ইতিহাস বড়ই স্বার্থপর। যা কাউকে হাসায় আবার কাউকে চরমভাবে আক্রমণ করে। ছোট্ট একটি অভিজ্ঞতা দিয়েই আজ দ্বিতীয় পর্ব শুরু করব। ২০১২’র শেষের দিকের কথা। বর্তমান কারাবন্দী শিবিরে সাবেক সভাপতি দেলওয়ার ভাই একটি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃবৃন্দের সাথে মিটিং করছেন। তার সমাপনী বক্তব্যের একটি ঘটনাই আমার শিবিরে থাকার শ্রেষ্ঠ ও যথেস্ট অনুপ্রেরণার পরশ পাথর।
দেলওয়ার ভাই তখন রাবির সভাপতি, তিনি প্রায়ই লক্ষ করতেন একটি হলের দায়িত্বশীল মিটিং এ স্বয়ং হল সভাপতিই দেরিতে আসেন! কখনো অনুপস্থিত থাকেন! উল্লেখ্য মিটিং গুলো সাধারণত সন্ধ্যা রাত্রে হতো। হল সভাপতির এমন আচরণে শাখা সভাপতি চরম ক্ষেপে গেলেন। দিনক্ষণ ঠিক করে তলব করলেন সেই হল সভাপতিকে। শাখার সকল নেতৃবৃন্দের সামনেই কর্কশ ভাষায় প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, আপনার কি খবর? বার বার অনুপস্থিত থাকেন কেন? আরও নানাভাবে তাকে সবার সামনেই অপমান ও অপদস্থ করলেন! কষ্ট আর চোখভরা কান্না নিয়ে সেই হল সভাপতি ভাইটি দেলওয়ার ভাইয়ের সাথে পারসোনালি দেখা করার অনুমতি চাইলেন। মিটিং শেষে দেলওয়ার ভাইয়ের কামড়ায় দুইজন মজলুম ভাই কন্ট্রাক্ট শুরু করলেন। হল সভাপতির দুচোখ অশ্রুশিক্ত, বৃষ্টির মতো পানি ঝরছে। আঁচ করতে পেরে দেলওয়ার ভাইও কিছুটা নরম হয়ে গেলেন। শুনতে চাইলেন কেন হল সভাপতি অনুপস্থিত থাকেন? শুরু হলো মর্মান্তিক ও ব্যথনার্ত গল্প। ভাই আমার বাবা শারীরিকভাবে কাজকর্মে অক্ষম। ঘরে ছোট বোনটির পড়ালেখার খরচ আর বড় বোনটির বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। সংসারে কোনো আয় নেই। আমার পড়ালেখার খরচ দিতে বাবা অপারগ। অবস্থা বুঝতে পেরে আমি কিছুদিন টিউশনিও করিয়েছি। টাকা পয়সা তেমন দেয়না, আবার মানবিকের ছাত্র বলে টিউশনিও খুব বেশি পাওয়া যায় না। চরম কষ্টের মধ্যে ছিলাম। মাঝেমধ্যে না খেয়ে থেকেছি, কাউকে কিছু বলিনি। যখন দেখলাম ক্ষুধায় পেটটা চো- চো করছে তখন আর পারলাম না। এতটুকু বলেই হল সভাপতি ভাইটি হাউমাউ করে কাঁদা শুরু করে দিলেন। পাশে দেলওয়ার ভাইও কাঁদছে।
আবারও শুরু হলো, অনেকটা বাধ্য হয়েই আমি রিকশা চালানো শুরু করি। লোকচক্ষুর লজ্জায় ক্যাম্পাস থেকে অনেক দূরে গিয়ে রাতের আধারে রিকশা চালাই। যাতে কেউ না দেখতে পারে। ফলে মাঝে মাঝে হলে আসতে দেরি হয়। সেজন্যই মিটিং এ ঠিক মতো উপস্থিত থাকতে পারিনি। ভাই আমার ভুল হয়ে গেল। আমি দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারছি না। আমাকে মাফ করবেন। এতক্ষণ দেলওয়ার ভাই ঠিক থাকলেও কান্নার গতি যেন তারই বেড়ে গেল। সে নিজেই তো অপরাধী! তিনিই যে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় দায়িত্বশীল! অথচ তিনি খবরই রাখেন না! জনশক্তিরা না খেয়ে থাকছে। বন্ধ দরজা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দুজনই প্রাণখুলে কাঁদছে! হৃদয়বিধারক মাহিন্দ্রক্ষণে আন্দোলনের দুই গোলাম । প্রভু ছাড়া কেউ জ্ঞাত নয়। আজ যদি ঐ হল দায়িত্বশীল ভাইটি সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় তুলে ধরে, তবে রেজা ভাইয়ের পারিবারিক করুণ পরিস্থিতি নিশ্চয় হার মানবে।
আর একটি প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়, এসব ক্ষোভ-অভিমানের দাবি কার কাছে তুলব? যে ব্যক্তিগুলো এই কাফেলায় দায়িত্ব পালন করে যান তারা সবাই সোনার চামচ মুখে নিয়ে নিশ্চয় বড় হননি! দৈনদশার কয়লার চামচও মুখে জুটছে কিনা সন্দেহ? ধরে নিলাম সারা দেশের সকল সদস্য-সাথী-কর্মী একযোগে রানিং সি.পির কাছে অভিযোগ দিল! আমরা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনে দিন-রাত কাজ করছি নিজের পড়াশোনার দিকে নজর ও পরিবারের দেখবাল করতে পারছি না! কাজেই আমরা আর ছাত্রশিবিরে নাই!!! এখন যদি রানিং সি.পি বলে বসে আমারও তো পরিবার আছে, পড়াশোনা আছে, আমিও আমার সাবেক দায়িত্বশীলদের কাছে অভিযোগ দিয়ে গেলাম! আমিও শিবিরকে গুডবাই জানাচ্ছি! ফলাফল কি হবে? জগাখিচুরি ছাড়া আর কিছু নয়! সেটা নিশ্চয় লেখক রেজা ভাই চান না! তাহলে অভিযোগ তো তার কাছেই দিতে হয়, যিনি এই সংগঠনের মূল হর্তাকর্তা মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে! নাউজুবিল্লাহ। এও কি সম্ভব? যেখানে প্রভু কুরআনে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, পৃথিবীতে তোমাদের খলিফা হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
আপনি লম্বা আলোচনা থেকে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান বুঝতে পেরেছি, আপনি শুধু অভিমানের দিকে নিজেকে রেখেছেন! বিপরীতে সংগঠনকে রাখার চেষ্টা করেছেন। লেখকের সেই মর্মান্তিক কষ্টের দিনগুলোকে অস্বীকার করার কোনো ধৃষ্টতা দেখাচ্ছি না। আর আপনি জানেন ছাত্রশিবির গরিব-মেধাবীদের সংগঠন নাকি ধনীর আদরের দুলালদের সংগঠন? আপনি, আমরা, এমনকি অ্যান্টি-দলগুলোও একমত ছাত্রশিবিরের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে। তাই বলে তো সবার সংগঠন ছেড়ে দেয়া সম্ভব না, তাইনা? আমরা তো এতদিন জানতাম আদর্শ কর্মী তিনিই যিনি সংগঠন ও পড়াশোনায় ব্যালেন্স রক্ষা করতে পারেন । কিন্তু আপনার লেখায় রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কথা ও এম. এ পরীক্ষার ইতিহাস শুনে প্রশ্ন উঠতেই পারে এই ধারনা কি ঠিক ? সর্বোপরি রেজাল্টের জন্য সংগঠনের পাশাপাশি একজন কর্মির নিজের প্রচেষ্টাও দায়ী থাকতে পারে, তাইনা?
আমার নিজের দেখা জ্বলন্ত একটি উদাহরণ এখানে প্রাসংঙ্গিক বিধায় উল্লেখ করছি, একটি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিবের সাবেক সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় গবেষণা সম্পাদক এক ভাই, তাকে হল দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা মারতে মারতে দুই পা ভেঙ্গে দিয়েছে। আজও সে ঠিক মতো হাঁটতে পারেন না। তিনি শাখা সভাপতি থাকা অবস্থায় অনার্সে তৃতীয় আর মাস্টার্সে দ্বিতীয় হয়েছেন। শুধু তাই নয় কেন্দ্রে দায়িত্ব থাকা অবস্থায় এম.ফিলে প্রথম হয়েছেন। এরপর কেন্দ্রীয় গবেষণায় থাকাকালীন ৩৪তম বি.সি.এস ভাইভা পরীক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহর রহমতে ৩৪তম বি.সি.এস এ শিক্ষা ক্যাডার পেয়েছেন। এছাড়াও নতুন-পুরাতন প্রজন্মের কাছে আরও ভূড়ি ভূড়ি উদাহরণ আছে। সেগুলোর দিকে আমাদের দৃষ্টি দেয়া দরকার!
আপনার দ্বিতীয় পর্বের কয়েকটি পয়েন্টে আসি…..
১. আপনি নিজে যেখানে অধিকাংশ পরিষদ সদস্যদের ভোটে সেক্রেটারি জেনারেল নিয়োগের পক্ষে মত দিলেন, সেই আপনিই আবার জি.এস নির্ধারনের ব্যাপারের শহীদ কামারুজ্জামান ভাইয়ের কাছে পরামর্শ চাইলেন! বিষয়টা কি স্ববিরোধী হয়ে গেল না?
২.সাইফুল ইসলাম মিলন ভাইকে সেক্রেটারী না করার ব্যাপারে যুক্তি দাঁড় করালেও, যারা যোগ্যতার তালিকায় ছিল, তাদের ব্যাপারে আদৌ কি সুস্পষ্ট ধারনা দিয়েছেন? সুস্পষ্ট কোন ধারনা লেখায় আসেনি। যার ফলে পাঠক হিসেবে বক্তব্য একতরফা মনে হয়েছে আমার কাছে।
৩. যাই হোক ঢাবি শিবিরের সভাপতি আশেক আহমেদ জেবাল ভাইকে সংশোধনীয় প্রস্তাব উত্থাপন থেকে বিরত রেখে আসন্ন একটি সংকট থেকে রক্ষা করলেন, যা খুবই প্রজ্ঞাসম্পন্ন সিদ্ধান্ত ছিল। স্যালুট জানাই। কিন্তু বর্তমানে দল ও প্রথম সারির নেতাদের নাজুক এবং শিবিরের মহাসংকটে এই লেখার মাধ্যমে নিজের অগোচরেই কট্টর অ্যান্টি-ইসলামিকদের হাতে সিন্ধুকের চাবি ধরিয়ে দেয়া হয়েছে কি?
জানি না এইসব প্রশ্নের উত্তর পাব কিনা? নাকি নীরবেই মণি কোঠায় রেখে দিতে হবে! তরুণ প্রজন্মের একজন হিসেবে এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত নিজেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিতে দাঁড় করাতে পারছি না।
তাছাড়া আপনার বক্তব্য অনুযায়ী সেক্রেটারী সংক্রান্ত প্রস্তাবটি পাশ হলে এনামুল হক মঞ্জু ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে না! কিন্তু কেন তিনি প্রস্তাবটি পাশের ব্যাপারে অনিহা প্রকাশ করলেন? এবং প্রস্তাবটির সাথে তার অনাগ্রহের সম্পর্কের কোনো ব্যাখ্যা কেনইবা দিলেন না? এছাড়াও আপনি বলেছেন, যখন প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয় তখন অধিকাংশ প্রস্তাবের পক্ষে ছিল।তার মানে কয়েকজন সংশোধনী প্রস্তাবের বিপক্ষেও ছিলেন?তাদের পরিচয়টাও তো পাঠকরা জানার দাবি করতে পারে, সেটা তো আপনার জন্যেই পজিটিভ হতো! কারণ তাদের মধ্যে থেকেই কেউ কি সেক্রেটারী মনোনীত হচ্ছেন কিনা? সেটাও পরিষ্কার হতো।
চলবে…….. ৩য় পর্ব
প্রাসঙ্গিক লেখা : শিবিরের ক্রান্তিকালঃ ১৯৮২ সালের কথকতা-৩
নোট: লেখাটি সম্পাদক কর্তৃক সম্পাদিত




