রেজা ভাইয়ের ১৯৮২ সালের কথকতা’র প্রেক্ষিতে বর্তমান প্রজন্মের চিন্তা ও অবস্থান-৩য় পর্ব

১ম পর্ব,  ২য় পর্ব

অক্টোবর, ২০১৩। ‘ধর্ম ও রাজনীতি: দক্ষিণ এশিয়া, শীর্ষক আলোচনায় বক্তা হিসাবে ভাড়া করে আনা হয়েছে মাওলানা মওদুদী সাহেবের ছেলে হায়দার ফারুক মওদুদীকে! মিটিং এ বসছে ঘাদানিক নেতারা! ভিলেন ফারুক মওদুদী! ডানে গোলাম রাব্বানি-শাহরিয়ার কবির আর বামে মুনতাসির মামুন! ঠিক সামনেই খাতা-কলম নিয়ে বন্ধুক তাক করে আছেন গৃহপালিত ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ!! নাস্তিকত্বার আদা-জল আর ঢাকার চকবাজারের লম্বা লম্বা জিলাপী খাইয়ে ফারুক মওদুদীকে চেতনার নিরেট ভক্ত বানালেন তারা!! চেতনাসক্ত হয়ে মিডিয়ার সামনে ফারুক মওদুদী গলাবাজি করলেন ‘জামায়াতকে জারজ সন্তান উল্লেখ করে তার বাবার ধর্মীয় রাজনীতিকে হারাম দাবী করলেন! বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করতে সরকারকে জ্ঞান দিয়ে গেলেন! এমনকি পরের দিন দেশের সকল ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া একযোগে হেডলাইন করল ফারুদ মওদুদীর অমৃত বচন! এই প্রসঙ্গ থেকে জাস্ট ভবিষ্যৎতের স্মৃতিস্পটের প্রাসঙ্গিক একটি বিষয় সামনে আনার চেষ্টা করব।

আমি বিশ্বাস করি, মনে প্রাণে আশা রাখি প্রিয় রেজা ভাই কোনো দিন ঐ সমস্ত অ্যান্টি-ইসলামিক কমরেডদের পাশে বসে মিটিং করবে না। তবে আশংকা করছি রেজা ভাইয়ের  সিরিজ লেখাগুলোকে কি ফারুক মওদুদীর মতো ইসলামের বিরুদ্ধে তুরুপের তাস হিসাবে ব্যবহার করে কিনা? অতীত বলে কট্টর বামরা যেকোনো ক্লু পেলেই ইসলামের বিপক্ষে কল্পনাতীত জিকির তুলেছে! যার প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়া যায়! যেমন টক-শোতে দেখা যায় শাহরিয়ার কবীর কিংবা মুনতাসির মামুনরা প্রায়শই জামায়াতকে আক্রমণ করতে গিয়ে ফারুক মওদুদীর উদাহরণ টেনে নিয়ে আসেন! এখন হয়ত রেজা ভাইকে ব্যবহার করবে। এজন্যই আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, রেজা ভাইয়ের লেখাগুলো স্বযত্নে রেখে দিবে গোঁড়া জামায়াত বিরোধীরা এবং ঝুপ বুঝে অবশ্যই কোপ মারার চেষ্টা করবে!

তরুণ প্রজন্ম হিসাবে আমি মনে করি প্রকৃত সমালোচক তারাই যারা সমালোচনার পাশাপাশি সমাধানের পথটাও আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে যায়। এবার যদি সোজাসুজি একটি প্রশ্ন করি, রেজা ভাই তার সম্পূর্ণ আলোচনায় আদৌ কি কোনো সমাধানের রাস্তা দেখিয়ে গিয়েছেন? উত্তরটা পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম। পাঠক সমাজকে অন্তরদৃষ্টির বাইরে রেখে লেখক অনেক ইতিহাসকে এড়িয়ে গেছেন। যা আমাকে বিভ্রান্তে ফেলে দিচ্ছে!

তৃতীয় পর্বের শুরুতে আপনি বললেন‘ নির্বাচন হলো এবং আমাকে ঢাকা শহরের সভাপতি নির্বাচিত করা হলো। লক্ষ করুণ এর আগের পর্বে আপনি বললেন জনাব মুজাহিদ সাহেব জোর করে আপনাকে ছয় মাসের জন্য চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে আসলেন! সোজা বাংলায় আপনি আগে থেকেই তো সিলেক্টেট!! অথচ বললেন আপনি ঢাকার নির্বাচিত সভাপতি ? আগে থেকেই তো ঠিক করা ছিল! তাহলে আবার কিসের নির্বাচন? কিন্তু দু:খের বিষয় হচ্ছে আপনিই সেন্ট্রাল জি.এস মনোনয়নে বিরোধীতা করলেন! অথচ আপনাকে একই কায়দায় নির্বাচনের আগেই ঢাকার সভাপতি হিসেবে মনোনীত করা হলো! সেক্ষেত্রে আপনার আপত্তি আপনার লেখায় উঠে আসেনি!

অন্যদিকে প্রথমে শুনিয়েছেন সংশোধনী প্রস্তাব পাশ হলে সিপি এনামুল হক মঞ্জু ভাই পদত্যাগ করবেন! যাই হোক প্রস্তাব তো পাশ হলো না আবার সেক্রেটারীও মন-মতো ছিল! তারপরও কেন মঞ্জু ভাই পদত্যাগ করলেন?? এই প্রশ্নের একটা ব্যাখ্যা আসা দরকার ছিল, যেহেতু সেটা আসেনি কাজেই তরুণ প্রজন্মের একজন হিসেবে বিশ্লেষণের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বলতে পারি, সিপি এনামুল হক মঞ্জু ভাই হুট করে পদত্যাগ করার জন্যই ৮২’র মূল সংকটটা তৈরি হয়েছে। নিশ্চয়ই সাইফুল ইসলাম মিলন ভাইকে সেক্রেটারী করার জন্য নয়! তাহলে মঞ্জু ভাই কেন পদত্যাগ করলেন সেই প্রশ্ন আবারো এসে যাচ্ছে। এর পেছনে কি কি কারণ ছিল? উনার ব্যক্তিগত কি কি কারণ থাকতে পারে, যার জন্য উনি পদত্যাগ করতে পারেন? এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আপনি দিয়ে যাননি। কাজেই আমার মতে, এটাই আপনার আলোচনার সবচেয়ে বড় দুর্বল পয়েন্ট।

আপনার সিরিজ লেখার বিশ্লেষণ বলছে, সেক্রেটারি জেনারেল নিয়োগের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের দিকে অবশ্যই নজর দিতে হয়। ১. পরিষদের অধিকাংশের মতামত ২. অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা। এখন আসি আপনার সেক্রেটারী হওয়ার স্টেজে! তয় পর্বের একটি লাইন ‘আর যা-ই করুন, আমাকে সেক্রেটারী জেনারেল করবেন না’। কিভাবে জানতেন যে, আপনিই সেক্রেটারী জেনারেল হচ্ছেন মিলন ভাইয়ের পরিবর্তে! ধরে নিলাম প্রথম বিষয়টি আপনার অনুকূলে কিন্তু দ্বিতীয়টি তো প্রতিকূলে ছিল! তাছাড়া আপনি দেখতেছেন মিলন ভাইকে সেক্রেটারি না করাতে নতুন করে আরেকটি সংকট তৈরি হচ্ছে! তাহলে কেন আপনি জি.এস পদ থেকে পদত্যাগ করলেন না? যাই হোক, আপনার বক্তব্য অনুযায়ী কয়েক বছর যাবৎ দেখা যাচ্ছে, যিনি সেক্রেটারী জেনারেল নিযুক্ত হন পরবর্তীতে তিনিই কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন! তাহলে মঞ্জু ভাই পদত্যাগ করার পরও কেন মিলন ভাই সভাপতি হলেন না?? যদি সাবেকদের ইচ্ছা মোতাবেক সভাপতি করা হয়, তাহলে তারা তো তখনই মিলন ভাইকে সভাপতি করতে পারতেন! এই রহস্যের মুখোশ উন্মোচিত হয়নি আপনার লেখায়।

এবার শাহজাহান চৌধুরী (মোমেনশাহী)এর প্রপাগান্ডার দিকে আসি।  ১০০% একমত জনাব শাহজাহান যে জগন্য কাজটি করেছেন সে জন্য উপযুক্ত শাস্তি হলে আমরা নতুন প্রজন্ম খুবই খুশি হতাম। পাশাপাশি যাদের নাম শুনে আপনি বিস্মিত হয়েছেন তাদের নামগুলোও উল্লেখ করতে পারতেন। শাহজাহান চৌধুরী কেন এমনটা করলেন? কি রহস্য এর পিছনে থাকতে পারে? কার কার মদদ আছে? নাকি তিনি নেহায়েত কারো সাথে ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে সংগঠন বর্হিভূত কাজটি করেছেন। সেটার নিদিষ্ট ব্যাখ্যা এবং শাহজাহান চৌধুরীর পুর্নাঙ্গ পরিচয় কিন্তু আপনি দিয়ে যাননি!

অন্যদিকে ৪র্থ পর্বে একটি লাইন দেখে আমি মর্মাহত ও কিছুটা আশ্চর্য হলাম! ‘হঠাৎ করে গোটা দেশের সদস্যরা এমন সংগঠন-সচেতন হয়ে উঠলো কেন? এটা পড়ে শুধু হতাশই হলাম না পাশাপাশি মনক্ষুণ্নও হলাম! আমার মনে হয়েছে শিবিরের তৎকালীন জি.এস কর্মীদের সচেতনতা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন! দ্বিতীয় আরেকটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, ঢাবির মুজাহিদ ভাই সকল দায়-দায়িত্ব আমীরে জামায়াতের উপর ন্যাস্ত করতে প্রস্তাব দিলেন, এ ক্ষেত্রে আপনার ভিন্ন অবস্থান আমাকে দো-টানায় ফেলে দিল! কেননা যেখানে আপনাদের সম্পূর্ন প্যানেল অভিযুক্ত সেখানে আপনাদের কাছ থেকে কিভাবে সঠিক তদন্ত আশা করতে পারে পাঠক সমাজ?

`মুজাহিদুল ইসলাম হয়তো মনে করেছেন, আমীরে জামাত খালেস-মুখলিস মানুষ, আপনি এই বক্তব্য দ্বারা কি ইঙ্গিত করলেন? আমি সম্পুর্ণ হতবাক। আপনার রেফারেন্স অনুয়ায়ী আপনি ও কাদের ভাই যখন উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে আমীরে জামায়াতের কাছে গেলেন তখন আমীরে জামায়াতের বক্তব্য ছিল, ‘ঘটনা শোনার পর আমি অস্থির হয়ে পড়েছি। তারপরও আমীরে জামায়াতের উপর আস্থার ব্যাপারে প্রশ্ন আসল কেন?  তাছাড়া আরেকটা বিষয় আমার কাছে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে, আপনার বক্তব্যের কোটেশন ‘আমার ব্যক্তিগত চিন্তা ছিল, প্রথমে আমরা সংগঠনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণে শাহ জাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেব’। কি আর বলব! যেখানে ফরীদ রেজা নিজেই অভিযুক্ত সে-ই কিভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়নকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে? নিশ্চিয় সেটা একমাত্র আমীরে জামায়াত মহোদয়ই করতে পারে। আপনার কথায় মনে হয়েছে তার উপরও বিশ্বাস নেই!

৪র্থ পর্বের শেষের আলোচনাটুকু নিয়ে আমি যথেষ্ঠ আতংকিত ও বিস্মিত! যদিও আপনি একটা সাংগঠনিক ডিসিশনকে ব্যক্তি পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে সিরিজ লিখলেন! সেটা একান্ত ব্যক্তির নিজস্ব রুচিবোধ। শুধু একটা প্রশ্ন জানতে চাই? সংগঠনের স্বার্থে আপনি সাংগঠনিক লাইফে যতগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেগুলোর কোন ভোক্তভোগি যদি সেগুলোকে আজ রেজা ভাইয়ের ব্যক্তি স্বার্থের দিকে আঙ্গুল তুলে তাহলে আপনার জবাব কি হবে? একটু জানাবেন প্লিজ। সেই দিন জাবাল ভাইকে থামিয়ে দিয়ে আপনি সংগঠনিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। তবে কেন আপনি আরেকটি সংগঠনিক সিদ্ধান্তকে (আপনাদের প্রতি অনাস্থার কারণে বিদায়) ব্যক্তি পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন? আমার কাছে সেটা বোধগম্য নয়!

চলবে………………

প্রাসঙ্গিক লেখা : শিবিরের ক্রান্তিকালঃ ১৯৮২ সালের কথকতা-২

নোট: লেখাটি সম্পাদক কর্তৃক সম্পাদিত

Leave a Reply