লিখেছেনঃ মাশরুর রাহীল
লেখার প্রেক্ষাপট এবং আমার পরিচয় শ্রদ্ধেয় ফরিদ রেজার সাম্প্রতিক ‘১৯৮২ সালের কথকতা’ শিরোনামের ধারাবাহিক লেখার প্রেক্ষিতে যে বিশ্লেষণ চলছে তার একটা সংযুক্তি বলা যেতে পারে এই লেখাকে। আমি জামায়াত বা শিবিরের দায়িত্বশীল পর্যায়ের কিছু ছিলাম না কখনও, এখনও এর থেকে অনেক দুরে অবস্থান করছি। তবে জামায়াত ঘরানার যা কিছু ঘটে তার একজন পর্যবেক্ষক। সেখান থেকেই এই বিশ্লেষণ পেশ করছি। আমি বর্তমানে ইউএসএ তে পিএইচডি অধ্যয়নরত আছি।
আমার লেখায় প্রথমে আনুগত্য, নেতৃত্ব এবং দল নিয়ে কথা বলব। তারপর ভালো নেতৃত্ব এবং ভালো অধীনস্তদের সম্পর্কের ক্যামিস্ট্রি তুলে ধরব। তারপর জামায়াত বা শিবির কেমন করছে তার ব্যাপারে কিছু অবরজার্ভেশন পেশ করব। সামনের দিনগুলোতে ইসলামী আন্দোলন কোন দিকে যাবে বা যাওয়া উচিত সেটা নিয়ে কথা বলব। সবশেষে, একজন বিশ্বাসী যে অবিশ্বাসীর মত ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের অধিকারী হতে পারে না তা সুরা বাক্বারার প্রথম দিকের কিছু আয়াতের বিশ্লেষণের মাধ্যমে করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
আনুগত্য, নেতৃত্ব এবং দলের কনসেপ্ট
পাশ্চাত্যে পড়াশুনা করতে এসে টিম (সংগঠন), টিম লীডার (নেতৃত্ব) এবং অবেডিয়েন্স (আনুগত্য) এর যে নজীর দেখেছি তাতে আমি যারপরনাই অবাক হই। ছোটবেলার এই শিক্ষাগুলোর বাস্তব প্রতিফলন আমি এখানে দেখতে পাই। কুরআন আজ থেকে ১৪শ বছর আগে এত দক্ষতার সাথে এবং গুরুত্বের সাথে এই বিষয়গুলো মুসলিমদের আত্নস্থ করিয়েছে যে এক কথায় অতুলনীয়। হাদীসের কথা থেকে জানি, তিনজন একসাথে থাকলেও একজনকে নেতা বানিয়ে নিতে বলা হয়েছে। ইসলাম ফ্যামিলির নেতৃত্ব পর্যন্ত ডিফাইন করে দিয়েছে। নেতৃত্ব কতক্ষণ থাকবে, কতদুর পর্যন্ত তার আনুগত্য করা যাবে, নেতার সাথে কর্মীর মতের অমিল হলে কি করতে হবে ইত্যাদি বিস্তারিত বিষয় কুরআন-হাদীসের বক্তব্যের ভিত্তিতে খুবই শক্ত ভিত্তির উপরে দাঁড় করানো সম্ভব। বাংলাদেশে জামায়াত-শিবির সেটার চমৎকার একটা কাঠামো দিতে পেরেছে এই দাবী করব না, তবে এই ম্যাসেজ ছোটবেলায় আমার পর্যন্ত পৌঁছেছে তাদের হাত ধরে। পাশ্চাত্যে কোন ব্যক্তি সম্পর্কে মূলায়ণের ব্যাপারে এটা একটা বড় ইস্যূ হয় যে, সেই ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁর দায়িত্বশীল (লীডার, যদিও দায়িত্বশীলের ইংরাজী লীডার নয়) কী বলে। কখনই উল্টাটা কেউ এক্সপেক্ট করে না।
সংগঠন পরিচালনায় ভাল নেতা এবং কর্মীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজের ধরণ
আমি শ্রদ্ধেয় ফরিদ রেজা এবং জামায়াত-শিবিরের তৎকালীন দায়িত্বশীলদেরকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। আমি বিশ্বাস করি এই দুই পক্ষ তাঁদের চিন্তার জায়গাগুলো থেকে সঠিক কাজটিই করে গেছেন। তবে কিছু ‘দুষ্টচক্রে’র কারণে সেই কাজগুলিতে শয়তান প্রভাব সৃষ্টির সুযোগ পেয়েছে। কে সেই দুষ্টচক্র- এটা বের করা প্রায় অসম্ভব এবং অপ্রয়োজনীয়। বরং সেই ঘটনার আলোকে বর্তমান দায়িত্বশীল এবং প্রাসঙ্গিক অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
একজন নেতার প্রাসঙ্গিক যে গুণটি প্রয়োজন তা হলো তার অধিনস্তদের কাছ থেকে সম্ভাব্য বেস্টটি তুলে নিয়ে আসতে পারার সক্ষমতা। অধিনস্তদের সম্ভাবনাকে ফ্লারিশ করা, গাইড করা, ধৈর্য্য ধরে শোনা। অন্য অনেক দরকারী গুণাবলীর সাথে যিনি এই কাজটি দক্ষতার সাথে করতে পারেন তারই নেতৃত্বে থাকা উচিত। একজন ভালো নেতার কথায় এবং কাজে তার অধিনস্ত সকলের মতের প্রতিফলন থাকবে এটাই স্বাভাবিক। যদি না থাকে তাহলে বুঝতে হবে পারস্পরিক যোগাযোগ কম। কোন একটা কিছুর দায়ভার অনেকাংশে দায়িত্বশীলের উপরে বর্তায়। এই সত্যটা জামায়াত-শিবিরের নেতৃবৃন্দ উপলব্ধি করেন বিধায় তাঁদেরকে শপথ অনুষ্ঠানে ভয়ে কেঁদে ফেলতে দেখেছি অসংখ্যবার। যে কেউ যখন নতুন কিছু সামনে নিয়ে আসে, একজন ভালো দায়িত্বশীল বুঝেন এটাই সেই দরজা যার মাধ্যমে তিনি নিজেকে এবং সেই সাথে সংগঠনকে আপগ্রেড করতে পারছেন। সংগঠন যেই শিক্ষা লালন করছে (একজন নেতা সেটার সূতিকাগার) এবং তার কর্মীরা যখন বিভিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকে সেই শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটায় এবং সেই ছড়িয়ে দেয়া শিক্ষায় কোন কিছু যুক্ত করে তখন তার চেয়ে ভালো আর কিছুই হতে পারে না। এভাবে সময়ের সাথে সংগঠন রিভাইভ হতে থাকে।
পক্ষান্তরে একজন ভালো কর্মীর প্রথম এবং অন্যতম প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত নেতার আনুগত্য করা (আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সা:) আনুগত্যের শর্তাধীনে)। নেতার কথা বুঝা, সেই কথার কনটেক্সট ধরার চেষ্টা করা (উল্টোটা এক্সপেক্ট করা অনেকক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। কারণ একজন নেতা তুলনামূলক বড় পিকচার মাথায় নিয়ে চলেন)। কর্মী হচ্ছে অনেকটা শিক্ষানবীশের মত। তাঁরা শিখছেন। এই পর্যায়ে তাঁরা অনেক ধরনের এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে দিয়ে যান। নিজেরাই নিজেদের চিন্তা-ভাবনাকে আপডেট করেন প্রতিনিয়ত (এগুলি একজন নেতারও মাথায় রাখা উচিত যে তাঁর কর্মীর এ চিন্তা দীর্ঘস্থায়ি নাও হতে পারে, সেক্ষেত্রে তাঁকে প্রোপার গাইড করলে চিন্তার ইভোল্যুশন ত্বরান্বিত হয়ে একটা প্রোপার শেপ পেতে পারে)। সবকিছুর পরও নেতা এবং কর্মীর দ্বন্দ থেকেই যেতে পারে। এর কারণ হতে পারে কর্মীর দৃষ্টি নেতার থেকে বড়, সেক্ষেত্রে নেতাকর্মী সুসম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা আছে (কারণ কর্মী দৃষ্টি গভীর হওয়ার কারণে সম্পর্কের ম্যাকনিজমটা বুঝতে পারছেন)। ২য় কারণ হতে পারে, কর্মী তাঁর কনটেক্সটকে বৃহত্তর ক্ষেত্রে পরিস্কারভাবে নিতে পারছেন না এবং বৃহত্তর পর্যায়ে কেমন ফিট করে সেটা দেখার ধৈর্য্যও তাঁর নেই। এমন অবস্থায় এ সম্পর্ক কর্মীর তরফ থেকে বিদ্রোহে রুপ নেয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই ব্যাপারটি তাৎক্ষণিক পরিস্কার না হলেও পরবর্তী কার্যক্রম থেকে বোঝা যেতে পারে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, একজন কর্মী যদি পরিস্কারভাবে নেতার পদস্খলন দেখেন তখন কী করবেন (ধরে নিচ্ছি নেতাকে সরানোর সবপ্রকারের উপায়-উপকরণ অবলম্বনের পরে)? এখানে একটি জবাবই হতে পারে, এই প্রক্রিয়ার কোন শেষ নেই। সব রকমের উপায় উপকরণ এক্সপ্লোর করা হয়নি, অথবা যেকোন কারণেই হোক আপনি ঐ দল বা সংগঠনে থাকার যৌক্তিকতা রাখেন না।
জামায়াত-শিবিরের কাজ মূলত লোক তৈরি করা
জামায়াত এবং শিবিরের সম্পর্ক কেমন? কাগজে কলমে তাঁরা পরিস্কার পৃথক সংগঠন। কিন্তু জামায়াত এবং শিবির যে আদর্শ লালন করে তা মূলত একই। এ কারণেই সংগঠন দুটি আলাদা হওয়াতে পারস্পরিক সম্পর্কে তেমন প্রভাব পড়ে না। উপরে নেতা এবং কর্মীর যে আলোচনা করলাম তার আলোকে বলা যায়, জামায়াত হচ্ছে শিবিরের নেতা। শুধু জামায়াতই নয়, আমি মনে করি অন্য দলের শীর্ষনেতৃত্বও শিবিরের আদর্শিক নেতা হওয়ার যোগ্য যদি তাঁদের চিন্তা-দর্শনে কোন পার্থক্য না থাকে। প্রসঙ্গত মনে পড়ছে, শিবিরের এক শিক্ষা-বৈঠকের কথা যেখানে প্রফেসর গোলাম আযম উপস্থিত ছিলেন। তাঁর অনেকগুলি কথার মধ্যে কেবল একটি কথায় শুধু মনে আছে। তিনি বলছিলেন, “বাংলাদেশে ৪টি সংগঠন লোক তৈরির কাজ করে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, ইসলামী ছাত্রশিবির, ইসলামী ছাত্রীসংস্থা এবং চাষী কল্যাণ সমিতি। এছাড়াও আরও সংগঠন আছে যেমন মসজিদ মিশন, ইসলামিক সেন্টার, আধুনিক প্রকাশনী ইত্যাদি। তবে এঁদেরকে লোক তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়নি।” খুব সম্ভবত এই চারটি সংগঠন এখনও এই কাজটিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অনেক রাজনৈতিক কর্মসূচীতে এই সংগঠনগুলির (বিশেষত জামায়াত এবং শিবির) নাম ঘুরে ফিরে আসলেও এবং নানামুখী ব্যস্ততা থাকলেও জনশক্তির অবস্থার খোঁজখবর নিলে সেই সত্যতার কিছুটা আভাস মেলে। সংগঠনের প্রাক্তনদের সাধারণত সেটা জানার সুযোগ হয় না বলে তাঁরা একধরনের পেরেশানিতে থাকেন। তবে অধিকতর রাজনৈতিক কর্মসূচীর অংশগ্রহণ সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীকে সমভাবে লোক তৈরির গুরুত্বপূর্ণ এই কাজকে স্মরণে রাখতে দেয় কিনা সেই প্রশ্নও রাখছি।
সেই সাথে এটাও মনে করি, জামায়াতের কাজের যে ধারা তা রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টার অনুকূল নয় (not specialized to change political system)। বরং, সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে মোটামুটিভাবে এটা কেবল লোকই তৈরি করে।
বিশ্ব কোনদিকে যাচ্ছে এবং জামায়াত কি করতে পারে?
বিশ্বের আজকের যে অবস্থান তার সব উপাদান অনৈসলামিক নয়। এটা একেবারেই প্রসিদ্ধ যে আজকের বিশ্ব জ্ঞানের যে ধারবাহিকতার ফল তার মধ্যে একটা বিশাল অংশে মুসলিম তথা বিশ্বাসীদের জ্ঞান চর্চা এবং পূর্বের জ্ঞানের (গ্রীকদের) নতুন করে পুনরুজ্জীবন জড়িত আছে। এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, যদি ইসলাম এ ধরায় না আসত তবে বর্তমান বিশ্বের চেহারা অন্যরকম হতো।
কিন্তু আপনি যদি বর্তমান বিশ্বের দিকে গভীরভাবে তাকান তবে এর অনেক ত্রুটি চোখে পড়বে। সবচেয়ে বড় ত্রুটি হচ্ছে প্রোপার মোটিভেশন। আধুনিক সভ্যতার মুলে বসে আছে আমেরিকা। অথচ, এই আমেরিকার প্রতি ৩ জনে ১ জন অবেসিটিতে ভূগছে। এই আমেরিকা ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দেশটিকে হাজার বছর পিছনে ঠেলে দিয়েছে। এরকম আরও হাজারটা স্ট্যাটিসটিক্স দেখানো যেতে পারে। এই ওয়ার্ল্ডের নিজেদের ম্যাকানিজমে এইসব থেকে বের হয়ে আসার জ্ঞান নাই। কাজেই অদূর ভবিষ্যতে এই বিশ্ব ডিক্লাইন করতে থাকবে ট্রু গাইডেন্স এর অভাবে। এর থেকে সার্থকভাবে উত্তরণের ম্যকানিজম ইসলাম উদ্ভসিত জ্ঞানে বিদ্যমান আছে। কিন্তু সেই চর্চাটা জোরে সোরে হচ্ছে না।
ইসলামি আন্দোলন ইসলামের অনেক মৌলিক বিষয়কে পুনরুজ্জীবন দান করেছে, দাওয়াতকে বেগবান করেছে। কিন্তু বর্তমান ওয়ার্ল্ড কাঠামোর সাথে খুব বেশি ব্যবধান তৈরি করে ফেলেছে পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয়ের পূর্বেই। কাজেই পূর্ণ এবং সঠিক ইসলামী রাষ্ট্র বিশ্বের কোথাও ইমার্জ হলে এই বিশ্ব মানবে না। মুহুর্তে গুঁড়িয়ে দিতে তাদের সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করবে যেমনটা মিশরে আমরা দেখছি। এই বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীও অনেক কিছু কম্প্রোমাইজ করেছে (যেমন তারা এখন আর বলে না যে, আল্লাহর আইন চাই এবং সৎ লোকের শাসন চাই)। কাজেই এখানে দুইটি চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে। এক, বর্তমান বিশ্বের সাথে এডাপ্ট করা; দুই, ইসলামের মুল তৌহিদবাদিতা থেকে দুরে সরে আসা। বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের গতি শ্লথ হওয়ার (অথবা কাঙ্খিত মান অর্জিত না হওয়ার) পিছনে প্রথম কারণ দায়ী আর ২য়টার কারণে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সংগঠন তার মুল শক্তি হারিয়ে ফেলছে।
ড. তারিক রামাদান একটি সাক্ষাতকারে বলছিলেন যে, ইসলামি সভ্যতার পতনের পরে সুন্নী মসলিমরা জ্ঞান চর্চাকে একেবারে গুটিয়ে কেবল ফিকহ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। পক্ষান্তরে, শিয়ারা অনেক ক্ষেত্রে সেই চর্চা জারি রেখেছে। ইউএসএ তে বড় বড় মুসলিম স্কলারদের তালিকা করলে অধিকাংশই পাওয়া যাবে ইরানি স্কলার। এমনকি সাদ্দামের প্রশাসনের যে ৫৫জনকে ইউএসএ মোস্ট ওয়ান্টেড এর তালিকা করে সেখানে ৩৬ জন ছিলো শিয়া (এই তথ্য পেয়েছি একজন ইরাকি সুন্নীর কাছ থেকে)। আজকের ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ও তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করে। যদিও এটা প্যাথেটিক যে, ইরানের পররাষ্ট্র নীতি কেবল শিয়াইজমকে প্রোমোট করে বলেই প্রতীয়মান হয়।
যাই হোক, মুল কথা হলো এই বিশ্ব এক সময় ইসলাম উদ্ভাসিত জ্ঞান এবং প্রজ্ঞায় কনভার্জ হবে। সেই সময়ের আগ পর্যন্ত পূর্ণ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। ইসলামি আন্দোলন এখন যেটা করতে পারে তা হলো সেই সময়ের উপযোগি স্বার্থক লোক তৈরির বর্তমান প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করা। সেজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (প্রাইমারি লেভেলকে ইম্ফ্যাসিস দিতে হবে বেশি), সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা এবং সাংগঠনিক লোক তৈরিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে যদি রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে থাকে। কাজেই রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের চেষ্টাও জারি রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমান ওয়ার্ল্ড কাঠামোর (এর সব উপাদান অনৈসিলামিক নয় অবশ্যই, এর সাথে ইসলামের অনেক কমন ব্যাপার রয়ে গেছে সেখান থেকে শুরু করতে হবে) সাথে সাংঘর্ষিক নয় এরকম একটি রাষ্ট্র কায়েমের চেষ্টা করা উচিত। এ লক্ষ্যে, রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য সংস্কার প্রস্তাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে জামায়াত ভিন্ন রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারে (কামারুজ্জামান সাহেবের চিঠি গুরুত্বপূর্ণ স্টার্টিং পয়েন্ট )।
আমার লেখার মুখ্য উদ্দেশ্য শ্রদ্ধেয় ফরিদ রেজা ভাইয়ের লেখার প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা আলোচনায় অংশ নেয়া। প্রাসঙ্গিকভাবে জামায়াতের করণীয় কি হতে পারে সেটা এই অনুচ্ছেদে আলোচনায় এসেছে। সংক্ষেপে আবার বলি, জামায়াত এবং বাকী ৩টি সংগঠন লোক তৈরির প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একে আরও যত ইচ্ছা পারা যায় সুন্দর করার চেষ্টা করতে পারে। সেই সাথে জামায়াত যদি মনে করে রাষ্ট্রব্যবস্থা অনুকূলে থাকলে (বিপ্লব কিন্তু অনেক পরে) একাজে গতি আসবে, তাহলে আরেকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারে যার উপরে লোক তৈরির দায়িত্ব থাকবে না।
বিশ্বাসী কখনই অবিশ্বাসীর মত ডাবল-স্ট্যান্ডার্ড (মুনাফিক) চরিত্রের হতে পারে না
সুরা ফাতিহাকে বলা হয় কুরআনের সারমর্ম। ব্যক্তিগতভাবে একজন মুসলিমের এটাই (ফাতিহাতে যা বলা হয়) একান্ত চাওয়া এবং সে দুআ’ই আমরা নামাজে প্রতিনিয়ত করি। এর পরেই সুরা বাক্বারা। প্রথম ২০ আয়াতের দিকে মনোযোগ দিতে বলব। প্রথম ৫ আয়াত এক পক্ষের লোকের জন্য, বাকী ১৫ আয়াত ভিন্নধর্মী লোকের জন্য।
মুত্তাক্বীরা বিশ্বাস করে,
১. কুরআন আল্লাহর কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই। (পৃথিবীতে এমন আর কিছুই নেই যাকে এবসল্যুট ট্রুথ হিসাবে মেনে নেয়া যায় ক্বুরআন ছাড়া। ক্বুরআনের প্রতিটি শব্দ, বাক্য সত্য। এর ইন্টারপ্রেটেশনে ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু বক্তব্যে কোন ভুল নেই। মুত্তাক্বীদের জন্য এই পাওনা একটা বিশাল পাওনা। এই ক্বুরআনের কথার উপর নির্ভর করে নিশ্চিন্তে সে তার ভিত্তি নির্মান করতে পারে।)
২. যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে। (অদৃশ্যে বিশ্বাস ঈমানের জন্য তো বটেই, জীবনের জন্যও ভীষণ প্রয়োজনীয়। জ্ঞানে মানুষ কখনই স্যাচুরেটেড হতে পারবে না। বিশাল একটা অদৃশ্য জ্ঞানের জগত আমাদের নাগালের বাইরে সবসময় থেকে যাবে। সেই জগত সম্পর্কে বিশ্বাস জীবনের ফাজিনেস (fuzziness) দুর করে দেবে। নিজেকে সবসময় জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে চালিত রাখবে যেটা আসলে আপনাকে মুক্তি দিবে।)
৩. নামাজ কায়েম করে।
৪. যে রিযিক আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন তা থেকে খরচ করে। (পৃথিবীতে কেউ ম্যাটারিয়েল এবং জ্ঞান সাথে নিয়ে আসে না। এ দুটিই একচ্ছত্র আল্লাহর। সে যা খরচ করে তা আল্লাহই তাকে দিয়েছেন।)
৫. সকল আসমানী কিতাবের উপর ঈমান আনে।
৬. আখিরাতে বিশ্বাস রাখে।
… এইসব মুত্তাক্বীরাই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারা সফলকাম।
বাকী ১৫ আয়াতে অবিশ্বাসী (উপরোক্ত বিষয়ে যাদের বিশ্বাস নেই) এবং দ্বৈত চরিত্রের লোকদের কথা বলা হয়েছে। এরা আল্লাহর সাথে এবং প্রথম পক্ষের সাথে ধোঁকাবাজি করে চলে। এরা মিথ্যা বলে। এদেরকে ফাসাদ সৃষ্টি না করার কথা বললে এরা বলে তারাই তো সংশোধনকারী। (প্রসঙ্গত বলে রাখা উচিত সংশোধনকারী হচ্ছেন আল্লাহ। আমরা অন্যদের জন্য বড়জোর সতর্ককারী হওয়ার যোগ্যতা রাখি।)
সোর্সঃ বিডিটুডে.নেট





সর্বোপরি আলোচনাটা প্রাসঙ্গিক হলেও রেজা ভাই যে পয়েন্টগুলোতে জামাত ও ছাত্রশিবিরের দিকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে ছুড়ে দিয়েছে, সেটা নিয়ে পয়েন্ট বাই পয়েন্ট আলোচনা প্রত্যাশা করি…….