একুশ শতকের তারুণ্যময় কবি আসাদ বিন হাফিজের কাব্যিক মহিমায়,
“যেখানে অন্ধকার সেখানেই বিপ্লব,
যেখানে ক্লেদাক্ত পাপ ও পঙ্কিলতার সয়লাব সেখানেই বিপ্লব”
হ্যাঁ ইসলামি আন্দোলন এমনি এমনি আইয়ামে জাহেলিয়াতের সেই বিভীষিকাময় আঁধারকে ধুয়ে মুছে এত দুর পর্যন্ত আসেনি। দিকে দিকে যুগে যুগে শত শত বীর সেনানীদের আত্মত্যাগ আর রাতের প্রহরে সহস্রাধিক মজলুমের অশ্রুসিক্ত স্রোতের বদলেই আজ বিশ্বব্যাপি ইসলামের বিজয় নিশানা উড়ছে। এই আন্দোলনের পথটা যে কখনোও পুষ্পাচ্ছন্ন ছিল না তা উহুদের যুদ্ধে রাসূল(সা:) এর দন্ত হারানো কিংবা তায়েফের রক্তস্মাতই অকাট্য প্রমাণ দেয়। সেই সুমহান পদযাত্রায় আবু জাহেল, আবু লাহাব, কুঁজো বুড়ির মতো অনেকে কাঁটা পুতে রাখবে তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
অ্যান্টি ইসলামিকদের দৃশ্য কিংবা অদৃশ্য ষড়যন্ত্র অতীতে ছিল, এখনো আছে এমনকি ভবিষ্যতেও তা বহাল থাকবে। তারপরও বাতিলশক্তির সেই হুংকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অন্ধকারকে আলো দ্বারা ঢেকে দিয়ে ইসলামের খুটি আঁকড়ে রেখেছেন ইতিহাসের অনেক প্রাণপুরুষ। মনে পড়ে হামির হামজার বীরুত্ব, খালিদ বিন ওয়ালিদের উন্মুক্ত তরবারি, তারিক বিন জিয়াদের স্পেন বিপ্লব, ক্রুসেড যুদ্ধে সালাউদ্দিন আউয়ুবীর ধৈর্য্য, তিতুমীর-বখতিয়ারের ঘোড়ার খুরের উড়ন্ত ধুলি আজও মুসলিম বিশ্বের আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। তাই তো কবি আল মাহমুদ বলেন,
“প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা”
এরপর অনেক চড়াই-উতরাই পার করতে হয়েছে ইসলামি আন্দোলনের মজলুম জনতাকে। সহ্য করতে হয়েছে অপশক্তির অমানবিক নির্যাতন-নিপীড়ন। নড়বড়ে নেতৃত্ব নিয়ে চলতে হয়েছে দীর্ঘদিন। এই দুর্দিনে এগিয়ে এসেছেন বিংশ শতাব্দীর আন্দোলনের চালিকাশক্তি হাসানুল বান্না, সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ, বদিউজ্জামান নুরসী এবং উপমহাদেশের সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী। তাদের সত্যান্বেষী আন্দোলনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে জামাল আবদেল নাসেররা আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছিল। কিন্তু পারেনি। উপমহাদেশেও বাতিলদের প্রেতাত্মারা বার বার ছোবল মারার চেষ্টা করেছে, কুশীলবদের ষড়যন্ত্র এখনও থামেনি।
ইসলামি নেতৃত্বেই কেন বাতিলশক্তির প্রধান আক্রমণ?
ইসলামি নেতৃত্ব ধ্বংসের মহড়া নিরেট ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র। যখনই সত্যের মিছিলকে থামানোর শেষ চেষ্টা জলে গেছে তখনই দানবরা ভয়াবহ হিংস্র হয়ে উঠেছে। ছলে-বলে কৌশলে নেতৃত্বের মূল পাটাতনে হামলা করেছে। মক্কার কাফির কর্তৃক স্বয়ং মানবতার সর্দার রাসূল (সা:) এর হত্যাচেষ্টা থেকে মিশরের সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ, শহীদ আব্দুল কাদের আওদাহ, বাংলাদেশের শহীদ কাদের মোল্লা, শহীদ কামারুজ্জামানের হত্যাকান্ডের নীল-নকশা একই সূত্রে গাঁথা। জালিমদের ধারনা একজন সাইয়্যেদ কুতুব কিংবা একজন কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দিলেই ইসলামি আন্দোলনের বারোটা বেজে যাবে! অথচ মূর্হুতের মধ্যেই যে লক্ষ লক্ষ কুতুব বা কাদের মোল্লা দাঁড়িয়ে যাবে তা বুঝার অক্ষমতাই ইসলাম বিদ্বেষীদের নাম্বার ওয়ান দুর্বলতা। ঠিক সেই জন্যই নিশ্চিত মৃত্যুর কাঠগড়ায় বসে আল্লামা সাঈদী বলিষ্ট কন্ঠে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন,
“ওহে জালিম তুমি কাকে ভয় দেখাও ঐ ভয়ে কম্পিত নয় আমার হুদয়, কুরআনের রাজকায়েমে উৎসর্গিত সকল জাগতিকতা প্রহসনের ফাঁসির রশি আমার পায়ের জুতার ফিতা”
বাংলাদেশি জামাল আবদেল নাসের
বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ বরাবরই ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ। এদেশের ছোট্ট শিশুদের ইসলামপ্রিয়তা নতুন কিছু নয়। মসজিদে মসজিদে মক্তব, পালকিতে কাপড় পেচিয়ে মহিলাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গমন, শালীনতার প্রতি শহর কিংবা গ্রাম্য মহিলাদের ভক্তি যা একমাত্র বাংলাদেশি ইসলামি কৃষ্টি-কালচার।
তাই তো কবি কাজী নজরুল গেয়েছেন,
“ভোর হল দোর খোল খুকুমণি ওঠ রে, ঐ ডাকে জুঁই শাখে ফুল খুকি ছোট রে”
আর নীতি-নৈতিকতার বললেই চলে আসে কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কারের অমিয় বাণী
“সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি,
আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে”
এদেশের ধূলি কণায় মিশে আছে হযরত শাহজালালের ঘাম, শাহ আমানতের বলিষ্ট স্পৃহা, মুফতি আমিনীর কুরআনের স্লোগান, আল্লামা সাঈদীর কুরআনের তাফসির। ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে ছিল কুরআনের প্রতি আমজনতার ভালোবাসা। যা এখনো বিদ্যমান। উপমহাদেশের মজলুম ইসলামিস্ট অধ্যাপক গোলাম আযম, কবি ফররুখ আহমেদ, কবি আল মাহমুদ, কবি মতিউর রহমান মল্লিকরা এদেশের পথে-ঘাটেই বেড়ে উঠেছেন। শহীদ আব্দুল মালেকরা আজও এদেশের লক্ষ লক্ষ যুবকের প্রেরণার বাতিঘর। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে চলছে ইসলামিস্টদের জয়জয়কার। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, শহর থেকে শহরান্তে ছড়িয়ে পড়ছে ন্যায় ও সত্যের প্রস্ফুটিত গোলাপের সিগ্ধতা।
সিকিমের লেন্দুপ দর্জির মতো এদেশেও ক্ষমতাবাজরা যখন দিনের দুপুরে দেশের স্বার্থকে বিকিয়ে দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম তখনই প্রতিবাদ করছে। রুখে দিতে শিখেছে। পলাশীর প্রান্তর থেকে শাপলা চত্বরের নৃশংসতাকে যুবসমাজ প্রেরণার মেশিন হিসাবে নিয়েছে। পাশ্ববর্তী দেশের গোলামিকে ভালো চোখে নেননি তরুণ প্রজন্ম। দেশের সার্বভৌমত্বকে টিকিয়ে রাখতে তারা বদ্ধ পরিকর। পিছিয়ে নেই হযরত সুমাইয়ার(রা:) উত্তরসূরীরাও। হাজার হাজার তরুণীরা আজ দেশসেরা বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা করেও ইসলামি সংস্কৃতিকে ধারন করে আছে। আর মহিসয়ী মায়েরা নিজ গর্ভের সন্তানকে বন্ধুকের নলের সামনে ঠেলে দিতে বিন্দুমাত্র অশ্রু জড়াচ্ছেন না। বাংলা মায়ের সন্তানরাও ভীতু নন। তারা আবু জাহেলের হত্যাকারী দুই যুবক মুয়ায বিন আমর ও মুয়ায বিন আফরার হিম্মতকে বুকে ধারন করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ইসলামি আন্দোলনকে। নারী-মদ কোনো কিছুর দ্বারাই তাদের দাবিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
সেটাই মাথা-ব্যাথার কারণ হয়ে উঠেছে ধর্মনিরপেক্ষতার গুরু আওয়ামী সরকারের। তার উপর কট্টর ইসলাম বিরোধী কমিউনিস্টদের কু-বুদ্ধি ও কু-পরামর্শ তো আছেই! ফলে একটি সম্ভবনাময়ী আন্দোলনের গায়ে শেষ পেরেক ঢুকিয়ে দিতে সবরকম আয়োজন করে যাচ্ছে ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকার। ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রশিবিরের অভিনব সাফল্যে তেলে বেগুনে বেজে উঠছে আওয়ামী শাসক গোষ্ঠী। এ ক্ষেত্রে তারা ৭১’র কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে।
কামানের নিশানা জামায়াত-ছাত্রশিবিরের দিকে কেন?
বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির ইতিহাস-ঐতিহ্য খুব বেশি একটা দীর্ঘ নয়। কারণটাও স্পষ্ট। একটা সময় ছিল কওমীপন্থী আলেম সমাজ ইসলামি রাজনীতিকে হারাম মনে করতেন। যদিও ধীরে ধীরে তাদের চিন্তা-ধারার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তাছাড়া স্বাধীনতা পরিবর্তী সময়ে কৌশলে ইসলামি আন্দোলনের ভিতকে নিধন করার অপচেষ্টা করা হয়। যদিও পর্দার আঁড়ালে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে। তা সত্ত্বেও জালিমের রক্তচক্ষুকে বার বার উপেক্ষা করে ময়দানে টিকে থেকেছে মজলুম কাফেলার এই আন্দোলনটি। জনতার সংস্পর্শে এসে নিজেদের অবস্থানকেও পাকাপোক্ত করে ফেলেছে আন্দোলনের কর্মীরা। জামায়াত-ছাত্রশিবিরের কর্মীদের কঠোর পরিশ্রম আর ত্যাগের মহিমার জন্য জনমানুষের ভালোবাসার একমাত্র প্রাণপ্রিয় সংগঠন হয়ে উঠছে জামায়াতে ইসলামি। তাছাড়া অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর কোন্দল ও প্রতিনিয়ত ভাঙ্গনের কারণে সাধারণ জনতা তাদের উপর আস্থা-বিশ্বাস রাখতে পারছে না।
ফলে জামায়াত আস্তে আস্তে ভোটের মাঠেও নিজেদের অবস্থান জানান দেয়া শুরু করেছে। অচিরেই যে শাসকগোষ্ঠীর সাথে পাল্লা দিবে তা প্রায় সুনিশ্চিত। যা সহজভাবে নিতে পারেননি মুজিববাদী আদর্শের ভক্তরা। অন্যদিকে জামায়াত দলের ভেতরে ও বাইরে সবজায়গাতেই গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রেখেছে। ইহা দেশ-বিদেশে জামায়াতের সুনাম বয়ে আনছে।
এসব অগ্রযাত্রাকে রুখতেই আওয়ামী শাসকগোষ্ঠী নিত্য-নতুন ফঁন্দি আটছে। একাত্তরের ছুতো হচ্ছে সেটারই ফটোকপি মাত্র! রূপকথার গল্প সাজিয়ে গৃহপালিত ট্রাইবুনাল দিয়ে বিচারের নামে স্পষ্ট প্রহসন করছে। ট্রাইবুনাল চত্বর থেকে রাজসাক্ষী কিডনাপ, বিচারপতি নাসিমের স্কাইপি সংলাপ ফাঁস, শাহবাগের গুটিকয়েক ব্যক্তির চাহিদা মোতাবেক আইন পর্যন্ত পরিবর্তন, পাবলিক ট্রায়াল বাদ দিয়ে বানোয়াট-ভিত্তিহীন সাক্ষ্যগ্রহণ, অভিযুক্তদের কারো নামে ৭১’র পটভূমিতে কোনো প্রকার মামলা বা জিডি না হওয়া, এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৯৯৬ তে কোয়ালিশন গঠন, ক্রুটিপূর্ণ বিচারব্যবস্থা নিয়ে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অ্যামেনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আইনজীবিদের তীব্র প্রতিবাদ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অধ্যাপক গোলাম আযমের আর্শীবাদ চাওয়াসহ অনেকগুলো বিষয় রীতিমতো অবাক হওয়ার মতো। সাজানো বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে এগুলোই যথেষ্ট।
ইনশা-আল্লাহ, প্রিয় মোল্লা ভাই দেখা হবে জান্নাতের সিঁড়িতে
বিশ্বনন্দিত ইসলামিস্টরা পার্থিব জগতে কারো কাছেই মস্তক অবনত করেননি। হোক সে জামাল আবদেল নাসের কিংবা শেখ হাসিনার মতো সুপারস্টার ভিলেন! নেতাদের সাহসিকতা, ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা, অবিশ্বাস্য ধের্য্য, সবকিছুই আগামীদিনের ইসলামি আন্দোলনের দা’য়ীদের জন্য প্রেরণা রসদ হয়ে থাকবে। ইসলামি আন্দোলনের কর্মীরা একমাত্র মহান প্রভুরই মুখাপেক্ষী, কোনো ডিজিটাল তাগুতের নয়! নয় কোনো রাক্ষুসী নব্য ফেরাউনের!
মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম রবের কাছে ফরিয়াদ করেছেন,
“হে আমার রব আমার হাড় দুর্বল হয়ে গেছে, বার্ধ্যকে আমার মাথা সাদা হয়ে গেছে।
আমি তোমার কাছে চেয়ে কখনো ব্যর্থ হয়নি”
সাইয়েদ কুতুব শহীদ ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছেন,
“আমি এ প্রস্তাব শুনে অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হচ্ছি যে, মজলুমকে জালিমের নিকট ক্ষমার আবেদন জানাতে বলা হচ্ছে। আল্লাহর কসম! যদি ক্ষমা প্রার্থনার কয়েকটি শব্দ আমাকে ফাঁসি থেকেও রেহাই দিতে পারে, তবু আমি এরূপ শব্দ উচ্চারণ করতে রাজি নই”
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে জালিমদের জানান দিয়েছেন,
“মৃত্যুর ফায়সালা জমিনে নয়, আকাশে হয়ে থাকে”
আর আমাদের প্রিয় নেতা ও সবুরের প্রতীক কাদের মোল্লা ভাই বলেছেন, “আমার শাহাদাতের পর ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা যেন ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেয়”
একেই বলে ইসলামি বুনিয়াদ। বাংলাদেশে ধের্য্যের বীজ নতুন করে বুনে গেলেন মজলুম শহীদ কাদের মোল্লা। বাতিলের জন্য যা চিরকাল বুমেরাং হয়ে থাকবে। সময় ও প্রয়োজনের তাগিদেই সেটা টাইম টু টাইম প্রতীয়মান হবে।
আসলে মানবজীবনের গতিবিধি বড়ই রহস্যময়! কে জানত কৈশোরে ছুটে বেড়ানো আমিরাবাদেই লাশ হয়ে আবারও ফিরে আসতে হবে শহীদ কাদের মোল্লাকে। মাঝপথে সুপ্তাবস্থায় থাকবে জান্নাতের হাতছানি। মেধাবী এই ছাত্রনেতার ছাত্ররাজনীতির শুরুটা ছিল কার্ল মার্কসের রচিত কমিউনিজমে! ইসলামি ছাতার আশ্রয়ে এসে সাবেক বাম এই ছাত্রনেতার লাইফ স্টাইলে রাতারাতি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যায়। পাশাপাশি মেধার সাক্ষর রেখে গেছেন ছাত্রজীবনের প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায়। হীরা মনিকে ভুলতে পারেনা। তাই তো ঢাবির শহীদুল্লাহ হলের ইটগুলো আজও শহীদ মোল্লার চারিত্রিক মাধুর্য্যের জয়গান গেয়ে চলেছে।
সময়ের কসম। মাটির কসম। চলমান ইসলামি আন্দোলনের জীবন্ত একটি গোলাপের নাম শহীদ কাদের মোল্লা। বিপর্যস্ত সময়ে যিনি সহনশীলতার বাস্তব প্রতিভু। মিষ্টভাষীতার নজীরবিহীন প্রতিচ্ছবি। প্রিয় এই নেতাদের জন্ম ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলায় ১৯৪৮ সালের ২রা ডিসেম্বরে। ছোটবেলায়ই মেধার প্রখরতা লক্ষ করা যায় কিশোর কাদের মোল্লার মাঝে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ আবারও ধাক্কা দিয়েছেন মেধার সিঁড়িতে। পরে তিনি ফরিদপুরের বিখ্যাত রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও বি.এস.সি কমপ্রিট করে পাড়ি জমান প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র হয়ে জনাব কাদের মোল্লা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্স সম্পুন্ন করেন। কর্মজীবনে ঢাবির উদয়ন হাই স্কুল, রাইফেল পাবলিক স্কুল ও মানারত স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। মাঝে ইসলামিক ফাউন্ডেশনেও কিছুকাল চাকরি করেছেন।
তবে রাজনীতি ও সাংবাদিকতাই ছিল তার নেশা ও প্যাশন। তিনি বহুদিন দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরপর দুই বার ঐক্যবদ্ধ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। শহীদ মোল্লা ১৯৬৬ সালে ইসলামি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ছাত্রসংঘের শহীদুল্লাহ হল সভাপতি, ঢাবি সভাপতি, মহানগর সেক্রেটারী, পরে জামায়াতের ঢাকা মহানগর আমির, প্রচার সম্পাদক এবং সবশেষ কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেলের দায়িত্বপালনকালে নরাধম আওয়ামী সরকার বর্ণাঢ্য এই রাজনীতিকের উপর জুডিশিয়াল কিলিং মিশন চালায়। এছাড়াও তিনি ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামীলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ ও মোহাম্মদ নাসিমের সাথে যুগপৎভাবে রাজপথে আন্দোলনও করেছেন।
বুদ্ধিদ্বীপ্ত ইসলামিক স্কলার কাদের মোল্লার কূটনীতিক মহলেও ভালো আনাগোনা ছিল। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তার পরিচিতি চোখে পড়ার মতো। দৃঢ়চেতা এই নেতার মহান রবের উপর ছিল অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা। সময়ের ডাকে কিংবা চাহিদার দাবিতে সর্বদা নিবেদিত ছিল আমাদের প্রিয় মোল্লা ভাই। বিদায়ের অন্তিম প্রহরে কারাগার থেকেই স্ত্রীকে বলে যান, ‘তোমাদের অভিভাবক আল্লাহ। তুমি পরিবারকে দেখাশোনা করবে মাত্র। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তোমার এ দায়িত্ব পালন শেষ হওয়ার পরই যেন আল্লাহ তায়ালা তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসেন,।
শহীদ কাদের মোল্লা জালিমের আপোসকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছেন। ফাঁসির মঞ্চকে ন্যূনতম পরোয়া করেননি। বাংলার সবুজ-শ্যামল ভূমিকে কাঁদিয়ে বিদায় নিয়েছেন কাফেলার পরিচিত মুখ প্রিয় শহীদ মোল্লা ভাই। নিজের পবিত্র রক্ত দিয়ে কারাগারের প্রকোষ্ঠকে রঞ্জিত করে গিয়েছেন। যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১২ ডিসেম্বরের রাতটি চির অক্ষয় হয়ে থাকবে ভবিষ্যৎ ইসলামিস্টদের স্মৃতিস্পটে।
তবে এটা চিরন্তন সত্য মজলুমের পবিত্র রক্ত কোনো কালেই বৃথা যায়নি। কাজেই বৃথা যাবে না শহীদ হাসানুল বান্নার রক্ত, সাইয়্যেদ কুতুব শহীদের রক্ত, শহীদে মালেকের রক্ত, শহীদ কাদের মোল্লা ও শহীদ কামারুজ্জামানের রক্ত। ১৫ মার্চ ১৯৮২ সাল। মাত্র ২ দিন আগেই হায়েনার নৃশংসতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে শহীদ হয় ছাত্রশিবিরের তিনজন নেতা। ‘শোক করিয়া লাভ নাই শহীদি খুনের নজরানা চাই’ শিরোনামে সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় কলম ধরেছেন প্রিয় মোল্লা ভাই। তার লেখার শেষ উক্তিগুলো আজও অন্তরটি কাঁপিয়ে তুলে,
“ তোরি দেশের বাঁকে বাঁকে
লক্ষ শহীদ আজো ডাকে
তবু কি রইবি বেহুশ
আজি এ কথার জবাব যে চাই..”
জনাব মোল্লা ভাই জবাবটা কোনো সভা-মিছিল দিয়ে চাননি। শুধু চেয়েছেন ঈমানের আলোতে প্রজ্জ্বলিত রক্তের তাজা শহীদি খুনের নজরানা। বিধাতার কি লীলাখেলা শহীদি বাসনাদ্বীপ্ত সেই কাদের মোল্লা ভাই-ই সারা জীবনের আশান্বিত শহীদি পেয়ালা পান করে সোজা রবের কাছে চলে গেছেন। শেষ করব গোলাম মাওলা রনির প্রতি শহীদ কাদের মোল্লার বেদনাতুর চিঠিটি দিয়ে,
প্রিয় রনি,
“যদি কখনও সময় পাও এবং তোমার ইচ্ছা হয় তবে আমার ফাঁসির পর একবার হলেও বলো বা লিখো- কাদের মোল্লা আর কসাই কাদের এক ব্যক্তি নয়। আমার আত্মা কিয়ামত পর্যন্ত কাঁদবে আর কসাই কাদের তখন কিয়ামত পর্যন্ত অট্টহাসি দিবে”
আর কবি আল মাহমুদ সুর তুলেন,
“সভ্যতার তলদেশে যাদের ঘামের অমোঘ নদী ।
কোনদিন শুকোয় না । শুনো, তাদের কলরব ।
বন্দীরা জেগে উঠছে….”





আসসালামু আলাইকুম…………
ঈমান উজ্জীবিত হওয়ার মত আবেগঘণ লেখাটির জন্য আপনাকে ধন্বাদ, জাযাকাল্লাহ