[নোটঃ ১৯৮২ সালের কথকতা’র প্রেক্ষিতে এটি একটি পর্যালোচনামুলক ধারাবাহিক লেখা, বোঝার সুবিধার্থে আগের পর্বগুলো পড়ে নেয়া জরুরী]
আগের লেখাঃ ৩য় পর্ব
ভিন্নমত কিংবা পাল্টা কলমের প্রতি প্রায় সবাই অসহনশীল! হোক সে আস্তিক কিংবা নাস্তিক। ব্যক্তি পরিচিত বা অপরিচিত মুখ যাই হোক, তিনি কি বললেন বা লিখলেন সেটাই তো আলোচনার এজেন্ডা হওয়া উচিত। অথচ চলমান পৃথিবীর নিয়মটা পরিবর্তন হতে চলেছে! ছোট্ট বলে মতামতকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয় কেউ কেউ! আজ খুব মনে পড়ছে, বিশ্বমানবতার সর্দার কেন একজন হাবশী গোলাম হযরত বেলাল (রা:) কে কাবা শরীফের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আর কেন-ই-বা অন্ধ সাহাবার প্রতি রাসূল (সা:) এর বে-খেয়াল এর জন্য স্বয়ং প্রভু কুরআনে আয়াত নাযিল করেছেন। একেই বলে ইসলাম। যেখানে আমীরুল মোমেনীন হয়রত উমর (রা:) পর্যন্ত ছাড় পাননি। জবাবদিহি করতে হয়েছে সাধারণ জনতার কাছে। কিভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বরাদ্দকৃত স্বল্প কাপড় দিয়ে পুরোে একটি জামা বানালেন। ইসলামের প্রাণপুরুষরা বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন ছোট্ট বা অপরিচিত মুখ বলে কাউকে তিরষ্কার বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে হয়না। হাজারো বার মস্তক অবনত সালাম তোমায় ইসলাম। তোমার ইনসাফে মুগ্ধ হয়েই তো আজও বেঁচে আছি…..
আমার ধারাবাহিক এই লেখার প্রেক্ষিতে সম্প্রতি কে বা কারা অজানা একটি আইডি থেকে মেইল করে বললেন, ‘আমার Episode নাকি Bullshit, Non-Sense, আমি নাকি Time waste করছি!, পাশাপাশি পরামর্শ দিয়েছেন ভালো করে ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে শিখতে, জানতে। তারপর লিখতে। সেই শুভাকাঙ্খী ভাইটিকে বলব, আপনার প্রথম আক্রমণাত্বক বক্তব্যে আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি কিন্তু দ্বিতীয় অংশটার জন্য আপনার প্রতি আজীবন শুভকামনা থাকল। এক্ষেত্রে কবির সুরে বলব ‘বিশ্ব জোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র। নানা ভাবে নতুন জিনিস শিখছি দিবা রাত্রি।,
এই ঘটনার পর আইএমবিডি ব্লগ এডমিন মহোদয় জানালেন, ‘প্রিয় ব্লগার অভিযোগের ভিত্তিতে আপনার এপিসডের শিরোনাম ও আক্রমণাত্বক বিষয়গুলো ছাঁটাই করা হয়েছে। কাজেই যারা আমার লেখা পড়ে কষ্ট পেয়েছেন কিংবা অ্যাটাকিং মনে করেছেন, তাদের কাছে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাচ্ছি। তবে আমি কিছুটা হতবাক! এজন্য যে, আমার এপিসড এডিট করার পূর্বে অন্তত আমাকে একবারও জানানো হয়নি! পুর্ব সিগন্যালটা আশা করেছিলাম। নিজের হাতে নিজের মতো করে সহনশীল ভাষায় এডিট করে দিতাম। একজন ব্লগার হিসাবে ন্যূনতম এই অধিকারটুকুই আমি চেয়েছিলাম। তারপরও এডমিন মহোদয়ের নীতিগত অবস্থানটা আমার কাছে নিরপেক্ষ মনে হয়েছে।
প্রিয় ফরীদ আহমেদ রেজা ভাই, আপনি অনেক বড় ব্যক্তি। আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি রসকসহীন লেখাটি শুরু করে ফেলেছি কিন্তু লেখায় আবেগকে যথাসম্ভব দুরে রাখার চেষ্টা করেছি। কাজেই নবীন হিসাবে ভরা নদীতে একটু সাঁতার শিখার চেষ্টা করছি আর কি! যাই হোক এবার আলোচনায় আসি। প্রথমে লেখক শাহজাহান চৌধুরীর সাথে মাওলানা নিজামী সাহেবকেও অভিযুক্ত করলেন। অথচ ৪র্থ পর্বে আমীরে জামায়াত পরিষ্কার করে বললেন, ‘আব্দুল্লাহ তাহেরের বরাতে তুমি যে কথা বলেছিলে তা আমি নিজামী সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছি। তিনি বলেছেন তাহেরকে তিনি এ ধরনের কোন কথা বলেননি।’ কাজেই মীমাংসিত এই বিষয়টা লেখায় উঠে আসাতে আমি বিস্মিত। আর মাওলানা আব্দুল জব্বারের মাধ্যমে লেখকের লেখাতেই এসেছে, ৮২’র সেই কঠিন ও স্পর্শকাতর বিষয়টির ব্যাপারে একক সিদ্ধান্ত আসেনি। পরামর্শের ভিত্তিতে চড়ান্ত ডিসিশন নিয়েছে মজলিশে সূরা। সুতরাং একক মুজাহিদ কিংবা একক নিজামী এমনকি এককভাবে আমীরে জামায়াত সিদ্ধান্ত নেননি। এটাই তো হলো ইসলামি আন্দোলনের আসল বুনিয়াদ। আমরা এমনটাই আশা করি। স্যালুট ইসলামি আন্দোলনের মজলুম নেতাদের।
যুবশিবির গঠনের ব্যাপারে লেখক জামায়াতের সহযোগিতার কথা জোর দিয়ে বললেন। যেমন অধ্যাপক গোলাম আযমের প্রশ্নে ‘সাবেক শিবির-সদস্যরা তা করবেন। জামায়াতকেও সহযোগিতা করতে হবে।, অথচ ছাত্রশিবির যখন মহাসংকটে তখন জামায়াতের পরামর্শ নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি ভিন্নমত ব্যক্ত করেছেন। ফলে এক্ষেত্রে লেখকের দ্বৈত অবস্থান পরিলক্ষিত হয়েছে বলে ধারনা করছি।
৫ম পর্বে লেখকের আলোচনার শুরুটা আমার জন্য খুবই কষ্টদায়ক। মজলুম নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম ও তার বক্তব্যকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা কোনো দিনও প্রত্যাশা করিনি। যে নেতার উজ্জ্বল মুখখানা এক নজর দেখলেই মানুষ তৃপ্তির হাসি দিত। মগবাজারের বাসায় কফিনটা আজও চোখে ভাসছে। প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলাম। কি নূরানী চেহারা। যেন সদ্য প্রষ্ফুটিত গোলাপ ফুল। স্বচক্ষে দেখেছি তার প্রতি জামায়াত-ছাত্রশিবিরের বাইরেও সাধারণ জনতার অন্তিম ভালোবাসা। মরহুমের জানাযার সময় বায়তুল মোকারমে লাখ লাখ মানুষকে মজলুম এই নেতার জন্য পাগলের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে দেখেছি। আমি আরও দেখেছি, প্রিয় নেতার কফিনটা মাত্র একটিবার স্পর্শ করার জন্য সাধারণ মানুষের আহাজারি আর প্রতিযোগিতা। ঐ অনলি ওয়ান অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, অধ্যাপক গোলাম আযমের গায়ে একাত্তরের কোনো কাঁদা লাগেনি। নয়ত তিনি লাখ লাখ মানুষের ভালোবাসার ভাগিদার হতে পারতেন না।
অন্যদিকে একটি সংগঠনের প্রাণই হচ্ছে চালকের আসনটা শক্ত ও মজবুত হওয়া। কাজেই আমি মনে করি, পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তার তাগিদেই হয়ত একই সেশনে তিনবার নির্বাচন করার দরকার ছিল। যে কোনো সুস্থ বিবেক তাই বলে। জামায়াত পরিস্থিতির শিকার মাত্র! আর ইসলামি পলিটিক্স নিয়ে আপনি যথেস্ট অভিমান ব্যক্ত করেছেন। ছো্ট্ট মাথার মূল্যায়ন থেকে বলতে পারি, ভৌগলিক অবস্থানটাও ইসলামি রাজনীতির জন্য বড় একটি ফ্যাক্টর। বাংলাদেশে চাইলেও কেউ তুরস্ক, তিউনিশিয়া, মিসরের ইসলামি রাজনীতির কৌশল ও পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারবেন না। যদিও আদর্শিক ভিত্তিটা একই। তাছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই ইসলামপ্রিয় সেটা শুধুমাত্র মসজিদ-মাদ্রাসা কেন্দ্রিক! রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় নয়! আর এটাই হচ্ছে বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির ক্রিটিক্যাল পয়েন্ট।
সে সেক্ষেত্রে জামায়াতের নাম পরিবর্তন খুব বেশি কাজে আসবে বলে মনে হয়না। যদি না সাধারণ জনতার মন-মানসিকতায় কোনো প্রকার পরিবর্তন আনা যায়। প্রাসঙ্গিক একটি উদাহরণ, মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড কৌশল হিসাবে মূল সংগঠনের বাহিরে তাদের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি গঠন করেছিল। পরিবর্তিতে ক্ষমতাসীনও হয়েছিল কিন্তু টিকতে পারেনি। কারণ সমস্যাটা তো আদর্শিক, পার্থিব কোনো নামে নয়। আর জামায়াত যদি অন্য যেকোনো নাম ধারন করে। তাহলে নিশ্চিত মিডিয়া সন্ত্রাসের শিকার হবে! কারণ প্রায় সকল মিডিয়াই জামায়াত বিরোধীদের দখলে! তাছাড়া বিশ্বায়নের যুগে কাউকে ধোকা দিতে চাওয়াটাও তো বোকামী। তাহলে নাম পরিবর্তন করলেই কি জামায়াত সম্পর্কে রাতারাতি ৭১’র নিয়ে বিরোধীপক্ষের অপপ্রচার বন্ধ হয়ে যাবে?
তবে একাত্তর নিয়ে অনেকের মতো লেখকের মতামতটা তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শিমূলক মনে হয়েছে। হয়ত সেই দিন নেতারা ভিন্নভাবে চিন্তা করেছেন। এক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে কারো উপর ভুলের দায়-দায়িত্ব চাপানোটা নেহায়েত অমূলক। কারণ সিদ্ধান্ত মজলিসে শূরার ছিল ব্যক্তির নয়। ধরুন একাত্তরে যদি মুক্তিবাহিনী পরাজিত হতো তাহলে কিন্তু শেখ মুজিব সবচেয়ে বড় রাজাকার হতেন! আওয়ামীলীগ হতো রাজাকারের দোসর! তখন ঐ ভুলটাই আবার প্রশংসার বানে ভাসতো। মানুষ তো শুধু উদ্যোগ নিতে পারে, ফায়সালা তো মহান প্রভুই দিবেন।
আর বর্তমান রাজনীতির মাঠে গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও ইসলামি রাজনীতি দুটোতেই আমি জামায়াতকে এগিয়ে রাখব। যা আবেগ নয় আমার বিবেক নির্ভর অবজারভেশন। দেখুন, বিএনপি ও আওয়ামীলীগ নিরেট পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি করছে। কাজেই গণতন্ত্রের নামগন্ধও নেই তাদের মাঝে। আর জামায়াত ছাড়া অন্যান্য ইসলামিক দলগুলোর অবস্থাও তো নাজেহাল! নদীর তীরের মতো খালি ভাঙছে আর ভাঙছে! এমনকি আহমেদ আব্দুল কাদের ভাইয়ের দল খেলাফত মজলিশও বেশ কয়েকবার ভেঙেছে! ফলে সাধারণ মানুষের ভরসা কিন্তু জামায়াতেই থাকার কথা। বিকল্প কোনো অপশনও নেই। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের ফলাফল সেটারই ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে ছাত্র সংগঠনের দিকে একটু খেয়াল করলে দেখবেন, ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের উদ্ভট নেতৃত্বে ছাত্রজনতার বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। নারী-মদ-গাজার প্রার্দুভাব দিন দিন বাড়িয়ে নিচ্ছে এইসব ছাত্রসংগঠনের প্রফেশনাল ছাত্রনেতারা!! ফলে একমাত্র ভরসা শহীদি কাফেলা ছাত্রশিবির। আলোচনার সাথে সম্পর্কিত সেজন্যই বলছি, গত পরশু টিউশনি শেষে এক বন্ধুর সাথে হলে ফিরছিলাম। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে গল্প হচ্ছিল। কথা প্রসঙ্গে অরাজনৈতিক বন্ধুটি বলে বসল, আমাদের থেকে চট্টগ্রাম ক্যাম্পাসটি অনেক ভালো আছে! জিজ্ঞাস করলাম কেন এমনটি বললে? উত্তরটা শুনে প্রাণটা শান্তিতে ভরে গেল। ছাত্রশিবিরের কল্যাণে নাকি চবিতে বাদ ফজর হলের রুমে রুমে কুরআন তেলওয়াত হয়। সবার অবগতির জন্য বলছি, আমি একটি আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাম্পাসে কাজ করি। তাই সেই বন্ধুটি জানেনা আমি ছাত্রশিবিরের ছাঁয়ায় আছি। এমনকি ঢাবি, রাবির, ইবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা, হল কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও চুপি চুপি আমাদের ভাইদের কাছে জানতে চায়, কবে ক্যাম্পাসে ফিরবেন আপনারা? সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে অন্যান্য ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের অবস্থান ও ইমেজের কথা আর নাইবা বললাম। তাছাড়া স্বয়ং লেখকের স্মৃতিময় ক্যাম্পাসটি কিন্তু এখনো কাফেলার সদস্যরা পুত-পবিত্র রেখেছে। কাজেই আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি আগামী ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্ব ছাত্রশিবিরই দিবে ইনশা-আল্লাহ।
এখনো ছাত্রশিবিরের প্রতি লেখকের ভালোবাসা ও সহানুভূতি দেখে আমি সত্যিই অভিভূত। আশা করি ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে উনার ‘শিবির এখন জামায়াতের ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত হবে এবং আস্তে আস্তে গণমানুষের আস্থা ও সমর্থন হারাবে।’ এই বক্তব্যটিতে আমি আপত্তি করব। আমার মনে হয়েছে লেখক সংগঠনের বর্তমান অবস্থান ও কুট-কৌশল বিবেচনায় না নিয়ে ঢালাওভাবে ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন। তাছাড়া লেখক গণমানুষ বলতে কি শুধু অ্যান্টি জামায়াতকে বুঝিয়েছেন? ৮২’তে কেমন সমর্থন ছিল এবং ১৫’তে সেই সমর্থন-আস্থা বেড়েছে নাকি কমেছে তার কোনো ক্লিয়ার তুলনামূলক ব্যাখ্যা লেখক দিয়ে যাননি। সমর্থন কমে থাকলে কত পারসেন্ট কমেছে সেটারও কোনো ধারনা লেখকের এপিসডে দেখছিনা। কাজেই লেখককে বিনীত অনুরোধ করব, দেশে এসে মাঠপর্যায়ে একটু খোজ-খবর নিয়ে দেখুন। আশা রাখি আপনার ধারনাপ্রসূত মন্তব্যের বিপরীত চিত্রটি পরিষ্কার দেখতে পাবেন।
চলবে…….




