়াত শিবিরই একমাত্র ইসলামী আন্দোলন বা সংগঠন নয়; তবে বর্তমান সময়ে বিরাজমান ইসলামী সংগঠন এবং আন্দোলন গুলোর মাঝে কমপ্রেহেন্সিভ সংগঠন হিসেবে জামায়াত শিবির শ্রেষ্ঠ।
৪) জামায়াত শিবিরের এবং জনশক্তির ভুল ত্রুটি অতীতে হয়েছে। কিন্তু তা এমন নয় যে সেসব ভুল ত্রুটির কারণে সংগঠনটি অপাংতেয় হয়ে গেছে। বরং কন্টেক্স্ট বিবেচনা করলে এবং অন্যান্য সংগঠন বা আন্দোলনের সাথে কম্পেয়ারেটিভলি বিবেচনা করলে প্রমাণিত হবে যে , আমাদের রেকর্ড, অবদান এবং প্রাপ্তি, অন্যদের চাইতে অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং গৌরবের।
৫) তাই আমাদের যেমন অহংকারের সুযোগ নেই , তেমনি আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং কার্যক্রম সম্পর্কে কোন প্রকার হীনমন্যতা, কনফিউশন, দোদুল্যমনতা, ইন্ফেরীয়রিটি কমপ্লেক্স-
ইত্যাদির ও সুযোগ নেই.
৬) জামায়াত শিবির বর্তমান যে পরিস্থিতি পার করছে তা সাময়িক দৃষ্টিতে অনেক বেশি কিছু মনে হলেও, সামগ্রিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে তেমন বড় কিছু নয়. এর চাইতেও অনেক বড় পরীক্ষা ও বিরোধিতার সম্মুখীন ইসলামী আন্দোলনকে হতে হয়েছিল এবং তাতে ইসলামী আন্দোলনের গতি কমেনি, বরং এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আন্দোলন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে, নতুন প্রেরণা সৃষ্টি হয়েছে, নব জাগরণ এসেছে। নানা ধরনের বৈচিত্রময় চ্যালেঞ্জ ও অভিজ্ঞতার মুখোমুখি মোকাবেলা করেই ভবিষ্যতের জন্য ঝালাই হতে হবে. এর বিকল্প বিপ্লবের কোন শর্ট -কাট সহজতর পথ নেই.
৭) তাই সংগঠন বা আন্দোলনের উদ্দেশ্য বা ভবিষ্যত সম্পর্কে কোন ধরনের সন্দেহ সংশয় এর সুযোগ নেই, বরং বলিষ্ঠতার সাথে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে লেগে থাকতে হবে.
৮) সমালোচনা, বিরোধিতা, চ্যালেঞ্জ ইত্যাদির কোন শেষ নেই এবং নির্দিষ্ট কোন রূপ নেই. নানা ভাবে নানাদিক দিয়ে নানান সময়ে আসতে পারে। নতুন ধরনের কোন চ্যালেঞ্জ বা বিরোধিতার মুখোমুখি হলে শক্ড বা হতবুদ্দ্বি হয়ে খেই হারিয়ে ফেলার দরকার নেই. অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় এবং নিম্নমানের রিয়েকশন করার দরকার নেই.
৯) কোনভাবে কারো সাথে মতবিরোধের সময় আমাদের কাংখিত মান বিসর্জন দেয়া যাবেনা। বিরোধী বা সমালোচনাকারী যতই খারাপ হোক না কেন, এই আশা রাখতে হবে যে সে কখনো তার ভুল বুঝতে পারবে এবং আমাদের দিকে আসতে পারে, আমাদের অংশ হয়ে যেতে পারে। এরকম অতীতে অনেক হয়েছে, আমাদের কাছাকাছি কোন না কোন উদাহরণ আছে. সে বিশ্বাস এবং আশা রেখে সবার সাথে ব্যবহার করতে হবে. সকল আলোচনা-তর্ক-বিতর্কের উদ্দেশ্য হতে হবে দাওয়াত। সে উদ্দেশ্যে কখনো টেকটিকাল হার মানলেও ক্ষতি নেই যাতে অপরপক্ষ আমাদের থেকে দুরে সরে না যায়.
১০) সর্বোপরি নিজেদের ইমান, তাকওয়া, ইখলাস, পারস্পরিক ভাতৃত্ববোধ ইত্যাদি গুন ও চেতনা গুলো জাগ্রত রাখার চেষ্টা করতে হবে. অহংকার, ইগো, একগুয়েমি, কারো প্রতি বিদ্বেষ, অশ্রদ্ধা বোধ ইত্যাদি থেকে অন্তর কে সাফ রাখতে হবে. কেউ আমার প্রতি ভুল করলে মাফ করে দিতে হবে. সব তিক্ততা ভুলে যেতে হবে. এখনি যদি আমার অকস্বাত মৃত্যু হয় তাহলে পাকসাফ অন্তর নিয়ে যাতে ওপারে যেতে পারি সেজন্য সর্বদা তৈরী থাকতে হবে.
সমাপ্ত….
আসসালাম….. বারাকাতুহ
কিছু বাক্যে অপরের নিয়তের অবস্থা নিয়ে কথা হয়েছে- যেটা না হলেই ভালো হতো! কারণ বাহ্যতঃ যা-ই মনে হোক, কারো অন্তরের অবস্থার উপর মন্তব্য করা বিপজ্জনক!!
কিছু বাক্য ও শব্দ বেশী রূঢ় মনে হয়েছে, নমনীয় শব্দে বললে উত্তম হতো!
সমাপ্তিটা খুব সুন্দর হয়েছে,
জাযাকাল্লাহ
সন্মানিত ভাই, আপনার সব কথাই ধরে নিলাম ঠিক।কিন্তু এভাবে ভার্চুয়াল জগত বা ব্লগে এই ব্যাপারে না লিখলে কি ভাল হত না? ধৈর্য ধরেছেন বিশ্বাস করি আর একটু ধৈর্য ধারণ করলে কি ভাল হত না। এই লিখা পড়ার পর অনেকের মধ্যে ফিতনা তৈরি হতে পারে। প্রীয় ভাই আপনি জানেন সমাজে যে ব্যাক্তি ফিতনা ,ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করল তা হত্যার চেয়ে ও জগন্য। বিশেষ করে আপনি যাদের বিষয় অবতারণা করেছেন তারা ইসলামি আন্দোলনের দায়িত্বশীল তাদের কেউ কেউ ব্যাক্তিগত ভাবে ভুল করতে পারে কিন্তু জামায়াত – শিবিরের লক্ষ ঊদ্দ্যেশ্য কোন ত্রুটি নাই।এটা এভাবে লেখালেখি না করে আরো সুন্দর উপায় বের করা যেতে পারত।। অনেক কষ্ট গড়া আমাদের এই মসজিদ দয়া করে আপনাদের মত এত বিচক্ষণ লোকেরা এ ভাবে ভেঙ্গে দিবেন না।আপনার দূরদর্শী চিন্তা ও প্রঙ্গা ইসলামি আন্দোলন এর জন্য দরকার কিন্তু এভাবে বলাটা সমিচিন হয়নি। করন এটা আপনি বলতে পারেন আপনার ব্যাক্তিগত আত্বকাহিনী কিন্তু আপনি যা লিখেছেন তা কোন ব্যাক্তির মধ্যে আর সিমাবদ্ধ নেই এটা এখন পুরা জাতির নেগেটিভ ও পজিটিভ চিন্তার খোরাক হয়ে দাড়িয়েছে। দয়া করে আপনি আপনার উচ্চতা,মান,সাবেক দায়িত্ব ও কুরআন -হাদিসের সঠিক knowledge অর্জন করার পর আপনার এই কথা গুলো এভাবে বলা ঠিক হয়েছে কি না একটু নিজ বিবেক কে প্রশ্ন করবেন? আপনাকে ইসলামি আন্দোলনে প্রয়োজন কিন্তু আপনি থাকতে পারেননি কারণ আমার মনে হয় আপনার ধৈর্য শক্তি কম। আল্লাহ আমাদের কে হেফাজত করুন। ।
রেজা ভাই,
যেহেতু ইসলামী আন্দোলন করা ফরজ।
তাই জামায়াত কে পছন্দ না হলে অন্য কোন ইসলামী সংগঠন করুন।
যদি সেরকম কোন সংগঠন না দেখেন।
তাহলে বসে না থেকে নিজেই কোরআন -হাদীসের আলোকে একটি সংগঠন তৈরি করে সেটা করুন।
তাও ফরজ টুকু পালন হবে।
আল্লাহ হাফেজ।
After reading through all these article, I am totally confused!
আমি মনে করিনা জামায়াতের সকল নেতার ঐক্যমতের ভিতরে কিছু চিটা থাকতেই পারে, যারা এখন বোল পাল্টাবেন, বর্তমান পরীক্ষাটা কিন্তু শুধু একটি দলের জন্য আসছে যারা ভাবছেন তারা ভুল করছেন, এই সুযোগে ইসলামী সকল দল মতভেদকে আলাদা রেখে একটি ভালো ইস্যুতে ঐক্যের ঘোষণা দিতে হবে, এখন ৮২ আলোচনার একাধিকবার নিষ্প্রয়োজন, যারা তর্কে লিপ্ত হচ্ছেন তারাও ভুল করছেন, বিশ্ব প্রক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করা এর থেকে সোয়াবের কাজ হবে, ইসলামী সংগঠনের মূল কথা কেউ কেউ ইসলামী সংগঠন করবেন, না করলে একটি নতুন দল করেও করতে পারেন, মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্যের বাহিরে যত জজবাই দেখানো হউক ফলাফল ঘোড়ার ডিম, আগে দরকার ঐক্যবদ্ধতা, যা ছাড়া সংগঠন হয়না, পুরাতন চাল ভাতে বারে” আপনারা একটা তৈরী করে ইসলামের দাওয়াত দেন বেশী বেশী আলোচনা ভালো সমালোচনাতো নয়ই, সবাই ভেবে দেখার অনুরোধ করছি ||