তিন শীর্ষস্থানীয় নেতার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। দলের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর্যায়ে। অন্য নেতাদের মামলাও দ্রুত পরিণতির দিকে। পুরো দলই নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে। এ অবস্থায় দলের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ এবং বিকল্প নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে ভাবনায় পড়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ‘ধীরে চলার’ কৌশল নিয়ে আগাতে চায় জামায়াত। গতকাল সোমবার দলের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে ‘ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যার প্রতিবাদে’ সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি দিলেও তা আগের মতো সহিংস ছিল না। বস্তুত, রাস্তায় শক্তি না দেখানোর নীতিগত অবস্থান নিয়েছে জামায়াত। অবশ্য দলের এই অবস্থানের বিষয়ে দায়িত্বশীলদের কেউ নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি।
এর আগে গত বছরের নভেম্বর থেকে সহিংস প্রতিক্রিয়া জানানো শুরু করেছিল জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। বিশেষ করে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর অন্তত ২৮টি জেলায় ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও প্রতিকার কমিটির সভায় উপস্থাপিত হিসাবে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাত সদস্যসহ ১১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে তখন।
তবে এখন দলের নেতাদের মূল্যায়ন হচ্ছে, রাজপথে শক্তির মহড়া দেখানোর ফল ভালো হয়নি। এতে শক্তি ক্ষয়ের পাশাপাশি জনগণের মধ্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। তাই আগের মতো মারমুখী প্রতিক্রিয়া না দেখানোর ব্যাপারেই অধিকাংশের মত। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করে, জামায়াতের আগের শক্তি এখন নেই। নাশকতার মামলায় অনেকেই কারাগারে আছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও দলের আইনজীবী নেতা মশিউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কর্মসূচি আছে, নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়াও আছে। কিন্তু আগে মানুষ ভাবত, পুলিশ কয়টা গুলি করবে! এখন গুলি চালানোর ব্যাপারে পুলিশের কোনো বাছবিচার নেই। তা ছাড়া কর্মী-সমর্থকেরা তো দলের কাছে আমানতও।’
দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, দলের সাংগঠনিক কাঠামো ঠিক রাখতে শীর্ষ নেতা নির্বাচনে এখন থেকেই একাধিক বিকল্প ভাবনা শুরু করেছেন বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা। কারণ দলের নতুন-পুরোনো মিলিয়ে ২৩ সদস্যের নির্বাহী পরিষদের তিনজনের ফাঁসি হয়েছে, তিনজন মারা গেছেন, ছয়জন কারাগারে আছেন। একজন বিদেশে, আরেকজন দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়, আর বাকি নয়জন আত্মগোপনে আছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেপ্তার হন দলের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ। সেই থেকে শীর্ষ দুটি পদ চলছে ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দিয়ে। বর্তমানে মকবুল আহমাদ ভারপ্রাপ্ত আমির ও শফিকুর রহমান ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল। এর মধ্যে মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। তাই এখন সেক্রেটারি জেনারেল পদে কাউকে স্থায়ী মনোনয়ন দিতে হবে।
জামায়াতের নেতারা মনে করছেন, আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে মতিউর রহমান নিজামীরও সাজা হয়ে যেতে পারে। সে পর্যন্ত সেক্রেটারি জেনারেল পদে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা শফিকুর রহমান থাকতে পারেন। এরপর একসঙ্গে দলের শীর্ষ দুটি পদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হতে পারে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলের গঠনতন্ত্র মেনে নেতা নির্বাচন করা দুরূহ। সে ক্ষেত্রে মজলিশে শুরার অধিবেশন ডাকা এবং সারা দেশে রুকনদের (শপথধারী সদস্য) ভোট নিতে হবে। তাই নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একাধিক বিকল্প ভাবছেন নীতিনির্ধারকেরা।
সর্বশেষ গত বছরের জুলাই মাসে প্রকাশিত জামায়াতের গঠনতন্ত্রে দেখা যায়, ‘আমিরে জামায়াত’-সম্পর্কিত ১৫ নম্বর ধারায় (ঘ) উপধারা যুক্ত করে ভারপ্রাপ্ত আমিরের মেয়াদ অনির্দিষ্টকাল করা হয়েছে। তাতে বলা আছে, ‘কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বিবেচনায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমিরে জামায়াতের নির্বাচন অনুষ্ঠান যদি কিছুতেই সম্ভব না হয়, তা হইলে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত আমির কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার অনুমোদন সাপেক্ষে স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন।’ অবশ্য দলের গঠনতন্ত্রে তিন বছর অন্তর আমির নির্বাচন, আমির অনূর্ধ্ব ছয় মাসের জন্য দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করে একজন ভারপ্রাপ্ত আমির করা, নিযুক্ত আমির ছয় মাসের মধ্যে অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য নতুন আমির নির্বাচনের ব্যবস্থা করার কথাও উল্লেখ আছে।
নিজামী ও মুজাহিদ আবার মুক্ত হয়ে ফিরে আসবেন—এ আশায় গঠনতন্ত্র সংশোধন করে অনির্ধারিত সময়ের জন্য এ দুই পদে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চালানোর বিধান সংযোজন করা হয়েছিল। কিন্তু মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এবং নিজামীর মামলা চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকায় পরবর্তী আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচনের প্রক্রিয়া কী হবে, তা সামনে এসে পড়েছে। আবার এ দুই পদে কারা নেতা হবেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে একধরনের স্নায়ুচাপ চলছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মশিউল আলম বলেন, আমির শুরার সঙ্গে পরামর্শ করে সেক্রেটারি জেনারেল মনোনয়ন দেন। কিন্তু এখন আমিরও ভারপ্রাপ্ত। স্বাভাবিক অবস্থা না হলে মজলিশে শুরা ডাকা যাচ্ছে না। তাই আপৎকালীনের জন্য ম্যান্ডেট (অনুমোদন) নেওয়া আছে।
জামায়াতের গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা বলেন, দলের একটি অংশ মকবুল আহমাদকে আমির ও শফিকুর রহমানকে সেক্রেটারি জেনারেল পদে স্থায়ী করার কথা ভাবছে। নায়েবে আমির মুজিবুর রহমানকে আমির ও শফিকুর রহমানকে সেক্রেটারি করার মতও আছে। আবার একটি পক্ষ চায় শফিকুর রহমান আমির হলে দলের ঢাকা মহানগরের আমির রফিকুল ইসলাম খান যেন সেক্রেটারি জেনারেল হন।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, কারাবন্দী থাকলেও এত দিন মুজাহিদের পরামর্শেই দল পরিচালিত হতো। বর্তমানে যাঁরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁরা মুজাহিদের পছন্দের লোক। এর মধ্যে রফিকুল ইসলাম খানকে মুজাহিদের আস্থাভাজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে ডিঙিয়ে রফিকুল ইসলাম খানকে ঢাকা মহানগরের আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অবশ্য মশিউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত দিয়ে তো অনেক দলই চলছে। আমাদের চলতে অসুবিধা কোথায়।’
উৎসঃ দলের ভবিষ্যৎ ও নেতৃত্ব, বিকল্প চিন্তায় জামায়াত, সেলিম জাহেদ, প্রথম আলো, ২৪ নভেম্বর ২০১৫





