ভারত বাংলাদেশে কী চায়?

  1. ভারত বাংলাদেশে কী চায়?, আনু মুহাম্মদ , Alalodulal.org, 17 January 2014 

ভারত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে:

এরকম ধারণা সমাজে এখন বেশ জোরদার যে, ভারত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সকল সমর্থন প্রদান করেছে, তারা তাদের গোয়েন্দা সংস্থাসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে এই কাজে আগের চাইতে অনেক বিস্তৃতভাবে নিয়োজিত করেছে। সেকারণে দেশ ও বিদেশের সকল মত অগ্রাহ্য করে সরকার একতরফা নির্বাচন করতে সক্ষম হয়েছে। এতো বাধা বিপত্তির মধ্যে এরকম নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য যে মনোবল দরকার ছিলো তার অন্যতম যোগানদার ভারত। ভারতের সাহসেই এটা সম্ভব হয়েছে। সফলভাবে সরকারও গঠিত হয়েছে। ভারত শুধু যে সমর্থন দিয়েছে তাই নয়, অন্যদের সমর্থন আদায়ে প্রভাবও খাটিয়েছে।

ভারতপন্থী আর ভারতবিরোধী সবাই ভারতের স্বার্থ দেখেঃ 

আওয়ামী লীগ ভারতপন্থী আর বিএনপি ভারতবিরোধী এরকম সরল সিদ্ধান্ত সমাজে বেশ শক্তভাবে বিরাজ করলেও বিষয়টি এতো সরল নয়। ভিন্ন অনেক বিষয়ও আছে। কারণ বাংলাদেশে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় নীতি ও দুর্নীতির পথ গ্রহণে বিএনপি-জামাত কখনোই কার্পণ্য করেনি। যেকারণে বিএনপির শাসনামলে ভারতের বিনিয়োগ ও বাজার বৃদ্ধির রেকর্ড আওয়ামী আমলের চাইতে কম নয়। মার্কিন কোম্পানির কর্তৃত্বে ভারতে বাংলাদেশের গ্যাস রফতানি, বিপজ্জনক টাটা প্রকল্প এসবগুলোতেই চারদলীয় জোট সরকারের প্রবল আগ্রহ আমরা দেখেছি। জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে জনপ্রতিরোধের কারণেই বাংলাদেশ তখন বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। 

তাছাড়া এটা মনে রাখতে হবে যে, বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এডিবি যে নীতি সংস্কার এদেশে পরিচালনা করে তার প্রত্যক্ষ সুফলভোগী ভারতের বৃহত্‍ পুঁজি। পশ্চিমা বহুজাতিক পুঁজির সাথে এই পুঁজি এখন জৈবিকভাবে যুক্ত। সুতরাং যারা বিএনপি জামায়াতের মতো পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ অনুসারী, তাদের মুখে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ভারতের বিরোধিতার বাগাড়ম্বর শোনা যেতে পারে, কিন্তু তাদের নীতি ও পদক্ষেপ আখেরে ভারতের বৃহত্‍ পুঁজির স্বার্থই রক্ষা করে। এর থেকে ভিন্ন কোন ভূমিকা গ্রহণ বাংলাদেশের লুটেরা শাসক শ্রেণীর কোন দলের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাহলে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে ভারত মরিয়া এই ধারণা সমাজে তৈরি হচ্ছে কেনো? তৈরি হয়েছে আরও অনেক কারণের সাথে ভারত সরকারের কতিপয় মন্ত্রী, মিডিয়া এবং বাংলাদেশের সরকারের বিভিন্নজনের বক্তব্য ও ভূমিকা থেকে। একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত: হিন্দু পত্রিকার সঙ্গে আলোচনায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ (৩০ ডিসেম্বর ২০১৩)। তাঁর কথার সুর এরকম যে, বাংলাদেশ নিয়ে যথাযথ ভূমিকা নির্ধারণের এখতিয়ার ভারতেরই আছেভারতের অবস্থান অনুযায়ীই অন্যদের ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত!

ভারতকে বিরক্ত করা যাবেনাঃ 

বাংলাদেশ কি এখন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীনসহ নানা বৃহত্‍ শক্তির ভাগবাঁটোয়ারার ক্ষেত্র? ভারত কি বাংলাদেশকে পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়? বাংলাদেশকে কি ভারত তার উপগ্রহ বানাতে চায়? বাংলাদেশ কি ভারত হয়ে বিশ্বের সাথে যোগাযোগ রাখবে? অন্যান্য দেশকে কি ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ করতে হবে? শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ভারতের সমঝোতা কি এরকম যে, ভারত যে কোন মূল্যে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখবে আর তার বিনিময়ে ভারতের চাহিদা পূরণে যা যা দরকার তা বিনা প্রশ্নে বাস্তবায়ন করবে এই সরকার? গত কয়েকবছরে সরকারের ভূমিকা এসব প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ যুক্তিকে সমর্থন করে। সীমান্ত হত্যা, কাঁটাতারের বেড়া, ছিটমহল, টিপাইমুখ, ট্রানজিট, নদীর পানিবন্টন চুক্তি ইত্যাদি নিযে সরকারের ভূমিকা এমনকি কতিপয় মন্ত্রীদের বক্তব্য থেকে সবসময়ই মনে হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের চাইতে ভারতের শাসকদের স্বার্থ দেখার দায়িত্বই যেনো তাদের বেশি। মনে হয়েছে ভারত কখন বিরক্ত হয় সেটা নিয়েই তাদের উদ্বেগ

দখল ও স্বৈরশাসনের যৌক্তিকতা দিতে ‘মৌলবাদী জঙ্গী’ তৈরিঃ 

অনেকের মুখে শুনি, ভারতের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব এদেশের ‘মৌলবাদী জঙ্গী’ দমনের জন্য খুবই দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্য তৈরির পেছনেও একই যুক্তির কথা শোনা যায়। এই যুক্তি কিংবা অজুহাতে ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন সরকারের আমলে নানারকম চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, মহড়া ও আয়োজন আছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের’ ফ্যাসিবাদী যুগে বাস করছি। এই মডেল পুরো বিশ্বকেই এখন আতংকিত ও সন্ত্রস্ত করে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিশাল জনগণও নানাভাবে এর শিকার।পাকিস্তানের পরিস্থিতি এই মডেলের পরিণতি দেখাচ্ছে। এই মডেলে ঢুকিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ে নানা খেলা চলছে প্রায় একদশক ধরেই। এখন তা আরও জোরদার হয়েছে। দখল ও স্বৈরশাসনকে যৌক্তিকতা দেবার জন্য প্রয়োজনে ‘মৌলবাদী জঙ্গী’ তৈরি করার ঘটনাও এখন প্রমাণিত। ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলীও দেখায় যে, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রই এসব ‘মৌলবাদী জঙ্গী’ লালন পালন করে, তার পৃষ্ঠপোষকতা করে। এই মডেল প্রয়োগ করে, নিজ দেশের জনগণকে শৃঙ্খলিত রাখা দমনপীড়ন করা এবং বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করায় ভারতের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী।

ভারত বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বজায় রাখতে চায়ঃ

বলা হয়, ভারত বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষা ও এইদেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বজায় রাখতে সহযোগিতা করবে। কিন্তু ভারত বলতে তো সমরূপ কোন দেশ বোঝায় না। সেখানেও শ্রেণী, জাতি, বর্ণ ও লিঙ্গীয় বৈষম্য ও নিপীড়ন আছে প্রবলভাবে। তা বাংলাদেশ থেকে কোন অংশে কম নয়, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি। তাহলে যেদেশে সরকার সেইদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিককে নিপীড়ন ও বৈষম্যের মধ্যে রাখে তারা আরেক দেশে শান্তি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কী সহযোগিতা করতে পারে? তাছাড়া সাংবিধানিকভাবে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ হলেও এই রাষ্ট্রকে কোনভাবেই অসাম্প্রদায়িক বলা যায় না। সমাজের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী ভাবধারার ওপর ভর করেই সেখানে বিকশিত হয়েছে বিজেপি ও উগ্র ধর্মান্ধ হিংস্র বর্ণবাদী গোষ্ঠী। ভারতের সেই হিন্দুত্ববাদী জঙ্গী ‘মৌলবাদী’ বা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের দমন করবে কে? বাংলাদেশ ও ভারতে, দুই ধর্মের আবরণে হলেও, একটি আরেকটির অনিবার্য মিত্র কিংবা পুষ্টিদাতা। ভারতের নৃশংস সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সমার্থক নাম − নরেন্দ্র মোদী। গুজরাট দাঙ্গার সাথে তার সংশ্লিষ্টতা বহুভাবে প্রমাণিত হলেও আইনের রায়ে এখন তিনি নির্দোষ। এই রায়ের ফলে ‘দায়মুক্ত’ মোদীর এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে আর কোন বাধা নেই।

ভারত কি বাংলাদেশকে সিকিম বানাবেঃ  

এরকম আশংকাও সমাজে আছে। এরকম কোন সম্ভাবনা নেই। কেননা, এর চাইতে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কাজেরদায় নেই, সুবিধা বহুবিধ। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলাদেশকে ঘেরাও করে ভারতের শাসকেরা পুরো দেশের একমাথা থেকে অন্যমাথা নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় ট্রানজিট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। বাংলাদেশে গার্মেন্টস এখন ভারতের প্রভাব বাড়ছে, চার শতাধিক বায়িং হাউজ ভারতেরই। শিক্ষা, চিকিত্‍সা, মিডিয়া, বিনোদন জগতেও তাদের প্রভাব অনেক, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নানা আয়োজন চলছে। ভূমি ও বসতি বাণিজ্যেও অনেক প্রস্তাব আছে। বিদু্যত্‍ খাতে নিয়ন্ত্রণ আনার নানা প্রকল্প কাজ করছে। নদী বিনাশী আরও তত্‍পরতা আমরা দেখবো সামনে। বাণিজ্য অসমতা দূর করবার উদ্যোগ জোর পাবে না, বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা জুনিয়র পার্টনার হয়েই খুশি থাকবেন হয়তো

ভারতের বৃহত্‍ পুঁজির জন্য উপনিবেশ দরকারঃ 

তবে এইকালে এককভাবে উপনিবেশ রক্ষা ভারতের জন্য সম্ভব নয়। তার দরকার যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সমর্থন। ভাগবাঁটোয়ারায় খুশি হলে এই দেশগুলো ভারতের কর্তৃত্ব মেনে নিতে অসম্মত হবে না। জনগণের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্যই বরং দেখবো আমর।তখন বাংলাদেশের জনগণকেই ঐসব দেশের জনগণের সাথে সংহতি প্রতিষ্ঠা করে মোকাবিলা করতে হবে এই বাস্তবতাকে। বলাই বাহুল্য, লুটেরা শক্তির এই দল ঐদল সম্পর্কে মোহমুক্তি ছাড়া দাসত্বের নতুন পুরনো শৃঙ্খল থেকে আমাদের মুক্তি সম্ভব হবে না।

2. ভারতে বাংলাদেশ নিয়ে জরুরি কথা, আনু মুহাম্মদ, প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১৪

‘বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ কী জন্য বাড়ছে? এভাবে যদি বিদ্বেষ জমতে থাকে, তাহলে আপনি দুই দেশের জনগণের সংহতির যে প্রস্তাব রাখছেন, তা কী করে সম্ভব?’ কলকাতা ও দিল্লিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তিনটি সমাবেশে কথা হচ্ছিল ভারতের অনেক সংগঠক, লেখক, পরিবেশবাদী, রাজনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকের সঙ্গে।নিম্নোক্ত বিষয়ে আলোচনা ছড়ালঃ

রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রঃ

সুন্দরবন ধ্বংস করে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ করছে ভারতেরই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি। দ্বিতীয়ত, সুন্দরবন ভারতেও বিস্তৃত। বাংলাদেশের সুন্দরবন যদি ক্ষতবিক্ষত হয়, ভারতেও সুন্দরবন অক্ষত থাকবে না। এ ধ্বংসাত্মক কাজ ঠেকাতে ভারতের জনগণও ভূমিকা পালন করবে—এ প্রত্যাশা থেকেই এসব সভা।

বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মানুষ খুব কম জানেঃ

বাংলাদেশে ভারত সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যেসব বিষয়ে যুক্তিযুক্ত ক্ষোভ আছে, সেগুলো আপনারা হয়তো জানেন না। কারণ, আমরা ভারত সম্পর্কে যতটা জানি, সে তুলনায় আপনারা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেন অনেক কম। আপনারা আমাদের টিভি দেখতে পারেন না, বইপত্রও আসে খুব কম। আপনাদের মিডিয়ায় বাংলাদেশ সম্পর্কে সেসব খবরই গুরুত্ব পায়, যাতে মনে হয়, বাংলাদেশ ‘মৌলবাদ জঙ্গি’-অধ্যুষিত দেশ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে লড়াই ও চিন্তার খবর কমই আসে।

ভারতের নদী আগ্রাসনঃ

আপনারা অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম বইটির কথা জানতে পারেন, এটি নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের কথাও নিশ্চয়ই জানেন। কিন্তু জানেন না ভারতের ভারী যন্ত্রপাতি নেওয়ার জন্য সেই নদী আড়াআড়িভাবে ভরাট করা হয়েছিল। আপনারা জানেন না ভারতের পণ্য বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পার হয়ে ভারতেরই আরেক অঞ্চলে নেওয়ার জন্য নানা ব্যবস্থা করা হচ্ছে জনগণকে না জানিয়ে। এর জন্য বাংলাদেশের কী লাভ, কী ক্ষতি—সে সম্পর্কে সরকার জনগণকে পরিষ্কারভাবে কিছু জানায়নি।আপনারা জানেন না যে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের ক্ষতি কত দূর বিস্তৃত হয়েছে। এরপর আবার টিপাইমুখ বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করলে মানুষ কেন ক্ষুব্ধ হবে না? বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন ৫৪টি নদী নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি, তিস্তা নদী নিয়ে বিরোধ ঝুলে আছে।

কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্ত হত্যাঃ

বাংলাদেশের তিন দিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত সন্ত্রাসীদের ঠেকানোর নামে। তিন দিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরাও হয়ে থেকে বন্ধুত্ব কীভাবে সম্ভব? ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ইসরায়েল এ রকম বেড়া দিয়েছে। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কি সে রকম সম্পর্ক তৈরি করতে চায়? ভারতের মানুষ কি তা অনুমোদন করে? আরও বললাম, আপনারা সীমান্ত হত্যার খবর খুব কম জানেন।

ভারতের বিনিয়োগ আগ্রাসনঃ 

আপনারা জানেন না, ভারতের বিনিয়োগ বাংলাদেশে অগ্রাধিকার পেলেও ভারতে বাংলাদেশের বিনিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা মাত্র বছর খানেক আগে শিথিল করা হয়েছে, কিন্তু এখনো নানা বাধা-বিপত্তি বজায় আছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে আইনি পথে যেসব পণ্য আসে, তার চেয়ে বেশি আসে বেআইনিভাবে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ভারতে আইনিভাবে পণ্য নিতে গেলেও শত অশুল্ক বাধা।

রাষ্ট্র ও জনগণ সমার্থক নয়ঃ 

আলোচনায় প্রশ্ন এল, তাহলে এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার পথ কী? বললাম, এ পথ পেতে গেলে চিন্তার একটি অস্বচ্ছতা থেকে আমাদের মুক্ত থাকা দরকার। সেটি হলো, রাষ্ট্র ও জনগণ যে সমার্থক নয়, তা স্পষ্ট করা। ভারতের সরকার যা করছে, ভারতের শাসকশ্রেণী যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তার দায়দায়িত্ব ভারতের জনগণের নয়। যেমন আমাদের দেশের সরকার বা শাসকগোষ্ঠী যত অপকর্ম করে, তার দায়দায়িত্ব গ্রহণে আমরা রাজি নই। এ বিষয় সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য। অরুন্ধতী রায়ের হিসাবে, ভারতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল এখন সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সেই শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধেই। এটাই দুই দেশের মানুষের ঐক্যের জায়গা। কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণকে কি সব সময় আলাদা করে দেখা সম্ভব? বিশেষত বেশি শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন তুলনামূলকভাবে দুর্বল দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে নিয়োজিত থাকে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মানুষের পক্ষে এ রকম বিভাজন করা কঠিন হয়।শক্তিশালী দেশ নিজ দেশের জনগণকে যেমন অজ্ঞতা, তথ্য গোপন বা বিকৃত করে বিভ্রান্তির মধ্যে আটকে রাখতে চেষ্টা করে, তেমনি চেষ্টা করে সীমান্তের বাইরের জনগণের সঙ্গে দেশের মানুষের যোগাযোগের সুযোগ যতটা সম্ভব কম রাখতে। কলকাতা ও দিল্লির আলোচনায় তাই জোর দিয়ে বললাম, ভারতের জনগণ বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যবাদী অন্যায় তৎপরতার বিরুদ্ধে সরব হলে বাংলাদেশের মানুষও বুঝতে পারবে, ভারতের জনগণ তাদের সরকার বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অন্যায় কাজের শরিক নয়। (দেখুনঃ 50 years ago today, Indira Gandhi got the Indian Air Force to bomb its own people)

পাকিস্তান মানেই নির্যাতক সামরিক জান্তা নয়ঃ 

পাকিস্তান বাংলাদেশে গণহত্যা করেছিল। তাদের যুদ্ধাপরাধীদের এখনো বিচারের আওতায় আনা হয়নি। এখন পর্যন্ত পাকিস্তান তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেনি, উল্টো নানা ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে। তার পরও পরিষ্কার করে বলতে হবে যে পাকিস্তান মানেই নির্যাতক সামরিক জান্তা নয়। পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কৃষক-শ্রমিক-গরিব-নারী-পুরুষ-শিশু-শিক্ষার্থী নিজেরাও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিপীড়ন, নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার। সেখানে সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এখনো স্বাধীনতার চিন্তা লালন করছে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। 

ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রের আধিপত্যের ব্যাকরণ নির্ধারিত হয় নাঃ 

ভারতের শাসকশ্রেণীর এসব তৎপরতাকে পুঁজি করে বাংলাদেশে ধর্মপন্থী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিস্তারের চেষ্টা বরাবরই শক্তিশালী। ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানাভাবে ভূমিকা রাখে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কৌশলও তা-ই। কিন্তু ভারত মানেই কেবল হিন্দু নয়, বাংলাদেশ মানেই কেবল মুসলমান নয়। ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রের আধিপত্যের ব্যাকরণ নির্ধারিত হয় না। নেপাল হিন্দুপ্রধান রাষ্ট্র হলেও ভারতের কাছে তার অবস্থানের উন্নতি হয়নি। ভারতের নির্যাতিত মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠই হিন্দুধর্মাবলম্বী, পাকিস্তানে তারা মুসলমান। ধর্মের কারণে তাদের পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ধর্মপন্থী রাজনীতি বস্তুত স্বধর্মের মানুষকেই শৃঙ্খলিত করে প্রথম।

বস্তুত ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জাতিগত, বর্ণগত, শ্রেণীগত, লিঙ্গীয় ও আঞ্চলিক বৈষম্য-নিপীড়নের শিকার। দারিদ্র্য, সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতায় জর্জরিত। সামরিকীকরণে শৃঙ্খলিত ভারতের বিশাল খনিসমৃদ্ধ অঞ্চল। আরেক ভারত শাইনিং—দক্ষিণ এশিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তারে ব্যস্ত; নিজ দেশের মানুষের জীবন ও পরিবেশের বিনিময়ে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভবন করা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী।

এত সব বৈষম্য, অসম্মান ও আধিপত্যের ঘটনা থাকলে আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষমাত্রই তার প্রতিকার চাইবে। এ ক্ষোভকে ভারতবিরোধী বিদ্বেষ বা মৌলবাদীদের তৎপরতা হিসেবে চিত্রিত করা মানে মূল ইস্যুকে আড়াল করা। তাতে অবিশ্বাস ও বিদ্বেষের রাস্তাই প্রশস্ত হবে।

ভারতকে বুঝা সিরিজের বাকী পোস্টগুলো;

Leave a Reply